এসএস পাওয়ার ওয়ান লিমিটেড (এসএসপিওয়ানএল) দেশের বেসরকারি খাতে একমাত্র বৃহৎ যৌথ (চীন-বাংলাদেশ) বিনিয়োগী কোম্পানি। ১ হাজার ২২৪ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতাসম্পন্ন এ বিদ্যুৎ প্রকল্প ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর থেকে প্রায় ১ হাজার ১০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে আসছে। এই বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানাটির বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্র চালানো হচ্ছে বলে এর ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ অভিযোগ করেছে।
অভিযোগে বলা হয়, ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে একটি জাতীয় ইংরেজি দৈনিক পত্রিকার ছাপা কপি, অনলাইন ও ডিজিটাল মাধ্যমসহ বিভিন্ন গণমাধ্যমে ন্যক্কারজনকভাবে ভিত্তিহীন ও মিথ্যা তথ্য পরিবেশন করে অপপ্রচার চালানোর মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানাটিকে কলঙ্কিত করার অপচেষ্টা চালানো হচ্ছে।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, এস আলম গ্রুপ বিদ্যুৎ প্রকল্পটির মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি না করে ১৮৪টি ভুয়া ইনভয়েস ব্যবহার করে ৮১ কোটি ৫৭ লাখ ৮০ হাজার (৮১৫ দশমিক ৭৮ মিলিয়ন) মার্কিন ডলার বিদেশে পাচার করেছে। এর বিপরীতে দেওয়া ব্যাখ্যায় এসএসপিআইএল কর্তৃপক্ষ বলেছে, কোনো রকম যাচাই না করে একতরফা মনগড়া তথ্য পরিবেশন করা হয়েছে প্রতিবেদনটিতে। এ বিদ্যুৎ কারখানাটিতে বৃহত্তর বিদেশি বিনিয়োগ রয়েছে এবং ভিত্তিহীন তথ্য দিয়ে সংবাদ পরিবেশন করার ফলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত দেশের জন্যই বড় ক্ষতির কারণ হতে পারে।
গত শনিবার এক বিবৃতিতে এসএসপিওয়ানএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তান ঝেইলিং জানান, বিদ্যুৎ উৎপাদন কারখানাটিতে মোট বিনিয়োগের পরিমাণ ২৫০ কোটি ৬০ লাখ মার্কিন ডলার। এর মধ্যে চীনের ছয়টি ব্যাংক যৌথভাবে মোট ১৭৮ কোটি ২০ লাখ মার্কিন ডলার এবং দেশীয় রাষ্ট্রায়ত্ত আর্থিক প্রতিষ্ঠান রূপালী ব্যাংক ৩ কোটি ডলার বিনিয়োগ করেছে। এর বাইরে চীন সরকার ইক্যুইটি বা প্রাথমিক মূলধন হিসেবে ২৩ কোটি মার্কিন ডলার সরবরাহ করেছে। এস আলম গ্রুপের ইক্যুইটি বা মূলধনের পরিমাণ ৫০৭ মিলিয়ন বা ৫০ কোটি ৭০ লাখ ডলার।
২০১৮ সালের ২৮ ডিসেম্বরের ঋণচুক্তি অনুযায়ী চীনের সরকার এবং দেশটির ছয় ব্যাংক একটি কনসোর্টিয়াম তহবিল গঠন করে বিদ্যুৎ প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য অর্থায়ন করে। প্রকল্পটিতে চীনের সরকার ও দেশটির ব্যাংকগুলোর বিনিয়োগ মোট বিনিয়োগের ৮০ শতাংশ প্রায়। প্রকল্পটির যাবতীয় নির্মাণকাজ বাস্তবায়ন করে চীনের ইঞ্জিনিয়ারিং, প্রকিউরমেন্ট অ্যান্ড কনস্ট্রাকশন (ইপিসি) কনট্রাক্টর (ঠিকাদার)। বিদ্যুৎ প্রকল্পটির যাবতীয় আমদানি ব্যয় নির্বাহ করা হয়েছে চীনা বিনিয়োগের টাকায় দেশটির ছয় ব্যাংকের যৌথ তহবিল থেকে। এ জন্য কোনো এলসি বা আমদানি ঋণপত্র খুলতে হয়নি। মুলধনি যন্ত্রপাতি আমদানি করা হয়েছে ‘ইমপোর্ট পারমিট’ নিয়ে। এর মূল্য পরিশোধ করা হয়েছে চীনের বিনিয়োগকারীদের তহবিল থেকে এবং বাংলাদেশ থেকে কোনো বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হয়নি।
