‘সকাল সাড়ে ১০টায় লাইনে দাঁড়াই। তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে ট্রাকের কাছাকাছি আসি দুপুর দেড়টায়। কিন্তু পেছন ও সাইড থেকে হুড়োহুড়ি-গুতাগুতিতে ধাক্কা খেয়ে লাইনে টিকতে পারিনি। বাধ্য হয়েই সাইডে এসে পড়ি। অনেকেই ২ থেকে ৩ বার নিলেও আমি একবারও কিছু পাইনি।’ এভাবেই আনোয়ার খান মেডিকেল কলেজের কাছে মিরপুর রোডে শেখ জামাল খেলার মাঠের পূর্ব পাশে গতকাল ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশ-এর (টিসিবি) ট্রাকসেলে পণ্য কিনতে গিয়ে ভোগান্তির কথা বলেন কেরানীগঞ্জের ঘাটারচরের সুমি বেগম।
তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্বামীর আয়ে কুলায় না। তাই লোকমুখে শুনে কিছুটা কম দামে জিনিস কিনতে অনেক কষ্ট করে এখানে এসেছি। আসা-যাওয়ায় অর্ধেক দিন চলে গেছে। কিন্তু কোনো জিনিস পাব কি না জানি না।’
শুধু এখানেই নয়, রাজধানীর ফার্মগেট, কলেজগেট, আদাবর থানার সামনেসহ অন্য এলাকার ট্রাকসেলেও একই চিত্র দেখা গেছে। পুরুষরা ট্রাকসেলের লাইনে অপেক্ষা করলেও নারীরা হই-চই, হুড়োহুড়ি-গুতাগুতি করতে থাকেন। কে কার আগে জিনিস কিনবেন সেই যুদ্ধে মেতে ওঠেন। এমনকি কোনো কোনো জায়গায় স্যান্ডেল তুলে মারামারি, চুল ছিঁড়াছিঁড়ির ঘটনাও ঘটেছে। ডিলাররা বলছেন, পুরুষরা লাইনে দাঁড়ালেও নারীরা কিছুই মানছেন না। তারা পণ্য পেতে অস্থির হয়ে যাচ্ছেন। মাথা খেয়ে ফেলছেন।
রমজান মাসের মতো কোরবানি ঈদ উপলক্ষে রাজধানীসহ সারা দেশে টিসিবি স্বল্পমূল্যে চিনি, ডাল, তেল বিক্রির জন্য ১১ মে ‘ট্রাকসেল’ কার্যক্রম শুরু করেছে। তা চলবে ১০ দিন ধরে অর্থাৎ ২০ মে পর্যন্ত। টিসিবি জানিয়েছে, সারা দেশে ৪৫০টি ভ্রাম্যমাণ ট্রাকের মাধ্যমে প্রতিদিন পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। প্রতিটি ট্রাকে গড়ে ৪০০ জনের জন্য পণ্য বরাদ্দ থাকে। তবে অনেক স্থানে তার দ্বিগুণ তিন গুণ মানুষ লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। ফলে বিশৃঙ্খলা ও ভোগান্তির ঘটনা ঘটছে নিয়মিত।
শেখ জামাল খেলার মাঠের পূর্ব পাশে টিসিবির ট্রাকসেলের ডিলার মো. রহিম খবরের কাগজকে বলেন, ‘বেলা ১১টায় এখানে ট্রাক নিয়ে আসি। লাইনে দাঁড়িয়েছিলেন এমন ৩৩ জন পুরুষ ও ৬৮ জন নারীর হাতে সিরিয়াল নম্বর দেওয়া হয়। মাল দেওয়া শুরু করলে পুরুষরা ঠিকমতো লাইনে থাকলেও ১২টার পর নারীরা লাইনে হই-চই হুড়োহুড়ি-গুতোগুতি শুরু করে। তাদের বিশৃঙ্খলার কারণে পণ্য বিক্রি করতে বেগ পেতে হয়। ব্যাগসহ ৪৯০ টাকায় তিন পণ্য দেওয়া হচ্ছে।’
দেড়টার সময় আসলাম নামে একজন ক্রেতা বলেন, ‘১১টার দিকে এখানে এসে লাইনে দাঁড়ায়। আড়াই ঘণ্টা পর এই পণ্য পেলাম।’ রায়েরবাজার থেকে আসেন গৃহিণী রাইশন বেগম। তিনি এবার টিসিবির পণ্য নেওয়ার পরও লাইনে পাশে আবার হাতে টাকা নিয়ে অপেক্ষা করছেন দ্বিতীয়বার নেওয়ার জন্য। জানতে চাইলে তিনি বলেন, এটা পোলার (ছেলে) বাবার জন্য নিয়েছি। এবার আমি নিব। অন্য নারীরাও হাতে টাকা নিয়ে হুড়োহুড়ি করতে থাকেন। কে কার আগে নিতে পারেন সেই চেষ্টায় ব্যস্ত। এ সময় ডিলার মো. রহিম বলতে থাকেন, সবাই লাইনে দাঁড়ান। এলোমেলোভাবে থাকলে কাউকে পণ্য দেওয়া হবে না। তারপরও তারা হই-চই করতে থাকেন।
খামারবাড়ি খেলার মাঠের পাশে ট্রাকসেলেও হুড়োহুড়ির চিত্র দেখা গেছে। কেরানীগঞ্জের ওয়াশপুর থেকে আসা গৃহিণী হাজেরা বেগম বলেন, ‘সংসারে স্বামী নেই। ছেলে নেই। মেয়ে নিয়ে থাকি। খুব অভাব। বাধ্য হয়েই কিছুটা কম দামে পাওয়ার জন্য কষ্ট করে অনেক দূর থেকে এখানে এসেছি।’ এ সময় সরস্বতী নামে এক নারী এই প্রতিবেদককে বলেন, ঠেলাঠেলিতে লাইনে থাকতে পারিনি। বাধ্য হয়ে সাইডে চলে এসেছি। কখন পাব জানি না। আপনি একটু দেওয়ার ব্যবস্থা করেন।’
৪৮০ টাকায় ৩ পণ্য পেতে চলে যাচ্ছে অর্ধেক দিন
টিসিবির একটি ট্রাক সেলে তিন ধরনের পণ্য বিক্রি করা হচ্ছে। একজন ভোক্তা সর্বোচ্চ ২ লিটার ভোজ্যতেল, ১ কেজি চিনি ও ২ কেজি মসুর ডাল কিনতে পারছেন। এর মধ্যে প্রতি লিটার ভোজ্যতেল ১৩০ টাকা, প্রতি কেজি চিনি ৮০ টাকা ও প্রতি কেজি মসুর ডাল ৭০ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। সব পণ্য একসঙ্গে কিনলে একজন ক্রেতার লাগছে ৪৮০ টাকা। ব্যাগে নিলে আরও ১০ টাকা বেশি দিতে হচ্ছে ক্রেতাকে। মুদি দোকানে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এসব পণ্য কিনতে সর্বোচ্চ ৭৪৫ টাকা লাগে। অর্থাৎ সাশ্রয় হচ্ছে ২৬৫ টাকা। এই ২৬৫ টাকা কম দেওয়ার জন্য অধিকাংশ ক্রেতার অর্ধেক দিন চলে যাচ্ছে। কারণ বেলা ১১টায় ট্রাক সেলে এসব পণ্য বিক্রি শুরু করলেও ক্রেতারা আগে পাওয়ার আশায় সকাল থেকেই লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।