জাতিসংঘের উদ্যোগে আয়োজিত পরিবেশ সম্মেলনের (কপ২৯) নবম দিন ছিল বুধবার। ধীরে ধীরে সম্মেলন স্থল থেকে অনেকেই চলে যাচ্ছেন, বিশেষ করে রাষ্ট্রপ্রধানরা সম্মেলন ছেড়ে নিজ দেশে চলে গেছেন। এখন যারা আছেন তারা অর্থায়ন সম্পর্কিত চুক্তির চূড়ান্ত দলিল তৈরিতে ব্যস্ত। গতকাল তারা গভীর রাত পর্যন্ত এ নিয়ে কাজ করেছেন। আলাপ-আলোচনা, পর্যালোচনার মধ্যে তারা ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন।
কিন্তু দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেটিনা ছিল অনুপস্থিত। কপ২৯ শুরুর তিন দিনের মাথায় সে দেশের সব প্রতিনিধি বাকু ত্যাগ করে চলে যান। ধারণা করা হচ্ছে, ট্রাম্পের জয়ের পর আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মিলেই প্রথম বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান যিনি ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করবেন। আর এ কারণেই বাকুতে গুঞ্জন রয়েছে তিনিসহ আর্জেটিনার প্রতিনিধিরা এই পরিবেশ সম্মেলন ছেড়ে গেছেন। আর্জেটিনার পররাষ্ট্রমন্ত্রী জেরারদো ওয়েরথেইন বলেছেন তারা প্যারিস চুক্তির বিষয়টি পুনর্মূল্যায়ন করছেন। তবে দেশটি কপ২৯ চুক্তির অংশ হয়ে থাকবে। সম্মেলন ছেড়ে আর্জেন্টিনা চলে আসায় ক্ষুব্ধ হয়েছে সে দেশের পরিবেশবাদী সংগঠনগুলো। বাকুতে তাদের উপস্থিতি আর চাপের কারণেই আর্জেন্টিনা কপের সঙ্গে থাকছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে অভিযোগ উঠেছে, আজারবাইজানের প্রেসিডেন্ট ইলহাম আলিয়েভকে নিয়ে। কপ২৮ সম্মেলনে যোগ দেওয়া ফ্রান্সের প্রতিনিধি ও পরিবেশ পরামর্শক পল ওয়াটকিনসন তাকে ‘স্বৈরাচারী’ আখ্যা দিয়ে এবারের আলাপ-আলোচনার বাইরে রাখার অনুরোধ জানিয়েছেন।
দ্বীপদেশ মালদ্বীপের আহ্বান
বাকুর বুধবারের (২০ নভেম্বর) সম্মেলনে বেশ কয়েকটি রাষ্ট্রের প্রতিনিধিরা পরিবেশ বিপর্যয় এবং তা থেকে রক্ষা পাওয়া নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদেরই একজন আমাদের প্রতিবেশী ছোট রাষ্ট্র মালদ্বীপ। মালদ্বীপ যে কার্বণ নিঃসরণ ঘটায় তার পরিমাণ মাত্র ০.০০৩ শতাংশ। কিন্তু দ্বীপদেশ হওয়ায় তাদেরই মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের সম্মুখীন হতে হবে। মালদ্বীপের পরিবেশ পরিবর্তনবিষয়ক মন্ত্রী তোরিক ইব্রাহিম বলেন, ‘আমরা পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য দায়ী নই, দায়ী উন্নত দেশগুলো। তারা এমন কিছু করছে যার জন্য আমরা প্রস্তুত নই।’
কপ২৯-এর প্রধান লক্ষ্য হচ্ছে কীভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে কার্বন নিঃসরণ আর পরিবেশ বিপর্যয়ের আক্রমণ থেকে রক্ষা করা যায়, সে জন্য সংগৃহীত পরিবেশ অর্থায়নের তহবিল গঠনের নতুন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা। এর আগে সর্বশেষ ২০০৯ সালে যে লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল, তাতে ছোট ছোট দ্বীপদেশগুলোর কথা বিবেচনা করা হয়নি।
মালদ্বীপের মন্ত্রী বলেছেন, ‘এখন সময় এসেছে বিষয়টি বিবেচনা করার। আমাদের বছরে ৩৯ বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ দিতে হবে।’ সেই সঙ্গে তিনি প্রস্তাব দেন, বহুমাত্রিক ঝুঁকির একটা সূচক তৈরি করা হোক। গত কপ২৮ সম্মেলনে ‘ক্ষতি ও ধ্বংসজনিত তহবিল’ শিরোনামে অর্থ সংগ্রহের যে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল তাতে ধনী দেশগুলোর অংশগ্রহণ ছিল সামান্য। এখনই মালদ্বীপের উল্লিখিত পরিমাণ অর্থের দরকার, না হলে ২১০০ বা তার আগেই দেশটি সমুদ্রে ডুবে যাবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের দিকটি বিশেষভাবে বিবেচনা করতে হবে।’
