বৃহস্পতিবার (১৪ নভেম্বর) ছিল আজারবাইজানের বাকুতে আয়োজিত পরিবেশ সম্মেলনের (কপ২৯) চতুর্থ দিন। বিগত তিন দিনের মতোই এই দিনটিও ছিল সম্মেলনে অংশগ্রহণ করা বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকারপ্রধান ও প্রতিনিধিদের একটা ব্যস্ত দিন। এই সম্মেলনের লক্ষ্য একটাই। কীভাবে পরিবেশ বিপর্যয় থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য অর্থায়নের বিষয়টি নিশ্চিত করা যায়।
সম্মেলনে গবেষকরা বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে উন্নয়নশীল ও দরিদ্র দেশগুলোর জন্য দরকার হবে বছরে অন্তত ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। আর এই বিপুল পরিমাণ অর্থের সংস্থান হতে পারে ধনী দেশগুলো এগিয়ে এলে। কিন্তু এ জন্য প্রয়োজন ঐকমত্যে পৌঁছানো। সমস্যা কিন্তু এখানেই।
ঐকমত্য হতে হবে ধনী দেশগুলোর সঙ্গে উন্নয়নশীল বা দরিদ্র দেশগুলোর। ধনী দেশগুলোর সংকট ততটা তীব্র নয়। তারা ধনী, ধনীই থেকে যাবে। কিন্তু পরিবেশ বিপর্যয়ে বিপর্যস্ত হতে হয় গরিব ও উন্নয়নশীল দেশগুলোকে। তাদের সহায়তার জন্যই অর্থের প্রয়োজন। ফলে কতটা অর্থ পাওয়া যাবে, ধনী দেশগুলো কত অর্থ দেবে, তাই নিয়ে মাথাব্যথাটা তাদেরই। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হচ্ছে, এই দেশগুলোর মধ্যে অর্থায়ন বা অর্থের সংস্থান নিয়ে তীব্র মতপার্থক্য দেখা গেছে।
এদিকে জলবায়ু পরিবর্তনের সংকট দিন দিন ভয়াবহ হয়ে উঠছে। পরিবেশবিদরা নতুন করে একটা গবেষণার ফলাফল গতকাল এই সম্মেলনে উপস্থাপন করেছেন। তা থেকেই উঠে এসেছে ভয়াবহতার চিত্র। গবেষকরা বলেছেন, ২০৩০ সালের মধ্যে কার্বন নিঃসরণ শূন্যে নামিয়ে আনতে হবে। না হলে পৃথিবীর সমূহ বিপদ। আজারবাইজানের প্রতিনিধি আলচিন রিভিয়েভ বলেছেন, সব জানালা রুদ্ধ হয়ে আসছে। এখনই প্রয়োজন পৃথিবীর তাপমাত্রা ১.৫ সেলসিয়াসে সীমিত রাখার চেষ্টা করা। কিন্তু তার জন্য চাই অর্থ। আর জলবায়ুর এই অর্থায়ন নিয়ে এখন বিশ্ব দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে। অনেক দেশ কার্বন নিঃসরণের মূল কারণ জীবাশ্ম জ্বালানি ব্যবহারের পক্ষে কথা বলেছে, কিন্তু অন্য দেশগুলো, যারা প্রাকৃতিক বিপর্যয়ের শিকার তারা বলছেন, এই জ্বালানির ব্যবহার বন্ধ করতে হবে। পরিবেশ বিপর্যয়ের হাত থেকে আমাদের রক্ষা করার জন্য ধনী দেশগুলোকে অর্থ দিতে হবে। সবচেয়ে কঠিন কথা বলেছেন আলবেনিয়ার প্রধানমন্ত্রী ইদি রামা, ‘আমরা ভালো ভালো কথা বলছি, কিন্তু কোনো পরিবর্তন হচ্ছে না।’
