ঢাকা ২৩ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
মহেশখালীতে হিটস্ট্রোকে জেলের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সমঝোতা: ইসরায়েলের হাতে বিকল্প কী লতাপাতায় ঢাকা ২ কোটি টাকার সেতু, পাঁচ বছরেও শেষ হয়নি প্রকল্প গরমে কমেছে কাজের গতি নিজেই নিজেকে গড়ছে এআই, শঙ্কা অ্যানথ্রোপিকের বাংলাদেশ-তুরস্ক সম্পর্ক নতুন উচ্চতায় নিতে সম্মত খরা, বন্যা ও খাদ্যসংকটের ঝুঁকিতে ভারত, চীন ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া দিনাজপুরের: সুই-সুতো আর কি-বোর্ডে নির্যাতিত নারীদের নতুন স্বপ্ন পুতিনকে আলোচনায় বসতে জেলেনস্কির খোলাচিঠি রাজশাহী অঞ্চলে তাপপ্রবাহে হাঁসফাঁস দিল্লিতে ‘ককরোচ জনতাপার্টির’ বিক্ষোভ আজ ইসলামী ব্যাংকের কারণেই আরেকটি ৫ আগস্ট ঘটে যেতে পারে বায়ুদূষণে বদলে যাচ্ছে ভ্রূণের জিন জলাবদ্ধতা ও দুর্গন্ধে নাকাল ঘিওর বাজার ছায়ানটে শুরু হলো দুই দিনের নজরুল উৎসব রাজধানীবাসীকে ফেরাতে সিটি বাসও গেছে ঢাকার বাইরে ৬ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ৬ জুন: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল মে মাসে মব হামলায় নিহত ৩২: এমএসএফ ‘নতুন পুরাতন মিলিয়ে ভালোই বোর্ড হবে’ শাহজালালের কার্গো শেডে আগুন শূন্যরেখায় মানবেতর জীবন শিকলবাহায় হত‍্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মরদেহ নিয়ে মহাসড়কে বিক্ষোভ অ্যালামনাই প্ল্যাটফর্ম ০২০৪ ব্যাচের বন্ধুদের ঈদ পরবর্তী পুনর্মিলনী মায়ানমারে পাচারকালে দেড় হাজার বস্তা সিমেন্ট আটক ৫২ মরুভূমিতে বিকল ট্রাক, পানির অভাবে ৪৯ জনের মৃত্যু মেধা ও ক্রীড়াবান্ধব জাতি গঠনে সরকার বহুমুখী কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে: ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী নোয়াখালীতে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের মিছিল আর্জেন্টিনা-ব্রাজিল ভক্তদের শোডাউন সরকারকে ৭ দিনের আলটিমেটাম ইনকিলাব মঞ্চের
Nagad desktop

লণ্ঠনের মতো পাথরকুচি ফুল

প্রকাশ: ২৪ জানুয়ারি ২০২৫, ১১:০৭ এএম
আপডেট: ২৪ জানুয়ারি ২০২৫, ১১:০৭ এএম
লণ্ঠনের মতো পাথরকুচি ফুল
শীতা ফোটা পাথরকুচি ফুল। ছবি: লেখক

মাঘ মাস, ঢাকার চেয়ে ঢাকার বাইরে শীতটা একটু বেশি লাগে। ভোরের কুয়াশার ভেতর দিয়ে ঢাকা থেকে সকাল ৭টায় রওনা হয়ে ১০টায় পৌঁছে গেলাম টাঙ্গাইলের সখিপুর উপজেলার যাদবপুর গ্রামে। সেখানে কবি নজরুল পার্কে দেখা হলো পাথরকুচিগাছের সঙ্গে। যদিও এ দেশে পাথরকুচি কোনো দুর্লভ গাছ না। ছোটবেলায় অনেক বাড়িতে এ গাছটি দেখতাম। এখন সেভাবে আর গ্রামের বাড়িগুলোতেও পাথরকুচির গাছ চোখে পড়ে না। কৃমি হলে পাথরকুচি পাতার রস খাওয়াতেন ঠাকুমা। শিশুকালে পেটব্যথা কমাতেও এ পাতার রস কয়েকবার খেয়েছি। সেই পাতার রসটা খেয়ে বেশ আরামবোধ হতো। তখন ঠাকুমাও হয়তো ঠিক জানতেন না যে কৃমির কারণেও পেটে ব্যথা হতে পারে।

কবি নজরুল পার্কে নামফলকের পাশে লাগানো কয়েকটা পাথরকুচিগাছে ফোটা ফুলগুলোতে চোখ যেন আটকে গেল। যদিও পাথরকুচিগাছ সচরাচর চোখে পড়ে। তবে এর ফুল সহজে চোখে পড়ে না। কেননা শুধু শীতকালেই এই গাছে ফুল ফোটে। ফুলগুলো অন্য সব গাছের ফুলের মতো না। এ ফুল দেখতে বড়ই অদ্ভুত লাগে। গাছের মাঝখান থেকে একটা লম্বা ডাঁটির মতো পুষ্পদণ্ড খাড়া হয়ে ওপরে উঠে গেছে। সেই পুষ্পদণ্ডের মাথায় অধোমুখী হয়ে লণ্ঠনের মতো ঝুলছে গাঢ় লালচে গোলাপি রঙের ফুল। পুরো ফুলটাই ঝুলে থাকে মাটির দিকে মুখ করে।

