১৯৫৯ সাল। এক বছর আগে পাকিস্তানের সামরিক শাসক ফিল্ড মার্শাল আইয়ুব খান মার্শাল ল’ জারি করেন। জাস্টিস কাইয়ানি তখন পাঞ্জাব হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। ফেব্রুয়ারির একদিন সিএসপিদের আমন্ত্রণে আইয়ুব খান নৈশভোজে উপস্থিত হয়েছেন। কাইয়ানি সেই সময় ছিলেন পশ্চিম পাকিস্তান সিএসপি অ্যাসোসিয়েশনের প্রেসিডেন্ট।
কাইয়ানি সেই অনুষ্ঠানে ১০ মিনিটের স্বাগত বক্তব্য দেন। চিফ জাস্টিসের ভাষণটি হয়তোবা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে ইতিহাসের স্মৃতি থেকে ম্লান হয়ে গেছে। কিন্তু আজও তার গুরুত্ব অনুধাবন করলে আমাদের উপলব্ধি করতে অসুবিধা হবে না যে, কাইয়ানির শব্দগুলোর মর্ম ছিল, রাষ্ট্র ক্ষমতায় সেনাবাহিনীর রাজনীতিতে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ জাতীয় সার্বভৌমত্বের জন্য কতটা ভয়ানক হতে পারে। কাইয়ানি বললেন, মার্শাল ল’ জারির মধ্যদিয়ে পাকিস্তান সেনাবাহিনী তার নিজের দেশকে দখল করেছে। প্রচলিত আছে যে, প্রত্যেক স্বাধীন রাষ্ট্রের একটা সেনাবাহিনী আছে। কিন্তু পাকিস্তান সেনাবাহিনীর একটা স্বাধীন রাষ্ট্র আছে। কথাটি হয়তোবা ব্যঙ্গাত্মক অর্থে ব্যবহার করা হয়ে থাকে। কিন্তু পাকিস্তানের ৭৫ বছর জীবনের আয়ুষ্কালে অধিকাংশ সময়ে সেনাবাহিনী ক্ষমতায় থাকার ফলে দেশটির রাজনৈতিক মুক্তির আকাঙ্ক্ষার পথগুলোর বাস্তবায়ন সম্ভব হয়নি।
দার্শনিক বিশ্লেষণে চিফ জাস্টিস কাইয়ানির উক্তিটি অত্যন্ত গভীর প্রজ্ঞাপ্রসূত এবং আজও তার মূল সারমর্ম রাষ্ট্র বনাম সেনাবাহিনীর ‘দায়িত্ব ভার’ সম্পর্কের স্থানটিকে পরিষ্কারভাবে তুলে ধরে। ১৯৭১ সালে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ভূমিকাটি ছিল অত্যন্ত দুঃখজনক এবং মর্মান্তিক। তদানীন্তন পূর্বপাকিস্তান দখল করতে গিয়ে বাংলাদেশকে গণহত্যার বধ্যভূমিতে পরিণত করার ইতিহাস আজও আমাদের মনস্তাত্ত্বিক রক্তক্ষরণের বেদনাদায়ক পটভূমিতে লিপিবদ্ধ হয়ে রয়েছে।
পাকিস্তানের ঘনিষ্ঠ বন্ধু যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্রের ভূ-রাজনীতি সর্বদা পাকিস্তান জেনারেলদের পক্ষই সমর্থন করেছে। ১৯৫৮ সালে পাকিস্তানে যখন প্রথম মার্শাল ল’ জারি করা হয়, তখন যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ছিল। ১৯৭১ সালে যখন স্বাধীনতা যুদ্ধ চলছে, তখনো গণহত্যার খবর অবগত হওয়া সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিল পূর্ব পাকিস্তানের রাজনীতিবিদদের পাকিস্তানে সামরিক জান্তার সঙ্গে বসে রাজনৈতিক সমাধানের পথ খুঁজে বের করা। চেষ্টাটি সফল হয়নি। বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে।
অথচ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, সেখানে রাজনীতিবিদরা চাইলেও তাদের সামরিক বাহিনীকে দেশের জনগণের বিরুদ্ধে নিজেদের স্বার্থ উদ্ধারের জন্য ব্যবহার করতে পারবেন না। কথাটি স্পষ্ট করেছিলেন জেনারেল মার্ক মিলি, যুক্তরাষ্ট্রের ২০তম জয়েন্ট চিফ স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান।
দীর্ঘ ৪৩ বছর সেনা জীবনের শেষে জেনারেল মিলি তার বিদায়ী ভাষণে বলেছিলেন, সামরিক বাহিনী কোনো রাজা, রানি, স্বৈরাচার কিংবা ক্ষমতালিপ্সু শাসকের কাছে শপথ গ্রহণ করে না। এই বাহিনী কোনো একক ব্যক্তির কাছে শপথ গ্রহণ করে না। সামরিক বাহিনী শপথ গ্রহণ করে আমেরিকা নামক রাষ্ট্রের একটি আইডিয়া বা ধারণার কাছে। এ আইডিয়াকে রক্ষা করার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর সদস্যরা যেকোনো মূল্য দিতে প্রস্তুত। জেনারেল মিলি তার ভাষণে সংবিধানের প্রতি আমেরিকার সামরিক বাহিনীর দায়বদ্ধতার কথা স্মরণ করিয়ে দিলেন। প্রত্যেকটি সেনা, নাবিক, বিমান সেনা ও মেরিন এবং কোস্টগার্ড ও ন্যাশনাল গার্ডের সদস্যের দায়িত্ব হলো দেশের অভ্যন্তরের এবং বাইরের শত্রুদের হাত থেকে সংবিধান রক্ষার জন্য বদ্ধপরিকর থাকা।