অর্থায়নের বিষয়ে ধনী দেশগুলোর অনীহা দেখে কেউ কেউ এভাবে চেয়েচিন্তে নিতে হচ্ছে বলে ‘এটা অপমানজনক’, এরকম মন্তব্যও করেছেন। ধনী দেশগুলোর একটি ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি বলেছেন, ‘এসব থাক, আসুন বাস্তবমুখী’ পরিকল্পনা গ্রহণ করি। তার সুরটা এমন যে, উৎপাদন ব্যহত না করে কার্বনহীন হওয়ার কথা বলাই ভালো।
মঙ্গলবার আর বুধবারের আয়োজনে অংশগ্রহণ করার পরে অনেক প্রতিনিধিই নিজেদের দেশে ফিরে গেছেন। মঙ্গলবার আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ফ্রান্সকে তার ঔপনিবেশিক দৃষ্টিকোণ থেকে ‘অপরাধ’ করছে বলায় ফ্রান্সের পরিবেশমন্ত্রী বাকুতে আসার বিমানযাত্রা বাতিল করে দিয়েছেন। আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ার মিলে তার দেশের প্রতিনিধিদলকে ফিরে আসতে বলেছে। শুধু এই বিভাজন বা মতপার্থক্য নয়, যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্যারিস চুক্তি থেকে তার দেশকে জলবায়ু চুক্তির অঙ্গীকার থেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারেন, এই ভয়ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর মধ্যে কাজ করছে। বারবাডোজের প্রধান তাই ট্রাম্পকে মুখোমুখি আলাপ-আলোচনার মধ্য দিয়ে সমাধান খোঁজার প্রস্তাব দিয়েছেন।
আগে ২০৩৫ সালের মধ্যে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন অর্থের সংস্থানে ধনী দেশগুলো প্রতিশ্রুতবদ্ধ হতে পারে বলে ভাবা হয়েছিল। কিন্তু জাতিসংঘের পরিবেশ গবেষকরা বলছেন, এতদিন পর্যন্ত অপেক্ষা করা যাবে না। ওই সময়ের পাঁচ বছর আগেই এই অর্থের ব্যবস্থা করতে হবে। কেননা, বর্তমান অবস্থা যদি চলতে থাকে তাহলে তাপমাত্রা ২ দশমিক ৭ সেলসিয়াস বেড়ে যেতে পারে। এতে মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হবে। কিন্তু অর্থের সংকটটি এমন যে, ২০২২ সাল ছাড়া কখনোই ১ ট্রিলিয়ন ডলার পাওয়া যায়নি। অথচ দরকার বছরে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। কীভাবে এই অর্থ মিলবে তাই নিয়ে চলছে দেনদরবার আর টানাপোড়েন। বিশ্বের ২০০টি দেশের সরকারপ্রধান ও প্রতিনিধিরা এই নিয়ে গত তিন দিন ধরে আলোচনা আর বক্তব্য রেখেই যাচ্ছেন।
পরিবেশ অর্থনীতিবিদ নিকোলাস স্টার্ন, ভেরা সোনগে ও অমর ভট্টাচার্য গতকাল বাকু সম্মেলনে যে হিসাব উপস্থাপন করেছেন, তাতে তারা বলেছেন ২০২২ সালে যেখানে দরকার ছিল ২ দশমিক ৪ ট্রিলিয়ন ডলার, সেখানে ওই বছরে পাওয়া গেছে ১ ট্রিলিয়ন ডলার। সেটাই ছিল এ যাবৎকালের সর্বোচ্চ পরিমাণ অর্থ।
