ঢাকা ২৫ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, সোমবার, ০৮ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
নওগাঁয় পানিতে ডুবে ১৩ মাসের শিশুর মৃত্যু পুশইন বন্ধে ভারতকে ১০-১২টি চিঠি দিয়েছে সরকার: পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী এসএসসি-সমমান পরীক্ষার ফলাফলের তারিখ ঘোষণা সিলেটে হাম উপসর্গে আরও ১ শিশুর মৃত্যু ভাঙ্গায় বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে যুবকের মৃত্যু সরিষাবাড়ীতে চুরি করতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্টে মৃত্যু সিরাজউদ্দৌলা নাটকের ৪টি অনুধাবনমূলক প্রশ্ন ও উত্তর, ৩য় পর্ব, এইচএসসির বাংলা ১ম পত্র প্রতিবন্ধী তরুণীকে ধর্ষণের চেষ্টা, এলাকাবাসীর তৎপরতায় রক্ষা বিল-ঝিলে পদ্ম ও শাপলার মায়াবী রূপ শরীয়তপুরে মাটি গরম হয়ে ধোঁয়া ওঠা স্থানে গ্যাস নেই: বাপেক্স শার্শায় আওয়ামী লীগ নেতা টিংকু গ্রেপ্তার শক্তিশালী ভাবমূর্তি রক্ষার জন্য যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চান নেতানিয়াহু! মানিকগঞ্জে বাবার মৃত্যুতে প্যারোলে মুক্ত ছেলে ফিলিপাইনে ভূমিকম্পে মৃত্যু ১৯, আহত ১৩০ ড. ইউনূসহ ৫ জনের বিরুদ্ধে মামলার আবেদন খারিজ লক্ষ্মীপুর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি নিয়োগ প্রতিদিন ১০০ কোটি লিটার পানি ঢাকায় সরবরাহ করা সম্ভব হবে : মির্জা ফখরুল মাঠের ফুটবল যখন জীবনের ব্যাধি হয়ে দাঁড়ায় ইসরায়েলের পেট্রোকেমিক্যাল কারখানায় ইরানের হামলা পাঁচ বছর না খেয়েও যেভাবে বেঁচে থাকে গভীর সমুদ্রের প্রাণী ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় বাস খাদে পড়ে নারী-শিশুসহ নিহত ৪ ধামরাইয়ে ৭ বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা আবারও ম্যাচ চলাকালে মাঠে লুটিয়ে পড়লেন এরিকসেন উড়োজাহাজ প্রযুক্তিতে চীনের নতুন মাইলফলক রাজধানীর বনানীতে আরএফএল ‘বেস্ট বাই’ এর নতুন শোরুম চালু গজারিয়ায় পাঁচ বছরের শিশুকে ধর্ষণচেষ্টা, গণধোলাই দিয়ে পুলিশে সোপর্দ পৈতৃক সম্পত্তি আত্মসাতের মামলায় গ্রেপ্তার তুরিন আফরোজ ফুটপাথের দোকানীকে সাধারণ ভাববেন না! হতে পারে... ইরানের হামলায় চুক্তির কোনো পরিবর্তন হবে না: ট্রাম্প রামুতে জোড়া হত্যা মামলার প্রধান আসামি গ্রেপ্তার
Nagad desktop

মন্ত্রী, এমপিসহ ১৪৯ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা

প্রকাশ: ২৭ নভেম্বর ২০২৪, ১১:৫৯ এএম
আপডেট: ২৭ নভেম্বর ২০২৪, ১২:০০ পিএম
মন্ত্রী, এমপিসহ ১৪৯ জনের বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

আওয়ামী লীগ সরকারের সাবেক মন্ত্রী, এমপি ও দলটির নেতাসহ গুরুত্বপূর্ণ ১৪৯ ব্যক্তির বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করেছে সরকার। পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) থেকে এ সংক্রান্ত একটি নির্দেশ হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরসহ দেশের সব বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন শাখায় পাঠানো হয়েছে।

নিষেধাজ্ঞার ওই তালিকা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, এ নিষেধাজ্ঞার আওতায় রয়েছেন ১৫ জন সাবেক মন্ত্রী, ৮ জন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, ২০ জন সাবেক সচিব ও ৬৪ জন সাবেক সংসদ সদস্য (এমপি)। এ ছাড়া তালিকাটির মধ্যে এমন অন্তত ৮ জন রয়েছেন, যারা গত ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে বা পরে বিভিন্ন মামলায় গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে রয়েছেন। আরও ৭ জন বিদেশে পালিয়েছেন। বিগত সরকারের আমলের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর নামও রয়েছে এ তালিকায়। 

 কয়েক দিন আগে একটি ইংরেজি দৈনিকের সম্পাদক হযরত শাহজালাল বিমানবন্দরে হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট দেন। এ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা হয়। তবে পরে ইমিগ্রেশনের পুলিশের পক্ষ থেকে দুঃখ প্রকাশ করা হয়। 

পুলিশের বিশেষ শাখার কর্মকর্তারা জানান, যাদের বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া রয়েছে, তাদের নামে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময় দুর্নীতি, মানবাধিকার লঙ্ঘন ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগ রয়েছে। তারা দেশ ছেড়ে গেলে রাষ্ট্রবিরোধী কাজে লিপ্ত হতে পারেন। পাশাপাশি নিষেধাজ্ঞার আওতায় যারা আছেন, তারা আবার বিভিন্ন মাধ্যমে অবৈধভাবে দেশ ছাড়ার চিন্তা করছেন। এতে করে দেশের ভাবমূর্তি বিদেশে ক্ষুণ্ন হওয়ার পাশাপাশি রাষ্ট্রবিরোধী ষড়যন্ত্র বেগবান হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এ জন্য তাদের বিদেশ যেতে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। অপরদিকে যদি কোনো ব্যক্তি নিজেকে নির্দোষ মনে করেন, তাহলে তিনি বিদেশে যেতে হলে আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এসবির এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মঙ্গলবার (২৬ নভেম্বর) বিকেলে খবরের কাগজকে জানান, গত আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতায় আসার পর কিছু ব্যক্তির বিদেশে যেতে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া রয়েছে। 

নিষেধাজ্ঞার আওতাধীন যারা: বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞার সেই তালিকায় রয়েছেন- বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সাবেক প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য তোফায়েল আহমেদ, সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, সাবেক বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন, সাবেক মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ. ক. ম. মোজাম্মেল হক, সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ, সাবেক প্রতিমন্ত্রী মির্জা আজম, সাবেক পানিসম্পদ মন্ত্রী আনিসুল ইসলাম মাহমুদ, সাবেক আইজিপি হাসান মাহমুদ খন্দকার, জাবেদ পাটোয়ারি, সাবেক ডিআইজি সৈয়দ আনোয়ার হোসেন, সৈয়দ নুরুল ইসলাম, হারুন অর রশীদ, সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, শফিকুল ইসলাম, সাবেক অতিরিক্ত ডিআইজি বিপ্লব কুমার সরকার, প্রলয় কুমার জোয়ার্দার, এস এম মেহেদী হাসান, সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, র‌্যাবের সাবেক ডিজি এম খুরশীদ হোসেন, সাবেক অতিরিক্ত আইজিপি মনিরুল ইসলাম, সাবেক মন্ত্রিপরিষদ সচিব মাহবুব হোসেন, কবীর বিন আনোয়ার, খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, এম আব্দুল আজিজ, সাবেক সচিব নাসির উদ্দিন, আব্দুল হালিম, জাকিয়া সুলতানা, মহিবুল হক, নজরুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম খান, খাইরুজ্জামান মজুমদার, ডা. খলিলুর রহমান, মোকাব্বির হোসেন ও আকবর হোসেন প্রমুখ। 