জেনারেল মিলির বক্তব্য তার নিজের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে উদ্দেশ করে বলেছিলেন, যদিও তার শব্দ কিংবা বাক্য চয়নে কোথাও ট্রাম্পের কথার উল্লেখ ছিল না। ট্রাম্প পেন্টাগনকে ব্যবহার করতে এবং তার নিজের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ধরে রাখতে চেয়েছিলেন কিন্তু জেনারেল তা হতে দেননি। এজন্য অবশ্য জেনারেল মিলিকে ট্রাম্প প্রশাসনের রোষানলে পড়তে হয়েছিল। ট্রাম্প জেনারেল মিলির ওপর প্রতিশোধ নিলেন তাকে ব্যক্তিগতভাবে আঘাত করে। দ্বিতীয়বার ক্ষমতা গ্রহণের পর ট্রাম্প সরকার জেনারেল মিলির নিরাপত্তা ছাড়পত্র বাতিল করলেন।
অধুনা ট্রাম্প সরকার আমেরিকার উচ্চপদস্থ প্রায় ৮০০ জন কমান্ডারকে অধিবেশনের ডাক দেন। এই অধিবেশনে আমেরিকার প্রতিরক্ষামন্ত্রী (Secretary of War) পিট হেগসেথ জেনারেল এবং অ্যাডমিরালদের নিয়ে হাস্য কৌতুক করেছেন। তাদের শারীরিক গঠনের ওপর বিদ্রুপাত্মক মন্তব্য করে তাদের ‘স্থূলকায় জেনারেল এবং অ্যাডমিরাল’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও কমান্ডার-ইন-চিফ হিসেবে বক্তব্য দেন। তিনি মন্তব্য করেন যে, যেকোনো জেনারেলকে পছন্দ না হলে তৎক্ষণাৎ বরখাস্ত করবেন। ট্রাম্প এবং হেগসেথের সামরিক বাহিনীর উচ্চপদস্থ কমান্ডারদের ওপর এ ধরনের অনভিপ্রেত এবং ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ ক্ষমতার অপব্যবহার বৈ আর কিছু নয়। উভয়ের বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা হয়েছে এবং অনেকে তাদের এ ধরনের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যকে ‘ফ্যাসিস্ট’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন।
একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে দেখা যাবে যে, ডোনাল্ড ট্রাম্প চাকরি খাওয়ার ভয় দেখিয়ে আমেরিকার সামরিক বাহিনীকে রাজনীতিকরণ (Politics of The Military) করতে চাচ্ছেন। পাকিস্তানের উদাহরণের সঙ্গে এর মূল পার্থক্য রয়েছে। পাকিস্তানের আইয়ুব খান চেয়েছিলেন রাজনীতির সামরিকরণ (Militarization of The Politics)। সামরিক বাহিনীকে তার পেশাগত দায়িত্ব থেকে বিচ্যুত করার এ দুটি কপটাচরণই জাতির স্বার্থ এবং নিরাপত্তার জন্য হুমকিস্বরূপ।
গত সরকারের আমলে বাংলাদেশেও আওয়ামী লীগ সরকারের আচরণে অনুরূপ সামরিক বাহিনীর রাজনীতিকরণের একটা প্রচেষ্টা বলবৎ ছিল। ফলে রাজনৈতিক আদর্শের ক্ষতি তো হয়েছে, তার সঙ্গে সামরিক বাহিনীর পেশাগত দায়িত্বের দিকটাও দুর্বল এবং ইউনিফর্মের ভাবমূর্তির ওপর মারাত্মক আঘাত এনেছে।
আওয়ামী লীগের শাসনামলে ডিজিএফআইয়ের পাঁচজন মহাপরিচালকসহ ৩০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে। তাদের অপরাধ, বিরোধী মতের লোকদের গুম, হত্যা এবং নির্যাতনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা। এতদ্ব্যতীত, বহু উচ্চপদস্থ অফিসারের বিরুদ্ধে গুরুতর আর্থিক দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়ার ফলে তাদের বিরুদ্ধে বিচারিক কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। অভিযুক্ত জেনারেলদের অনেকেই এখন দেশ ছেড়ে পলাতক আছেন।