এ ছাড়া ইপিসি কন্ট্রাক্টরকে তার প্রাপ্য পরিশোধ করা হয় ফ্যাসিলিটি এজেন্ট ব্যাংক অব চায়নার সিঙ্গাপুর শাখা থেকে। এ প্রকল্পের সব ব্যয় নির্বাহ করার কাজ তত্ত্বাবধান করে উদ্যোক্তা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগকৃত আন্তর্জাতিক প্রকৌশলীরা, বিনিয়োগকারী ও ঋণদাতা প্রতিষ্ঠানগুলোর পরামর্শক প্রতিষ্ঠান ব্ল্যাক অ্যান্ড বিচ ও মট ম্যাকডোনাল্ড, রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক এবং বাংলাদেশ ব্যাংক। যথাযথভাবে যাচাই-বাছাই সাপেক্ষে ক্লিয়ারেন্স বা ছাড়পত্র দেওয়ার পরই সব বিল ও ইনভয়েসের বিপরীতে পাওনাদি পরিশোধ করা হয়েছে। এখানে সব লেনদেন প্রক্রিয়া জবাবদিহিমুলক, স্বচ্ছ ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার তত্ত্বাবধানে প্রচলিত বিধিবিধান অনুসরণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে এস আলম গ্রুপ কর্তৃক অর্থ পাচারের দাবির কোনো যৌক্তিকতা নেই। উপরন্তু, বিদ্যুৎ প্রকল্পটির সব যন্ত্রাংশ আমদানির অনুমোদন দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি), বাংলাদেশ ইনভেস্টমেন্ট ডেভেলপমেন্ট অথরিটি (বিডা), সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ ব্যাংক এবং আমদানি-রপ্তানি পরিদপ্তরের প্রধান নিয়ন্ত্রকের অফিস। রাষ্ট্রায়ত্ত রূপালী ব্যাংক সিন্ডিকেটেড ওই বিদেশি ঋণদাতাদের অনশোর সিকিউরিটি এজেন্ট হিসেবে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থা ও প্রতিষ্ঠানে নিয়মিত রিপোর্টিং করার দায়িত্ব নির্ভুলভাবে পালন করেছে।
বিবৃতিতে এসএসপিওয়ানএলের এমডি তান ঝেইলিং বলেন, ‘আমরা স্পষ্টভাবে অর্থ পাচারের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করছি। কোম্পানির পক্ষ থেকে কোনো অনুমোদনহীন লেনদেন করা হয়নি বলেও আমরা দৃঢ়তার সঙ্গে দাবি করছি।’

চলতি বছরের ২৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বিদ্যুৎ কারখানার সব আর্থিক আয়-ব্যয়ের বিপরীতে মোট ১ হাজার ৬০৫ কোটি ৩০ লাখ টাকা রাজস্ব (আয়কর, ভ্যাট, আমদানি ও সম্পূরক শুল্ক এবং সরকারি ফি) হিসেবে সরকারি কোষাগারে পরিশোধ করা হয়েছে।
পত্রিকাটিতে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়, ঋণপত্র নং ০০০০০২৬৩১৯১৫০০০৫ (তারিখ: ২৯-০১-২০১৯)-এর বিপরীতে ১২ কোটি ১৯ লাখ ৬০ হাজার ডলার এবং ঋণপত্র নং ০০০০০২৬৩২১১৫০০৩৮ (তারিখ: ৩০-০৫-২০২১)-এর মাধ্যমে ৭৯ কোটি ২৪ লাখ ডলার দেশের বাইরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
এসএসপিওয়ানএল কর্তৃপক্ষ জানায়, এ ধরনের লেখনীর মাধ্যমে প্রকাশিত হয় যে ইপিসি কন্ট্রাক্ট সম্পর্কে প্রতিবেদকের কোনো ধারণা নেই। বাস্তবতা হলো, এ ধরনের প্রকল্প অর্থায়নে ইপিসি কন্ট্রাক্টরকে আমদানির অনুমতি দেওয়া হয়, উদ্যোক্তাকে নয়। এ ক্ষেত্রে সরাসরি ঋণদাতা প্রতিষ্ঠান সরবরাহকারীকে পাওনাদি পরিশোধ করে থাকে। ঋণপত্র নম্বর শুধু রেফারেন্স হিসেবে বিদেশি ঋণদাতাদের অনশোর সিকিউরিটি এজেন্ট হিসেবে রূপালী ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকে রিপোর্টিংয়ের জন্য ব্যবহার করেছে।