নিষেধাজ্ঞার আওতায় আরও রয়েছেন, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, কাজী জাফর উল্লাহ, কর্নেল (অব.) মুহাম্মদ ফারুক খান, কামরুল ইসলাম, ডা. মোস্তফা জালাল মহিউদ্দিন, এ এইচ এম খায়রুজ্জামান লিটন, সাবেক প্রতিমন্ত্রী বীরেন শিকদার, মেহের আফরোজ চুমকি, মোহাম্মদ এ আরাফাত, আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক শাম্মী আহমেদ, তথ্য ও গবেষণা সম্পাদক ড. সেলিম মাহমুদ, ত্রাণ ও সমাজকল্যাণবিষয়ক সম্পাদক আমিনুল ইসলাম আমিন, দপ্তর সম্পাদক ব্যারিস্টার বিপ্লব বড়ুয়া, মহিলাবিষয়ক সম্পাদক জাহানারা বেগম, সংস্কৃতিবিষয়ক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, সাংগঠনিক সম্পাদক বি এম মোজাম্মেল হক, আবু সাঈদ আল মাহমুদ স্বপন, শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল, সুজিত রায় নন্দী, উপ-প্রচার সম্পাদক সৈয়দ আব্দুল আউয়াল শামীম, কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সদস্য সাহাবুদ্দিন ফরাজি ও মারুফা আক্তার পপি, সাবেক স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরী।

তালিকায় আরও রয়েছেন, জেপি সভাপতি আনোয়ার হোসেন মঞ্জু, সাবেক অর্থমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী, সাবেক পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলম, জাতীয় পার্টির মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু, সাবেক প্রতিমন্ত্রী তারানা হালিম, সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রতিরক্ষা উপদেষ্টা তারেক আহমেদ সিদ্দিকী, সেনাবাহিনীর সাবেক প্রধান আজিজ আহমেদ। 

যেসব সাবেক এমপি নিষেধাজ্ঞার এ তালিকায় রয়েছেন তারা হলেন- নড়াইলের মাশরাফী বিন মুর্তজা, দিনাজপুর-২ আসনের খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, নীলফামারী-৩ আসনের রানা মোহাম্মদ সোহেল, রংপুর-১ আসনের মসিউর রহমান রাঙ্গা, বগুড়া-৫ আসনের হাবিবর রহমান, নওগাঁ-২ আসনের শহিদুজ্জামান সরকার, নওগাঁ-৫ আসনের নিজাম উদ্দিন জলিল, রাজশাহী-১ আসনের ওমর ফারুক চৌধুরী, রাজশাহী-২ আসনের ফজলে হোসেন বাদশা, নাটোর-১ আসনের শহিদুল ইসলাম বকুল, নাটোর-৩ আসনের জুনাইদ আহমেদ পলক, সিরাজগঞ্জ-২ আসনের হাবিবে মিল্লাত, সিরাজগঞ্জ-৪ আসনের তানভীর ইমাম, পাবনা-২ আসনের আহমেদ ফিরোজ কবীর, পাবনা-৫ আসনের গোলাম ফারুক খন্দকার প্রিন্স, মেহেরপুর-১ আসনের ফরহাদ হোসেন, কুষ্টিয়া-৪ আসনের সেলিম আলতাফ জর্জ, চুয়াডাঙ্গা-১ আসনের সোলায়মান হক জোয়ার্দ্দার, চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের আলী আজগার টগর, যশোর-৩ আসনের কাজী নাবিল আহমেদ, মাগুরা-১ আসনের সাইফুজ্জামান শিখর, বাগেরহাট-১ আসনের শেখ হেলাল উদ্দীন, বাগেরহাট-২ আসনের শেখ তন্ময়, খুলনা-২ আসনের শেখ সালাহউদ্দিন জুয়েল, খুলনা-৩ আসনের বেগম মন্নুজান সুফিয়ান, সাতক্ষীরা-১ আসনের মুস্তফা লুৎফুল্লাহ, বরগুনা-১ আসনের ধীরেন্দ্র দেবনাথ শম্ভু, বরগুনা-২ আসনের শওকত হাচানুর রহমান রিমন, পটুয়াখালী-২ আসনের সাবেক এমপি আ. স. ম. ফিরোজ, ভোলা-৩ আসনের নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, বরিশাল-১ আসনের আবুল হাসনাত আবদুলাহ, বরিশাল-৪ আসনের পংকজ নাথ, পিরোজপুর-১ আসনের শ ম রেজাউল করিম, টাঙ্গাইল-২ আসনের তানভীর হাসান ছোট মনির, জামালপুরের মুরাদ হাসান, ময়মনসিংহ-৫ আসনের কে এম খালিদ বাবু, নেত্রকোনা-২ আসনের আশরাফ আলী খান খসরু, কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের রেজওয়ান আহাম্মদ তৌফিক, মানিকগঞ্জ-১ আসনের নাইমুর রহমান দুর্জয়, মুন্সীগঞ্জ-১ আসনের মাহি বি চৌধুরী, ঢাকা-১৬ আসনের ইলিয়াস উদ্দিন মোল্লা, গাজীপুর-২ আসনের জাহিদ আহসান রাসেল, নরসিংদী-২ আসনের আনোয়ারুল আশরাফ খান, নারায়ণগঞ্জ-২ আসনের নজরুল ইসলাম বাবু, রাজবাড়ী-১ আসনের কাজী কেরামত আলী, মাদারীপুর-১ আসনের নূর-ই-আলম চৌধুরী, শরীয়তপুর-১ আসনের ইকবাল হোসেন অপু, শরীয়তপুর-২ আসনের এ কে এম এনামুল হক শামীম, শরীয়তপুর-৩ আসনের নাহিম রাজ্জাক, সুনামগঞ্জ-৫ আসনের মুহিবুর রহমান মানিক, সিলেট-২ আসনের মোকাব্বির খান, মৌলভীবাজার-২ আসনের সুলতান মোহাম্মদ মনসুর আহমেদ, হবিগঞ্জ-৩ আসনের সাবেক এমপি আবু জাহির, ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৩ আসনের উবায়দুল মোকতাদির চৌধুরী, কুমিল্লা-৬ আসনের বাহাউদ্দিন ও কুমিল্লা-১০ আসনের আ হ ম মোস্তফা কামাল, ফেনী-৩ আসনের মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, নোয়াখালী-৪ আসনের মোহাম্মদ একরামুল করিম চৌধুরী, চট্টগ্রাম-২ আসনের সৈয়দ নজিবুল বশর মাইজভাণ্ডারী, চট্টগ্রাম-১১ আসনের এম. আবদুল লতিফ, চট্টগ্রাম-১৫ আসনের আবু রেজা মুহাম্মদ নেজামউদ্দিন নদভী, কক্সবাজার-২ আসনের আশেক উল্লাহ রফিক ও কক্সবাজার-৩ আসনের সাইমুম সরওয়ার কমল। 

