ঢাকা ১ আষাঢ় ১৪৩১, শনিবার, ১৫ জুন ২০২৪

কোরবানিদাতার কাছে আল্লাহ যা চান

প্রকাশ: ০৯ জুন ২০২৪, ০৯:০০ এএম
আপডেট: ০৯ জুন ২০২৪, ১০:১৬ এএম
কোরবানিদাতার কাছে আল্লাহ যা চান
কোরবানির পশুর যত্ন নিচ্ছেন এক কিশোর। ইন্টারনেট

কোরবানির মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর জন্য তার সবচেয়ে প্রিয় জিনিস ত্যাগ করতে রাজি আছে কি না, সেটিই পরীক্ষার বিষয়। কোরবানি আমাদের সেই পরীক্ষার কথাই বারবার স্মরণ করিয়ে দেয়। ইবরাহিম (আ.)-এর কাছে আল্লাহর পরীক্ষাও ছিল সেটাই। আমাদের এখন আর সন্তান কোরবানি দেওয়ার মতো এত কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয় না। শুধু একটি জবাইয়ের উপযুক্ত হালাল পশু কোরবানি করেই আমরা সেই পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে পারি। ঈমানের এসব কঠিন পরীক্ষায় যারা যত বেশি নম্বর অর্জন করতে পারেন, তারাই হন তত বড় আল্লাহপ্রেমিক ও আল্লাহর প্রতিনিধি হিসেবে ততই সফল। ঈদের প্রকৃত আধ্যাত্মিক আনন্দ তারা ঠিক ততটাই উপভোগ করতে পারেন, যতটা তারা এ জাতীয় পরীক্ষায় সফল হন।

কোরবানি আত্মশুদ্ধি ও পবিত্রতার মাধ্যম
কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে সওয়াব লেখা হয়। আল্লাহর কাছে কোরবানির সওয়াব গ্রহণীয় হওয়ার তাৎপর্য হচ্ছে, পূর্ণ ঈমান ও ত্যাগের মহিমায় উদ্দীপ্ত হয়ে ইবরাহিম (আ.) স্বীয় প্রাণাধিক প্রিয় ছেলের কাঁধে ছুরি চালিয়েছিলেন, কোরবানির পশুর গলায় ছুরি দেওয়ার সময় কোরবানিদাতার মনটা সেই মানসিকতা ও ত্যাগের সুরে অনুরণিত হতে হবে। আর যদি তার দেহ-মনের পরতে পরতে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের আকুল আগ্রহ উদ্বেলিত না হয়, তাহলে তার এই কোরবানির উৎসব নিছক গোশত খাওয়ার জন্যই হবে। সেজন্যই আল্লাহতায়ালা কোরবানিদাতাদের সাবধান করে বলেন, ‘কোরবানির পশুর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছায় কেবল তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৭)

কোরবানি আত্মত্যাগের অনন্য উপমা
কোরবানি শুধু পশু জবাই করার নাম নয়। নিজের পশুত্ব, ক্ষুদ্রতা, নীচুতা, স্বার্থপরতা, হীনতা, দীনতা, আমিত্ব ও অহংকার ত্যাগের নাম কোরবানি। নিজের নামাজ, কোরবানি, জীবন-মরণ ও যাবতীয় বিষয়-আশয়—সবকিছুই শুধু আল্লাহর নামে তাঁরই সন্তুষ্টির জন্য চূড়ান্তভাবে নিয়োগ ও ত্যাগের মানসিকতা এবং বাস্তবে সেসব আমল করাই হচ্ছে প্রকৃত কোরবানি। এই কোরবানি পশু জবাই থেকে শুরু করে নিজের ভেতরকার পশুত্ব জবাই বা বিসর্জন এবং আল্লাহর পথে সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালানোর মাধ্যমে তার পথে শাহাদত বরণ পর্যন্ত সম্প্রসারিত। এই কোরবানি মানুষের আকাঙ্ক্ষা, নিয়ত, প্রস্তুতি ও গভীরতম প্রতিশ্রুতি থেকে শুরু করে তার চূড়ান্ত বাস্তবায়ন পর্যন্ত সম্প্রসারিত। মূলত কোরবানি হচ্ছে একটি প্রতীকী ব্যাপার। আল্লাহর জন্য বান্দার আত্মত্যাগের একটি উপমামাত্র। 

