ভোরের আলো ফোটার আগেই ঘুম ভাঙে চা শ্রমিক অলকা রবিদাসের। মৌলভীবাজারের দেওড়াছড়া চা বাগানে বসবাস তার। সাংসারিক কাজ সামলে হাতে তুলে নেন মাটির ঘরের কোণে রাখা কাঁধে ঝোলানোর থলে। তারপর বেরিয়ে পড়েন চা বাগানের পথ ধরে। শিশিরভেজা পাতায় পা ছুঁয়ে যায়, আর কাঁধের থলে ধীরে ধীরে ভারী হয় সময়ের সঙ্গে। যেখানে জমে ওঠে শ্রম আর জীবন।
পর্যটনের শহর মৌলভীবাজারের বিস্তীর্ণ সবুজ চা বাগান যেন রং, ঘ্রাণ আর গল্পের এক অপূর্ব মিশ্রণ। এখানকার প্রতিটি চা পাতায় লুকিয়ে আছে অলকা রবিদাসের মতো চা শ্রমিকদের শ্রম, সময় আর শত বছরের ঐতিহ্য। তাই তো হাজারো পর্যটক আসেন চা বাগান দেখতে, অভিজ্ঞতা নিতে। পাশাপাশি চায়ের আস্বাদনে ডুবে যান তাদের অনেকেই।
দিনের পর দিন রোদে-পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে যারা পাতার পর পাতা তুলে আনেন, সেই চা শিল্পের শিল্পী চা শ্রমিকদের জীবনের গল্প ততটা আনন্দদায়ক নয়। এখানে আছে সবুজে মোড়া স্বপ্নময় এক জগৎ। তাদের শ্রমে তৈরি হয় যে চা, তা শুধু স্বাদে নয়, হৃদয়ের গভীরেও ছাপ রেখে যায়।
কিন্তু সেই চা কাপ অবধি আসা প্রতিটি পাতার পেছনে রয়েছে কঠিন বাস্তবতার গল্প। কর্মব্যস্ত নাগরিক জীবনের সব ক্লান্তি ভুলে জীবনের চলার পথে হাসি-কান্না, আনন্দ-বিষাদ- সবখানেই এক কাপ চা নিয়ে আসে গভীর তৃপ্তি।
চা শিল্পে জড়িতরা জানান, দিনের শুরুতেই চা পাতা সংগ্রহে মাঠে নামেন মূলত নারী শ্রমিকরা। কাঁধে ঝোলানো থলে, হাতে দ্রুত চলা আঙুল, প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা পাতা সংগ্রহে ব্যস্ত থাকে তারা। স্বল্প মজুরি, কঠিন পরিশ্রম আর সীমিত সুযোগ, চা শ্রমিকদের জীবনযাপন এখনো সংগ্রামে ভরা। পাতা সংগ্রহের পর তা নিয়ে যাওয়া হয় কারখানায়। সেখানে শুকানো, গুটানো, রোস্টিংসহ নানা ধাপে তৈরি হয় পরিচিত সেই চা।
দেওড়াছড়া চা বাগানের চা শ্রমিক অলকা রবিদাসের কণ্ঠে ছিল আক্ষেপের সুর। তিনি বলেন, ‘ভোর হইতেই বাগানে যাই, রোদ-বৃষ্টি যাই আসুক, পাতা তুলতেই হয়। এই পাতাগুলা আমার মতো শ্রমিকদের হাত দিয়া তোলা। পরে এই পাতা চায়ে রূপ নেয়, ভাবতেই ভালো লাগে। তবে যদি আরেকটু ভালো মাইনে পেতাম, জীবনটা সহজ হতো।’
কমলগঞ্জের মিরতিংগা চা বাগানের চা শ্রমিক জয়ন্তী কুর্মি বলেন, এত কষ্ট করি, কিন্তু মাইনে (মজুরি) খুবই কম। তবু চা বাগানই আমাদের জীবন। যারা বেড়াতে আসেন, তারা আমাদের সঙ্গে কথা বলেন, ছবি তোলেন, ভালোই লাগে। কিন্তু আমাদের কষ্টটা কয়জন বোঝে?