তালিকায় রয়েছে আওয়ামীপন্থি চিকিৎসকদের সংগঠন ‘স্বাচিপ’ নেতা ইকবাল আর্সলানের নাম। পাশাপাশি নানা কারণে আলোচিত শিল্পকলা একাডেমির সাবেক পরিচালক লিয়াকত আলী লাকিও রয়েছেন নিষেধাজ্ঞায়। এ ছাড়াও ব্যবসায়ী ইউসুফ আবদুল্লাহ হারুনেরও বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা রয়েছে।

৭ জন সাংবাদিককে বিদেশ যাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। তারা হলেন- জাতীয় প্রেসক্লাবের সাবেক সভাপতি ও সাবেক এমপি শফিকুর রহমান, একাত্তর টিভির মোজাম্মেল বাবু, ডিবিসির চেয়ারম্যান ইকবাল সোবহান চৌধুরী, কলামিস্ট সুভাষ সিংহ রায়, ডিবিসির মঞ্জুরুল ইসলাম, এটিএন বাংলার জ.ই মামুন এবং পিআইবির সাবেক মহাপরিচালক জাফর ওয়াজেদ।

বিদ্যুতে হাজার হাজার কোটি টাকা লোকসান চুরি, সিস্টেম লস ও ভর্তুকিতে ঘুরপাক

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৪৯ এএম
চুরি, সিস্টেম লস ও ভর্তুকিতে ঘুরপাক
বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ভর্তুকির ওপর নির্ভর করেই টিকে আছে পুরো বিদ্যুৎ খাত। ছবি: সংগৃহীত

বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাত যুগ যুগ ধরেই লোকসানে রয়েছে। চুরি, সিস্টেম লস, অপচয়, দুর্নীতি এবং ব্যবস্থাপনাগত দুর্বলতার কারণে প্রতিবছরে এই খাতে রাষ্ট্রকে গুনতে হচ্ছে হাজার হাজার কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি। বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের পকেট কেটে ভর্তুকির ওপর নির্ভর করেই টিকে আছে পুরো বিদ্যুৎ খাত। উপাদন সক্ষমতা বাড়লেও বিতরণব্যবস্থার দুর্বলতা, অবৈধ সংযোগ, মিটার কারসাজি এবং বিভিন্ন অনিয়মের কারণে বিদ্যুৎ খাত এখনো বড় চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

সংশ্লিষ্টদের মতে, বিদ্যুৎ চুরির অন্যতম প্রধান উৎস হলো অবৈধ সংযোগ বা ‘হুকিং’। দেশের বিভিন্ন এলাকায় বাসাবাড়ি, দোকানপাট, বাজার এবং অস্থায়ী স্থাপনায় সরাসরি বিদ্যুতের লাইন থেকে সংযোগ নেওয়ার ঘটনা ঘটছে। এ ছাড়া মিটার টেম্পারিং, বাইপাস সংযোগ, বিলিং জালিয়াতি এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা ও অটোরিকশার অবৈধ চার্জিং স্টেশন থেকেও বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ চুরি হচ্ছে। অনুমোদনহীন এসব চার্জিং পয়েন্টে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ বিদ্যুৎ ব্যবহৃত হলেও এর বড় অংশের কোনো বৈধ হিসাব থাকে না।

বিশ্লেষকরা বলছেন, বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলো দীর্ঘদিন ধরে অসাধু কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের কারসাজিতে হচ্ছে অনিয়ম-দুর্নীতি। সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ওই সব অসাধু কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ভুতুড়ে বিল, মিটার জালিয়াতি, অবৈধ সংযোগ, সিস্টেম লসের নামে অনিয়ম এবং ক্রয় প্রক্রিয়ায় দুর্নীতির অভিযোগ দীর্ঘদিনের। কার্যকর জবাবদিহি ও শাস্তির নজির না থাকায় পরিস্থিতিরও তেমন উন্নতি হচ্ছে না। অন্যদিকে, বছর বছর বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে ভোক্তাদের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করা হলেও খাতটির আর্থিক সংকট কাটছে না। 

তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, বিশ্বের উন্নত দেশগুলোতে বিদ্যুতের সিস্টেম লস সাধারণত ২ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকলেও বাংলাদেশে তা ১০ থেকে ১৩ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছেছে। বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) ও বিতরণ সংস্থাগুলোর তথ্য অনুযায়ী, পুরোনো অবকাঠামো, দুর্বল ট্রান্সফরমার, জরাজীর্ণ লাইন এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে প্রযুক্তিগত ক্ষতির পাশাপাশি চুরি ও অনিয়ম মিলিয়ে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ বিদ্যুতের অপচয় হচ্ছে।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে মোট ৯ হাজার ৫৪৩ কোটি ইউনিট বিদ্যুৎ সরবরাহ করা হলেও গ্রাহকদের কাছে পৌঁছেছে ৮ হাজার ৮১৯ কোটি ইউনিট। ফলে ৭২৪ কোটির বেশি ইউনিট বিদ্যুৎ সিস্টেম লস হিসেবে অপচয় হয়েছে। প্রতি ইউনিটের গড় মূল্য হিসাব করলে এই ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৬ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা।

বিতরণ সংস্থাগুলোর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ডেসকোর বিদ্যুৎ অপচয়ের হার ছিল ৫ দশমিক ৫০ শতাংশ, ডিপিডিসির ৫ দশমিক ৬, পিডিবির ৬ দশমিক ৬৮, ওয়েস্ট জোন পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ৭ দশমিক ২৬ এবং পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের (আরইবি) ৮ দশমিক ৫১ শতাংশ।

একই সময়ে বিপিডিবির আর্থিক অবস্থা আরও নাজুক হয়েছে। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে সংস্থাটির নিট লোকসান দাঁড়িয়েছে ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকা, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ৮ হাজার ৭৬৪ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে লোকসান বেড়েছে ৯৪ শতাংশেরও বেশি।

বিদ্যুৎ সরবরাহে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিপিডিবির মোট ব্যয় ছিল ১ লাখ ২১ হাজার ৪২০ কোটি টাকা। এর বিপরীতে বিদ্যুৎ বিক্রি করে আয় হয়েছে ৬৯ হাজার ৩৮৩ কোটি টাকা। ঘাটতি কমাতে অর্থ বিভাগ থেকে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা ভর্তুকি দেওয়া হলেও শেষ পর্যন্ত ১৭ হাজার ২১ কোটি টাকার নিট লোকসান হয়েছে সংস্থাটির।

তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় সবচেয়ে বেশি বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে বেসরকারি আইপিপি কেন্দ্রগুলো থেকে। এ খাতে ব্যয় হয়েছে ৭২ হাজার ৭১ কোটি টাকা, যা আগের অর্থবছরের তুলনায় ১৪ হাজার ৬৯৪ কোটি টাকা বেশি। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আইপিপি থেকে বিদ্যুৎ কেনা হয়েছিল ৫৭ হাজার ৩৭৭ কোটি টাকার। অথচ জাতীয় বাজেটে এ খাতে ব্যয়ের প্রাক্কলন ধরা হয়েছিল মাত্র ৪৩ হাজার ৯৮৭ কোটি টাকা।