কোরবানি থেকে শিক্ষা নিয়ে সারা বছরই আল্লাহর নৈকট্য লাভের আশায় নিজ সম্পদ অন্যের কল্যাণে ব্যয় করার মনোভাব গড়ে উঠলে বুঝতে হবে কোরবানি স্বার্থক হয়েছে। আর না হয় এটি নামমাত্র একটি ভোগবাদী অনুষ্ঠানই থেকে যাবে চিরকাল। আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমাদের জন্য কোরবানির উটগুলোকে আল্লাহর নিদর্শনের অন্যতম করেছি। যাতে তোমাদের জন্য কল্যাণ রয়েছে। সুতরাং সারিবদ্ধভাবে দণ্ডায়মান পশুগুলোর ওপর তোমরা আল্লাহর স্মরণ (বিসমিল্লাহ বলে কোরবানি) করো। আর যখন কাত হয়ে পড়ে, তখন সেগুলো থেকে খাও। আর আহার করাও ধৈর্যশীল অভাবী ও ভিক্ষাকারী অভাবগ্রস্তকে। এভাবে আমি ওদের তোমাদের অধীন করে দিয়েছি; যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো।’ (সুরা হজ, আয়াত: ৩৬)

চিত্ত-বিত্তের মেলবন্ধনের নাম কোরবানি
কোরবানির গোশত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না। যতটুকু যায় বা রেকর্ড হয়ে থাকে, তা হলো আমাদের মনে তাঁর প্রেমের গভীরতার মাত্রা। কোরবানির গোশত গরিবদের জন্য যতটুকু সম্ভব বিলিয়ে দেওয়া চাই। কেবল সেটাই পরকালে আমাদের পাথেয় হয়ে থাকবে। আর যাকে আমরা আমাদের অংশ মনে করে কৃপণের ধনের মতো আঁকড়ে আছি, সেটাই বরং আমাদের কাছ থেকে হাতছাড়া হয়ে যাচ্ছে, যে বিষয়ে আমরা একেবারেই বেখবর। আল্লাহ বলেন, ‘হে ঈমানদাররা, যে অর্থ তোমরা উপার্জন করেছ এবং যা কিছু আমি জমি থেকে তোমাদের জন্য ফলিয়েছি, তা থেকে উত্তম অংশ আল্লাহর পথে ব্যয় করো।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ২৬৭)

কাজেই আমাদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত সম্পদ মানবসেবায় ব্যয় করা চাই। গরিব মানুষের সহযোগিতায় সব বিত্তশালী লোকের এগিয়ে আসা উচিত। সারা জীবন সাধ্যমতো আল্লাহর সন্তুষ্টি ও নৈকট্য লাভের কথা বিবেচনা করে মানুষকে সাহায্য করা দরকার। চিত্ত আর বিত্তের মিল ঘটানোর জন্যই আল্লাহতায়ালা পবিত্র কোরআনে বারবার মানুষকে আহ্বান করেছেন।

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

মিনায় গমন, হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০৯:৪৭ এএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০৯:৪৭ এএম
মিনায় গমন, হজের আনুষ্ঠানিকতা শুরু
ছবি: সংগৃহীত

পবিত্র হজের মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হচ্ছে আজ শুক্রবার (১৪ জুন)। আজ ভোরে ইহরামের কাপড় পরে তাঁবুর শহর মিনায় গমনের মাধ্যমে পাঁচ দিনের হজ কার্যক্রম শুরু হবে। তবে গতকাল বৃহস্পতিবার রাত থেকেই হজযাত্রীদের মিনায় নেওয়া শুরু করেছেন অনেক মুয়াল্লেম। এশার নামাজের পর মক্কার নিজ নিজ আবাসন থেকে মিনার উদ্দেশে রওনা হন হাজিরা। 

