আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে হঠাৎ উত্তাপ দেখা দিয়েছে। দীর্ঘদিন পর রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যকার সংকট ও টানাপোড়েন এখন প্রকাশ্যে আসছে। পাল্টাপাল্টি অভিযোগও উত্থাপিত হচ্ছে। নির্বাচন সামনে রেখে বড় দলগুলোর মধ্যে যে অনাস্থা ও বিভাজন তৈরি হয়েছে, তার প্রভাব ক্রমেই কেন্দ্র ছাপিয়ে তৃণমূল পর্যায়েও ছড়িয়ে পড়ছে। পরিস্থিতির উন্নতি না হলে নির্বাচনি প্রচারের সময় বড় সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় পার্টি এবং ১০-দলীয় জোটভুক্ত জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) এই চার পক্ষের পারস্পরিক অভিযোগ ও অবস্থান নির্বাচনি পরিবেশকে আরও জটিল করে তুলেছে। একদিকে বিএনপি নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে পক্ষপাতমূলক আচরণের অভিযোগ তুলছে; অন্যদিকে এনসিপি প্রকাশ্যেই বলছে, বর্তমান নির্বাচন কমিশন সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের সক্ষমতা হারিয়েছে। নির্বাচন পেছাতে একটি গোষ্ঠী ষড়যন্ত্র করছে বলেও আশঙ্কার কথা বড় দলগুলোর পক্ষ থেকে প্রকাশ্যে উচ্চারিত হচ্ছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় খবরের কাগজকে বলেন, ‘সব দলই নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। বিগত তিনটি নির্বাচনে জনগণ ভোট দিতে পারেনি। তাই জনগণ এবার ভোট দেবে। কিন্তু আমি নির্বাচনে জয়লাভ করতে পারব না বলে নির্বাচনে যাব না, এটা তো গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া নয়।’
তিনি বলেন, ‘শুধু সরকার, নির্বাচন কমিশন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী দিয়ে নির্বাচনের পরিবেশ সুষ্ঠু করা সম্ভব নয়। এখানে প্রত্যেক প্রার্থীর দায়িত্ব রয়েছে। ভোটারদের কাছে নিজেকে আকর্ষণীয় করে তুলতে হবে। তাদের ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসতে হবে।’
নির্বাচনি প্রস্তুতি শুরুর পর থেকেই বিভিন্ন সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোর বিরোধ বাড়তে থাকে। ভোটের কার্যক্রম চলাকালে বিএনপির প্রার্থী ও এনসিপির নেতাদের মধ্যে দফায় দফায় বাগবিতণ্ডার ঘটনাও ঘটেছে। জামায়াতের অভিযোগ, প্রশাসন একটি বিশেষ দলের (বিএনপি) প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ নেই। এ ছাড়া বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের মতোই জামায়াতের আমিরের জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একই ধরনের প্রটোকল দাবি করেছে দলটি। এনসিপির অভিযোগ, নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট ভূমিকা রেখে বিএনপির ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকত্ব থাকা কয়েকজন নেতার প্রার্থিতা বহাল রেখেছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।
অন্যদিকে বিএনপি শুরু থেকেই বলে আসছে, একটি বিশেষ গোষ্ঠী পরিকল্পিতভাবে দেশে নির্বাচন বানচাল করতে চায়। নির্বাচন ঘিরে সৃষ্ট সংকটের জন্য ওই গোষ্ঠীকেই দায়ী করছে দলটি। একই সঙ্গে পোস্টাল ব্যালটের মাঝখানে বিএনপির ‘ধানের শীষ’ প্রতীক যেভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে, তা নিয়েও নির্বাচন কমিশনে আপত্তি জানিয়েছে দলটি। বিএনপির নেতাদের আশঙ্কা, পোস্টাল ব্যালটের মাঝামাঝি স্থানে ধানের শীষ প্রতীক উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে রাখা হয়েছে। এর পেছেনে একটি বিশেষ দলের রাজনৈতিক অপকৌশল রয়েছে বলেও মনে করছে বিএনপি। এসব আপত্তির মুখে নির্বাচন কমিশন নতুন করে পোস্টাল ব্যালট ছাপানোর আশ্বাস দিলেও বিতর্ক থামেনি।
এই পরিস্থিতিতে রাজপথে সক্রিয় হয়ে উঠেছে বিএনপির সহযোগী সংগঠন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদল। টানা কয়েক দিন ধরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে নির্বাচন কমিশনের সামনে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেছে সংগঠনটি। গতকাল সোমবারও নির্বাচন কমিশন ভবনের সামনের প্রধান সড়ক অবরোধ করে ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভ করেন। সেখানে নির্বাচন কমিশনের সিদ্ধান্তকে পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রশ্নবিদ্ধ আখ্যা দিয়ে নানা অভিযোগ তোলা হয়।