২০২৪-২৫ অর্থবছরে বেসরকারি খাত থেকে ১ লাখ ৩০৯ মিলিয়ন কিলোওয়াট ঘণ্টা বিদ্যুৎ কেনা হয়েছে। প্রতি ইউনিটের গড় দাম পড়েছে ১৪ টাকা ৪৫ পয়সা, যা আগের বছরের তুলনায় ইউনিটপ্রতি ১ টাকা ৪০ পয়সা বেশি। ফলে বিদ্যুতের গড় উৎপাদন খরচও বেড়ে ১২ টাকা ১০ পয়সায় পৌঁছেছে, যা ২০২৩-২৪ অর্থবছরে ছিল ১১ টাকা ৩৫ পয়সা।

বিদ্যুৎ খাতে ভর্তুকি নিয়েও রয়েছে তথ্যগত অসংগতি। বিপিডিবির হিসাবে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বিদ্যুতে ভর্তুকি দেওয়া হয়েছে ৩৮ হাজার ৬৩৬ কোটি টাকা। তবে বিদ্যুৎ বিভাগের এক নথি অনুযায়ী একই সময়ে ভর্তুকির পরিমাণ ছিল ৫৯ হাজার ৬০০ কোটি টাকা। অর্থ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বকেয়াসহ বিদ্যুৎ খাতে মোট ভর্তুকি ব্যয় হয়েছে প্রায় ৫৯ হাজার কোটি টাকা এবং প্রতি মাসে গড়ে ৩ হাজার ২৫০ কোটি টাকা ভর্তুকি দিতে হয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দেশের মোট জ্বালানির প্রায় ৯৭ থেকে ৯৮ শতাংশই জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভর এবং এর প্রায় ৬০ শতাংশ আমদানি করতে হয়। ফলে আমদানি নির্ভরতা কমানো না গেলে বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক চাপও কমবে না। বিপিডিবির হিসাব অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরে সম্ভাব্য আর্থিক ঘাটতি প্রায় ৬২ হাজার ৯৬৪ কোটি টাকায় পৌঁছাতে পারে।

অন্যদিকে বিদ্যুতের দাম একাধিকবার বাড়ানো হলেও আর্থিক সংকট কাটছে না। চলতি মাসে এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সিদ্ধান্ত অনুযায়ী পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ, গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ এবং সঞ্চালন (হুইলিং) চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে। এর আগে ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম সাড়ে ৮ শতাংশ এবং পাইকারি দর ৬ টাকা ৭০ পয়সা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৭ টাকা ৪ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। 

বিদ্যুৎ খাতে লোকসানের পেছনে বিতরণ সংস্থার কর্মকর্তাদের ‘চুরি’র কারণে সংকট কাটছে না বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা অধ্যাপক এম শামসুল আলম। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ খাত একটি অসাধু সিন্ডিকেটের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। তাদের লাগামহীন দুর্নীতি ও চুরির কারণে দেশের বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের সংকট তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকারের কারণেও এই সংকট বাড়ছে।

তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে এমন ব্যক্তিদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যারা ভোক্তাবিরোধী ও গণবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত। কিন্তু তাদের বিরুদ্ধে বিচারের কোনো নজির নেই। ফলে সংকটও কাটছে না।

অধ্যাপক শামসুল আলমের মতে, বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি কমানোর কথা বলে বারবার বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হলেও বাস্তবে আর্থিক ঘাটতি কমছে না, বরং প্রতিবছরই তা বাড়ছে। তিনি বলেন, সরকারের প্রধান দায়িত্ব জনগণকে সেবা দেওয়া, মুনাফা অর্জন নয়। তাই শুধু দাম বাড়ানোর নীতি অনুসরণ না করে সাধারণ মানুষের স্বার্থে বিদ্যুতের মূল্য যৌক্তিক পর্যায়ে রাখার উদ্যোগও প্রয়োজন।

বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:২৪ এএম
বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন হবে
খবরের কাগজ ইনফোগ্রাফ

দেশের অর্থনীতি সংকটে আছে। রাজস্ব আদায়ে রেকর্ড ঘাটতি হয়েছে। প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি নেই। বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ সর্বনিম্ন। এমন প্রেক্ষাপটেও আগামী অর্থবছরের বাজেট বক্তৃতায় বিএনপির ১৩ নির্বাচনি প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা থাকছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের বাজেটবিষয়ক প্রতিবেদন থেকে এসব জানা যায়। 

প্রতিবেদন থেকে আরও জানা যায়, বাজটে বক্তৃতায় প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের অংশ হিসেবে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ, খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত, অর্থনীতি পুনরুদ্ধার, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতা বাড়ানো, ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো কর্মসূচির কথা থাকছে। এলাকাভিত্তিক কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে জোর দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। এভাবে একগুচ্ছ বিষয় অন্তর্ভুক্ত করে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে বাস্তবায়নের জন্য চিহ্নিত করা হয়েছে। 

সূত্র জানায়, আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জন্য বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় অঙ্কের বাজেট দিতে যাচ্ছে তারেক রহমানের সরকার। গতকাল পর্যন্ত এ বাজেটের আকার ধরা হয়েছে ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এই বাজেটে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব আদায়ে হিসাব কষা হয়েছে। ঘাটতি ধরা হয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা।

সরকারের নীতিনির্ধারকরা বলেছেন, সরকার বিভিন্ন সংকটে আছে। আর তাই আগামী বাজেটে বিএনপি সরকারের নির্বাচনি সব প্রতিশ্রুতি অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব না হলেও বেশির ভাগই থাকছে। এসব প্রতিশ্রুতির বেশির ভাগই সম্পূর্ণ বাস্তবায়নের পরিবর্তে পাইলট প্রকল্প হিসেবে আনা হবে। 

অর্থনীতির সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নিয়েই রেকর্ড ঘাটতির বাজেট ঘোষণা করতে যাচ্ছে সরকার। একই সঙ্গে অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় বড় অঙ্কের রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা ধার্য করা হয়েছে। বাজেটে অর্থায়নে যে সূত্র আঁকা হয়েছে, তা সফল না হলে সমগ্র অর্থনীতি চাপে পড়বে। 

প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর খবরের কাগজকে বলেন, বর্তমান সরকার জনগণের সরকার। বিএনপি নির্বাচনের আগে যেসব অঙ্গীকার করেছে, আগামী বাজেটে তার বেশির ভাগই থাকবে। অনেক প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন আগামী বাজেট থেকে শুরু করা হবে। পরে ধাপে ধাপে সম্পূর্ণ বাস্তবায়নে যাবে। 

অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, দেশের অর্থনীতি এ যাবৎকালের মধ্যে সবচেয়ে সংকটে আছে। বিগত দুই সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকার সূত্রে ভঙ্গুর অর্থনীতি পেয়েছি। এমন পরিস্থিতিতেও বড় অঙ্কের বাজেট দেওয়া হবে। এই বাজেট বাস্তবায়নে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। রাজস্ব আদায় বাড়াতে আয়ের খাত বাড়ানো হয়েছে। 

জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সাবেক চেয়ারম্যান ড. মো. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বড় অঙ্কের বাজেটে অর্থায়ন করতে হলে রাজস্ব আদায় বাড়াতে হবে। কিন্তু আমরা জানি চলতি অর্থবছরের গত ১১ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) রেকর্ড রাজস্ব ঘাটতি হয়েছে। আগামীতে রাজস্ব আদায়ের লক্ষ্যমাত্রা বাড়িয়ে তা অর্জন করা প্রায় অসম্ভব বলে মনে করছি। এতে অর্থনীতি ঝুঁকিতে পড়বে।’ 

বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো ড. মোস্তাফিজুর রহমান খবরের কাগজকে বলেছেন, দেশের অর্থনীতি সংকটে ছিল। মধ্যপ্রাচ্যের রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে দেশের অর্থনীতির সংকট বেড়েছে। সরকার ও ব্যক্তি খাত–দুই খাতই ভালো নেই। এমন পরিস্থিতিতে প্রকল্প বাস্তবায়ন, উন্নয়ন বাজেট বাস্তবায়ন কঠিন হবে। তবে সরকার যত সংকটেই থাকুক না কেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি ও ভর্তুকি খাতে বরাদ্দ দিতে হবে। নির্বাচনের আগে বিএনপি যেসব প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের কথা বলেছে, তার বেশির ভাগ আগামী বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করা হলেও সব বাস্তবায়ন সম্ভব হবে না। আগামী অর্থবছরে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ডের মতো প্রতিশ্রুতি পাইলট প্রকল্প হিসেবে বাস্তবায়ন করা যেতে পারে। 

আগামী অর্থবছরের বাজেটের আকার, কোন খাতে কত ব্যয় ধরা হবে, কোন খাত থেকে কত আয় করা হবে, এনবিআর ও এনবিআরবহির্ভূত খাত থেকে আয় নির্ধারণসহ বাজেটের বিভিন্ন হিসাব নিয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী কয়েক দফা বৈঠক করেন। অনেক বিষয় নিয়ে মন্ত্রিসভার বৈঠকেও আলোচনা হয়। এনবিআর চেয়ারম্যান আবদুর রহমান খানসহ বাজেট প্রস্তুত কমিটির কর্মকর্তাদের সঙ্গেও পৃথকভাবে প্রধানমন্ত্রী বৈঠক করেন। সবার মত নিয়ে যাচাই-বাছাই করে প্রস্তাবিত বাজেটের সারসংক্ষেপ প্রণয়ন করা হয়েছে। 

আগামী ১১ জুন জাতীয় সংসদে বাজেট উপস্থাপনের পর ৩০ জুন পর্যন্ত আলোচনা হবে। এরপর তা চূড়ান্ত করে ১ জুলাই থেকে বাস্তবায়ন করা হবে। 

অর্থ মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের বাজেট ৭ লাখ ৯০ হাজার কোটি। আসন্ন অর্থবছরের বাজেট ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। শতকরা হিসাবে চলতি বাজেটের তুলনায় ১৮.৭৩ শতাংশ বেশি, যা বাংলাদেশের ইতিহাসে রেকর্ড বৃদ্ধি। সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে মোট ১ লাখ ৩৮ হাজার ৩৩৯ কোটি টাকা বরাদ্দের কথা ভাবা হচ্ছে, যা আগের বছরের তুলনায় অন্তত ১২ হাজার কোটি টাকা বেশি। উপকারভোগীর সংখ্যা বাড়ানোর হিসাব পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে।

বাজেটে সরকারের পরিচালন ও অন্যান্য ব্যয় ধরা হচ্ছে ৬ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা। এর বাইরে উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ লাখ কোটি টাকা। রাজস্ব আদায়ের এনবিআর থেকে ৬ লাখ ৫ হাজার কোটি টাকা, নন-এনবিআর ২৫ হাজার কোটি টাকা এবং এনটিআর খাত থেকে ৬৬ হাজার কোটি টাকা ধার্য করা হয়েছে। অর্থায়নের ক্ষেত্রে বৈদেশিক উৎস থেকে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা ও অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা ধরা হয়েছে। অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ খাতের মধ্যে ব্যাংকিং খাত থেকে ১ লাখ ১২ হাজার কোটি টাকা এবং ব্যাংকবহির্ভূত খাত থেকে ১৫ হাজার টাকা ধরা হয়েছে। আগামী অর্থবছরের বাজেটে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশ। 

প্রতিষ্ঠিত সন্তানের বাবা-মায়ের শেষ ঠিকানা কেন বৃদ্ধাশ্রম?

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:৪৯ এএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:০৭ এএম
প্রতিষ্ঠিত সন্তানের বাবা-মায়ের শেষ ঠিকানা কেন বৃদ্ধাশ্রম?
ছবি: খবরের কাগজ

মিরপুরের ৭৫ বছর বয়সী নূরজান বেগম। মৃত্যুর পর কয়েক দিন তার মরদেহ পড়ে ছিল ঘরের ভেতর। কয়েক দিন পর একই এলাকায় ৫৫ বছর বয়সী আফরোজা নামের আরেক নারীর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের সন্তানরা কেউ রাষ্ট্রের উচ্চপদে কর্মরত, কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কেউ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত জীবন গড়েছেন।

অন্যদিকে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক অধ্যাপক তারেক শামসুর রেহমানও দীর্ঘদিন উত্তরার নিজ ফ্ল্যাটে একা থাকতেন। স্ত্রী ও একমাত্র মেয়ে যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করতেন। শিক্ষক, গবেষক ও বিশ্লেষক হিসেবে তিনি ছিলেন দেশের পরিচিত মুখ। অথচ জীবনের শেষ মুহূর্তে তিনিও ছিলেন নিঃসঙ্গ। এই ঘটনাগুলো শুধু কয়েকজন মানুষের মৃত্যুর গল্প নয়। এগুলো এমন এক সমাজের প্রতিচ্ছবি, যেখানে অর্থনৈতিক উন্নয়ন ঘটছে, জীবনযাত্রার মান বাড়ছে, কিন্তু পারিবারিক সম্পর্কের উষ্ণতা ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে। 

দ্রুত বাড়ছে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ৬০ বছর বা তার বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৪ লাখেরও বেশি, যা দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৬.১৪ শতাংশ। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগামী কয়েক দশকে এই সংখ্যা আরও দ্রুত বাড়বে। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিল (UNFPA) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বাংলাদেশে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা সাড়ে তিন থেকে চার কোটির বেশি হবে। তখন দেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় ২০ থেকে ২২ শতাংশই হবেন প্রবীণ।

অর্থাৎ আগামী বাংলাদেশ হবে অনেক বেশি বয়স্ক মানুষের বাংলাদেশ। কিন্তু সেই মানুষের জন্য কি দেশ প্রস্তুত?

