দীর্ঘদিন পর আবার ‘রণংদেহি’ অবতারে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী, তথা বঙ্গেশ্বরী, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত বৃহস্পতিবার (৮ জানুয়ারি) বেলা ১১টা ৫৯ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা ২০ মিনিট পর্যন্ত দফায় দফায় ভারতের কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা (এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট) ইডির সঙ্গে সম্মুখসমরে অবতীর্ণ হয়েছিলেন তিনি। উপলক্ষ, তৃণমূল কংগ্রেসের পরামর্শদাতা সংস্থা আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জৈনের লাউডন স্ট্রিটের বাড়ি এবং সল্টলেকে আইপ্যাকের দপ্তরে ইডির হানা। দীর্ঘ ৪ ঘণ্টা ২৪ মিনিট ধরে মুখ্যমন্ত্রী ইডির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সক্রিয় রইলেন। কখনো নথিপত্র বার করে আনলেন, কখনো সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে কেন্দ্রীয় সরকার ও ইডিকে তুলাধোনা করলেন। যার জল গড়াল কলকাতা হাইকোর্ট পর্যন্ত।
শেক্সপিয়র সরণি থানা থেকে চিলছোড়া দূরত্বে ৭ নম্বর লাউডন স্ট্রিট। বৃহস্পতিবার ভোরে সেই ঠিকানায় প্রতীকের বাড়ি এবং তার আইপ্যাক দপ্তরে পৃথকভাবে হানা দেয় ইডি। বেআইনি কয়লা পাচার-সংক্রান্ত একটি পুরোনো মামলার সূত্রে এ তল্লাশি চলছিল। ইডির তল্লাশি চলাকালীনই কলকাতার পুলিশ কমিশনার মনোজ বর্মা যান প্রতীকের বাড়ি। তার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সেখানে পৌঁছেন মমতা। কয়েক মিনিটের মধ্যেই তিনি বেরিয়েও আসেন। হাতে একটি সবুজ রঙের ফাইল এবং ল্যাপটপ। সেখান থেকে তিনি সটান যান সল্টলেকে আইপ্যাকের দপ্তরে। সেখানে তখনো তল্লাশি চলছিল। তার মধ্যেই মমতা উঠে যান ওই বাড়ির ১২ তলায়। কিছু পরেই দেখা যায়, এক নিরাপত্তারক্ষী একাধিক ফাইল এবং নথিপত্র নিয়ে বেরিয়ে আসছেন। তিনি সেগুলো মুখ্যমন্ত্রীর গাড়িতে তুলে দেন। তার পরও বিকেল পর্যন্ত মমতা সেখানেই ছিলেন।
ইডির অভিযানকে ‘রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে বিজেপিকে আক্রমণ করেছেন মমতা। তার দাবি, তার দলের ‘নির্বাচনি কৌশল’ অন্যায়ভাবে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। মুখ্যমন্ত্রীর ‘সক্রিয়তার’ বিরুদ্ধে কলকাতা হাইকোর্টের দৃষ্টি আকর্ষণ করে ইডি। পাল্টা তৃণমূলের তরফেও মামলা করা হয়। বৃহস্পতিবার ইডির হানা এবং কেন্দ্রীয় সংস্থার সঙ্গে মমতার সম্মুখসমর সাত বছর আগের একটি ঘটনার স্মৃতি ফিরিয়ে দিয়েছে। ২০১৯ সালের ৩ ফেব্রুয়ারি এই লাউডন স্ট্রিটেই হানা দিয়েছিল অপর এক কেন্দ্রীয় সংস্থা সিবিআই। নিশানায় ছিল তৎকালীন পুলিশ কমিশনার রাজীব কুমারের সরকারি বাসভবন। সে বার যা হয়েছিল, এ বারও তা-ই হলো। মুখ্যমন্ত্রী নিজে ঘটনাস্থলে পৌঁছে গেলেন। তার রণংদেহি মূর্তি পশ্চিমবঙ্গে বিধানসভা ভোটের দামামা আরও জোরে বাজিয়ে দিল।
অনুপ মাজি ও তার সিন্ডিকেট (ইস্টার্ন কোলফিল্ড লিমিটেডের) ইসিএলের লিজ নেওয়া এলাকা থেকে অবৈধভাবে কয়লা খনন ও পাচার করত। এ পাচার হওয়া কয়লা বাঁকুড়া, বর্ধমান ও পুরুলিয়ার বিভিন্ন কারখানায় বিক্রি করা হতো। ইডির দাবি- পাচার হওয়া কয়লার একটি বড় অংশ শাকগুরি গ্রুপ অব কোম্পানিজ কিনেছে। এ ঘটনায় ১০ কোটি টাকার একটি বিশাল হাওলা চক্রের সন্ধান মিলেছে।...
