প্রায় প্রতিটি নির্বাচনি ইশতেহারেই তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়। কিন্তু কত বছরে কত কর্মসংস্থান হবে, কোন খাতে হবে, বেসরকারি ও সরকারি খাতের ভূমিকা কী—এই প্রশ্নগুলোর নির্দিষ্ট উত্তর ইশতেহারে খুব কমই পাওয়া যায়। ফলে নির্বাচন শেষে এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে নাগরিকদের জবাবদিহি দাবি করার সুযোগও সীমিত থাকে।...

নির্বাচনের মৌসুম এলেই নির্বাচনি ইশতেহারের প্রসঙ্গ আমাদের সামনে আসে। আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলো ইশতেহার তৈরিতে ব্যস্ত। সংবাদমাধ্যমে শোনা যাচ্ছে, কেউ কেউ ১৫-২০টি অগ্রাধিকারের কথা বলছে, কেউ আবার উন্নয়ন, গণতন্ত্র, কর্মসংস্থান বা রাষ্ট্র সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—এই ইশতেহারগুলো আদৌ কতটা দেশের উন্নয়নের কার্যকর দলিল হয়ে উঠতে পারবে? নাকি এটি মূলত নির্বাচনি প্রচারণার আনুষ্ঠানিক ভাষ্য হয়েই থেকে যাবে?
রাজনীতিবিদরা সব সময়ই রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনের স্লোগান দিয়ে থাকেন। নির্বাচনের ঠিক আগ মুহূর্তে এই স্লোগানগুলো একটু বেশি শোনা যায়। শুধু রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন নয়, গোটা রাষ্ট্রীয় কাঠামোর উন্নয়নে এবং গুণগত পরিবর্তনে তাদের প্রতিশ্রুতি অনবরত চলতে থাকে। কীভাবে জনগণের মনে স্থান পাওয়া যায় সেই লক্ষ্যটাও রাজনীতিবিদদের বেশি থাকে নির্বাচনের আগে। নির্বাচনের পরে সেগুলো মানতে হবে কি না—সেই চিন্তাটা অতটা উপলব্ধিতে থাকে না। কারণ, মূল লক্ষ্য হলো যেভাবেই হোক ক্ষমতায় যাওয়া। সাধারণত রাজনীতিবিদদের ভালো মুখরোচক প্রতিশ্রুতি, বক্তব্য, বিবৃতিতে দেশের ভোটাররা মুগ্ধ হয়ে যায়। এমনকি রাজনৈতিক দলগুলো সেসব প্রতিশ্রুতিসমৃদ্ধ একটি নির্বাচনি ইশতেহার তৈরি করে জনগণকে শুনিয়ে দেয়। যেটাকে বলা হয় তাদের ক্ষমতা-পরবর্তী কার্যক্রম এবং প্রতিশ্রুতির রোডম্যাপভিত্তিক একটি লিখিত দলিল। ইতোপূর্বে প্রতিটি সরকারই ক্ষমতায় আসার আগে এ ধরনের লিখিত একটি দলিল জনগণের সামনে ধরিয়ে দিয়েছিল। আবার লিখিত দলিলের পাশাপাশি মুখে মুখেও নানা প্রতিশ্রুতির ঝুলি আমাদের আকৃষ্ট করেছে। কিন্তু পূর্ববর্তী খুব কম সরকারই তাদের লিখিত-অলিখিত প্রতিশ্রুতিগুলো যথাযথভাবে পূরণ করতে পেরেছে বলে মনে হয়। এমনকি এও দেখা গেছে যে, ইশতেহারে নির্বাচনের আগে দেওয়া লিখিত প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের রাজপথে আন্দোলন করতে হয়েছে।