তারা বলেছেন, প্রয়োজনীয় অর্থের অর্ধেক মিলবে দরিদ্র ও উন্নয়নশীল দেশগুলোর জাতীয় বাজেট থেকে। কিন্তু বাকিটা অন্য সূত্র থেকে সংগ্রহ করতে হবে। অর্থাৎ ধনী দেশগুলোকে সেই অর্থায়ন করতে হবে। ২০৩৫ সালের মধ্যে একমাত্র চীনেরই লাগবে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ডলার। এখানে বলা প্রয়োজন, চীন এখনো উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে গণ্য হয়, ধনী নয়। যদিও জার্মানির পরিবেশ প্রতিনিধি জেনিফার মরগান চীনকে অর্থায়নে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
নতুন করে করারোপের কথাও বলেছেন সম্মেলনে অংশগ্রহণকারী প্রতিনিধিরা। কিন্তু দরিদ্র দেশগুলো এই করারোপ করতে পারবে না, সেই ঝুঁকি তারা নিতে পারবে না। এটা করতে হলে ধনী দেশগুলোকেই করতে হবে। ধনী দেশগুলো অবশ্য বেসরকারি খাত, যেমন এনজিওরাও অর্থায়ন করতে পারে, এরকমটা বলছে। কিন্তু পরিবেশবাদীদের কথা, ধনী দেশগুলো পরিবেশ ধ্বংসের জন্য দায়ী, তাদেরকেই ক্ষতিপূরণ হিসেবে পরিবেশ থেকে সুরক্ষা পাওয়ার জন্য দরিদ্র দেশগুলোকে অর্থ দিতে হবে। এই দাবিটাই তারা জোরেশোরে করছেন।
বাকুর সুবৃহৎ ফুটবল স্টেডিয়াম এখন পরিবেশবাদীদের প্রতিবাদে মুখর। গত কয়েক দিন ধরে এই স্টেডিয়ামে দেখা যাচ্ছে প্রতিবাদী অসংখ্য ব্যানার। তারা পরিবেশের সঙ্গে যুদ্ধকেও মিলিয়ে সমালোচনা করছেন। তারা যে দাবিতে এখন সম্মেলনকেন্দ্রের আশেপাশে সোচ্চার সেটা হলো ধনী দেশ আর বড় বড় তেল কোম্পানিগুলো মানবতার বিরুদ্ধে কাজ করছে। ‘ওয়ার অন ওয়ান্ট’ শীর্ষক একটা পরিবেশবাদী গোষ্ঠীর নির্বাহী পরিচালক আসাদ রেহমান বলেছেন. ‘পরিবেশকেন্দ্রিক ন্যায়বিচার চাই। আমাদের ভবিষ্যতের মানবতা হুমকির মুখে। জীবন-মরণের সমস্যা। মানবতা আজ ধুঁকছে। মানুষকে আজ মর্যাদা নিয়ে বাঁচতে দিতে হবে।’
এদিকে যখন এই সম্মেলন চলছে, তখন ফিলিপিন্সে তিন সপ্তাহের মধ্যে চতুর্থবারের মতো সাইক্লোন হওয়ার খবর পাওয়া যাচ্ছে। ওয়াংজুতে গরম শেষ হয় মার্চে, নভেম্বরে শীত নামে। কিন্তু এখনো সেখানকার পরিবেশ উষ্ণ। দীর্ঘতম উষ্ণ আবহাওয়া চলছে চীনে। ব্রাজিলে বন উজার হচ্ছে। ব্রাজিলের কিংবদন্তি ফুটবলার রোনালদিনহো তো প্রতিবাদীদের সঙ্গে বাকুতে এসে পৌঁছে গেছেন তৃতীয় দিনেই।
এভাবে শেষ হলো বাকু সম্মেলনের চতুর্থ দিন। একদিকে দেনদরবার, বাদানুবাদ, অন্যদিকে প্রতিবাদী সমাবেশ। আগামী সপ্তাহে নির্ধারিত হবে অর্থায়নের সংস্থান হওয়া নিয়ে চলবে আলাপ-আলোচনা আর তার ভিত্তিতেই অর্থায়নের বিষয়টি নির্ধারিত হবে। কিন্তু ফলাফল খুব একটা আশাপ্রদ হবে, এমনটা বলা যাচ্ছে না।