তিনি দাবি করেন, ‘প্রতিটি দেশকে তাদের পরিবেশ পরিকল্পনা তৈরি করে কীভাবে তাপমাত্রা ১ দশমিক ৫ শতাংশের মধ্যে রাখা যায় সেই কৌশল নির্ধারণের কথা বলতে হবে।’ গবেষকরা বলেছেন, ‘আমরা সেই উদ্যোগ হারিয়ে ফেলেছি। কিন্তু আমাদের চেষ্টা করতে হবে।’
নতুন নতুন গবেষণার ফলাফল আসছে
পরিবেশ সম্মেলন চলাকালেই পরিবেশ বিপর্যয় বা অবনতির নানা গবেষণা সামনে আসছে।
পৃথিবীর প্রধান পাঁচ কোম্পানি গত পাঁচ বছরে সবচেয়ে বেশি প্লাস্টিক দ্রব্য তৈরি করেছে, যা মারাত্মক দূষণ ঘটাচ্ছে। এই কোম্পানিগুলো হচ্ছে এক্সনমোবিল, ডোউ, শেল, টোটালএনার্জিস ও শেভরনফিলিপস। তাদের উৎপাদিত প্লাস্টিকের পরিমাণ প্রায় ১৩২ মিলিয়ন টন। তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, এর ১৫ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক পরিবেশ থেকে সরিয়ে ফেলবে। কিন্তু সেটা হয়নি। সরানো গেছে মাত্র ১ লাখ ১৮ হাজার ৫০০ টন প্লাস্টিক বর্জ্য। ইতিমধ্যে গঠিত হয়েছে প্লাস্টিক বর্জ্যবিরোধী বেশ কিছু পরিবেশবাদী গ্রুপ। এ রকমই একটা গ্রুপ হচ্ছে ‘এলায়েন্স টু অ্যান্ড প্লাস্টিক ওয়েস্ট’ (এইপিডব্লিউ)। তারা প্লাস্টিক দ্রব্যের উৎপাদন সীমিত করার দাবি জানাচ্ছে এবং একই সঙ্গে প্লাস্টিক বর্জ্য অপসারণের কথা বলছে। সম্মেলন স্থলে এসেও গ্রুপগুলোর সদস্যরা প্রতিবাদ করছেন।
আরেক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, শুধু উন্নয়নশীল দেশগুলো নয়, উন্নত দেশগুলোর পরিবেশ আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় অনেক বেশি বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছে। দিনে দিনে তা ভয়াবহ হয়ে উঠছে। ‘ক্লাইমেট সেন্টার’ শীর্ষক একটি গবেষণা প্রতিষ্ঠানের গবেষণা অনুসারে, ২০১৯-২০২৩ বর্ষে উত্তর আমেরিকায় হারিকেনের বাতাসের গতি ৮৪ শতাংশ বেড়েছে। গড়ে বইছে ঘণ্টায় ১৮ মাইল বেগে। ওই গবেষণার মূল লেখক ড্যানিয়েল গিলফোর্ড বলেছেন, ২০২৪ সালের প্রতিটি হ্যারিকেন ছিল ১০০ বছর আগের তুলনায় অনেক তীব্র। এতে উড়ে যাচ্ছে বাড়িঘর, হারাচ্ছি চাকরি।’
দৃষ্টি এখন মূল চুক্তির দিকে
৯ দিন পেরিয়ে গেলেও এখনো দুটি বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে। একটি হলো পরিবেশ বিপর্যয়ের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে, আরেকটি অর্থায়ন নিয়ে। পরিবেশ বিপর্যয়ের জন্য যে মূলত উন্নত দেশগুলো দায়ী, সে কথা প্রায় সব দেশ উল্লেখ করেছে। ২০০ দেশের প্রতিনিধিরা তাদের বক্তব্য প্রায় শেষ করে এনেছেন। শুক্রবার শেষ হবে এই সম্মেলন। কিন্তু তার আগেই প্রস্তুত করতে হবে চুক্তির মূল দলিল, যাতে অর্থায়নে সম্মতি থাকবে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর, বিশেষ করে ধনী দেশগুলোর। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র তাতে সায় দেবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ আছে। যুক্তরাষ্ট্রকে অনুসরণ করতে পারে আরও বেশ কিছু দেশ। এখন পর্যন্ত যে আভাস মিলছে তাতে চাহিদার তুলনায় তহবিলে অর্থ প্রাপ্তির প্রতিশ্রুতি পাওয়া যাবে খুবই কম। উন্নয়নশীল দেশগুলো যে পরিমাণ অর্থের দাবি জানাচ্ছে তারা তা দেবে না। তবু কতটা পাওয়া যায় সেদিকেই থাকবে বাংলাদেশসহ অধিকাংশ দেশের দৃষ্টি।