আগামীকাল শনিবার অনুষ্ঠিত হবে পবিত্র হজ। এদিন ভোররাতে মিনা থেকে আরাফাতের ময়দানে উপস্থিত হবেন হাজিরা। 

বিশ্বের অন্যান্য দেশ থেকে হজযাত্রীরা সৌদি আরব পৌঁছেছেন। এবার বাংলাদেশসহ ১৮০টির বেশি দেশের প্রায় ২০ লাখ মুসল্লি হজ পালন করবেন। বাংলাদেশ থেকে হজ পালন করবেন ৮৫ হাজার ২৫৭ জন। 

মিনায় পৌঁছে হাজিরা আজ ফজর থেকে শুরু করে এশা অর্থাৎ পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ আদায় করবেন নিজ নিজ তাঁবুতে।

৯ জিলহজ আরাফাতের ময়দানে অবস্থানের দিনকেই হজের দিন বলা হয়। এ দিনের নাম ইয়াওমুল আরাফা। আগামীকাল ৯ জিলহজ সূর্যোদয়ের পর হাজিদের আরাফাতের ময়দানের উদ্দেশে যাত্রা করার কথা থাকলেও বৃহস্পতিবার রাতেই নিয়ে যাবেন মুয়াল্লিমরা। সেখানে আগে পৌঁছে গিয়ে ফজর, জোহর-আসর আদায় করবেন আরাফাতের ময়দানে।

পবিত্র হজের আনুষ্ঠানিকতা চলে পাঁচ দিন। তার মধ্যে আরাফাতের দিবসকে ধরা হয় মূল হজ হিসেবে। মিনা থেকে ৯ জিলহজ শনিবার ভোর থেকেই হজযাত্রীরা ‘লাব্বাইক আল্লাহুমা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে আরাফাতের ময়দানে সমবেত হবেন। তাদের সমস্বরে উচ্চারিত ‘লাব্বাইক আল্লাহুমা লাব্বাইক’ ধ্বনিতে মুখরিত হবে আরাফাতের আকাশ-বাতাস। দুপুরে হজের খুতবা শুনবেন তারা। তারপর এক আজানে হবে জোহর ও আসরের নামাজ। সূর্যাস্তের পর হজযাত্রীরা আরাফাতের ময়দান ত্যাগ করে যাত্রা করবেন মুজদালিফার পথে। সেখানে আবার তারা এক আজানে আদায় করবেন মাগরিব ও এশার নামাজ। এ রাতে মুজদালিফায় তারা খোলা আকাশের নিচে অবস্থান করবেন।

এ সময় তারা মুজদালিফা থেকে পাথর সংগ্রহ করবেন জামারায় প্রতীকী শয়তানকে নিক্ষেপের জন্য। এরপর শনিবার সকালে সূর্যোদয়ের পর জামারায় প্রতীকী বড় শয়তানকে পাথর নিক্ষেপ করবেন হজযাত্রীরা। এরপর আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য পশু কোরবানি করবেন। কোরবানি করে মাথা মুণ্ডন করবেন। এহরাম খুলে পরবেন সাধারণ পোশাক। এরপর কাবাঘর তাওয়াফ করবেন। সাফা-মারওয়ায় সাতবার সাঈ (চক্কর) করবেন। পরে আবার ফিরে যাবেন মিনায়। এরপর দিন এবং তারপর দিন অর্থাৎ টানা দুদিন দ্বিতীয় ও ছোট শয়তানকে পাথর মারার মধ্য দিয়ে হাজিরা শেষ করবেন হজের আনুষ্ঠানিকতা। 

কেমন হবে কোরবানির পশু?