সংগঠন থেকে তিনটি দাবি তোলা হয়। এর মধ্যে রয়েছে–১. পোস্টাল ব্যালটসংক্রান্ত বিষয়ে নির্বাচন কমিশন পক্ষপাতদুষ্ট ও প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, যা নির্বাচন প্রক্রিয়ার নিরপেক্ষতা নিয়ে গুরুতর সংশয় সৃষ্টি করেছে। ২. বিশেষ একটি রাজনৈতিক গোষ্ঠীর চাপের মুখে দায়িত্বশীল ও যৌক্তিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে হটকারী ও অদূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করছে ইসি, যা কমিশনের স্বাধীনতা ও পেশাদারত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ৩. বিশেষ রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ প্রভাব ও হস্তক্ষেপে শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ নির্বাচন বিষয়ে ইসি নজিরবিহীন ও বিতর্কিত প্রজ্ঞাপন জারি করেছে, যা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণতান্ত্রিক চর্চার জন্য অশনিসংকেত। দ্রুত দাবি মানা না হলে ইসির প্রধান ফটক অবরোধ করবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন ছাত্রদলের নেতা-কর্মীরা।
অবস্থান কর্মসূচিতে জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের সাধারণ সম্পাদক নাছির উদ্দিন নাছির জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখপাত্র ও সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে তার বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, আসিফ মাহমুদের হাজার হাজার কোটি টাকার দুর্নীতির বিষয় দেশে ‘ওপেন সিক্রেট’ এবং এসব অভিযোগের তদন্ত হওয়া উচিত।
ছাত্রদল ও বিএনপির আন্দোলনের জবাবে এনসিপি পাল্টা অভিযোগ তুলেছে। দলটি দাবি করছে, বিএনপি ও তাদের সহযোগী সংগঠনগুলো পেশিশক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে। নির্বাচন সুষ্ঠু না হলে দায় প্রধান উপদেষ্টাকে নিতে হবে। গতকাল রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন যমুনায় প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে সাক্ষাৎ শেষে এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম বলেন, ইসি ও মাঠ প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে নিরপেক্ষ আচরণ করা দরকার, তারা তা করছে না। ইসি পক্ষপাতদুষ্ট আচরণ করলে নির্বাচন নিয়ে শঙ্কা তৈরি হবে। সংবিধানের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিদের পক্ষে রায় দিয়েছে ইসি। বিএনপি ও ছাত্রদল ইসির সামনে মব তৈরি করেছে। সে কারণেই ইসি এমন রায় দিয়েছে। দ্বৈত নাগরিক ও ঋণখেলাপিরা নির্বাচনে অংশ নিক, তা আমরা চাই না। আমরা আদালতে যাব।
এনসিপির মুখপাত্র ও নির্বাচন পরিচালনা কমিটির চেয়ারম্যান আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া একাধিক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, বিএনপির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের পর নির্বাচন কমিশন ঋণখেলাপি ও দ্বৈত নাগরিকদের বিষয়ে একপক্ষীয় রায় দিয়েছে। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি নির্দিষ্ট দলের সঙ্গে বৈঠক করেই আপিলের সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়েছে। সাবেক এই উপদেষ্টা বলেন, নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা ও সক্ষমতার ওপর এনসিপির আর কোনো আস্থা নেই। ফলে জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা হবে কি না, সে বিষয়ে জোটের শরিকদের সঙ্গে আলোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এ বিষয়ে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. সৈয়দ আবদুল্লাহ মোহাম্মদ তাহের খবরের কাগজকে বলেন, ‘এনসিপির নির্বাচনের পুনর্বিবেচনার মন্তব্য তাদের নিজস্ব বিষয়। এটা নিয়ে আমাদের কোনো মন্তব্য নেই।’