সাবেক উপদেষ্টা ও সমাজকর্মী ফরিদা আখতার মনে করেন, আলোচনায় আসা ঘটনাগুলো কেবল দৃশ্যমান অংশ। তিনি বলেন, ‘মিরপুরের ঘটনাটি সামনে এসেছে, তাই আলোচনা হচ্ছে। কিন্তু সারা দেশে এমন অনেক ঘটনা ঘটছে, যা আমাদের সামনে আসে না। অনেক বৃদ্ধ-বৃদ্ধা একাকিত্বে জীবন কাটাচ্ছেন। কেউ তাদের খোঁজ রাখছেন না।’

তার মতে, যৌথ পরিবার ভেঙে যাচ্ছে, পরিবার ছোট হচ্ছে, ছেলেমেয়েরা বিয়ের পর আলাদা হয়ে যাচ্ছে। ফলে পারিবারিক বন্ধন দুর্বল হয়ে পড়ছে। ‘বাবা-মা সন্তানকে আদর-যত্ন করে বড় করলেন, লেখাপড়া শিখিয়ে প্রতিষ্ঠিত করলেন। অথচ সেই সন্তান যদি বৃদ্ধ বয়সে বাবা-মায়ের খোঁজ না রাখে, সেটি শুধু অমানবিক নয়, সামাজিক অন্যায়ও’ বলেন তিনি।

তার মতে, যেসব সন্তান সচেতনভাবে বাবা-মায়ের দায়িত্ব এড়িয়ে যান, তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক ও আইনগত জবাবদিহি থাকা প্রয়োজন।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, বিষয়টিকে শুধু সামাজিক অবক্ষয় বলে ব্যাখ্যা করলে পুরো চিত্রটি ধরা পড়ে না। একদিকে রয়েছে বিশ্বায়ন, কর্মসংস্থানের জন্য দেশ-বিদেশে ছড়িয়ে পড়া, নগরজীবনের ব্যস্ততা, ছোট পরিবার ও জীবনযাত্রার পরিবর্তন। অন্যদিকে রয়েছে দায়িত্ববোধের ঘাটতি, সম্পর্কের দূরত্ব এবং প্রবীণদের মানসিক চাহিদাকে অবহেলা করার প্রবণতা।

বর্তমান প্রজন্মের অনেকেই বাবা-মায়ের জন্য অর্থ পাঠান, চিকিৎসার খরচ বহন করেন। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বৃদ্ধ বয়সে মানুষের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন কেবল অর্থ নয়, সঙ্গ-কথা বলার মানুষ এবং মানসিক নিরাপত্তা।

ঢাকার একাধিক বৃদ্ধাশ্রমের দায়িত্বশীলরা জানান, সেখানে বসবাসকারী অনেক প্রবীণের সন্তান দেশ-বিদেশে প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু নিয়মিত যোগাযোগ করেন না। কেউ কেউ মাসের পর মাস বাবা-মায়ের সঙ্গে দেখা করতেও আসেন না।

বাংলাদেশে বৃদ্ধাশ্রমকে এখনো অনেকেই নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখেন। কিন্তু বাস্তবতা দ্রুত বদলাচ্ছে। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. আনজুমান আরা মনে করেন, আধুনিক সমাজে বৃদ্ধাশ্রমের প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তিনি বলেন, ‘জাপান, থাইল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের অনেক দেশে ওল্ড হোম বা বৃদ্ধাশ্রম খুবই স্বাভাবিক একটি ব্যবস্থা। আমাদের দেশেও এখন অনেক আধুনিক বৃদ্ধাশ্রম গড়ে উঠছে। সেখানে সাবেক সচিব, শিক্ষক, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন পেশার মানুষ থাকছেন।’

তার মতে, সন্তানরা কর্মজীবন বা উচ্চশিক্ষার জন্য বিদেশে যেতেই পারেন, সেটি অপরাধ নয়। তবে বাবা-মায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

তিনি বলেন, ‘যাদের সামর্থ্য আছে, তারা চাকরিজীবনের শুরু থেকেই ভবিষ্যতের জন্য পরিকল্পনা করতে পারেন। পেনশন বা আয়ের একটি অংশ প্রবীণ বয়সের নিরাপদ আবাসনের জন্য সঞ্চয় করা যেতে পারে।’

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণায় দেখা গেছে, দীর্ঘস্থায়ী একাকিত্ব মানুষের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর মারাত্মক প্রভাব ফেলে। একাকিত্ব হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, বিষণ্নতা, উদ্বেগ, স্মৃতিভ্রংশ এবং অকাল মৃত্যুর ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

প্রবীণদের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও বেশি। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিয়মিত সামাজিক যোগাযোগ, পরিবার-পরিজনের সঙ্গে সময় কাটানো এবং কমিউনিটি কার্যক্রমে অংশগ্রহণ প্রবীণদের সুস্থ জীবনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

বাংলাদেশে বাবা-মায়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে পিতা-মাতার ভরণপোষণ আইন, ২০১৩ রয়েছে। এই আইনে বলা হয়েছে, সক্ষম সন্তানদের বাবা-মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতে হবে। দায়িত্ব পালনে অবহেলা করলে শাস্তির বিধানও রয়েছে।

তবে বাস্তবে খুব কম মানুষই আইনের আশ্রয় নেন। কারণ অধিকাংশ বাবা-মা সন্তানের বিরুদ্ধে মামলা করতে চান না। তারা শাস্তি নয়, সন্তানের ভালোবাসা ও উপস্থিতি চান।

বাংলাদেশ দ্রুত উন্নয়নের পথে এগোচ্ছে। মাথাপিছু আয় বাড়ছে, শিক্ষার হার বাড়ছে, বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে পড়ছে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্ম। কিন্তু একই সঙ্গে একটি প্রশ্নও সামনে আসছে, আমরা কি সম্পর্কের বিনিময়ে উন্নয়ন কিনছি?

যে মা রাত জেগে সন্তানের জ্বর দেখেছেন, যে বাবা নিজের প্রয়োজন বিসর্জন দিয়ে সন্তানের ভবিষ্যৎ গড়েছেন, তাদের জীবনের শেষ সময় কি একটি নীরব ফ্ল্যাটে একা কাটার কথা?

কর্মজীবনের ব্যস্ততা, বিদেশে বসবাস কিংবা ব্যক্তিগত সীমাবদ্ধতা থাকতেই পারে। কিন্তু সেই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও বাবা-মায়ের নিরাপত্তা ও সঙ্গ নিশ্চিত করার দায়িত্ব থেকে সন্তানরা মুক্ত নন। মৃত্যুর পর কয়েক দিন ধরে বন্ধ ঘরে পড়ে থাকা কোনো বৃদ্ধ বা বৃদ্ধার মরদেহ শুধু একটি পারিবারিক ট্র্যাজেডি নয়; এটি আমাদের সমাজ, মূল্যবোধ ও মানবিকতার জন্যও এক গভীর প্রশ্নচিহ্ন।

যে বাবা-মা এক দিন সন্তানকে পৃথিবীর আলো দেখিয়েছেন, তাদের জীবনের শেষ আলোটুকু যেন নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে নিভে না যায়। সন্তানের কাছেই হোক তাদের শেষ আশ্রয়। আর যদি তা সম্ভব না হয়, তবে অন্তত এমন নিরাপদ ও মানবিক ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে কোনো মা-বাবাকে আর একা, নিভৃতে, অযত্নে মৃত্যুবরণ করতে না হয়। কারণ একটি সভ্য সমাজের প্রকৃত পরিচয় তার আকাশচুম্বী ভবনে নয়, বরং সে তার প্রবীণ মানুষকে কতটা সম্মান, নিরাপত্তা ও ভালোবাসা দিতে পারে সেখানেই।

