বাংলাদেশের শিল্প বাঁচাতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের হস্তক্ষেপ এই মুহূর্তে খুবই প্রয়োজন। এই হস্তক্ষেপ বড় বড় শিল্পগ্রুপের জন্য যেমন প্রয়োজন, তেমনি ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্যও জরুরি। চব্বিশের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর থেকে যে হারে শিল্প-কারখানাগুলো বিভিন্নভাবে আক্রান্ত হয়েছে তা থেকে উত্তরণ এখন সময়ের দাবি।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায় দেশের প্রথম সারির শিল্পগ্রুপ এস আলম গ্রুপ। প্রাচ্যের রাণী চট্টগ্রামে এ শিল্পগোষ্ঠীর উপস্থিতি লাখো শ্রমিক ও পরিবারের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। খাদ্যপণ্য, চিনি, ভোজ্যতেল, ইস্পাত, সিমেন্ট, বিদ্যুৎ উৎপাদনসহ বহু খাতে এর বিনিয়োগ দেশের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
সমুদ্র যখন অশান্ত হয়, তখন সবচেয়ে শক্ত জাহাজও কেঁপে ওঠে এবং ডুবে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। ইতিহাসে আমরা দেখেছি, অহংকার নয়- অপ্রস্তুত ঝড়ই ডুবিয়ে দেয় মহাশক্তিধর জাহাজকে। যেমন একদিন টাইটানিক আমাদের চোখের সামনে তুলে ধরেছিল মানবসভ্যতার এক করুণ পরিণতি। আজ চট্টগ্রামের অর্থনৈতিক দিগন্তে আমরা দেখতে পাচ্ছি আরেকটি ঝড়ের পূর্বাভাস- শুধুমাত্র ব্যক্তিগত ঈর্ষা, অহমিকা এবং চট্টগ্রামবিরোধী মনোভাবের কারণে একজন ব্যক্তির একঘেয়েমি সিদ্ধান্তে চট্টগ্রাম বড় ধরনের অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে। হাজার হাজার মানুষের বেকারত্ব, পরিবার পরিজন নিয়ে মানবেতর জীবন চলছে। আসন্ন মহাঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে আছে এস আলম- চট্টগ্রামের শিল্প অভিযাত্রার এক দীর্ঘ অধ্যায়, লাখো শ্রমিকের জীবনরেখা এবং দেশের অর্থনীতির শক্ত স্তম্ভ।
বন্দরনগরী চট্টগ্রাম বাংলাদেশের বাণিজ্যিক আত্মা এবং শিল্পনগরী হিসেবে বিবেচিত। প্রাচ্যের রাণী চট্টগ্রাম কেবল একটি শহর নয়; এটি বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণকেন্দ্র। এই শহরের প্রতিটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান মানে হাজারো পরিবারের স্বপ্ন। আশির দশকে ছোট পরিসরের পরিবহন ব্যবসা দিয়ে শুরু করে এস আলম আজ যে বিস্তৃত শিল্প সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছে- তা কেবল ব্যবসায়িক সাফল্য নয়, একজন উদ্যোক্তার সাহস ও দক্ষতার অনন্য উদাহরণ।
খাদ্যপণ্য, চিনি, ভোজ্যতেল, ইস্পাত, সিমেন্ট, বিদ্যুৎ উৎপাদন- বহু খাতে এস আলমের বিনিয়োগ দেশের উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অংশগ্রহণ করে বৈদেশিক বাজারে বাংলাদেশের উপস্থিতি জোরদার করেছে।
ব্যাংক ঋণ নিয়ে ব্যবসা পরিচালনা করা হয়েছে- যা শিল্প অর্থনীতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। অন্তর্বর্তী সরকারের পূর্ব পর্যন্ত তারা কখনো ঋণ খেলাপি ছিল না। ঋণ মানেই অপরাধ নয়; বরং উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের ইঞ্জিন সচল রাখার উপায়। যদি কোথাও অসঙ্গতি থাকে, আইন আছে, তদন্ত হোক। কিন্তু বিচারপূর্বেই একটি চলমান ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলা কি ন্যায্য?
সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মুখোমুখি চট্টগ্রামের জনগণ
যদি এই শিল্পগোষ্ঠী ধ্বংস বা ভেঙে পড়ে, কয়েক লাখ শ্রমিক ও কর্মচারী বেকার হবে। বাজারে খাদ্য ও নির্মাণ সামগ্রীর সরবরাহে ঘাটতি দেখা দেবে, মূল্যস্ফীতি বাড়বে, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা নষ্ট হবে, সামাজিক অস্থিরতা বাড়বে। একটি শিল্পগোষ্ঠীর পতন মানে কেবল একটি নামের বিলুপ্তি নয়; এটি লাখো পরিবারের চুলা নিভে যাওয়ার শঙ্কা।
ষড়যন্ত্র না প্রতিযোগিতা? নাকি এক ব্যক্তির উচ্চাকাঙ্খা, একঘেয়েমি অবস্থান ও ঈর্ষাপরায়ণতা? সফলতা সবসময় প্রশংসা পায় না- পায় ঈর্ষাও। বাজার প্রতিযোগিতা থাকবেই। কিন্তু প্রতিযোগিতা যদি নীতির বদলে কৌশলী আঘাতে পরিণত হয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয় গোটা অর্থনীতি। রাজনৈতিক চাপ, বাজার নিয়ন্ত্রণের লড়াই, স্বার্থের সংঘাত- এসব প্রশ্ন আজ জনমনে ঘুরপাক খাচ্ছে। আমি কোনো রায় দিচ্ছি না; সত্য উদঘাটিত হোক, কিন্তু শিল্পকে ধ্বংস করে নয়।
প্রধানমন্ত্রীর প্রতি আবেদন
আপনি শপত নেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বিনিয়োগের আচলাবস্থা দূর করার জন্য নির্দেশনা প্রদান করেছেন, দুর্বল ও বিনিয়োগবঞ্চিত কারখানাগুলোর সহযোগিতা করার উদ্যোগ নিয়েছেন- যার ফলে বিনিয়োগকারীদের মাঝে কিছুটা হলেও স্বস্তি এসেছে।
আপনার নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের জন্য ক্ষতিকর “মব সংস্কৃতি” বন্ধ করার উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। আজ চট্টগ্রামের সংকটময় মুহূর্তে আপনার বিচক্ষণ নেতৃত্বই পরিস্থিতি স্থিতিশীল করতে পারে। আমরা চাই:
নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত
শিল্প ও কর্মসংস্থানের সুরক্ষা
ব্যাংকিং খাতে স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ রক্ষা
একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে বহু বছর; ধ্বংস হতে মুহূর্ত লাগে। আপনার হস্তক্ষেপ লাখো পরিবারকে আশ্বাস দিতে পারে, ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে পারে এবং শিল্পকে রক্ষা করতে পারে।
আমাদের দায়বদ্ধতা
এই মুহূর্তে প্রয়োজন তথ্যভিত্তিক আলোচনা, গণতান্ত্রিক ও আইনানুগ আন্দোলন, দলমত নির্বিশেষে ঐক্য। এস আলম গ্রুপকে রক্ষা করা মানে কেবল একটি শিল্পগোষ্ঠীকে নয়; চট্টগ্রামের শিল্প ঐতিহ্য, শ্রমিকের অন্ন এবং দেশের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতাকেও রক্ষা করা।
সম্প্রীতি খবরে প্রকাশ, অন্তর্বর্তী সরকারের বিবেচনাধীন সিদ্ধান্তে বিদ্যুৎ বিপর্যয়ের ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। চট্টগ্রামের বাশখালীতে অবস্থিত এস এস পাওয়ার-১ আই লিমিটেডের পাওনা আটকে থাকায় প্রতিষ্ঠানটি বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানি সংগ্রহ করতে পারছে না। কয়েকটি কয়লাবাহী জাহাজ বহিনোঙরে অবস্থান করলেও অর্থের অভাবে খালাস করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে দেশ বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে। ১,২০০ মেগাওয়াটের বেশি বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যোগ হতে পারে না- এটি শুধু চট্টগ্রাম নয়, দেশের অর্থনৈতিক ও বিনিয়োগ পরিবেশকে প্রভাবিত করে।
পরিশেষে সদয় নিবেদন
আজ আমরা নীরব থাকলে, কাল আরেকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান একই পরিণতির মুখে পড়তে পারে। কলম সমুদ্রের ঢেউ থামাতে পারবে না, কিন্তু সত্য ও বিবেকের শক্তি ইতিহাসের গতিপথ বদলাতে পারে। আসুন, সকল ভেদাভেদ ভুলে দেশের উন্নয়নের স্বার্থে এক হই। ন্যায়বিচার ও স্বচ্ছতা চাই—কিন্তু কোনো শিল্প ধ্বংস না হয়ে। চট্টগ্রামের আকাশে আবার যেন ভেসে ওঠে নবপ্রভাতের সূর্য।