দিনাজপুরের বিরলে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সাঁওতালদের ব্যবহার করে চলছে জমি দখল। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দলটির নেতারা জমি দখল করে সেখানে সাঁওতাল পরিবারকে বসিয়ে দিতেন। ক্ষমতার পালাবদলের পর সেই দখল করা জমি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন বিএনপির নেতারা। এসব জমি নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি নতুন করে দখলেও মেতে উঠেছেন তারা। হাতিয়ার শুধু সাঁওতালরা। এভাবে একবার আওয়ামী লীগ, আরেকবার বিএনপি নেতারা মিলেমিশেই চালাচ্ছেন এই দখলবাজি। এসব জমি দখল নিয়ে আদালতে মামলা হলেও তার সুরাহা হচ্ছে না।
২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর শুরু হয় জমি দখল প্রক্রিয়া। দিনাজপুর-২ (বিরল-বোচাগঞ্জ) আসনে আওয়ামী লীগের তৎকালীন সংসদ সদস্য ও সাবেক নৌপ্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর সমর্থনে ও বিরল উপজেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সভাপতি ইসহাক আলীর নির্দেশনায় ওই জমি দখল শুরু হয়। বিরল উপজেলা পরিষদের সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম, ধামইর ইউনিয়ন চেয়ারম্যান মোসলেম উদ্দিন, তার ভাই বাবু ও সাঁওতাল নেতা আব্দুল কুদ্দুসের মদদে ২০১৩ সালে বিরল উপজেলার ধামইর ইউনিয়নের পিপল্লা মৌজার ১ একর ৩০ শতক জমি দখল করা হয়। ওই জমিতে ১৩-১৪টি সাঁওতাল পরিবারকে ঘর তুলে দেন তারা।
২০১৮ সালের নির্বাচনে ফের আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর এই দখলের মাত্রা বাড়তে থাকে। ওই সময় বিরল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সবুজার সিদ্দিক সাগর, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রমাকান্ত রায়, ধামইর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ও আওয়ামী লীগ নেতা মোসলেম উদ্দিন, তার ভাই বাবু ও সাবেক বিরল উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান আনোয়ারুল ইসলাম নিজেদের স্বার্থে জমি দখল করে সাঁওতাল পরিবারের সংখ্যা বাড়াতে থাকেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাঁওতালরা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী হওয়ায় তাদের প্রতি মানুষের এক ধরনের সহানুভূতি রয়েছে। আর সেটাই কাজে লাগিয়ে তখন জমি দখলে নেন আওয়ামী লীগ নেতারা। পরে সাঁওতালরা আরও জমি দখল করতে থাকেন। ধীরে ধীরে দখল করা জায়গায় সাঁওতাল পরিবারের সংখ্যা বাড়তে থাকে। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন থেকে শুরু করে জাতীয় নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক হিসেবে কাজ করেছেন এই সাঁওতালরা। তাদের সংখ্যাও ক্রমশ বেড়েছে এবং তা ভোটব্যাংক হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে আওয়ামী লীগ নেতাদের কাছে।
আওয়ামী লীগ নেতাদের দাপট আর সাঁওতালদের সহানুভূতি কাজে লাগিয়ে ধুকুর ঝাড়ী বাজারসংলগ্ন সাঁওতালদের তৈরি বিভিন্ন ধরনের মদ, বাংলা চুয়ানির জমজমাট ব্যবসা গড়ে উঠেছে। বাংলা মদ, চুয়ানি সাঁওতালদের জন্য বৈধ থাকলেও তা সাধারণের জন্য অবৈধ। কিন্তু এখন তা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করছে সাঁওতালরা। প্রতিদিন দখল করা জায়গার মধ্যে সাঁওতালদের জমজমাট মদ আর চুয়ানির ব্যবসা চলছে। ক্ষমতায় থাকার সময় আওয়ামী লীগ নেতারা সেখান থেকেই প্রতিদিন চাঁদা আদায় করতেন। মোসলেম উদ্দিন চেয়ারম্যানের ভাই বাবু এই মদ ও বাংলা চুয়ানির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করতেন।
গত ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা দেশ ছাড়ার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতারা গা-ঢাকা দিয়েছেন। ইউপি চেয়ারম্যান মোসলেম উদ্দিন ও তার ছোট ভাই বাবুর নিয়ন্ত্রণে দখল করা জায়গা, সাঁওতালদের মদ ও বাংলা চুয়ানির ব্যবসা এখন নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন তাদেরই চাচাত ভাই বিএনপি নেতা হায়দার আলী, সাবেক সেনাসদস্য রেজাউল করিম ও লাইসুর রহমান। এখন সাঁওতাল পরিবারগুলোকে ঘুঁটি বানিয়ে ভূমি দখলের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন তারা। সাঁওতালদের কাছ থেকে প্রতিদিন মদ, বাংলা চুয়ানি বিক্রির কমিশনও নিচ্ছেন তারা।