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০৮:০৭ পিএম
কেমন হবে কোরবানির পশু?
কোরবানির পশু মোটাতাজা ও দেখতে সুন্দর হলে ভালো হয়। ইন্টারনেট

কোন পশু দিয়ে কোরবানি করা যাবে
গৃহপালিত সব ধরনের পশু তথা—ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, গরু, মহিষ এবং উট দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু (যেমন—হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি) দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ নয়। তেমনিভাবে হাঁস-মুরগি বা কোনো পাখি দিয়েও কোরবানি জায়েজ নয়। যে পশু কোরবানি করা হবে, তার ওপর কোরবানিদাতার পূর্ণ মালিকানা থাকতে হবে। বন্ধকি পশু, কর্জ করা পশু বা পথে পাওয়া পশু দিয়ে কোরবানি আদায় হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২০৫)

কোরবানির পশুর বয়স কত হতে হবে
গরু ও মহিষের দুই বছর এবং উটের পাঁচ বছর পূর্ণ হলে কোরবানি করা জায়েজ। ছাগল, দুম্বা ও ভেড়া এক বছর পূর্ণ হতে হবে। দুম্বা ও ভেড়া যদি এক বছর পূর্ণ না হয়, তবে স্বাস্থ্যগতভাবে এক বছরের বাচ্চার মতো মনে হয়, তা হলে এমন দুম্বা ও ভেড়া দিয়েও কোরবানি করা জায়েজ। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) কোরবানি এবং হজ-ওমরার পশুর ক্ষেত্রে উটের মাঝে পাঁচ বছর বয়স অতিক্রমকারী, গরু-মহিষের ক্ষেত্রে দুই বছর অতিক্রমকারী এবং বকরি ও ভেড়ার ক্ষেত্রে এক বছর অতিক্রমকারী পশুর কথা বলতেন। (মুয়াত্তায়ে মালেক, ৭৫৪)
 
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মুসিন্নাহ ছাড়া জবাই করো না। (মুসিন্নাহ হলো পাঁচ বছর বয়সী উট, দুই বছরের গরু ও ছাগলের ক্ষেত্রে এক বছর)। যদি সম্ভব না হয়, তা হলে ছয় মাস বয়সী ভেড়া বা দুম্বা।’ (মুসলিম, ১৯৬৩)

কোরবানির পশুর নর-মাদা হওয়ার শর্ত আছে কি
যেসব পশু কোরবানি জায়েজ, সেগুলোর নর-মাদা কোরবানি করা যায়। (ফতোয়ায়ে কাজিখান, ৩/৩৪৮)

খাসিকৃত পশু দিয়ে কোরবানি করা যাবে
খাসিকৃত পশু দিয়ে কোরবানি করা উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোরবানির ইচ্ছে করতেন, তখন দুটি বড় মোটা তাজা শিং ও সুন্দর রঙবিশিষ্ট মেষ কিনতেন। (ইবনে মাজাহ, ৩১১৩)। আবু রাফে (রহ.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি মোটা তাজা খাসিকৃত ভেড়া কোরবানি করেছেন।’ (মুসনাদে আহমদ, ২৬৬৪৯)

গর্ভবতী পশু কোরবানি করা যাবে কি
গর্ভবতী পশু কোরবানি করা জায়েজ। তবে প্রসবের সময় আসন্ন হলে সে পশু কোরবানি করা মাকরুহ। জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায়, তা হলে সেটাও জবাই করতে হবে এবং কেউ চাইলে এর গোশতও খেতে পারবে। (ফতোয়ায়ে কাজিখান, ৩/৩৫০)

বন্ধ্যা ও পাগল পশু দিয়ে কোরবানি হবে
বন্ধ্যা পশুর কোরবানি জায়েজ। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৫)। হাসান (রা.) বলেন, ‘পাগল পশুর কোরবানি জায়েজ। তবে যদি এমন পাগল হয়, যে ঘাস-পানি দিলে খায় না এবং মাঠেও চরে না, তা হলে তার কোরবানি জায়েজ হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২১৬)