নির্বাচনি ইশতেহারে অনেক সময় জনগণের জন্য চমক থাকে। বর্ণিত চমকগুলো যদি রাজনৈতিক দলগুলো যথাযথভাবে মনে রাখত তাহলে দেশের রাজনীতির গুণগত পরিবর্তনে আর কোনো সমস্যা থাকত না। নির্বাচনের আগে জনগণকে আকৃষ্ট করতে সব রাজনৈতিক দলই ইশতেহারে নানা চমকপ্রদ প্রতিশ্রুতি উপস্থাপন করে। বেশির ভাগ ইশতেহারে অভিন্ন একটি বৈশিষ্ট্য থাকে, সেটি হলো—জনগণের উন্নয়নের মাধ্যমে সমগ্র রাজনৈতিক কাঠামোতে সুশাসন প্রতিষ্ঠা করা। একটি রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার মাধ্যমেই ওইসব ইশতেহারভিত্তিক প্রতিশ্রুতি জনগণের কাছে উত্থাপন করা হয়। সব রাজনৈতিক দলেরই জনগণের সামনে উত্থাপিত প্রতিশ্রুতি মোতাবেক কিছু মৌলিক বিষয় উল্লেখ থাকা দরকার। এমন কিছু বিষয় থাকে, যেগুলো ক্ষমতায় যাওয়া-না যাওয়ার সঙ্গে সম্পর্ক নেই।
যেসব রাজনৈতিক দল নির্বাচনে অংশ নেয় এবং ইশতেহার প্রদান করে সে দলগুলো প্রত্যেকটি রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় আসতে পারবে না—এটি স্বাভাবিক। কিন্তু ক্ষমতায় না গেলেও ভবিষ্যতে ক্ষমতায় যাওয়ার কার্যক্রম অব্যাহত থাকার কথা রাজনৈতিক দলগুলোর। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতায় যেতে না পারলেও সেই দলটি রাষ্ট্রের গণতান্ত্রিক উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ, নির্বাচনের পর যারা ক্ষমতায় আসে না, তাদের অনেকেই বিরোধী দলের ভূমিকায় থাকে। গণতন্ত্রে বিরোধী দলের অস্তিত্ব সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত। আর বিরোধী দল হিসেবে একটি রাজনৈতিক দলের গণতন্ত্র শুদ্ধিকরণে বিশেষ ভূমিকা থাকে। বিশেষ করে জবাবদিহিমূলক সরকার প্রতিষ্ঠায় বিরোধী দলের কোনো বিকল্প নেই। সংসদীয় গণতন্ত্রের ঐতিহ্য বজায় রাখতে সংসদে ও সংসদের বাইরে বিরোধী দলের বিশেষ ভূমিকা রয়েছে।
রাজনৈতিক দলের ইশতেহারে ক্ষমতায় গেলে কী করবে আর ক্ষমতায় না গেলে কী করবে সেটাও সুনির্দিষ্টভাবে জনগণের সামনে উত্থাপন করার ন্যায্যতা রয়েছে। ক্ষমতায় গেলে সরকারি দল বিরোধী দলের ওপর দমন নিপীড়ন করবে আর ক্ষমতায় না গেলে নির্বাচনকে অস্বীকার করবে—এমন সংস্কৃতি থেকে বের হয়ে আসার প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে সুস্পষ্ট হওয়া দরকার।
অন্যদিকে রাজনৈতিক দলগুলো ক্ষমতায় যেতে না পারলে বিরোধী দল হিসেবে ক্রমাগত সংসদ বর্জন করবে নাকি সংসদে উপস্থিত হবে—এমন বিষয়ও ইশতেহারে উল্লেখ করে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে হবে রাজনৈতিক দলগুলোকে।
একজন নির্বাচিত নেতার ওপরই নির্ভর করে দেশের উন্নয়ন, সুশাসন এবং জনগণের আস্থার বিষয়টি। সব রাজনৈতিক দল যদি নির্দিষ্ট মাপকাঠি বিবেচনা করে রাজনৈতিক কমিটমেন্ট রক্ষা করে তাহলে জনগণের আস্থা এবং নেতাদের রাজনৈতিক জবাবদিহির ক্ষেত্র প্রসারিত হয়। রাজনৈতিক নেতা দুর্নীতিবাজ, জনবিচ্ছিন্ন হওয়া সত্ত্বেও তাকে মনোনয়ন দিয়ে দেশের উন্নয়ন আশা করাটা মোটেও যুক্তিসংগত নয়।
