সাতছড়ি জাতীয় উদ্যানের ছোট পুকুর থেকে বিরল ও দুর্লভ পাখিদের ছবি তুলে মাত্র ফিরলাম। সাতছড়ি হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলায় অবস্থিত। উদ্যান থেকে ফিরে ডরমিটরিতে ঢোকার মুহূর্তে পাশের টি স্টলে চায়ের তেষ্টা মেটাতে গেলাম। চা পান করতে করতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীদের সঙ্গে আলাপ হলো। আলাপচারিতার একপর্যায়ে জানা গেল তারা প্রতি রাতে ফরেস্ট গাইড প্রসেনজিত দেববর্মার সঙ্গে নিশাচর প্রাণীর খোঁজে বের হন। মনে পড়ে গেল ছয় থেকে সাত বছর আগের কথা। তখন এখানকার রেঞ্জার মুনির আহমেদ খান ও তার স্ত্রী বন্যপ্রাণী আলোকচিত্রী তানিয়া খান ও প্রসেনজিতকে নিয়ে নিশাচর প্রাণীর খোঁজে কতই না ঘুরেছেন। কিন্তু মুনির ভাই ও তানিয়া খানের অকালমৃত্যুর পর মনের দুঃখে ২০১৫ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিন বছর সাতছড়িমুখী হইনি।
২০১৮ সাল থেকে আবারও ওখানে যাওয়া শুরু করলেও রাতে কখনো বের হইনি। টি স্টলটা প্রসেনজিতদেরই। কথা বলতে বলতেই প্রসেনজিত চলে এল। ওকে দেখেই বললাম, ‘গোলগাল সেই আদুরে প্রাণীটিকে কি দেখাতে পারবে? ওকে আমি কোনো দিন বুনো পরিবেশে দেখিনি।’ আসলে ও এতটাই বিরল ও লাজুক যে ওর খোঁজ পাওয়া দুঃসাধ্য ব্যাপার। দৃঢ়তার সঙ্গে প্রসেনজিৎ বলল, ‘দেখাতে পারব, স্যার।’
ডরমিটরিতে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে ঘণ্টাখানেক পর প্রসেনজিতকে নিয়ে নিশাচর প্রাণীটির খোঁজে বের হলাম। সাতছড়ির রাস্তার দুই পাশের বড় বড় গাছের মধ্যে টর্চের আলো ফেলে ফেলে ক্যামেরা কাঁধে এগিয়ে চলেছি। মাত্র সাত কি আট মিনিট হেঁটেছি, এর মধ্যেই প্রসেনজিতের টর্চ গাছের ডালে বসে থাকা গোলগাল তুলার মতো এক আদুরে প্রাণীর ওপর গিয়ে পড়ল। আর যায় কোথায়? ক্যামেরায় ক্লিকের বন্যা বয়ে গেল। ২০২১ সালের ১৭ জানুয়ারির ঘটনা এটি।
এতক্ষণ গোলগাল আদুরে যে বিপন্ন প্রাণীটির কথা বললাম, সে এ দেশের ক্ষুদ্রতম বানরজাতীয় প্রাণী লাজুক বা লজ্জাবতী বা বানর। ইংরেজি নাম Bengal Slow Loris, Slow Loris, Northern Slow Loris। লরিডি (Loridae) গোত্রের স্তন্যপায়ী প্রাণীটির বৈজ্ঞানিক নাম Nycticebus bengalensis। বাংলাদেশ ছাড়াও ভারত, মায়ানমার, চীন, ক্যাম্বোডিয়া, লাওস, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে এদের দেখা যায়।
লাজুক বানর দেখতে কতকটা পান্ডার বাচ্চার মতো। এদের মুখমণ্ডল গোলাকার। চোখ বড় ও গোলাকার। দেহের দৈর্ঘ্য ২৬ থেকে ৪০ সেন্টিমিটার ও লেজ ২ থেকে ৩ সেন্টিমিটার। ওজন ১ দশমিক ২ থেকে ১ দশমিক ৬ কেজি। সদ্য জন্মানো বাচ্চার ওজন ৩০ থেকে ৬০ গ্রাম। লেজ খাটো ও কান ছোট। দেহের ওপরটা হলদে বাদামি থেকে হালকা বাদামি ও নিচটা ফ্যাকাশে। পিঠের মাঝ বরাবর একটি লম্বা গাঢ় বাদামি রেখা থাকে। এ ছাড়া চোখের চারদিকে বাদামি বলয় বা রিং রয়েছে।
এরা মূলত চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের চিরসবুজ বনের বাসিন্দা। অবশ্য কয়েক বছর আগে একটিকে মধুপুরের শালবনেও দেখা গেছে। এরা বনের গহিনে উঁচু গাছে থাকতে পছন্দ করে। নিশাচর প্রাণীগুলো দিনে গাছের খোঁড়লে বা ঘন পাতার আড়ালে অন্ধকারে ঘুমিয়ে কাটায়। ঘুমানোর সময় শরীরটাকে গোল বলের মতো করে রাখে। বিরল, নিশাচর ও লাজুক হওয়ায় দিনের বেলা সহজে চোখে পড়ে না। সচরাচর একাকী বা জোড়ায় দেখা যায়। মূলত গাছে গাছেই থাকে, সহজে মাটিতে নামে না। গাছের ডালে উল্টো হয়ে ঝুলে থাকতে পারে। মূত্রের মাধ্যমে নিজের এলাকা নির্ধারণ করে রাখে। নিজের এলাকায় অন্য কাউকে বরদাশত করে না। অত্যন্ত ধীরগতিতে চলাফেরা করে। প্রধানত ফল, পাতা, উদ্ভিদের রস, কষ ইত্যাদি খায়। মাঝেমধ্যে বড় কীটপতঙ্গ, পাখির ডিম-ছানা, সরীসৃপ ইত্যাদিও খায়। সচরাচর নীরব থাকে।
লাজুক বানর বছরের যেকোনো সময় প্রজনন করতে পারে। ১৮৫ থেকে ১৯৭ দিন গর্ভধারণের পর স্ত্রী একটিমাত্র বাচ্চা প্রসব করে। পুরুষ ১৭ মাসে ও স্ত্রী ১৮ থেকে ২৪ মাসে বয়ঃপ্রাপ্ত হয়। আয়ুষ্কাল ১৫ থেকে ২৫ বছর।
লেখক: পাখি ও বন্যপ্রাণী প্রজনন ও চিকিৎসা বিশেষজ্ঞ