মায়ানমারের চলমান সংকট একটি রাজনৈতিক সমস্যা এবং রাজনৈতিকভাবে এর সমাধান করতে হবে। রাজনৈতিক পদক্ষেপের অংশ হিসেবে বর্তমানে মায়ানমারে নির্বাচনের প্রস্তুতি চলছে। ২০২১ সালের সামরিক অভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক দল এবং জাতিগত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলো প্রতিরোধ গড়ে তোলে, সারা দেশে গৃহযুদ্ধ ছড়িয়ে পড়ে। তারা মায়ানমারের উত্তর, উত্তর-পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের বিস্তীর্ণ এলাকা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেয়। সামরিক বাহিনী দেশের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোয় তাদের আধিপত্য হারাতে থাকে। জান্তা সরকার মায়ানমারজুড়ে জরুরি অবস্থা জারি করে এবং স্টেট অ্যাডমিনিস্ট্রেশন কাউন্সিল (এসএসি) দেশ পরিচালনার ক্ষমতা লাভ করে। নির্বাচন উপলক্ষে জান্তা সরকার ২০২১ সালের অভ্যুত্থানের পর গঠিত এসএসি আনুষ্ঠানিকভাবে বিলুপ্ত করে স্টেট সিকিউরিটি অ্যান্ড পিস কমিশন (এসএসপিসি) গঠন করেছে। মায়ানমারের সামরিক সরকার আশা করে যে, এ নির্বাচন তাদের রাজনৈতিক বৈধতা এনে দেবে এবং ২০২১ পরবর্তী পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে সহায়ক হবে। মায়ানমারে মোট ৩৩০টি টাউনশিপ রয়েছে এবং এর মধ্যে প্রথম ধাপে ১০২টি টাউনশিপে ২৮ ডিসেম্বর ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে বলে ইউইসি জানায়। ইয়াঙ্গুন এবং নেপিদোসহ এ এলাকাগুলো সরকার-নিয়ন্ত্রিত এলাকায় থাকায় নির্বাচন কার্যক্রম এগিয়ে চলছে। এ ছাড়া আরও ১৭২টি টাউনশিপে নির্বাচন করা যাবে কি না সে বিষয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। কারণ সেগুলোর মধ্যে অনেক সক্রিয় সংঘাতপূর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত এবং সামরিক বাহিনী সেখানে তাদের নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছে। এগুলোকে ভোট গ্রহণের জন্য স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত বা বাদ দেওয়া হয়নি। বাদ দেওয়া ছাপান্নটি টাউনশিপের মধ্যে কাচিন রাজ্যের চারটি, কারেনি রাজ্যের তিনটি, চিন রাজ্যের চারটি, সাগাইং অঞ্চলে ১০টি, মাগওয়ে অঞ্চলে পাঁচটি, মান্দালয় অঞ্চলে তিনটি, রাখাইন রাজ্যের ১০টি এবং শান রাজ্যের ১৭টি টাউনশিপ রয়েছে।
পশ্চিমা সরকারগুলোর ডিসেম্বরের নির্বাচনের বৈধতা দেওয়ার সম্ভাবনা কম। মায়ানমারের রাজনৈতিক দলগুলো এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ নির্বাচনের বিষয়ে যে মনোভাব পোষণ করুক না কেন, চলমান গৃহযুদ্ধের পর আসিয়ানের কিছু সদস্য রাষ্ট্র এ নির্বাচন, শান্তি প্রক্রিয়াকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য একটি সুযোগ বলে মনে করে। চীন এ নির্বাচনকে সমর্থন করবে এবং ভারত, অস্ট্রেলিয়া ও জাপান এ নির্বাচনকে নির্বাচন না হওয়ার চেয়ে ভালো বলে মনে করে। মায়ানমারের মিত্রদেশ রাশিয়া এবং বেলারুশও এ প্রক্রিয়ার প্রতি সমর্থনের ইঙ্গিত দিয়েছে। ইএও এবং প্রতিরোধ বাহিনী জান্তার নির্বাচনি পরিকল্পনা প্রত্যাখ্যান করেছে এবং জনগণকে নির্বাচন বয়কটের আহ্বান জানিয়েছে। এ নির্বাচনকে তারা সামরিক শাসন প্রতিষ্ঠার জন্য পরিকল্পিত একটি প্রহসন হিসেবে দেখে।
নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে হলে গৃহযুদ্ধ বন্ধ হওয়া দরকার। গৃহযুদ্ধে ব্যবহৃত অস্ত্রের প্রবাহ সীমিত করার চেষ্টা করা হলেও চলমান প্রতিরোধ আন্দোলন থামানো সহজ হবে না বলে অনেক পর্যবেক্ষক মনে করে। মায়ানমারের চলমান সশস্ত্র সংগ্রাম ক্রমবর্ধমান অস্ত্র ও গোলাবারুদের তীব্র ঘাটতির কারণে সংকটের মুখোমুখি। আগস্ট মাসে চীনের চাপের মুখে ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি, মায়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি, তা’আং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি এবং শান স্টেট প্রগ্রেস পার্টিসহ গুরুত্বপূর্ণ মিত্রদের অস্ত্র এবং আর্থিক সহায়তা বন্ধ করে দেবে বলে জানায়। গৃহযুদ্ধের ফলে দেশজুড়ে অস্ত্রের চাহিদা বেড়ে যাওয়ার কারণে মায়ানমারে একটি অত্যন্ত লাভজনক অবৈধ অস্ত্রের বাজার গড়ে উঠেছে। প্রযুক্তিগত দক্ষতা, বিশ্বব্যাপী সরবরাহ নেটওয়ার্ক এবং অস্থিতিশীলতাকে সঠিকভাবে ব্যবহার করে বিভিন্ন সিন্ডিকেট অস্ত্র ব্যবসায় তাদের আধিপত্য বজায় রেখেছে। চলমান গৃহযুদ্ধ পরিস্থিতির উন্নতি না হলে মায়ানমারের জনগণ এ নির্বাচনের প্রকৃত সুফল ভোগ করতে পারবে না।
জান্তাপ্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের নির্দেশে এ নির্বাচনে ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তারা ইউনিয়ন সলিডারিটি অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট পার্টিতে (ইউএসডিপি) যোগ দিয়ে নির্বাচনে প্রার্থী হতে পারে, সামরিক বাহিনী ইউএসডিপি-কে সমর্থন করছে। ইউএসডিপি ২০১০ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করে। ২০১২ সালের উপনির্বাচন, ২০১৫ এবং ২০২০ সালের সাধারণ নির্বাচনে ন্যাশনাল লিগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি)-এর কাছে ইউএসডিপি বিপুল ব্যবধানে পরাজিত হয়। ২০২০ সালের নির্বাচনে পরাজয়ের পর, দলের নেতৃত্ব সামরিক প্রধান মিন অং হ্লাইংয়ের সঙ্গে যোগ দিয়ে অভ্যুত্থান ঘটায়। ২০২০ সালের নভেম্বরের নির্বাচনে এনএলডি নিরঙ্কুশ বিজয় লাভ করে। সেনাবাহিনী ভোট ব্যাপক জালিয়াতি হয়েছে জানিয়ে অং সান সু চি এবং আরও অসংখ্য গণতান্ত্রিকভাবে নির্বাচিত নেতাকে গ্রেপ্তার করে। ২০২০ সালের নির্বাচনে অংশ নেওয়া ১৪৫ জন নির্বাচিত এমপি এবং প্রায় ২ হাজার ৫০০ এনএলডি সদস্য বর্তমানে কারাগারে বন্দি। ২০২১ সালে সামরিক সরকার এনএলডির নেতৃত্বাধীন নির্বাচিত সরকারকে উৎখাত করে এবং দেশে চার বছরেরও বেশি সময় ধরে জরুরি অবস্থা জারি করে। এশিয়ান নেটওয়ার্ক ফর ফ্রি ইলেকশনস এবং কার্টার সেন্টারসহ স্বাধীন নির্বাচন পর্যবেক্ষণ গোষ্ঠীগুলো ব্যাপক জালিয়াতির দাবি প্রত্যাখ্যান করে জানিয়েছিল যে, ২০২০ সালের নির্বাচনের ফল ব্যাপকভাবে জনগণের ইচ্ছার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ ছিল।
মায়ানমারের সবচেয়ে বড় দল এনএলডি-সহ বিরোধী দলগুলো নির্বাচন বয়কট করার কথা জানিয়েছে। যেসব দল সে সময় মাত্র কয়েকটি আসন জিতেছিল তারাসহ ছোট ছোট ৫৫টি দল এ নির্বাচনে অংশগ্রহণের জন্য নিবন্ধন করেছে, যার মধ্যে নয়টি দল দেশব্যাপী আসনের জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা করবে। এ নির্বাচনের প্রার্থীদের মধ্যে বেশির ভাগই কোনো না কোনোভাবে সেনাবাহিনীর সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় ধারণা করা হয় যে, মায়ানমার সেনাবাহিনী কোনো বেসামরিক বা আধা বেসামরিক শক্তির কাছে রাষ্ট্রক্ষমতা ছাড়বে না। ফলে মায়ানমারের সংকট রাজনৈতিকভাবে সমাধান সম্ভব হবে কি না তা বোঝা যাচ্ছে না। পর্যবেক্ষকরা বর্তমান নির্বাচনকে চলমান সামরিক শাসনকে বৈধতা দেওয়ার একটি কৌশল বলে মনে করে।
আরাকান আর্মির প্রধান তুন মিয়াত নাইং মায়ানমার সরকারকে এ নির্বাচনে বৈধতা পেতে চাইলে প্রথমে অং সান সু চিকে মুক্তি দিতে হবে বলে জানান। আরাকান আর্মি রাখাইন রাজ্যের বেশির ভাগ অংশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর রোহিঙ্গা-সংখ্যাগরিষ্ঠ এলাকায় উত্তপ্ত জাতিগত ও ধর্মীয় অনুভূতি প্রশমিত করার জন্য রোহিঙ্গাদের সম্পৃক্ত করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নিচ্ছে বলে জানা যায়। রোহিঙ্গা অধ্যুষিত মংডু জেলায় আরাকান আর্মি জুরি নামে পরিচিত একটি প্রশাসনিক উপদেষ্টা সংস্থা