ফুলগুলো লম্বা আঙুরের মতো থোকায় থোকায় ঝুলছে। ফুল প্রায় দেড় ইঞ্চি লম্বা। তবে ভেতরটা ফাঁপা। ফুলের বাইরের অংশ লালচে। তাতে রয়েছে লম্বা লম্বা সাদাটে আঁচড়ের মতো দাগ, এগুলো ফুলের বৃতি। চোঙ্গাকার চারটি বৃতির মুখ থেকে বেরিয়ে এসেছে ফুলের মেরুন লাল পাপড়ি। পাপড়িগুলোর গোড়া যুক্ত হলেও অগ্রভাগ খণ্ডিত বা বিযুক্ত। পাপড়ির ভেতরে লুকানো তার জননাঙ্গ। সেগুলো বাইরে থেকে চোখে পড়ে না। শীতকালে ফোটা এই ফুল থেকে গ্রীষ্মকালে পরিপক্ব ফল ও বীজ পাওয়া যায়।

পাথরকুচির গাছগুলো বেশ অদ্ভুত। সাধারণত গাছের বীজ বা ডাল থেকে চারা হয়। তবে পাথরকুচির চারা হয় পাতা থেকে। পাতাকে ভেজা মাটির ওপর শুইয়ে দিলে পাতার কিনারার প্রতিটি খাঁজ থেকে চারা বের হয়। বর্ষাকাল চারা গজানোর সবচেয়ে ভালো সময়। চারা ও গাছ কষ্ট সইতে পারে। বালি বা মাটি, কাঁকর বা নুড়ি যেখানেই হোক, পাথরকুচিগাছ বেঁচে থাকার চেষ্টা করে।

পাথরকুচি কেন এ গাছের নাম হলো? সেটা খুঁজতে গিয়ে কিছু মজার তথ্য পেলাম। প্রথমে ভেবেছিলাম, পাথরের ফাঁকে ফাঁকে বা কংক্রিটের ওপরে জমা ময়লার মধ্যে এ গাছ জন্মাতে পারে বলে হয়তো এর নাম ‘পাথরকুচি’ হয়েছে। পরে দেখলাম, অয়ুর্বেদাচার্য শিবকালী ভট্টাচার্য তার চিরঞ্জীব বনৌষধি বইয়ের চতুর্থ খণ্ডে পাথরকুচির আরও একটি নাম লিখেছেন, ‘পাষাণভেদ’। এটি পাথরকুচির সংস্কৃত নাম।

তিনি লিখেছেন, পাষাণভেদ নামের তাৎপর্য মনে হয় যে, দেহের ভেতরে বিশেষ আশয়ের অশ্ম অর্থাৎ পাথর হয়, তাকে ভিন্ন করে বা ভেঙে দেয় এই গাছ। তাই কি এর নাম পাষাণভেদ? পাষাণ মানে পাথর। আর ভেদ বা ভিন্ন অর্থ কুচি-কুচি করা। মূত্রথলির পাথরকে ভাঙতে সক্ষম পাথরকুচি। সেখান থেকেই মনে হয় এ গাছের বাংলা নামকরণ করা হয়েছে পাথরকুচি।

এ গাছের আরও তিনটি বাংলা নাম পেলাম। সেগুলো হলো পত্রিক পাথরকুচি, কফপাতা ও গাত্রপুরী। এ গাছের পাতার রস ঘি ও রসুন রসের সঙ্গে মিশিয়ে খেলে কাশি ও সর্দির উপশম হয় বলেই কি এর নাম কফপাতা? ফার্সি ভাষায় সর্দিকে বলে কফ। ইংরেজি নাম Kalanchoe বা Love Bush উদ্ভিতাত্ত্বিক নাম Kalanchoe Pinnata ও গোত্র ক্রাসুলেসি। এ দেশে কালাঞ্চো গণের আরও চারটি গাছ রয়েছে। এগুলো হলো লাল পাথরকুচি (Kalanchoe Blossfeldiana), হাজার পাথরকুচি (Kalanchoe Diagremontiana), সেরা পাথরকুচি (Kalanchoe Heterophylla) ও হিমসাগর (Kalanchoe Laciniata)।

পাথরকুচি একটি চিরসবুজ বিরুৎজাতীয় নরম পাতা ও কাণ্ডবিশিষ্ট উদ্ভিদ। পাতা রসালো, পুরু, উপবৃত্তাকার, কিনারা খাঁজকাটা ও লালচে সবুজ। কাণ্ডের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত গিঁটে গিঁটে পাতা জন্মে। পাতা মাটিতে রেখে দিলে কিনারা থেকে চারার জন্ম হয়।

লম্বা ডাঁটির মতো পুষ্পমঞ্জরিতে ফুল ফোটে। ফুলের রং লালচে-কমলা, চারটি বৃতির রং লালচে সবুজ, লণ্ঠনের মতো দেখায়। পাথরকুচি মাদাগাস্কারের গাছ হলেও এ দেশে ঔষধি গাছ হিসেবে বেশ মানিয়ে গেছে। লিখতে গিয়ে শেষে মনে প্রশ্ন এল, কাজী নজরুল ইসলাম তার গানে কেন ‘পাথরকুচি হার’-এর কথা লিখলেন? নজরুল লিখেছেন, ‘তার ভুরুর ধনুক বেঁকে ওঠে তনুর তলোয়ার, সে যেতে যেতে ছড়ায় পথে পাথর-কুচির হার।’ পুষ্পদণ্ডে ফোটা ফুলগুলো দেখতে আসলেই কি রত্ন বা পাথরের টুকরোর মতো?

কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জরি

প্রকাশ: ০৫ জুন ২০২৬, ০৮:৪৮ এএম
আপডেট: ০৫ জুন ২০২৬, ০৯:১১ এএম
কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জরি
ঢাকার রমনা উদ্যানে ফোটা কৃষ্ণচূড়া ফুল। ছবি: লেখক

যুবক বয়সে শোনা লতা মঙ্গেশকরের একটি গানের পঙ্‌ক্তিগুলো এখনো কানে বাজে যখন চোখের সামনে পড়ে কৃষ্ণচূড়া ফুলেরা। গানটি হলো–‘কৃষ্ণচূড়া শোন শোন শোন।/ সারাবেলা দোলায় তোকে/ ক্ষ্যাপা হাওয়া যে!/ ক্ষ্যাপা হাওয়া যে!/ তার পায়ের শব্দ যায় না শোনা/ পাতার আওয়াজে,/ তোর পাতার আওয়াজে।’ কবি কাজী নজরুলের গানেও শুনি সে সুরের আভাস, কথার ইন্দ্রজাল–‘পিয়াল বনে উঠল বাজি তোমার বেণু ছড়ায় পথে কৃষ্ণচূড়া পরাগ-রেণু’ নজরুলের অন্তত ৯টি কবিতা ও গানে কৃষ্ণচূড়া ফুলের উল্লেখ পাওয়া যায়। 

কবি নজরুলের অন্য একটি গানে কৃষ্ণচূড়া ফুল যতটা খ্যাতি পেয়েছে, ততটা খ্যাতি মনে হয় আর কোনো গান বা কবিতায় পায়নি, গানের পঙ্‌ক্তিগুলো হলো–‘কৃষ্ণচূড়ার রাঙা মঞ্জরি-কর্ণে।/ আমি ভুবন ভুলাতে আসি গন্ধে ও বর্ণে / মোরে চেন কি?/ মোর আঁচলে চাঁপা, হেনা যুঁই অতসী।/ মোর বনের সাজিতে ভরা পলাশ বকুল/ নব আমের মুকুল,/ মম উত্তরী ঝলমল কিশলয় পর্ণে /’

কদম যেমন বর্ষার দূত, কৃষ্ণচূড়া তেমন গ্রীষ্মের। পঞ্জিকার পাতা না দেখে ফুল ফোটা কৃষ্ণচূড়া গাছ দেখে বোঝা যায় গ্রীষ্ম এসেছে। রৌদ্রদগ্ধ তপ্ত দিনের উত্তাপ যেন কৃষ্ণচূড়া ফুলেরা আরও বাড়িয়ে দেয়। লাল ও কমলা লাল ফুলগুলোকে দেখে মনে হয় কৃষ্ণচূড়া ফুল যেন কারও লজ্জা চুরি করে হয়েছে রক্তিম লাজবতী অথবা রোদ মেখে হয়েছে রৌদ্রবতী। কৃষ্ণচূড়া ফুল একদিকে যেমন প্রেমের, অন্যদিকে দ্রোহের প্রতীক। নজরুলের একটি অগ্রন্থিত ‘আবীর’ কবিতায় সে দ্রোহের ইশারা দেখি–
‘আবীর ছড়াও, আবীর ছড়াও, হে বীর তরুণদল,
নিরক্ত এই ধরা হোক পুন রক্তাক্তোজ্জ্বল।
পুষ্পাকীর্ণ পন্থা দেখাও কন্থা-জড়িত জীবে;
জ্বালাও অশোক কৃষ্ণচূড়ার শিখা, দীপ গেছে নিভে।’ 

ঢাকা শহরটি বড়ই অদ্ভুত ও আশ্চর্যময়। কৃষ্ণচূড়া ফুল ফোটার দিনে সড়ক-মহাসড়কগুলো যেন সেজে ওঠে সেসব রক্তিম ফুলে। নবীন সবুজ চিরল চিরল পাতার ফাঁকে ফাঁকে দলা দলা ফুল আর ফুল–আহা কি দাহ দিনের উষ্ণ আমন্ত্রণ! মুগ্ধ বিস্ময়ে শুধু তাকিয়ে থাকি সুবিশাল বৃক্ষের চূড়ায় পরা ফুলগুলোর দিকে। চন্দ্রিমা উদ্যান ও তার পাশের সড়ক, হাতিরঝিলের পাড় ধরে হাঁটতে থাকলে মনে হয় এ শহর বুঝি কৃষ্ণচূড়ার। আমাদের দেশের গাছ না সে, এসেছে সুদূর আফ্রিকার মাদাগাস্কার থেকে। ১৮২৪ সালে মাদাগাস্কার থেকে কৃষ্ণচূড়া যায় মরিশাসে, সেখান থেকে ইংল্যান্ড এবং আরও পরে বিস্তার ঘটে দক্ষিণ এশিয়ায়। অথচ বিদেশি গাছ হয়েও কীভাবে সে মানিয়ে গেছে এ দেশের প্রকৃতিতে, মনে হয় যেন সে আমাদেরই গৃহকন্যা।