এদিকে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের মুখ্য সংগঠক হাসিব আল ইসলাম নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে বিএনপি ও জামায়াতের দিকে ঝুঁকে পড়ার অভিযোগ তুলেছেন। তিনি দ্বৈত নাগরিকত্ব ও ঋণখেলাপির অভিযোগে অভিযুক্ত যেসব প্রার্থীর মনোনয়ন বৈধ ঘোষণা করা হয়েছে, সে ঘোষণা প্রত্যাহারের জন্য নির্বাচন কমিশনকে ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়েছেন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সিদ্ধান্ত পরিবর্তন না হলে কঠোর কর্মসূচির হুঁশিয়ারিও দেন তিনি। প্রসঙ্গত, এনসিপির শীর্ষ নেতারা আগে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের নেতৃত্বে ছিলেন।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজনৈতিক উত্তাপ শুধু কেন্দ্রেই সীমাবদ্ধ নেই। কেন্দ্রীয় পর্যায়ের এই সংকট ও অনিশ্চয়তা এখন তৃণমূল পর্যায়েও স্পষ্টভাবে প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। বিভিন্ন এলাকায় নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী বড় দলগুলোর প্রার্থীরা একে অন্যের সঙ্গে প্রকাশ্য বিতণ্ডায় জড়াচ্ছেন। কয়েকটি স্থানে এই বিতণ্ডা সহিংসতায় রূপ নিয়েছে। নির্বাচনি প্রচার শুরু হলে এসব সংঘাতে প্রাণনাশের ঝুঁকি অনেক বেড়ে যেতে পারে। তবে এসব ঘটনায় এখন পর্যন্ত প্রশাসনের কোনো দৃশ্যমান ও কার্যকর ভূমিকা লক্ষ করা যায়নি, যা নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করছে।
নির্বাচন পরিস্থিতি কোন দিকে যাচ্ছে–এমন প্রশ্নের উত্তরে জামায়াতের নায়েবে আমির ডা. তাহের কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এদিকে জোটের রাজনীতিতেও ভাঙনের সুর স্পষ্ট হয়েছে গত সপ্তাহেই। জামায়াতের নেতৃত্বে ইসলামী আন্দোলন জোটে থাকলেও প্রত্যাশিত আসন সমঝোতা না হওয়ায় দলটি এককভাবে নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। জোট ভাঙনের পর তৃণমূল পর্যায়ে জামায়াতের সঙ্গে ইসলামী আন্দোলন নেতা-কর্মীরা দ্বন্দ্বে জড়িয়েছেন, যা ভোটের মাঠে উত্তেজনা সৃষ্টি করেছে।
গত দুই দিনের ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছে জাতীয় পার্টি। দলটির আশঙ্কা, নির্বাচনপূর্ব ও নির্বাচনোত্তর সময়ে সরকার আদৌ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারবে কি না, সে বিষয়ে গুরুতর প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। এসব বিষয়ে জাপার মহাসচিব ব্যারিস্টার শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, নির্বাচন কমিশনের মতো একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের ভেতরে ও আশপাশে সহিংসতার ঘটনা গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য অশনিসংকেত। তার মতে, নির্বাচন কমিশনকে কেন্দ্র করে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়া নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা ও ভোটারদের নিরাপত্তা নিয়ে বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি করছে।
আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টির প্রধান মজিবুর রহমান মঞ্জু খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচন ইস্যুতে মাঠের রাজনীতিতে সামান্য উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। এতে কোনো সমস্যা নেই। কিছু বিশ্বাস-অবিশ্বাসের কারণেই এই উত্তেজনা। নির্বাচন নিয়ে কোনো শঙ্কা নেই। আমি আশা করি, নির্ধারিত সময়েই দেশে নির্বাচন হবে।’
বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সাবেক সাধারণ সম্পাদক রুহিন হোসেন প্রিন্স খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমরা শুরু থেকেই নির্বাচনি ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দাবি করেছিলাম। কিন্তু অন্তর্বর্তী সরকার সেটায় কর্ণপাত করেনি। ফলে শতভাগ গ্রহণযোগ্য নির্বাচন হবে না। তাই ন্যূনতম গ্রহণযোগ্য নির্বাচন নিশ্চিত করার জন্য আমাদের অগ্রসর হতে হবে। এখনো অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার হয়নি এবং সন্ত্রাসীদের গ্রেপ্তার করা হয়নি। ন্যূনতম ভোট গ্রহণ নিশ্চিত করা জরুরি।’ তিনি বলেন, কেউ যদি হীন উদ্দেশ্য নিয়ে নির্বাচনে অংশ না নেন, তাহলে কোনো প্রভাব পড়বে না।