সামরিক বাহিনীর সামাজিক মর্যাদা এবং পরাকাষ্ঠার জন্য প্রয়োজন এই প্রতিষ্ঠানটির প্রকৃত এবং দার্শনিক অধিবিদ্যাকে উপলব্ধি করা। এ বাহিনী রাষ্ট্রের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইনস্টিটিউশন, যার অবস্থান হলো সমকক্ষদের মধ্যে প্রথম (First Among The Equals)। এর কারণ হলো- রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং অখণ্ডতা রক্ষার দায়িত্ব প্রতিষ্ঠান হিসেবে সামরিক বাহিনীর ওপর বর্তায়।
বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক এবং অর্থনীতিবিদ অ্যাডাম স্মিথ তার অননুকরণীয় ধ্রুপদী পুস্তক The Wealth of Nations-এ লিখেছেন যে, সার্বভৌমের প্রথম দায়িত্ব হলো জাতীয় প্রতিরক্ষা। সম্পদের প্রাচুর্যের চেয়েও জাতীয় নিরাপত্তা অধিকতর মূল্যবান; কারণ নিরাপত্তা ছাড়া জাতীয় সমৃদ্ধি অর্থহীন। এ দায়িত্ব পালন করার জন্য রাষ্ট্রের শক্তিশালী সামরিক বাহিনীর পেছনে অর্থ ব্যয় সার্বভৌমের দায়িত্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্ণায়ক। ১৭৭৬ সালে, যুক্তরাষ্ট্রের জন্ম বছরে, লেখা এই বইটি আজও অর্থনীতির প্রজ্ঞার ওপর প্রতিষ্ঠিত ধারণাগুলোর শ্রেষ্ঠতম পুস্তক হিসেবে স্বীকৃত।
পার্বত্য চট্টগ্রামের অখণ্ডতা রক্ষায়, যা বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের জন্য ছিল অপরিহার্য, বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী বিশেষত, সেনাবাহিনী, বাংলাদেশ রাইফেলস (বিডিআর) এবং বিমান বাহিনীর অবদান অনবদ্য। বিডিআর এবং সেনাবাহিনীর অসংখ্য অফিসার এবং সেনা দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষার দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন, পঙ্গু হয়েছেন এবং রোগে ভুগে চাকরি থেকে আগাম পেনশন নিয়ে জীবন যুদ্ধে অকল্পনীয় সংগ্রাম করেছেন। কিন্তু পার্বত্য চট্টগ্রামের এক ইঞ্চি জমিও প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় পরিচালিত অভ্যন্তরীণ কিংবা বহিরাগত সন্ত্রাসীদের দখলে যেতে দেননি।
এখন প্রশ্ন হলো, এত শক্তিশালী ইনসারজেন্সি শক্ত হাতে দমন করে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী কীভাবে সক্ষম হয়েছিল। এর সহজ উত্তর হলো পেশাগত উৎকর্ষতা এবং সামাজিক দায়বদ্ধতা। পেশাগত প্রতিশ্রুতি প্রত্যেকটি সেনাকে দীক্ষিত করেছিল নিজের জীবন দিয়েও পাহাড়ি অধিবাসীদের জীবন রক্ষা করা। প্রয়োজনে ১০০ জন সেনার জীবনের বিনিময়ে একজন সিভিলিয়ানের জীবন রক্ষা করতে হবে। তাদের আত্মত্যাগের জন্য আজও বাংলাদেশের অখণ্ডতা টিকে আছে।
অথচ যে সিভিলিয়ানের প্রাণ রক্ষা করা সেনাবাহিনীর পরম ধর্ম, সেই সেনাবাহিনীর উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা নির্দোষ সিভিলিয়ানের গুম, খুন এবং নির্যাতনের জন্য আজ আসামি। ৯ মাস রক্তক্ষরণের মধ্যদিয়ে অর্জিত স্বাধীনতার দেশ বাংলাদেশ, যার মধ্যে সামরিক বাহিনীর ত্যাগ জাতীয় ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে, সেখানে সেনাবাহিনীর খণ্ডিত পথভ্রষ্টতা সমগ্র সামরিক বাহিনীর জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক এবং মর্মান্তিক অধ্যায়।
দেশের সিভিলিয়ানদের রক্ষার দ্ব্যর্থহীন সাংবিধানিক দায়িত্ব সামরিক বাহিনীর। “If Need Be Hundred Soldiers Should Die To Protect The Life if a Single Civilians।”
লেখক: অবসরপ্রাপ্ত বিমান বাহিনীর কর্মকর্তা
এবং সিএএবির সাবেক চেয়ারম্যান
.jpg)