কৃষ্ণচূড়া বিশাল বৃক্ষ, গোড়ায় ডানাওয়ালা অধিমূল, মাথায় ছাতার মতো ছড়ানো ডালপালা। তবে বছরের সব সময় গাছের চেহারা পত্রসুশোভিত ছত্রাকার থাকে না। শীতে সব পাতা ঝরে যায়। নিষ্পত্র সেসব গাছ দেখে মন খারাপ হয়ে যায়। শীতের শেষে বসন্তে আবার গাছ ভরে ওঠে কচি পত্রপল্লবে। বসন্তের পর গ্রীষ্মে ফুলগুলোর কাছ থেকে শোনা যায় গ্রীষ্মের আগমনী গান। চিরল চিরল সবুজ পাতা আর উজ্জ্বল লাল রঙের থোকা ধরা ফুল বড়ই মনোমুগ্ধকর। ফুলের পাঁচটি পাপড়ির মধ্যে চারটি পাপড়ি এক রকম, কিন্তু মাঝখানের একটি বড় ও অন্য রকম, হলদে-সাদা ছোপযুক্ত। শিগোত্রীয় গাছ, তাই বড় চ্যাপ্টা শিমের মতো ফল হয়, ফলের ভেতর বাদামি রঙের বীজ হয়। বীজ থেকে সহজে চারা হয়। বাগানের জন্য এ গাছ ভালো হলেও পথতরু হিসেবে ঝুঁকিপূর্ণ, কেননা এর ডালপালা খুব নরম। ঝড়-বাতাসে সহজে ভেঙে পড়ে। এতে পথচারীরা হতাহত হতে পারেন।

কৃষ্ণচূড়া গাছের ডালপালা চারদিকে ছড়ানো। গাছ ১০ থেকে ১৮ মিটার লম্বা হয়। থোকা ধরে টকটকে লাল রঙের ফুল ফোটা শুরু হয় এপ্রিলে, বর্ষাকালেও কিছু ফুল দেখা যায়। ফুল শেষে শিমের মতো চ্যাপ্টা বাদামি ও কাষ্ঠল বড় ফলের ভেতরে বীজ গঠিত হয়। বীজ থেকে গাছ হয়। পথতরু ও উদ্যানতরু হিসেবে লাগানো হয়। কৃষ্ণচূড়ার ইংরেজি নাম পিকক ফ্লাওয়ার, উদ্ভিদতাত্ত্বিক নাম Delonix regia ও গোত্র ফ্যাবেসি, উপগোত্র সিসালপিনিয়েসি। ডেলোনিক্স গ্রিক শব্দ, যার অর্থ থাবার মতো। ফুল দেখতে থাবার মতো। সম্ভবত সে জন্যই এর প্রজাতিগত নামের প্রথমাংশ রাখা হয়েছে ডেলোনিক্স রেজিয়া, যার অর্থ রাজকীয়। এটি যে রাজকীয় ফুল সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। তবে কাঠ যেন ততটাই মূল্যহীন, একমাত্র জ্বালানি কাঠ বা লাকড়ি ছাড়া এর আর তেমন উল্লেখযোগ্য কোনো ব্যবহার নেই। যে কোনো প্রান্তরে বা প্রশস্ত প্রাঙ্গণে রোপিত কৃষ্ণচূড়ার দীর্ঘ সারি খুবই মনোরম।

লেখক: কৃষিবিদ ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞ

বরিশালের পদ্মপুকুর: ‘প্রকৃতির রাজ্যে’ প্রবেশে বাধা

প্রকাশ: ০৪ জুন ২০২৬, ০৮:৫৪ এএম
আপডেট: ০৪ জুন ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
বরিশালের পদ্মপুকুর: ‘প্রকৃতির রাজ্যে’ প্রবেশে বাধা
ছবি : খবেরর কাগজ

কয়েক একরের বিশাল দিঘিজুড়ে সবুজের মেলা, তার মাঝে মাথা উঁচিয়ে আছে হাজারও বিরল শ্বেতপদ্ম। অথচ ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে বরিশালের এই বিখ্যাত পদ্মপুকুরের সৌন্দর্য দেখতে এসে হতাশ হয়ে ফিরে গেছেন অসংখ্য দর্শনার্থী। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) হঠাৎ করেই বন্ধ করে দিয়েছে ঐতিহ্যবাহী এই স্থাপনায় প্রবেশ। প্রায় এক মাস ধরে কার্যকর থাকা এই সিদ্ধান্তের কারণে স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রকৃতিপ্রেমীদের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

বরিশাল শহরের রাজাবাহাদুর সড়কে বিআইডব্লিউটিএর বিশ্রামাগার ‘হিমনীড়’-সংলগ্ন পুকুরটিতে প্রতিবছর এই সময়ে শ্বেতপদ্মে ছেয়ে যায়। ঈদের ছুটিতে দূর-দূরান্ত থেকে আসা অনেক দর্শনার্থীকে দেখা গেছে, সীমানাপ্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়ে শ্বেতপদ্মের সৌন্দর্য দেখছেন। কয়েকজন কিশোরও ভেতরে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকলেও সুযোগ পায়নি। অনেকে আক্ষেপ করছেন, বছরের এই একটি সময়ে ফোটা বিরল শ্বেতপদ্মগুলো কাছ থেকে দেখার সুযোগ থেকে তাদের বঞ্চিত করা হচ্ছে।

পরিবার-পরিজন নিয়ে পদ্মপুকুর দেখতে আসা মাহবুব মাসুম নামে এক প্রবাসী বলেন, ‘শনিবার অনেক আশা নিয়ে সন্তানদের এই ঐতিহাসিক পুকুরটি দেখাতে এনেছিলাম। কিন্তু গেটে থাকা আনসার সদস্যরা আমাদের ভেতরে ঢুকতে দেননি। বাধ্য হয়ে প্রাচীরের বাইরে দাঁড়িয়েই বাচ্চাদের ফুল দেখালাম।’

ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি আরও বলেন, ‘এত সুন্দর ও দর্শনীয় একটি জায়গা সাধারণ মানুষের জন্য এভাবে পুরোপুরি বন্ধ করে দেওয়া কোনোভাবেই ঠিক হয়নি। বরিশালের এই অনন্য প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে সবার জন্য উন্মুক্ত রাখা উচিত।’

পুকুরটির পাহারায় নিয়োজিত আনসার সদস্যরা জানান, কর্তৃপক্ষের কঠোর নির্দেশেই তারা কাউকে ভেতরে প্রবেশ করতে দিচ্ছেন না। তাদের দাবি, কিছু দর্শনার্থী ভেতরে ঢুকে পদ্মফুল টেনে ছেঁড়েন এবং আশপাশের বাগানের ক্ষতি করেন। এ ছাড়া কিছু অপ্রাপ্তবয়স্ক ও তরুণ-তরুণী দীর্ঘসময় ধরে ভেতরে বসে আপত্তিকর আচরণ করেন। মূলত এই সামাজিক পরিবেশ রক্ষা ও ফুল বাঁচানোর তাগিদেই বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল শাখার নির্বাহী প্রকৌশলী আমজাদ হোসাইনের নির্দেশে এই সিদ্ধান্ত কার্যকর করা হয়েছে।

তবে বিআইডব্লিউটিএর এই যুক্তিকে ‘অজুহাত’ বলে উড়িয়ে দিয়েছেন স্থানীয় সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। বরিশাল সাংস্কৃতিক সংগঠন সমন্বয় পরিষদের সাধারণ সম্পাদক শহীদুল ইসলাম শিশির এই সিদ্ধান্তের তীব্র বিরোধিতা করে বলেন, ‘এই পদ্মপুকুর বরিশালের একটি অন্যতম ঐতিহ্যবাহী স্থাপনা। এখানকার শ্বেতপদ্ম অত্যন্ত বিরল প্রজাতির। ফলে এই সৌন্দর্য উপভোগ করা ও দেখার নাগরিক অধিকার সবার আছে।’

তিনি আরও যুক্তি দেন, ‘পুকুরটির ঠিক পাশেই বিআইডব্লিউটিএর প্রকৌশল কার্যালয় এবং তাদের ঐতিহাসিক বাংলো ‘হিমনীড়’ অবস্থিত। সেখানে সার্বক্ষণিক আনসার ও নিরাপত্তাকর্মীরা ডিউটি করেন। এত নজরদারির মধ্যে কিশোর-কিশোরী বা যুবকদের পক্ষে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত কর্মকাণ্ড করা প্রায় অসম্ভব। আর যদি এমন কিছু ঘটেও থাকে, তবে তা শক্ত হাতে দমন করার দায়িত্ব তো নিরাপত্তাকর্মীদেরই।’

শহীদুল ইসলাম শিশির পরামর্শ দেন, প্রয়োজনে সিটি করপোরেশনের কাছ থেকে অতিরিক্ত নিরাপত্তারক্ষী চাওয়া যেতে পারে কিংবা আরও আনসার সদস্য নিয়োগ করা যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা সমাধানের নামে দর্শনার্থীদের ভেতরে ঢুকতে না দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের কাজ নয়। এর ফলে নতুন প্রজন্ম নিজেদের ইতিহাস ও প্রকৃতির সুন্দর একটা অংশ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

তবে বরিশাল নদীবন্দর কর্মকর্তা মো. আসাদুজ্জামান ইমন অবশ্য বিষয়টিকে দেখছেন ঐতিহ্য সংরক্ষণের অংশ হিসেবে। তিনি বলেন, ‘পদ্মপুকুরের ঐতিহ্য ও সৌন্দর্য সংরক্ষণের স্বার্থেই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এটি বিআইডব্লিউটিএর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা। দর্শনার্থীরা সীমানাপ্রাচীরের বাইরে থেকে পুকুরের সৌন্দর্য উপভোগ করতে পারবেন।’

ইতিহাসের পাতা ওল্টালে জানা যায়, ব্রিটিশ আমলে নগরের বান্দ রোড এলাকায় প্রায় সাড়ে পাঁচ একর জায়গাজুড়ে স্টিমার কোম্পানির কার্যালয় স্থাপন করা হয়। ১৯৬৫ সালে মেরিন ওয়ার্কশপের তৎকালীন ব্যবস্থাপক জার্মান নাগরিক মি. ইলিনগর বিশেষভাবে শ্বেতপদ্মের চারা সংগ্রহ করে পুকুরে রোপণ করেন। এর পর থেকেই পুকুরটি ‘পদ্মপুকুর’ নামে পরিচিতি পায়। প্রতিবছর এপ্রিল থেকে জুলাই পর্যন্ত পুকুরজুড়ে শ্বেতপদ্মের সমারোহ দেখতে ভিড় করেন প্রকৃতিপ্রেমী ও দর্শনার্থীরা।

মঈনুল ইসলাম সবুজ/ খাদিজা রুমি/

স্নিগ্ধ রং ও সুবাসের বেলি ফুল

প্রকাশ: ০৩ জুন ২০২৬, ০৮:০৭ এএম
স্নিগ্ধ রং ও সুবাসের বেলি ফুল
ময়মনসিংহের কাচারিঘাটের নার্সারিতে ফোটা বেলি ফুল। ছবিটি সম্প্রতি তোলা। ছবি: লেখক