২০১৯ সালে সারদা মামলায় তৎকালীন সিপি রাজীবকে জিজ্ঞাসাবাদ করতে লাউডন স্ট্রিটে হানা দিয়েছিল সিবিআই। তাদের পুলিশ কমিশনারের সরকারি বাসভবনে ঢুকতে বাধা দেয় কলকাতা পুলিশ। মমতা নিজে লাউডন স্ট্রিটে গিয়ে সিপিকে নিয়ে চলে আসেন ধর্মতলার মেট্রো চ্যানেলে। রাজীবের বাসভবনে কেন্দ্রীয় সংস্থার অভিযানকে রাজ্যের পুলিশ বাহিনীর বিরুদ্ধে কেন্দ্রীয় সরকারের ‘চক্রান্ত’ বলে দাবি করেন মমতা। প্রতিবাদে সেই রাত থেকেই ধর্মতলায় ধরনা শুরু করেছিলেন তিনি। সেখানে যোগ দেন রাজ্য সরকারের অধিকাংশ পদস্থ আধিকারিক। ছিলেন রাজীব কুমার নিজেও। রাজ্য সরকার সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হয়। শীর্ষ আদালত রাজীবকে ‘রক্ষাকবচ’ দেওয়ার পর ধরনা তোলেন মমতা। সে ঘটনার কয়েক মাস পরে ২০১৯ সালের লোকসভা ভোটে রাজ্যে ধাক্কা খায় তৃণমূল। ৪২টির মধ্যে ১৮টি আসন ছিনিয়ে নিয়েছিল বিজেপি। ২০২৬ সালের ৮ জানুয়ারিও ঘটনার কেন্দ্রে সেই লাউডন স্ট্রিট এবং মমতার অভিযান। তবে এবার মমতা প্রতিবাদে ধরনায় বসেননি। বরং তার দল তৃণমূল মামলা করেছে কলকাতা হাইকোর্টে। সে মামলায় যুক্ত করা হয়েছে ইডি এবং আইপ্যাককে।
কেন্দ্রীয় সংস্থার বক্তব্য, তথ্যপ্রমাণের ভিত্তিতে কয়লা পাচার মামলায় এ তল্লাশি অভিযান চলেছে পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লির ১০টি জায়গায়। তার মধ্যে কলকাতার দুটি জায়গায় তাদের কাজে বাধা দেওয়া হয়েছে। মমতার বিরুদ্ধে সাংবিধানিক পদের অপব্যবহারের অভিযোগ তুলেছে ইডি। নির্বাচন বা রাজনৈতিক দলের সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই বলেও দাবি করা হয়েছে। আইপ্যাক দপ্তরে ইডির অভিযানের বিরুদ্ধে বৃহস্পতিবার দুপুর থেকেই রাস্তায় নেমে পড়ে তৃণমূল। শুক্রবার পথে নামেন স্বয়ং মমতা। তিনি যখন আইপ্যাকের দপ্তরে, তখনই হাজরা মোড়ে দলবল নিয়ে প্রতিবাদে নেমে পড়েছিলেন স্থানীয় কাউন্সিলর বৈশ্বানর চট্টোপাধ্যায়। তার পর দলের তরফে প্রতিবাদ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। বিকেল ৪টা থেকে প্রত্যেক ওয়ার্ডে প্রতিবাদী মিছিলের নির্দেশ দিয়েছিল তৃণমূল। সে অনুযায়ী, দিকে দিকে তৃণমূল নেতাদের বিক্ষোভ মিছিলে দেখা যায়।
কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার দাবি- কয়লা পাচারে মানি লন্ডারিংয়ের আন্দোলন করে তার সিংহভাগ অংশ বিক্রি করা হয়েছে শাখন্তরী গ্রুপকে। এ গোষ্ঠীর সূত্রে সামনে আসে হাওলা যোগ। হাওলার মাধ্যমে কয়লা বিক্রির বিপুল টাকা বিদেশে পাচার করা হয়েছে। মোট সাতটি কোম্পানি আছে মুম্বাই, জয়পরের ঠিকানায়। হাওলা কারবারের একাধিক স্তর রয়েছে। তা খতিয়ে দেখতেই সামনে কয়লা পাচারের টাকা বিভিন্ন স্তর অতিক্রম করে আইপ্যাকের মাধ্যমে হাওলার লেনদেনে বিদেশে গিয়েছে। তার পরিমাণ কয়েক শ কোটি টাকা। ইডির দাবি, আইপ্যাক সরাসরি হাওলা কারবারের সঙ্গে যুক্ত।
২০২১ সালের এপ্রিল মাসের দিল্লির রাউস অ্যাভিনিউ কোর্টে ইডির তরফে স্পষ্টভাবে জানানো হয়েছিল, অনুপ মাঝি ওরফে কয়লা পাচারের কারবারের একটা বড় অংশের টাকা অভিষেক ব্যানার্জির দুই ঘনিষ্ঠ আত্মীয়র কাছে পাঠাতে সহায়তা করত। থাইল্যান্ড এবং লন্ডনে সে টাকা পাঠানো হতো। মৌখিক দাবি নয়, লিখিতভাবেই আদালতে তা জানিয়েছিল ইডি। তদন্তকারী সংস্থা সূত্রেই কয়লাকাণ্ডে প্রায় ১ হাজার কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ জানা গেছে। বিদেশের অ্যাকাউন্টে একাধিক শিখণ্ডি সংস্থার মাধ্যমে সে টাকা ঢুকেছে। ইতোমধ্যে লালার একাধিক অফিস ও বাড়িতে তল্লাশি চালিয়ে মিলেছে নথি, যাতে স্পষ্ট হয়েছে প্রভাবশালী সাংসদের স্ত্রী, শ্যালিকা, শ্যালিকার স্বামী ও শ্বশুরের বিদেশের অ্যাকাউন্টেও ঢুকেছে টাকা। হাওলা কারবারের মাধ্যমেই সে টাকা ঢুকেছে। আর সে হাওলা কারবারের সঙ্গেই আইপ্যাকের যোগও মিলেছে বলে দাবি ইডির।
‘ম্যায়নে সব লেকে আয়া’। আমি সব নিয়ে এসেছি, জানিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। প্রকাশ্যে, সাংবাদিকদের সামনে। বেসরকারি একটি কনসালটেন্সি ফার্ম (পরামর্শদাতা সংস্থার)-এর শীর্ষ আধিকারিকের বাড়িতে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থার তল্লাশি অভিযানের মাঝেই ঢুকে পড়ে নথি, হার্ড ডিস্কসহ ফাইল নিয়ে নেন খোদ রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী। সবুজ রঙের প্লাস্টিকের সেই ফাইল হাতেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী রাজ্যবাসীকে জানালেন, ‘দেখুন আমি সব এই ফাইলে নিয়ে এসেছি। সব প্রার্থীর তালিকা, পার্টির প্ল্যান, স্ট্র্যাটেজি সংগ্রহ করতে এসেছিল। কারণ প্রতীক (প্রতীক জৈন, আইপ্যাকের কর্ণধার) আনার পার্টির ইনচার্জ। সব হার্ড ডিস্ক আমি গুছিয়ে নিয়ে এসেছি।’