আনোয়ারা: দল বদলায়, রক্ষাকবচে অত্যাচার থামে না

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:৩৯ এএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:০২ এএম
আনোয়ারা: দল বদলায়, রক্ষাকবচে অত্যাচার থামে না
চট্টগ্রামের আনোয়ারার উপকূলীয় গহিরা প্যারাবন কেটে প্রথমে মাঠ বানানো হয় (বায়ে)। পরে মাটি কেটে মাছের ঘের তৈরি করা হয়। ছবি: খবরের কাগজ

১৯৯১ সালের ২৯ এপ্রিল। জলোচ্ছ্বাস আর ঘূর্ণিঝড় কেড়ে নিয়েছিল লাখো প্রাণ। লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছিল চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপকূলের গহিরা, রায়পুরসহ বিস্তীর্ণ জনপদ। সেই মহাবিপর্যয়ের পর উপকূলবাসীকে রক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়। বন বিভাগের পক্ষ থেকে ‘সবুজ দেওয়াল’ গড়ে তোলার প্রক্রিয়া শুরু হয়। প্রায় ২৫০ একর এলাকাজুড়ে রোপণ করা হয় কেওড়া, গেওয়া, বাইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির লাখো গাছ। তিন দশকে প্রাকৃতিকভাবে বেড়ে ওঠা সেই গহিরা প্যারাবনই এখন আনোয়ারা উপকূলের রক্ষাকবচ। অথচ এই বনকেই ধীরে ধীরে সাবাড় করা হচ্ছে। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, আওয়ামী লীগ আমলে এই বনের গাছ কাটা হয়েছে। বর্তমানে কাটা হচ্ছে মাটি। দল বদলায়, ক্ষমতার পালাবদল হয়, অথচ বনের ওপর অত্যাচার থামে না।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে প্রভাবশালী এক মন্ত্রীর ঘনিষ্ঠজনদের থাবায় বনের প্রায় ১৫ একর এলাকার গাছ কেটে সাবাড় করা হয়। আর বর্তমানে স্থানীয় বিএনপির নামধারী একশ্রেণির প্রভাবশালী সিন্ডিকেট প্রকাশ্যে ভেকু মেশিন (মাটি কাটার যন্ত্র) বসিয়ে বনের মাটি কেটে বিক্রি করছে। ফলে উপকূলের রক্ষাকবচ এই প্যারাবন এখন নিজেই নিঃশেষের পথে। 

স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গহিরা প্যারাবনের ওপর নির্যাতনের ইতিহাস দীর্ঘদিনের। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে তৎকালীন স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান আমিন শরীফের সরাসরি আশ্রয়ে জকু মাঝি নামের এক ব্যক্তি বনের ভেতরে তাণ্ডব চালান। সাগরের গুরুত্বপূর্ণ মোহনায় ঢাল হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকা বনের ভেতরের গাছ কেটে, চারপাশে মাটির বাঁধ দিয়ে পানি আটকে বিশাল ঘের তৈরি করেন।
সরেজমিনে গহিরা উপকূলে গিয়ে দেখা যায়, ওই মাছের ঘেরগুলোর ভেতরে এখনো কেটে ফেলা শত শত কেওড়া ও বাইন গাছের গোড়া (অবশিষ্টাংশ) পানির ওপর জেগে আছে। প্রায় ১৫ একর বনভূমির সবুজবেষ্টনী সম্পূর্ণ উজাড় করা হয়েছে। 

স্থানীয়দের অভিযোগ, ৫ আগস্টের পর বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে জড়িত স্থানীয় কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ও তাদের অনুসারীরা একজোট হয়ে এই সংরক্ষিত প্যারাবনের মাটি কেটে বিক্রি করছেন। বনের ভেতর ও সংলগ্ন এলাকার মাটি কেটে নেওয়ার কারণে সেখানে বড় বড় গর্ত তৈরি হয়েছে।
গহিরা এলাকার সত্তরোর্ধ্ব বাসিন্দা ইদ্রিস আলী বলেন, ‘আওয়ামী লীগের নেতা পরিচয়ে এসে বনের গাছ কাটল, মাছের ঘের বানাইল। ভাবছিলাম সরকার বদলালে বনটা বাঁচবে। এখন দেখি বিএনপির নাম দিয়ে আরেক দল এসে দিন-রাত মাটি কেটে নিয়ে যাচ্ছে। বনটা শেষ হয়ে গেলে সাগরের পানি আমাদের ঘরবাড়ি ভাসিয়ে নেবে।’

অনুসন্ধানে জানা যায়, বর্তমানে আনোয়ারার গহিরা এলাকায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) অধীনে একটি উপকূলীয় বেড়িবাঁধের নির্মাণকাজ চলমান রয়েছে। এই কাজের ঠিকাদার ‘মেসার্স শেখ এমদাদুল হক মামুন’ নামের একটি প্রতিষ্ঠান। জানা গেছে, এই ঠিকাদারের কাছ থেকে স্থানীয় বিএনপি নেতা সাহেদ, আব্দুল মজিদসহ কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি সাব-কন্ট্রাক্ট (উপ-ঠিকাদার) হিসেবে কাজ নিয়েছেন।

সরকারি নিয়ম অনুযায়ী, বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য দূরবর্তী কোনো স্থান বা ব্যক্তিমালিকানাধীন জায়গা থেকে মাটি কিনে বাঁধে দেওয়ার কথা। অথচ খরচ বাঁচিয়ে শতভাগ লাভ তুলে নিতে উপ-ঠিকাদার সংরক্ষিত প্যারাবনকে বেছে নিয়েছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, বনের ভেতরে বিশাল আকৃতির ভেকু দিয়ে দিন-রাত মাটি কাটা হচ্ছে। ডাম্প ট্রাকে করে সেই মাটি বেড়িবাঁধে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মাটি কাটার ফলে বনের ভেতরের জোয়ার-ভাটার প্রাকৃতিক প্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক গাছের শিকড় উপড়ে গেছে।
বনের বর্তমান অবস্থা নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা নূরনাহার বেগম (৪৫) বলেন, ‘চোখের সামনে বনটা শেষ হয়ে যাচ্ছে। আমরা বাধা দিলে মামলা-হামলার ভয় দেখানো হয়।’

অভিযোগের বিষয়ে উপ-ঠিকাদার ও মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত স্থানীয় বিএনপি নেতা সাহেদ (উপজেলা বিএনপির আহ্বায়কের ছেলে) মোবাইলফোনে বলেন, ‘ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমি জড়িত নই। দায়িত্বপ্রাপ্ত মূল ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানই বনের মাটি কেটে বেড়িবাঁধে দিচ্ছে। এ বিষয়ে তাদের সঙ্গে কথা বলুন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে আমাদের জড়িয়ে এসব ছড়ানো হচ্ছে।’
তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান মেসার্স শেখ এমদাদুল হকের দায়িত্বপ্রাপ্ত এক কর্মকর্তার মোবাইলফোনে একাধিকবার কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি। এসএমএস পাঠিয়েও কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি। এ ছাড়া আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িতরা বর্তমানে পলাতক থাকায় তাদের কারও সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশ বিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ কামাল হোসেন বলেন, ‘ম্যানগ্রোভ বা প্যারাবন উপকূলীয় এলাকার জন্য প্রাকৃতিক সুরক্ষাপ্রাচীর। এই বন শুধু সমুদ্রের উত্তাল ঢেউয়ের গতি কমায় না, বরং মাটিকে ধরে রাখে।’
তিনি বলেন, ‘বিগত সময়ে মাছ চাষের নামে এখানে যে গাছ কাটা হয়েছে, তা পরিবেশের অপূরণীয় ক্ষতি। আর এখন বনের ভেতর থেকে মাটি কেটে নিয়ে পুরো এলাকাকে যদি খালে রূপান্তর করা হয়, তবে সমুদ্রের জোয়ার ও ঢেউয়ের আঘাতে অবশিষ্ট বনও ধসে পড়বে। ফলে পুরো উপকূলীয় অঞ্চল দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী ঝুঁকিতে পড়বে।’