স্নিগ্ধ সাদা রং, মন-মাতানো সুবাস আর অতুলনীয় কোমলতার এক অপরূপ প্রতীক হলো বেলি ফুল। এর মোহনীয় সুবাস আর ধবধবে সাদা পাপড়ি বাঙালির হৃদয়ে এক বিশেষ জায়গা করে নিয়েছে। বেলির বৈজ্ঞানিক নাম Jasminum sambac,  এটি  Oleaceae  পরিবারের একটি  জনপ্রিয় সপুষ্পক উদ্ভিদ। এই ফুলের আদি নিবাস  দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া। বাঙালির উৎসব, সংস্কৃতি আর দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে এই ফুল জড়িয়ে আছে ওতপ্রোতভাবে। 

বেলি মূলত একটি মাঝারি আকৃতির গুল্মজাতীয় বা লতানো গাছ। এর পাতাগুলো গাঢ় সবুজ, চকচকে এবং ডিম্বাকৃতির হয়ে থাকে। বেলি ফুল সাধারণত গুচ্ছাকারে ফোটে।  পাপড়ির বিন্যাসের ওপর ভিত্তি করে বেলি ফুল কয়েক জাতের হয়। এক পাপড়ির বেলি আকারে কিছুটা ছোট  এবং এর সুবাস অত্যন্ত তীব্র হয়। মাঝারি বেলিতে  পাপড়ির স্তর কিছুটা বেশি থাকে। থোকা বেলি গোলাপের মতো ঘন পাপড়িযুক্ত এবং আকারে বেশ বড় হয়।
গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহে যখন প্রকৃতি ক্লান্ত হয়ে পড়ে, ঠিক তখনই বেলি ফুল ফোটার ধুম পড়ে। মূলত গ্রীষ্ম ও বর্ষাকাল বেলি ফুল ফোটার প্রধান সময়। বিকেলের ম্লান আলোয় এই ফুল ফুটতে শুরু করে এবং সন্ধ্যার পর এর সুবাস চারপাশ মুখরিত করে তোলে। বেলি ফুল চাষের জন্য উষ্ণ ও আর্দ্র আবহাওয়া সবচেয়ে উপযোগী। রোদেলা জায়গায় এই গাছ দ্রুত বৃদ্ধি পায়। সাধারণত দোআঁশ মাটিতে বেলি ভালো হয়। বছরের চৈত্র মাস থেকে শুরু করে বর্ষাকাল পর্যন্ত বেলিফুল ফোটার প্রধান সময়। কাটিং বা কলমের মাধ্যমে খুব সহজেই এই ফুলের বংশবিস্তার করা যায়। বিশেষ করে বর্ষাকালে ডাল কেটে মাটিতে পুঁতে দিলেই নতুন চারা গজিয়ে ওঠে।

শীতকালে বেলি গাছ একপ্রকার সুপ্তাবস্থায় থাকে। তাই শীতের শেষে (ফেব্রুয়ারি-মার্চ মাসে) গাছের ডালপালা হালকা ছাঁটাই করে দিলে বসন্ত ও গ্রীষ্মে প্রচুর নতুন কুঁড়ি আসে।

বেলি শুধু বাগানের সৌন্দর্যই বাড়ায় না, এর অর্থনৈতিক গুরুত্বও অপরিসীম। বাণিজ্যিক ভিত্তিতে বেলি ফুলের চাষ করে অনেকেই স্বাবলম্বী হচ্ছেন। বাঙালির যেকোনো উৎসব, বিয়ে বা ধর্মীয় অনুষ্ঠানে বেলি ফুলের মালা এক অপরিহার্য অনুষঙ্গ। নারীদের খোঁপার শোভা বর্ধনে কিংবা ঘরের সৌন্দর্য বাড়াতে এর জুড়ি মেলা ভার। এর তীব্র ও মনমাতানো ঘ্রাণের জন্য পারফিউম, কসমেটিকস এবং ধূপকাঠিতে বেলিফুলের নির্যাস ব্যবহার করা হয়। বিভিন্ন ধর্মীয় উপাসনায় বেলিফুল পবিত্রতার প্রতীক হিসেবে ব্যবহৃত হয়। বেলি ফুলের সুগন্ধি তেল (Jasmine Essential Oil) অত্যন্ত মূল্যবান। এটি নামি-দামি পারফিউম, সাবান, সুগন্ধি তেল এবং বিভিন্ন প্রসাধন সামগ্রী তৈরিতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। আয়ুর্বেদ ও লোকজ চিকিৎসায় বেলির পাতা ও ফুলের ব্যবহার রয়েছে। এর সুবাস মানসিক চাপ ও ক্লান্তি দূর করতে সাহায্য করে। অনেক দেশে বেলির শুকনা পাপড়ি দিয়ে সুগন্ধি ‘জেসমিন টি’ বা চা তৈরি করা হয়, যা স্বাস্থ্যের জন্য উপকারী, হজমে সাহায্য করে। এ ছাড়া এর পাতা ও শিকড় নানা চর্মরোগ সারাতে আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

আমাদের সাহিত্যে ও গানে বেলিফুলের উপস্থিতি বিশাল। বেলিফুল নিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাল্মিকী প্রতিভা গীতিনাট্যে  লিখেছেন, 