যে পশুর জন্মগত শিং নেই বা ভাঙা
যে পশুর জন্মগত শিং নেই বা মাঝখানে ভেঙে গেছে, তা দিয়েও কোরবানি জায়েজ। আলি (রা.) বলেন, ‘একটি গাভী সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করা যায়।’ (বর্ণনাকারী বলেন) বললাম, ‘যদি গাভী বাচ্চা দেয়, তা হলে কী করব?’ বললেন, ‘বাচ্চাকেও গাভীর সঙ্গে জবাই করে দাও।’ বললাম, ‘খোঁড়া পশু!’ বললেন, ‘যদি কোরবানির স্থানে হেঁটে যেতে পারে, তা হলে কোরবানি করবে।’ বললাম, ‘শিংভাঙা পশু!’ বললেন, ‘এমন পশু দিয়ে কোরবানি করতে কোনো সমস্যা নেই। তবে আমাদেরকে রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির পশুর চোখ-কান ভালোভাবে দেখে নেওয়ার আদেশ করেছেন।’ (তিরমিজি, ১৪২৩)


লেখক: খতিব, বনানী মসজিদ আত-তাকওয়া

কোরবানির গোশত বণ্টনরীতি

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০৩:০০ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০৫:৩৭ পিএম
কোরবানির গোশত বণ্টনরীতি
গোশতের ছবি। ইন্টারনেট

ঈদুল আজহার দিন প্রথমে কোরবানির গোশত দিয়ে খাবার শুরু করা সুন্নত। এ সুন্নত শুধু ১০ জিলহজের জন্য; ১১ বা ১২ তারিখে গোশত দিয়ে খাওয়া শুরু করা সুন্নত নয়। (তিরমিজি, ১/১২০)

হাদিসে এসেছে, কোরবানির স্থানে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজ হাতে ৬৩টি পশু কোরবানি করলেন। এরপর যা অবশিষ্ট থাকল, তা আলি (রা.)-কে দিলেন এবং তিনি তা কোরবানি করলেন। তিনি নিজে তাকে কোরবানির পশুতে শরিক করলেন। পরে তিনি প্রত্যেক পশুর কিছু অংশ নিয়ে একটি হাঁড়িতে রান্নার নির্দেশ দিলেন। গোশত রান্না হলে তারা দুজনই তা থেকে খেলেন এবং ঝোল পান করলেন। (মুসলিম, ২৮১৫)

কোরবানির গোশত বণ্টনের নিয়ম
কোরবানির গোশতের এক-তৃতীয়াংশ গরিব-মিসকিনকে, এক-তৃতীয়াংশ আত্মীয়-স্বজন ও পাড়া-প্রতিবেশীকে দেওয়া উত্তম। তবে যদি এমন হয় যে, সঠিকভাবে বণ্টন করলে নিজ পরিবারের কষ্ট হবে, তবে পুরো গোশত নিজে রেখে দিলেও অসুবিধা নেই। (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২২৪, ফতোয়ায়ে আলমগিরি, ৫/৩০০) 

উল্লেখ্য, শরিকে কোরবানিতে ওজন করে গোশত বণ্টন করতে হবে; অনুমান করে ভাগ করা জায়েজ নয়। (আদ-দুররুল মুখতার,৬/৩১৭, ফতোয়ায়ে কাজিখান, ৩/৩৫১)। বণ্টনের ক্ষেত্রে কাঁচা গোশত বা রান্না করা গোশতের মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। (আল কাফি, ১/৪২৪)

কোরবানির গোশতের সামাজিক বণ্টন
অনেক এলাকায় প্রত্যেক কোরবানিদাতা নিজ কোরবানির গোশতের এক-তৃতীয়াংশ (যা ফকির-মিসকিনদের মাঝে বণ্টন করা মুস্তাহাব) ব্যক্তিগতভাবে বণ্টন না করে সামাজিকভাবে বণ্টন করার উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় সমাজে জমা দেন। এটা জায়েজ আছে। সমাজে জমা দেওয়া গোশতের বণ্টন থেকে কোরবানিদাতা কোনো ভাগ গ্রহণ করতে পারবেন না। তা শুধু গরিব-মিসকিনদের প্রাপ্য। (বাদায়েউস সানায়ে, ৮/১৩৩) 

অমুসলিমদের কোরবানির গোশত দেওয়া
কোরবানির গোশত ভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের দেওয়া জায়েজ। (ইলাউস সুনান, ৭/২৮৩)

