মাঘ মাস, ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে শীতটা একটু বেশি লাগে। ভোরের কুয়াশার ভেতর দিয়ে ঢাকা থেকে সকাল ৭টায় রওনা হয়ে ১০টায় পৌঁছে গেলাম টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার যাদবপুর গ্রামে। সেখানে কবি নজরুল পার্কে দেখা হলো পাথরকুচিগাছের সঙ্গে। যদিও এ দেশে পাথরকুচি কোনো দুর্লভ গাছ না। ছোটবেলায় অনেক বাড়িতে এ গাছটি দেখতাম। এখন সেভাবে আর গ্রামের বাড়িগুলোতেও পাথরকুচির গাছ চোখে পড়ে না। কৃমি হলে পাথরকুচি পাতার রস খাওয়াতেন ঠাকুমা। শিশুকালে পেটব্যথা কমাতেও এ পাতার রস কয়েকবার খেয়েছি। সেই পাতার রসটা খেয়ে বেশ আরামবোধ হতো। তখন ঠাকুমাও হয়তো ঠিক জানতেন না যে কৃমির কারণেও পেটে ব্যথা হতে পারে।
কবি নজরুল পার্কে নামফলকের পাশে লাগানো কয়েকটা পাথরকুচিগাছে ফোটা ফুলগুলোতে চোখ যেন আটকে গেল। যদিও পাথরকুচিগাছ সচরাচর চোখে পড়ে। তবে এর ফুল সহজে চোখে পড়ে না। কেননা শুধু শীতকালেই এই গাছে ফুল ফোটে। ফুলগুলো অন্য সব গাছের ফুলের মতো না। এ ফুল দেখতে বড়ই অদ্ভুত লাগে। গাছের মাঝখান থেকে একটা লম্বা ডাঁটির মতো পুষ্পদণ্ড খাড়া হয়ে ওপরে উঠে গেছে। সেই পুষ্পদণ্ডের মাথায় অধোমুখী হয়ে লণ্ঠনের মতো ঝুলছে গাঢ় লালচে গোলাপি রঙের ফুল। পুরো ফুলটাই ঝুলে থাকে মাটির দিকে মুখ করে।
ফুলগুলো লম্বা আঙুরের মতো থোকায় থোকায় ঝুলছে। ফুল প্রায় দেড় ইঞ্চি লম্বা। তবে ভেতরটা ফাঁপা। ফুলের বাইরের অংশ লালচে। তাতে রয়েছে লম্বা লম্বা সাদাটে আঁচড়ের মতো দাগ, এগুলো ফুলের বৃতি। চোঙ্গাকার চারটি বৃতির মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে ফুলের মেরুন লাল পাপড়ি। পাপড়িগুলোর গোড়া যুক্ত হলেও অগ্রভাগ খণ্ডিত বা বিযুক্ত। পাপড়ির ভেতরে লুকানো তার জননাঙ্গ। সেগুলো বাইরে থেকে চোখে পড়ে না। শীতকালে ফোটা এই ফুল থেকে গ্রীষ্মকালে পরিপক্ব ফল ও বীজ পাওয়া যায়।
পাথরকুচির গাছগুলো বেশ অদ্ভুত। সাধারণত গাছের বীজ বা ডাল থেকে চারা হয়। তবে পাথরকুচির চারা হয় পাতা থেকে। পাতাকে ভেজা মাটির ওপর শুইয়ে দিলে পাতার কিনারার প্রতিটি খাঁজ থেকে চারা বের হয়। বর্ষাকাল চারা গজানোর সবচেয়ে ভালো সময়। চারা ও গাছ কষ্ট সইতে পারে। বালি বা মাটি, কাঁকর বা নুড়ি যেখানেই হোক, পাথরকুচিগাছ বেঁচে থাকার চেষ্টা করে।
পাথরকুচি কেন এ গাছের নাম হলো? সেটা খুঁজতে গিয়ে কিছু মজার তথ্য পেলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম, পাথরের ফাঁকে ফাঁকে বা কংক্রিটের ওপরে জমা ময়লার মধ্যে এ গাছ জন্মাতে পারে বলে হয়তো এর নাম ‘পাথরকুচি’ হয়েছে। পরে দেখলাম, অয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য তার চিরঞ্জীব বনৌষধি বইয়ের চতুর্থ খণ্ডে পাথরকুচির আরও একটি নাম লিখেছেন, ‘পাষাণভেদ’। এটি পাথরকুচির সংস্কৃত নাম।
তিনি লিখেছেন, পাষাণভেদ নামের তাৎপর্য মনে হয় যে, দেহের ভেতরে বিশেষ আশয়ের অশ্ম অর্থাৎ পাথর হয়, তাকে ভিন্ন করে বা ভেঙে দেয় এই গাছ। তাই কি এর নাম পাষাণভেদ? পাষাণ মানে পাথর। আর ভেদ বা ভিন্ন অর্থ কুচি-কুচি করা। মূত্রথলির পাথরকে ভাঙতে সক্ষম পাথরকুচি। সেখান থেকেই মনে হয় এ গাছের বাংলা নামকরণ করা হয়েছে পাথরকুচি।
এ গাছের আরও তিনটি বাংলা নাম পেলাম। সেগুলো হলো পত্রিক পাথরকুচি, কফপাতা ও গাত্রপুরী। এ গাছের পাতার রস ঘি ও রসুন রসের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে কাশি ও সর্দির উপশম হয় বলেই কি এর নাম কফপাতা? ফার্সি ভাষায় সর্দিকে বলে কফ। ইংরেজি নাম Kalanchoe বা Love Bush উদ্ভিতাত্ত্বিক নাম Kalanchoe Pinnata ও গোত্র ক্রাসুলেসি। এ দেশে কালাঞ্চো গণের আরও চারটি গাছ রয়েছে। এগুলো হলো লাল পাথরকুচি (Kalanchoe Blossfeldiana), হাজার পাথরকুচি (Kalanchoe Diagremontiana), সেরা পাথরকুচি (Kalanchoe Heterophylla) ও হিমসাগর (Kalanchoe Laciniata)।
পাথরকুচি একটি চিরসবুজ বিরুৎজাতীয় নরম পাতা ও কাণ্ডবিশিষ্ট উদ্ভিদ। পাতা রসালো, পুরু, উপবৃত্তাকার, কিনারা খাঁজকাটা ও লালচে সবুজ। কাণ্ডের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত গিঁটে গিঁটে পাতা জন্মে। পাতা মাটিতে রেখে দিলে কিনারা থেকে চারার জন্ম হয়।
লম্বা ডাঁটির মতো পুষ্পমঞ্জরিতে ফুল ফোটে। ফুলের রং লালচে-কমলা, চারটি বৃতির রং লালচে সবুজ, লণ্ঠনের মতো দেখায়। পাথরকুচি মাদাগাস্কারের গাছ হলেও এ দেশে ঔষধি গাছ হিসেবে বেশ মানিয়ে গেছে। লিখতে গিয়ে শেষে মনে প্রশ্ন এল, কাজী নজরুল ইসলাম তার গানে কেন ‘পাথরকুচি হার’-এর কথা লিখলেন? নজরুল লিখেছেন, ‘তার ভুরুর ধনুক বেঁকে ওঠে তনুর তলোয়ার, সে যেতে যেতে ছড়ায় পথে পাথর-কুচির হার।’ পুষ্পদণ্ডে ফোটা ফুলগুলো দেখতে আসলেই কি রত্ন বা পাথরের টুকরোর মতো?