রাজনৈতিক দলগুলোকে একটি স্থিতিশীল গণতান্ত্রিক পরিবেশ বজায় রাখতে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর বিরোধী দলগুলোকে সাংবিধানিক সব সুযোগ-সুবিধায় বাধা সৃষ্টি না করার বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে ইশতেহারভুক্ত করা উচিত। সুষ্ঠু নির্বাচনের মাধ্যমে ক্ষমতা হস্তান্তর এবং সরকারের মেয়াদ শেষে নির্বাচনকালীন সরকার নিয়ে টানাপোড়েনের রাজনীতিমুখী না হওয়া রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতিশ্রুতিতে থাকারও ন্যায্যতা রয়েছে। কাজেই একটি রাজনৈতিক দল কীভাবে রাজনীতির গুণগত পরিবর্তন আনতে পারে সেটা তার ইশতেহারেই সুস্পষ্ট করা সম্ভব। এক্ষেত্রে ক্ষমতায় আসুক আর না আসুক গণতন্ত্র তথা সুশাসন প্রতিষ্ঠার জন্য সব রাজনৈতিক দলকে অভীন্ন কিছু মৌলিক বিষয় ইশতেহারে লিপিবদ্ধ করার বিষয়টি সময়োপযোগী এবং বাস্তবসম্মত।
ইশতেহার মূলত একটি রাজনৈতিক দলের রাষ্ট্রচিন্তার লিখিত রূপ। এটি বলে দেয় দলটি ক্ষমতায় গেলে কী করবে, কোন সমস্যাকে কীভাবে সমাধান করতে চায় এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের দৃষ্টিভঙ্গি কী। উন্নত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রগুলোতে ইশতেহারকে কেবল প্রতিশ্রুতির কাগজ হিসেবে দেখা হয় না; বরং এটি ভবিষ্যৎ সরকারের নীতি কাঠামোর একটি চুক্তিপত্র হিসেবে বিবেচিত হয়। নাগরিকরা ইশতেহারের ভিত্তিতেই ভোট দেন এবং পরবর্তী সময়ে সরকারকে সেই ইশতেহারের আলোকে জবাবদিহির মুখোমুখি করেন। বাংলাদেশে এই সংস্কৃতি এখনো পুরোপুরি গড়ে ওঠেনি, যার ফলে ইশতেহার অনেক সময় বাস্তব উন্নয়নের হাতিয়ার না হয়ে রাজনৈতিক ভাষণের অংশে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের আরেকটি বাস্তবতা হলো—অনেক প্রতিশ্রুতি ইশতেহারে থেকে গেলেও তার বাস্তবায়ন বা মূল্যায়নের স্পষ্ট কাঠামো থাকে না। উদাহরণ হিসেবে কর্মসংস্থানের প্রশ্নটি ধরা যায়। প্রায় প্রতিটি নির্বাচনি ইশতেহারেই তরুণদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টির কথা বলা হয়। কিন্তু কত বছরে কত কর্মসংস্থান হবে, কোন খাতে হবে, বেসরকারি ও সরকারি খাতের ভূমিকা কী—এই প্রশ্নগুলোর নির্দিষ্ট উত্তর ইশতেহারে খুব কমই পাওয়া যায়। ফলে নির্বাচন শেষে এই প্রতিশ্রুতি নিয়ে নাগরিকদের জবাবদিহি দাবি করার সুযোগও সীমিত থাকে। ইশতেহার যদি সত্যিকার অর্থে উন্নয়নের দলিল হিসেবে সামনে রাখতে হয় তাহলে তা দেশের বাস্তব সমস্যাগুলোর মুখোমুখি করতে হবে।
লেখক: অধ্যাপক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়
[email protected]