পারিশ্রমিক হিসেবে গোশত দেওয়া
জবাইকারী, কসাই বা কোরবানির কাজে সহযোগিতাকারীকে গোশত বা কোরবানির পশুর কোনো কিছু পারিশ্রমিক হিসেবে দেওয়া যাবে না। (আদ-দুররুল মুখতার, ৬/৩২৮)

আলি (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে তাঁর কোরবানির উটের আনুষঙ্গিক কাজ সম্পন্ন করতে নির্দেশ দিলেন। তিনি কোরবানির পশুর গোশত, চামড়া ও আচ্ছাদনের কাপড় সদকা করতে আদেশ করেন এবং এর কোনো অংশ কসাইকে দিতে নিষেধ করেন। তিনি বলেন, ‘আমরা তাকে (তার পারিশ্রমিক) নিজেদের পক্ষ থেকে (আলাদাভাবে) দেব।’ (মুসলিম, ১৩১৭) 

লেখক: খতিব, বঙ্গভবন জামে মসজিদ

কোরবানি নিয়ে যা না জানলেই নয়

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০৯:০০ এএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০৯:৫৮ এএম
কোরবানি নিয়ে যা না জানলেই নয়
কোরবানির পশুর ছবি। এআই

কোরবানির পশুর রক্ত মাটিতে পড়ার আগেই আল্লাহর কাছে সওয়াব লেখা হয়। ইবরাহিম (আ.) নিজের প্রাণাধিক প্রিয় পুত্রের কাঁধে ছুরি চালিয়েছিলেন, কোরবানির পশুর গলায় ছুরি দেওয়ার সময় কোরবানিদাতার মনটা সেই মানসিকতা ও ত্যাগের স্বরে অনুরণিত হতে হবে। আর যদি তার দেহ-মনের পরতে পরতে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণের আকুল আগ্রহ উদ্বেলিত না হয়, তা হলে তার এই কোরবানির উৎসব নিছক গোশত খাওয়ার জন্যই হবে। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘কোরবানির পশুর গোশত ও রক্ত আল্লাহর কাছে পৌঁছায় না, কিন্তু তাঁর কাছে পৌঁছায় শুধু তোমাদের তাকওয়া।’ (সুরা হজ, ৩৭)

হারাম সম্পদের কোরবানি

হারাম সম্পদের ওপর ভিত্তি করে কোরবানি ওয়াজিব হয় না। তাই কোরবানিদাতার হালাল সম্পদ না থাকলে সন্দেহমূলক অর্থ হলেও ধার করে কোরবানি করবে এবং নিজ হালাল অর্থ দিয়ে ঋণ পরিশোধ করবে। (ফতোয়ায়ে শামি, ২/২৫; আপকে মাসাইল আওর উনকা হল, ৬/২৫২)

দাস বা গোলামের কোরবানি

দাস বা গোলামের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘গোলামের সম্পদে কোনো জাকাত নেই।’ (মুসান্নাফে আবদির রাজ্জাক, ৩/১৬১)

মুসাফির ও মুকিম ব্যক্তির কোরবানি

কোরবানির সময়ের প্রথম দিকে মুসাফির থাকার পরে তৃতীয় দিন কোরবানির সময় শেষ হওয়ার আগে মুকিম হলে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে। পক্ষান্তরে প্রথম দিকে মুকিম ছিল, এরপর তৃতীয় দিনে মুসাফির হয়ে গেলে; এক্ষেত্রে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব থাকবে না। অর্থাৎ সে কোরবানি না দিলে গুনাহগার হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/১৯৬; ফতোয়ায়ে খানিয়া, ৩/৩৪৬)

নাবালেগ শিশু ও পাগলের কোরবানি

নাবালেগ (অপ্রাপ্তবয়স্ক) শিশু এবং যে সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন নয়, নেসাবের মালিক হলেও তাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব নয়। অবশ্য তাদের অভিভাবক নিজ সম্পদ দিয়ে তাদের পক্ষ থেকে কোরবানি করলে তা সহিহ হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩১৬)