এবং সংস্কৃতি, রীতিনীতি এবং ধর্মীয় অনুশীলন সম্পর্কিত বিষয়গুলো পরিচালনা করে এমন একটি মুসলিম বিষয়ক কাউন্সিল গঠন করেছে। এ জুরিতে রোহিঙ্গা সম্প্রদায়ের প্রবীণ ব্যক্তি, যুব ও ধর্মীয় নেতারাও রয়েছেন। জুরি মূলত মুসলমানদের প্রতিনিধিত্ব করে এবং তাদের স্বার্থে কাজ করছে। জুরি ছাড়াও, আরাকান আর্মি একটি মুসলিম বিষয়ক কাউন্সিল গঠন করেছে, এটি ধর্মীয় ভবন এবং ধর্মীয় স্বাধীনতা সম্পর্কিত বিষয়গুলো পরিচালনা করবে। স্থানীয় প্রশাসনকে শক্তিশালী করতে এবং জনগণের জন্য পরিস্থিতি আরও উন্নত করতে এ সংস্থা কাজ চালিয়ে যাবে বলে জানা যায়।
আরাকান আর্মি রাখাইনের ১৭টি শহরের মধ্যে ১৪টি নিয়ন্ত্রণ করে। এ নির্বাচনে মংডু এবং ম্রাউক-ইউসহ ১০টি শহরে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে না। বাকি সাতটি শহরে জান্তা নির্বাচন আয়োজনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। বর্তমানে রাখাইনের সিতওয়ে, চকপিউ এবং মানাউং টাউনশিপ মায়ানমার সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। সাতটি টাউনশিপের মধ্যে তাউঙ্গুপ, গওয়া, থান্ডওয়ে এবং আন এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে। এগুলো নিয়ন্ত্রণে আনতে মায়ানমার সেনাবাহিনী ভোটের আগে এসব এলাকায় তাদের আক্রমণ জোরদারের চেষ্টা করবে। আরাকান আর্মির সঙ্গে মায়ানমার জান্তার নির্বাচনের আগে সমঝোতা হওয়ার এখনো কোনো সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে না। নির্বাচনের আগে রাখাইনের সাতটি শহরতলি সামরিক বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে আরাকান আর্মির সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ অনিবার্য। এর ফলে রাখাইনের নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতি ঘটবে। আক্রমণ ও প্রতি আক্রমণের ফলে জনগণের দুর্ভোগ আরও বাড়বে। রাখাইনে পুনরায় অশান্ত পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে এর ধাক্কা সামলাতে বাংলাদেশকেও প্রস্তুত থাকতে হবে।
আরাকান আর্মিকে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের সহবস্থান নিশ্চিত করার পাশাপাশি রোহিঙ্গাদের চলমান দেশত্যাগের প্রবণতা বন্ধে উদ্যোগ নিতে হবে। নির্বাচনের পর নির্বাচিত সরকার রাখাইনে রাজনৈতিক সমাধানের পথ প্রশস্ত করলে এ অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসার সম্ভাবনা রয়েছে। রোহিঙ্গাসংকট বাংলাদেশের একটি অন্যতম প্রধান সমস্যা, এ সমস্যা সমাধানে যেকোনো পদক্ষেপ বাংলাদেশ স্বাগত জানাবে। আরাকান আর্মি ও মায়ানমারের নতুন নির্বাচিত সরকারকে এ সংকট সমাধানে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এ সংকট সমাধানের আগ পর্যন্ত সমস্যা সমাধানের সব কার্যক্রম চলমান রাখতে হবে। মায়ানমারের প্রতিবেশী দেশগুলোর মতো বাংলাদেশকেও সীমান্ত ব্যবস্থাপনা ও সীমান্ত নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কাজ চালিয়ে যেতে হবে।
এর পাশাপাশি মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান বন্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে, যাতে রাখাইনসংলগ্ন বাংলাদেশের ভেতরে কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা বিঘ্নিত না হয়। বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রাম এলাকা অস্থিতিশীল করার চেষ্টা করা হচ্ছে, যা অবিলম্বে কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। মায়ানমারে সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠিত হোক, আরাকান আর্মি রাখাইনে রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে উদ্যোগ নিক এবং এ অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসুক- এটাই প্রত্যাশা।
লেখক: মায়ানমার ও রোহিঙ্গাবিষয়ক গবেষক