সরেজমিনে বিরল উপজেলার পিপল্লা গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কয়েকটি সাঁওতাল পরিবার ঘরবাড়ি ভেঙে অন্যত্র চলে যায়। পরে স্থানীয় বিএনপির নামধারী সাবেক সেনাসদস্য রেজাউল করিমের নির্দেশনায় সাঁওতাল পরিবারদের সেই জমিতে পুনরায় ফিরিয়ে আনা হয়েছে। তাদের ভূমি দখল, বাংলা মদ ও চুয়ানির ব্যবসা চালিয়ে যেতেও উৎসাহিত করছেন বিএনপি নেতারা।
২০১৩ সালে দিনাজপুর যুগ্ম জেলা জজ আদালতে জমি দখলের অভিযোগে স্থানীয় মোতাহার আলী, মোখলেছুর রহমান, নজরুল ইসলাম, বেলাল হোসেনসহ ৯ জন বাদী হয়ে ৪৮ জন সাঁওতালের নাম উল্লেখ করে উচ্ছেদ মামলা করেন। বর্তমানে মামলাটি চলমান রয়েছে।
জমির রেকর্ড সূত্রে উত্তরাধিকারী নজরুল ইসলাম বলেন, ‘এই জমি আমাদের পূর্ব-পুরুষদের। তখন থেকেই ধারাবাহিকভাবে আমরা পিপল্লা মৌজার জমি ভোগ দখল করে আসছি। হঠাৎ করেই ২০১৩ সালে আওয়ামী লীগের সেই সময়ের প্রভাবশালী সংসদ সদস্য খালিদ মাহমুদ চৌধুরীর নির্দেশনায় বিরল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ইসহাক আলী আমাদের জমি দখল করে সাঁওতাল পরিবারদের বসিয়ে দেন। তখন থেকেই মামলাটি আদালতে চলমান রয়েছে। খুব অল্প সময়ের মধ্যেই মামলার শুনানি হবে বলে আশা করছি।’
জমির আরেকজন মালিক মোখলেছুর রহমান বলেন, ‘এই মৌজার ১৩০ শতাংশ জমি পূর্ব-পুরুষের এসএ ও সিএস রেকর্ডসহ আমাদের নামে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় স্থানীয় নেতাদের যোগসাজশে আমাদের এই রেকর্ড সম্পত্তি দখল করে নেন সাঁওতালরা। বিষয়টি নিয়ে বহুবার স্থানীয়ভাবে মীমাংসার চেষ্টা হলেও সাঁওতালদের ব্যবহার করেই ওই জমি দখলে নেন আওয়ামী লীগ নেতারা। এখন আওয়ামী লীগ নেতাদের আত্মীয়-স্বজন বিএনপি নেতারা ওই সব জমি দখলে রেখেছেন।’
পিপল্লা গ্রামের ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী বিন্দু গুঞ্জার বলেন, ‘২০ বছর ধরে এই জায়গায় আমরা রয়েছি। আমাদের নিজস্ব কোনো জমি নেই। এখানে দেবোত্তর জায়গা আছে বলে আমরা জানতে পারি। সেই জমিতেই আমরা এখানে বসবাস করছি।’ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী লগেন গুঞ্জার বলেন, ‘জায়গাটি আমাদের নয়। আমাদেরকে এখানে বসিয়ে দেওয়া হয়েছে। আমাদের নিজস্ব কোনো জায়গাজমি নেই। তাই এখানে বসবাস করছি।’
কথা হয় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী অজয় গুঞ্জারের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘আগে আমরা অন্য জায়গায় ছিলাম। কিছুদিন আগেই এখানে বসেছি। ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর আমরা কয়েকটি পরিবার চলে গিয়েছিলাম। পরে আমাদের এখানে ফিরিয়ে আনা হয়েছে। এখানে এসে নতুনভাবে ঘর তৈরি করেছি। একটি এনজিও আমাদেরকে আর্থিক সহযোগিতা দিয়েছে।’ রবি গুঞ্জার বলেন, ‘এ জমি নিয়ে আদালতে মামলা চলছে। জমিটি দেবোত্তরের। তাই আমরা এখানে আছি। এখানে ১৩-১৪টি পরিবার আমরা বসবাস করছি। এদের বেশিরভাগই সাঁওতাল ।’
ধামইর ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান মোসলেম উদ্দিন বলেন, ‘সাঁওতাল পরিবারগুলো একেবারেই নিরীহ। তাদের বসবাসের জায়গা নেই। দেবোত্তর জায়গা মনে করে তাদের বসবাস করতে দেওয়া হয়েছে মাত্র। সাঁওতালরা পারিবারিকভাবেই মদ বা তারি তৈরি করে। তারা নিজেদের জন্যই এসব করে থাকে।’
বিরল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইশতিয়াক আহমেদ বলেন, ‘পিপল্লার মৌজায় বিরোধপূর্ণ জমির বেশির ভাগই ব্যক্তি মালিকানার। মাত্র ৯ শতক জমি দেবোত্তর নামে রেকর্ড আছে। অভিযোগ পাওয়ার পর সাঁওতাল পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার বৈঠক করেছি। তাদের ব্যক্তি মালিকানার জমি ছেড়ে দেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছিল। সরকারিভাবে বাসস্থানের ব্যবস্থা করা হবে- এমন প্রস্তাবও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু তারা কেন যেন সেখান থেকে যেতে চাচ্ছে না। এখানে স্থানীয় কিছু আওয়ামী লীগ বা বিএনপি নেতার ইন্ধন রয়েছে বলে মনে হয়েছে। তাদের একাধিকবার বিষয়টি বুঝিয়ে বলা হয়েছে। ভূমি অফিসে এসে প্রতিশ্রুতি দিয়ে গেলেও পরবর্তী সময় তারা আর সেই কথা রাখেননি।’