এ ছাড়া প্রতিবেদনটিতে দাবি করা হয় যে বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভারে উল্লেখিত ১৮৪ বিলের তথ্য এন্ট্রি করা থাকলেও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সার্ভারে তার কোনো খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। এই দাবিটি সত্য নয়। কারণ এনবিআর সার্ভারে এটি পাওয়া যাচ্ছে, এমনকি চট্টগ্রাম কাস্টমস হাউসের সার্ভারেও এটি পাওয়া যায়।
এদিকে প্রতিবেদনে রূপালী ব্যাংকের মতিঝিল শাখার মহাব্যবস্থাপক আবু নাসের মোহাম্মদ মাসুদের বক্তব্য হিসেবে যে অংশটুকু উল্লেখ করা হয়েছে, তা মিথ্যা। প্রতিবেদনের অংশ ছিল, আবু নাসের মোহাম্মদ মাসুদ নিশ্চিত করেছেন, কোনো দেশি বা বিদেশি ঋণচুক্তির আওতায় এই আমদানির অর্থ পরিশোধ করা হয়নি। তিনি বলেন, ‘দুটি ঋণপত্রের মোট মূল্য ছিল প্রায় ৯১৪ মিলিয়ন ডলার, যার মধ্যে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮১৫ মিলিয়ন ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। ৮১৫ মিলিয়ন ডলার পাচারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্ভারে মোট ১৮৪টি ভুয়া চালান (বিল অব এন্ট্রি) আপলোড করা হয়েছে- প্রথম ঋণপত্রের জন্য ৫৯টি এবং দ্বিতীয় ঋণপত্রের জন্য ১২৫টি।’
এসএসপিওয়ানএল বিবৃতিতে দাবি করে, প্রকৃতপক্ষে প্রতিবেদনের এ অংশটুকু প্রতিবেদকের সম্পূর্ণ কল্পনাপ্রসূত। প্রতিবেদক সংশ্লিষ্ট জিএমের বক্তব্য গ্রহণ ছাড়া বিষয়টি উপস্থাপন করেছেন। আমদানি ঋণপত্র হিসেবে যে দুটি নম্বর প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, তা আসলে আমদানি ঋণপত্র নম্বর নয়। ওই নম্বর দুটি আসলে মেশিনারি আমদানির জন্য বিল অব এন্ট্রি রিপোর্ট করার জন্য ব্যাংক কোড। প্রতিবেদনে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ব্যাংক কোডকে আমদানি ঋণপত্র হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে।
এসএসপিওয়ানএল কর্তৃপক্ষ জানায়, প্রতিবেদনটিতে এসএসপিওয়ানএলের চিফ ফিন্যান্সিয়াল অফিসারের বক্তব্যও সঠিকভাবে উপস্থাপন করা হয়নি। প্রতিবেদনে উপস্থাপিত তথ্য অসত্য, সাংবাদিকতার বিধি ও নিরপেক্ষতা পরিপন্থি এবং উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসএসপিওয়ানএলের ক্ষতি করতে কোনো পক্ষ দ্বারা প্রভাবিত।
এসএসপিওয়ানএল কর্তৃপক্ষ জানায়, চীন-বাংলাদেশ যৌথ মূলধনি এ কোম্পানিটি শুধু দেশের বিদ্যুৎ চাহিদা পূরণে সহায়তা করছে না, এটি দুই দেশের বিনিয়োগকারীদের এক মেলবন্ধন। এটি কূটনৈতিক সম্পর্কেও এক নতুন দৃষ্টান্ত। তাই উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে উপস্থাপিত ওই প্রতিবেদনের অসত্য তথ্য এই বিদ্যুৎ প্রকল্পটিতে দুই দেশের স্বার্থ রক্ষার ক্ষেত্রে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। এ জন্য এসএসপিওয়ানএল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনে ক্ষতিপূরণ দাবি করে যথাযথ আইনগত পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হবে।
এসএসপিওয়ানএল কর্তৃপক্ষ জানায়, তারা এ বিষয়ে আর কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাখ্যা দেওয়ার প্রয়োজন মনে করে না। বরং ভুয়া ওই প্রতিবেদনের কারণে সৃষ্ট ক্ষতিপূরণের লক্ষ্যে প্রকৃত তথ্য সন্নিবেশন করে একই স্থানে সমপরিমাণ কভারেজ দিতে সংশ্লিষ্ট ওই পত্রিকার কর্তৃপক্ষকে এসএসপিওয়ানএল কর্তৃপক্ষ অনুরোধ করেছে। একই সঙ্গে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে অতি সংবেদনশীলতা পরিহার ও প্রভাবমুক্ত খবর পরিবেশনেরও অনুরোধ জানানো হয়েছে।