সম্প্রতি চায়ের রাজধানী শ্রীমঙ্গলে খবরের কাগজের প্রতিনিধি কথা বলেন কয়েকজন পর্যটকের সঙ্গে। তাদের একজন ঢাকা থেকে আসা কলেজ শিক্ষার্থী দেবাশীষ সরকার। তিনি বলেন, প্রতিদিনই চায়ের কাপে চুমুক দিই। কিন্তু এই প্রথম চা বাগানে এলাম। এত সুন্দর পরিবেশ, তবে চা শ্রমিকদের কাজ খুব কঠিন, তা নিজের চোখে না দেখলে বোঝা যেত না। তারা সত্যিই সম্মান পাওয়ার যোগ্য।
পাশে দাঁড়ানো বেসরকারি চাকরিজীবী রওনক জামান বলেন, প্রথমবার এসেছি মৌলভীবাজারে। এখানকার মানুষদের জীবন সংগ্রাম দেখে সত্যিই মুগ্ধ হয়েছি। এই সৌন্দর্যের পেছনে যে এত পরিশ্রম, তা কল্পনাও করিনি। এখানে আসার পর বুঝতে পারি, আমাদের প্রতিদিনের এক কাপ চায়ের পেছনে কত মানুষের শ্রম আর গল্প লুকিয়ে আছে। এখন থেকে চা শুধু স্বাদে নয়, শ্রদ্ধায়ও উপভোগ করব।
শ্রীমঙ্গলের ভানুগাছ রোডে কথা হয় খুলনা থেকে আসা একদল পর্যটকদের সঙ্গে। তারা ছোট চায়ের দোকানের বসে গল্প করছিলেন। তাদের একজন মাহিনুল হাসান। তিনি বলেন, শ্রীমঙ্গলে চা খাওয়ার অভিজ্ঞতা মানেই যেন প্রকৃতির কোলে বসে এক কাপ ঘ্রাণে-গন্ধে ভরা স্বপ্নের চা। চারপাশে সবুজ চা-বাগান, এসবের মাঝে হাতে ধরা এক কাপ ধোঁয়া ওঠা কাপ। যেন মুহূর্তেই মন ভালো করে দেয়।
কথার শেষে আরেকজন বলে উঠলেন, প্রথম চুমুকেই বোঝা যায়, কেন শ্রীমঙ্গলকে বলা হয় ‘চায়ের রাজধানী’। চায়ের স্বাদ এখানে শুধু জিভেই নয়, মনে গাঁথা থাকবে অনেক দিন।
সপরিবারে ঢাকা থেকে আসা পর্যটক নিশাত রহমান বলেন, আমরা যে চা খাই, সেই চায়ের পেছনে কত মানুষের শ্রম জড়িয়ে আছে তা বাগানে এসে বুঝলাম।
লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের মূল ফটকে কথা ঢাকা থেকে আসা পর্যটক দম্পতি সোহাগ ইসলাম ও নীতু চৌধুরীর সঙ্গে। তারা জানান, এখানকার চা শুধু পানীয় নয়, এটি সংস্কৃতির অংশ। পর্যটকদের কাছে চা এখন অভিজ্ঞতার নাম।
চা কাপ হাতে যখন আমরা গল্প করি, তখন মনে রাখা দরকার এই চায়ের প্রতিটি ফোঁটায় মিশে আছে মৌলভীবাজারের সবুজ বাগান, চা শ্রমিক আর দীর্ঘ ইতিহাসের নির্যাস, বলছিলেন স্থানীয় পরিবেশকর্মী ও লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান ইকো ট্যুর গাইড সাজু মারছিয়াং।
দিনশেষে ক্লান্ত পা দুটি অলকা রবিদাসকে ফিরিয়ে আনে সেই মাটির ঘরে। কাঁধ থেকে থলেটা নামিয়ে শরীরজুড়ে জমে থাকা ক্লান্তি যেন ঘরের দেয়ালে গা লাগিয়ে চুপ করে বসে থাকেন। তবু সেই ক্লান্ত চোখে জ্বলজ্বল করে প্রশান্তির আলো। এটাই তার দিন, এটাই তার জীবন। যেই জীবনে প্রতিটি চা কাপে মিশে থাকে তারও একটু স্বপ্ন, একটু নীরব ভালোবাসা।