‘বেলি ফুল, বেলিফুল,
কার খোঁপায় হবি ব্যাকুল
কার গলায় মালিকা হয়ে
সুবাস দিবি আকুল করে।’ 
বেলিফুল কিন্তু ফিলিপিন্সের জাতীয় ফুল। সেখানে একে বলা হয় ‘সাম্পাগুইতা’ (Sampaguita)। এটি সেখানে বিশুদ্ধতা ও বিশ্বস্ততার প্রতীক হিসেবে গণ্য হয়।

শহুরে ব্যালকনি বা ছাদবাগান থেকে শুরু করে গ্রামীণ উঠোন—সবখানেই বেলি ফুল তার আপন মহিমায় উজ্জ্বল। এর সরল সৌন্দর্য এবং তীব্র ও স্নিগ্ধ সুবাস আমাদের মনকে সতেজ করে তোলে। যান্ত্রিক জীবনের ক্লান্তি ভুলে ঘরের কোণে এক গোছা বেলি ফুল এনে দিতে পারে এক টুকরো অনাবিল শান্তি ও সতেজতা।

লেখক : অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, মুমিনুন্নিসা সরকারি মহিলা কলেজ, ময়মনসিংহ

আবাস হারিয়ে মানুষের দোরগোড়ায় বনের নিঃশব্দ আর্তনাদ

প্রকাশ: ০২ জুন ২০২৬, ০৩:২১ পিএম
আপডেট: ০২ জুন ২০২৬, ০৩:৪৪ পিএম
আবাস হারিয়ে মানুষের দোরগোড়ায় বনের নিঃশব্দ আর্তনাদ
মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল থেকে গত এক মাসে লোকালয় থেকে ১৪টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়। খবরের কাগজ

নিজ আবাস হারিয়ে বনের প্রাণীরা এখন শহরের দরজায় এসে দাঁড়াচ্ছে, নিঃশব্দ আর্তনাদ নিয়ে। ক্রমাগত বনভূমি ধ্বংস, খাদ্য ও নিরাপত্তার সংকট তাদের ঠেলে দিচ্ছে মানুষের বসতির দিকে। মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গল উপজেলায় গত এক মাসে লোকালয় থেকে ১৪টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করেছে বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশন। এই সংখ্যা নিছক পরিসংখ্যান নয়; এ যেন ধীরে ধীরে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এক জীববৈচিত্র্যের মর্মান্তিক গল্প।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের পরিচালক স্বপন দেব সজল জানান, চলতি বছরের ৩ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত এই এক মাসে শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন এলাকা থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ১৪টি বন্যপ্রাণী। এদের মধ্যে রয়েছে অজগর, পদ্ম গোখরা, তক্ষক, বন বিড়াল, চিতা বিড়াল, জঙ্গল প্যাঁচা, সবুজ ফনিমনসা এবং বিপন্ন লজ্জাবতী বানরের মতো সংবেদনশীল প্রজাতি যারা একসময় গভীর বনে নির্ভয়ে বিচরণ করতো।

তিনি আরও জানান, তিনি নিজে ও পরিবেশকর্মী রাজদীপ দেব অনেক সময় মানুষের ঘরবাড়ি কিংবা দোকানপাট থেকে এসব প্রাণীকে উদ্ধার করেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রাণীগুলো থাকে আহত, ক্লান্ত কিংবা অসুস্থ। তাদের সযত্নে চিকিৎসা ও পরিচর্যা করে সুস্থ করে তোলার পর বন বিভাগের সহায়তায় আবার ফিরিয়ে দেওয়া হয় তাদের নিজস্ব আবাসে, বনের নীরব সবুজে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, একসময় শ্রীমঙ্গলের লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানসহ আশপাশের বনাঞ্চল ছিল বন্যপ্রাণীর স্বর্গরাজ্য। কিন্তু সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই বন আজ সংকুচিত। মানুষের বসতি, রিসোর্ট, কৃষিজমি আর অবাধ প্রবেশে কমে গেছে খাদ্যের উৎস। ফলে বনের প্রাণীরা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে, কখনও খাদ্যের খোঁজে, কখনো নিরাপদ আশ্রয়ের আশায়। আর সেই পথেই অনেক প্রাণ ঝরে যাচ্ছে দ্রুতগামী যানবাহনের চাকায়।

পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, এভাবে বন ধ্বংস অব্যাহত থাকলে শুধু প্রাণীকুলই নয়, পুরো বাস্তুতন্ত্রই একদিন হুমকির মুখে পড়বে। খাদ্যশৃঙ্খল ভেঙে গেলে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়বে কৃষি, পরিবেশ এবং মানুষের জীবনযাত্রায়।

বাংলাদেশ বন্যপ্রাণী সেবা ফাউন্ডেশনের তথ্য অনুযায়ী, গত বছর শ্রীমঙ্গল ও আশেপাশের এলাকা থেকে ৬৭টি বন্যপ্রাণী উদ্ধার করা হয়েছে, এই পরিসংখ্যান স্পষ্ট করে দেয়- বনের প্রাণীরা আর বনে নিরাপদ নেই।

স্বপন দেব সজল বলেন, নির্বিচারে গাছপালা কাটা, ঝোপঝাড় উজাড়, বনভূমিতে মানুষের অবাধ প্রবেশ, ফসল চাষ ও অপরিকল্পিত রিসোর্ট নির্মাণ সব মিলিয়ে বন্যপ্রাণীদের জীবন হয়ে উঠেছে দুর্বিষহ। খাদ্যের সংকটে তারা বাধ্য হয়ে মানুষের কাছাকাছি চলে আসছে।