পিতার নামে কোরবানি

ছেলে কোরবানির পশু ক্রয় করে পিতার (নামে) পক্ষ থেকে কোরবানি দিলে পিতার ওয়াজিব কোরবানি আদায় হবে না; বরং পিতার জন্য পৃথকভাবে পশু ক্রয় করে বা ওই পশুতে নিজের মালিকানার অর্থ দিয়ে শরিক হয়ে কোরবানি আদায় করতে হবে। (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া, ৫/৩০২)

অন্যের ওয়াজিব কোরবানি আদায়ের বিধান

অন্যের ওয়াজিব কোরবানি দিতে চাইলে সে ব্যক্তির অনুমতি নিতে হবে। নইলে তার কোরবানি আদায় হবে না। অবশ্য স্বামী বা পিতা যদি স্ত্রী বা সন্তানের অনুমতি ছাড়াই তাদের পক্ষ থেকে কোরবানি করে, তা হলে দেশীয় সামাজিক প্রচলনের কারণে তাদের কোরবানি আদায় হয়ে যাবে। তবে অনুমতি নিয়ে আদায় করা ভালো। (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২১১)

মৃতের পক্ষ থেকে কোরবানি

মৃতের পক্ষ থেকে কোরবানি করা জায়েজ। মৃত ব্যক্তি যদি অসিয়ত না করে থাকে, তা হলে সেটি নফল কোরবানি হিসেবে গণ্য হবে। কোরবানির স্বাভাবিক গোশতের মতো তা নিজেরাও খেতে পারবে এবং আত্মীয়-স্বজনকেও দিতে পারবে। আর যদি মৃত ব্যক্তি কোরবানির অসিয়ত করে যায়, তা হলে এর গোশত নিজেরা খেতে পারবে না; বরং গরিব-মিসকিনদের মাঝে সদকা করে দিতে হবে। (মুসনাদে আহমদ, ৮৪৫)

জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কোরবানি

যেমনিভাবে মৃতের পক্ষ থেকে ইসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কোরবানি করা জায়েজ, তেমনিভাবে জীবিত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার ইসালে সওয়াবের জন্য নফল কোরবানি করা জায়েজ। এ কোরবানির গোশত কোরবানিদাতা ও তার পরিবারও খেতে পারবে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৬)

দরিদ্র ব্যক্তির কোরবানির বিধান

দরিদ্র ব্যক্তির ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব নয়; কিন্তু সে যদি কোরবানির নিয়তে কোনো পশু ক্রয় করে, তাহলে তা কোরবানি করা ওয়াজিব হয়ে যায়। (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/১৯২)

একান্নভুক্ত পরিবারে কোরবানি কয়টি করতে হবে

একান্নভুক্ত পরিবারে একাধিক ব্যক্তির ওপর কোরবানি ওয়াজিব হওয়ার শর্ত পাওয়া গেলে (অর্থাৎ তাদের কাছে নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকলে) তাদের প্রত্যেকের ওপরই ভিন্ন ভিন্ন কোরবানি ওয়াজিব। একটি কোরবানি সবার জন্য যথেষ্ট নয়। (ফতোয়ায়ে শামি, ৫/২২০)

রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে কোরবানি করা

সামর্থ্যবান ব্যক্তির রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর পক্ষ থেকে কোরবানি করা উত্তম। এটি বড় সৌভাগ্যের বিষয়ও বটে। হানশ (রহ.) বলেন, ‘আমি আলি (রা.)-কে দেখলাম, তিনি দুটি বকরি কোরবানি করলেন। তাকে বললাম, এটি কী? (আপনার ওপর তো একটি কোরবানি করা আবশ্যক ছিল; কিন্তু দুটি করলেন কেন?)’ বললেন, ‘নিশ্চয়ই রাসুলুল্লাহ (সা.) আমাকে অসিয়ত করেছেন, যেন আমি তার পক্ষ থেকে কোরবানি করি। এ কারণে আমি তাঁর পক্ষ থেকে (একটি) কোরবানি করেছি।’ (তিরমিজি, ১/২৭৫)