রাজ্যবাসী জানল বেসরকারি ভোটকুশলী সংস্থার কর্ণধার রাজ্যের শাসক ঘলের ইনচার্জ, তার বাড়ি শাসক দলের পার্টি অফিসের সমতুল্য। দালের ভোট স্ট্র্যাটেজি, প্রার্থী তালিকা তৃণমূলের অফিস বা মুখ্যমন্ত্রীর বাড়ির দলীয় দপ্তর বা ক্যামাক স্ট্রিটে অভিষেক ব্যানার্জির অফিসে থাকে না। তা থাকে আইপ্যাকের কর্ণধার প্রতীক জেনের বাড়িতে। বৃহস্পতিবার সকাল থেকে দুপুর টানা মুখ্যমন্ত্রী থেকে গেলেন আইপ্যাকের কর্ণধারের বাড়ি এবং সংস্থার অফিসে। স্বাধীনতাত্তর বাংলায় এই দৃশ্য বেনজির। কয়লা থেকে গরু পাচার, শিক্ষক নিয়োগ দুর্নীতিতে অন্ততপক্ষে ৩০ জনের বেশি তৃণমূলের নেতা, মন্ত্রী, বিধায়ক, ঘনিষ্ঠদের ডেরায় গিয়ে তল্লাশি চালিয়ে গ্রেপ্তারিও করেছে কেন্দ্রীয় তদন্তকারী সংস্থা। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রীকে সেখানে সশরীরে ধরনা দিতে বা তল্লাশিতে বাধা দিয়ে নথিপত্র পাল্টা তুলে নিয়ে আসার মতো দৃশ্য দেখা যায়নি।
কয়লা পাচার কাণ্ডে বৃহস্পতিবার সকাল থেকেই পশ্চিমবঙ্গ ও দিল্লির মোট ১০টি স্থানে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট (ইডি) একযোগে তল্লাশি অভিযান শুরু করেছিল। প্রেস বিবৃতিতে ইডির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে ২০২০ সালের ২৭ নভেম্বর অনুপ মাঝি ওরফে লালার বিরুদ্ধে সিবিআই যে এফআইআর দায়ের করেছিল, সেই সূত্র ধরেই এ আর্থিক তছরুপের মামলার তদন্ত এগোচ্ছে। ইডির বক্তব্য, আইপ্যাক সংস্থার পেছনে রয়েছে অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়। তার সঙ্গে আবার অনুপ মাঝি, বিনোদ মিশ্রর সরাসরি যোগাযেগের প্রমাণ পাওয়া গেছে। অর্থাৎ কয়লা পাচার থেকে তৃণমূল নেতৃত্ব যে টাকা কামিয়েছেন, তাতে আইপ্যাকেরও হাত রয়েছে। তদন্তকারী সংস্থা সূত্রে খবর, অনুপ মাজি ও তার সিন্ডিকেট (ইস্টার্ন কোলফিল্ড লিমিটেডের) ইসিএলের লিজ নেওয়া এলাকা থেকে অবৈধভাবে কয়লা খনন ও পাচার করত। এ পাচার হওয়া কয়লা বাঁকুড়া, বর্ধমান ও পুরুলিয়ার বিভিন্ন কারখানায় বিক্রি করা হতো। ইডির দাবি- পাচার হওয়া কয়লার একটি বড় অংশ শাকগুরি গ্রুপ অব কোম্পানিজ কিনেছে। এ ঘটনায় ১০ কোটি টাকার একটি বিশাল হাওলা চক্রের সন্ধান মিলেছে। তদন্তে উঠে এসেছে যে, জনৈক হাওলা অপারেটর এ কালা পাচারের টাকা পাচার বা লেয়ারিং করার মাধ্যমে ইন্ডিয়ান প্যাক কনসাল্টিং প্রাইভেট লিমিটেড-এ পাঠিয়েছেন।
লেখক: ভারতের সিনিয়র সাংবাদিক