তিনি সবাইকে অনুরোধ করে বলেন, বন্যপ্রাণী লোকালয়ে এলে আতঙ্কিত হয়ে তাদের আঘাত করবেন না। আমাদের খবর দিন, আমরা নিরাপদে উদ্ধার করে তাদের আবার বনে ফিরিয়ে দেব।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) জাতীয় পরিষদ সদস্য আ স ম সালেহ সোহেল খবরের কাগজকে বলেন, প্রকৃতির ভারসাম্য রক্ষায় প্রতিটি প্রাণীরই নিজস্ব ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু আমরা যদি বন ও পরিবেশ রক্ষা না করি, একদিন এই প্রাণীরাও হারিয়ে যাবে আমাদের পৃথিবী থেকে। এই উদ্ধার কার্যক্রম শুধু প্রাণ বাঁচানো নয়, মানুষের মধ্যে সচেতনতার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার এক গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ।

মানুষের দখল ও অযত্নে প্রাকৃতিক আবাসস্থল ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কারণে বন্যপ্রাণীরা বাধ্য হয়ে লোকালয়ে চলে আসছে। বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণে এমন উদ্যোগ প্রকৃতিকে সুস্থ রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে বলে মনে করছেন পরিবেশবাদীরা।

থিও/

পটিয়ার লোকালয়ে মেছোবাঘ

প্রকাশ: ০১ জুন ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
পটিয়ার লোকালয়ে মেছোবাঘ
ছবি: খবরের কাগজ

চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নে লোকালয়ে ঢুকে পড়া একটি মেছোবাঘ (ফিশিং ক্যাট) গ্রামবাসীর হাতে আটক হয়েছে। এ সময় প্রাণীটিকে আটক করার চেষ্টা করলে মানিক (২১) ও বাবু (১৯) নামে দুই যুবক আহত হয়েছেন। পরে বন বিভাগের কর্মকর্তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে জীবিত অবস্থায় মেছোবাঘটিকে উদ্ধার করেন।

সোমবার (১ জুন) বেলা ২টার দিকে উপজেলার কচুয়াই ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের খলিল ভান্ডারবাড়ি এলাকায় এ ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, গত কয়েক দিন ধরে এলাকায় একটি মেছোবাঘের বিচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছিল। স্থানীয়দের দাবি, প্রাণীটি এরই মধ্যে কয়েকটি ছাগল ধরে খেয়ে ফেলেছে। এতে এলাকাজুড়ে আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর শিশু ও গৃহপালিত প্রাণীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন বাসিন্দারা।

স্থানীয় বাসিন্দা নুরে রায়হান বলেন, ‘কয়েক দিন ধরে এলাকায় মেছোবাঘটি দেখা যাচ্ছিল। আমাদের কয়েকটি ছাগলও মেরে ফেলেছে। তাই সবাই আতঙ্কে ছিল। সোমবার দুপুরে আবার বাঘটিকে দেখতে পেয়ে এলাকার মানুষ একত্রিত হয়ে সেটিকে ঘিরে ফেলে। একপর্যায়ে প্রাণীটি দৌড়ে পালাতে গিয়ে পাশের একটি ম্যানহোলে পড়ে যায়। পরে অনেক চেষ্টা করে সেটিকে নিয়ন্ত্রণে আনা হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘মেছোবাঘটিকে আটক করার সময় সেটি আত্মরক্ষার জন্য আক্রমণাত্মক হয়ে ওঠে। এতে দুই যুবক আহত হন। পরে খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে বিপুল সংখ্যক মানুষ জড়ো হয়।’

আহত দুই যুবক হলেন মানিক (২১) ও বাবু (১৯)। স্থানীয়রা তাঁদের উদ্ধার করে দ্রুত উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তাঁদের প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।

পটিয়া বন বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা এমদাদুল হক বলেন, ‘স্থানীয়দের মাধ্যমে খবর পেয়ে আমরা ঘটনাস্থলে যাই এবং জীবিত অবস্থায় একটি মেছোবাঘ উদ্ধার করি। উদ্ধারকৃত প্রাণীটি কিছুটা আহত হয়েছে। বর্তমানে সেটিকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে। প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পরিচর্যার পর উপযুক্ত ও নিরাপদ প্রাকৃতিক পরিবেশে অবমুক্ত করা হবে।’

বন বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, মেছোবাঘ বাংলাদেশের একটি সংরক্ষিত বন্যপ্রাণী। সাধারণত জলাভূমি, খাল-বিল ও বনাঞ্চলসংলগ্ন এলাকায় এদের বসবাস। খাদ্যের সন্ধানে কিংবা আবাসস্থল সংকুচিত হয়ে পড়লে অনেক সময় এসব প্রাণী লোকালয়ে চলে আসে। এ ধরনের পরিস্থিতিতে বন্যপ্রাণী দেখলে আতঙ্কিত না হয়ে দ্রুত বন বিভাগকে অবহিত করার পরামর্শ দিয়েছেন তাঁরা।

এদিকে বিরল এ প্রাণীটিকে ঘিরে এলাকায় ব্যাপক কৌতূহলের সৃষ্টি হয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে আলোচনা চলছে। স্থানীয়দের অনেকে মেছোবাঘটিকে দেখতে ঘটনাস্থলে ভিড় করেন।

রাফিউল আকরাম/রিফাত/