যাদের ওপর কোরবানি ওয়াজিব

১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন প্রত্যেক মুসলিম নারী-পুরুষের ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। টাকা-পয়সা, সোনা-রুপা, অলংকার, বসবাস ও খোরাকির প্রয়োজনে আসে—এমন জমি, প্রয়োজনের অতিরিক্ত বাড়ি, ব্যবসায়িক পণ্য ও অপ্রয়োজনীয় আসবাবপত্র কোরবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। (ফতোয়ায়ে তাতারখানিয়া, ১৭/৪০৫) 

কোরবানির নেসাব

সোনার ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি, রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি, টাকা-পয়সা ও অন্যান্য জিনিসের ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার মূল্যের সমপরিমাণ হওয়া। আর সোনা বা রুপা কিংবা টাকা-পয়সার কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না থাকে, কিন্তু প্রয়োজন অতিরিক্ত একাধিক বস্তু মিলে সাড়ে বায়ান্ন তোলা রুপার সমমূল্যের হয়, তাহলেও তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। (ফতোয়ায়ে শামি, ৫/২২২)

কোরবানির নেসাব পুরো বছর থাকা জরুরি নয়; বরং কোরবানির তিন দিনের মধ্যে যেকোনো দিন থাকলেই কোরবানি ওয়াজিব হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩১২)

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক

কোরবানির দিন নিয়ে যে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
আপডেট: ১৩ জুন ২০২৪, ০৭:৩২ পিএম
কোরবানির দিন নিয়ে যে সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে
কোরবানির পশু ও ইংরেজিতে ঈদুল আজহা লেখা ছবি। ফ্রিপিক

কোরবানির দিনের এক নাম শ্রেষ্ঠ হজের দিন। যে দিনে হাজিরা তাদের পশু জবাই করে হজকে পূর্ণ করেন। ইবনে উমর (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির দিন জিজ্ঞেস করলেন, ‘এটা কোন দিন?’ সাহাবিরা উত্তর দিলেন, ‘কোরবানির দিন।’ তিনি বললেন, ‘এটা হলো শ্রেষ্ঠ হজের দিন।’ (আবু দাউদ, হাদিস, ১৯৪৫)

কোরবানির দিন বছরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ দিন। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর কাছে দিবসসমূহের মাঝে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ দিন হলো কোরবানির দিন। এরপর এর পরের তিনদিন।’ (আবু দাউদ, হাদিস: ১৭৬৫)
 
কোরবানির দিন ঈদুল ফিতরের দিনের চেয়েও মর্যাদাপূর্ণ। কেননা এ দিনটি বছরের শ্রেষ্ঠ দিন। এ দিনে ঈদের নামাজ ও কোরবানি একসঙ্গে আদায় করা হয়। যা ঈদুল ফিতরের নামাজ ও সদকাতুল ফিতরের তুলনায় শ্রেষ্ঠ। আল্লাহতায়ালা রাসুলুল্লাহ (সা.)-কে কাওসার দান করেছেন। এর শুকরিয়া আদায়ে তিনি তাঁকে এ দিনে কোরবানি ও নামাজ আদায়ের নির্দেশ দিয়েছেন। 

ঈদুল আজহার দিনে অন্যতম ফজিলতপূর্ণ কাজ হলো, আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কোরবানি করা। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোরবানির দিনের আমলসমূহের মধ্য থেকে পশু কোরবানি করার চেয়ে কোনো আমল আল্লাহতায়ালার কাছে অধিক প্রিয় নয়। কেয়ামতের দিন এই কোরবানিকে তার শিং, পশম ও খুরসহ উপস্থিত করা হবে। আর কোরবানির রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহতায়ালার কাছে কবুল হয়ে যায়। সুতরাং তোমরা সন্তুষ্টচিত্তে কোরবানি করো।’ (তিরমিজি, হাদিস: ১৪৯৩)

তাই সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি এই ইবাদত পালন করে না, তার ব্যাপারে হাদিসে কঠোর ধমকি এসেছে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে কোরবানি করল না, সে যেন আমাদের ঈদগাহে না আসে।’ (ইবনে মাজাহ, হাদিস: ২১২৩)

লেখক: আলেম ও সাংবাদিক