সংরক্ষিত বনাঞ্চল কেটে বেড়িবাঁধের কাজ চললেও এর দায় নিতে নারাজ পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো)। সংস্থাটির নির্বাহী প্রকৌশলী শওকত ইবনে শহীদ বলেন, ‘আমরা মূল প্রকল্পের নকশা এবং কাজের গুণগত মান তদারকি করি। ঠিকাদার কোথা থেকে মাটি আনছেন, সেই বিষয়টি আমাদের সব সময় লিখিতভাবে জানানো হয় না। তবে স্থানীয়দের কিছু আপত্তির কথা আমরা শুনেছি। ঠিকাদারকে নির্দেশ দিয়েছি, যাতে তারা সংরক্ষিত বন বা উপকূলীয় এলাকা থেকে মাটি না কেটে দূরবর্তী স্থান থেকে এনে সরবরাহ করেন।’ 

বাঁশখালী রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার খায়রুল আলম বলেন, ‘আমি এই রেঞ্জে নতুন এসেছি। মাটি কাটার বিষয়টি লোকমুখে শুনে একবার পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। বিষয়টির বিস্তারিত আমার জানা নেই। নথিপত্র দেখে বলতে হবে, ওটা বন বিভাগের গেজেটভুক্ত জায়গা কি না।’

চট্টগ্রাম উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এম এ হাসান বলেন, ‘বিষয়টি আমার বিস্তারিত জানা নেই। আমি দ্রুত তদন্ত টিম পাঠাচ্ছি। বিন্দুমাত্র প্রমাণ মিললে জড়িতদের রাজনৈতিক পরিচয় বিবেচনা না করে আইনানুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’ 

আলোচিত না হলেই তদন্ত ও বিচারে ধীরগতি

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:১৩ এএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৮:১৭ এএম
আলোচিত না হলেই তদন্ত ও বিচারে ধীরগতি
খবরের কাগজ গ্রাফিকস

আলোচিত না হলেই ধর্ষণ ও শিশুহত্যার মতো বর্বরোচিত ঘটনাগুলোর তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া যেন থমকে যায়। বিশেষ করে গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ ধরনের যেসব ঘটনা ব্যাপক আলোচিত বা ‘ভাইরাল’ হয়, সেসব ঘটনায় করা মামলার ক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া তুলনামূলক অনেক বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু যেসব ঘটনা তেমন আলোচনায় নেই সেগুলোর মামলার ক্ষেত্রে তেমন একটা গুরুত্ব দেওয়া হয় না বলে নানা পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে।

  • মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণ হচ্ছে দক্ষ জনবলের অভাব: সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক
  • বিচারব্যবস্থায় এমন বৈষম্য থাকলে একে সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা বলে না: আইনজীবী মনজিল মোরসেদ
  • প্রচারের মাত্রায় নয়, অপরাধের গুরুত্বের ভিত্তিতেই সব মামলায় সমান অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি: মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির
  • রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব নাগরিককে সমানভাবে দেখা, সমান গুরুত্ব দেওয়া: অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক
  • শিশুহত্যা মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই: এআইজি (মিডিয়া), পুলিশ সদর দপ্তর

রবিবার (৭ জুন) আলোচিত শিশু রামিসা আক্তারকে ধর্ষণ ও বীভৎসভাবে হত্যার মামলার রায় ঘোষণা করা হয়েছে। হত্যাকাণ্ড ঘটার মাত্র ১৯ দিনের মাথায় গতকাল আদালত অভিযুক্ত সোহেল রানা ও তার স্ত্রী স্বপ্না আক্তারের বিরুদ্ধে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেন। এর মধ্য দিয়ে দ্রুত বিচারের একটি অনন্য নজির স্থাপন করা গেল। 

কিন্তু বিশ্লেষকরা মনে করেন, এ ধরনের প্রতিটি ঘটনা ভুক্তভোগী পরিবারগুলোর কাছে সমান কষ্টের ও বেদনার। ফলে সবার ক্ষেত্রেই দ্রুততম সময়ে বিচার সম্পন্ন হোক–সেটাই কাম্য। অথচ গণমাধ্যম বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি না হলে একই ধরনের অপরাধ বা হত্যাকাণ্ডের ক্ষেত্রে সে তুলনায় গুরুত্ব দেওয়া হয় না। শুধু আলোচিত বা চাঞ্চল্যের ওপর ভিত্তি করে একই ধরনের জঘন্য অপরাধমূলক ঘটনার মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় বৈষম্যের শিকার হচ্ছে অনেক ভুক্তভোগী পরিবার। ফলে ব্যক্তি, স্থান বা প্রচারের মাত্রায় নয়, অপরাধের গুরুত্বের ভিত্তিতেই সব মামলায় সমান অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করেন সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা।

তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৫ সালে মাগুরায় ঘটা আলোচিত শিশু আছিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) জমা দেওয়া হয়েছিল এক মাসের মধ্যেই। অভিযোগ গঠনের পর মাত্র ২৪ দিনের মাথায় সংশ্লিষ্ট আদালত এই ঘটনায় ঐতিহাসিক রায় দেন। যদিও বর্তমানে রায়-পরবর্তী আপিলের ধাপটি হাইকোর্টে নিষ্পত্তির অপেক্ষায় রয়েছে। অন্যদিকে গত ২১ মে চট্টগ্রাম নগরীর বাকলিয়া থানা এলাকায় গুদাম কক্ষে চার বছরের শিশুকে ধর্ষণের ঘটনায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয় এবং মাত্র ১৩ দিনের মাথায় (গত ৪ জুন) একমাত্র আসামি মনির হোসেনের বিরুদ্ধে আদালতে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ। এ ছাড়া সর্বশেষ গত ১৯ মে পল্লবীতে ঘটা শিশু স্কুলছাত্রী রামিসা ধর্ষণ-হত্যার ওই মামলায় চার্জশিট জমা দেওয়ার পর মাত্র পাঁচ কর্মদিবসে শুনানি শেষ হয় এবং ষষ্ঠ কর্মদিবসে গতকাল রায় ঘোষণা করেন বিচারক। এর আগে সরকারপ্রধান তথা প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নিজেও আলোচিত এই হত্যা মামলার রায় মাত্র এক মাসের মধ্যেই ঘোষণা করা হবে বলে এক অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে বলেছিলেন। 

বিশ্লেষকরা মনে করেন, শিশু আছিয়া বা রামিসা হত্যাকাণ্ডের দ্রুত বিচার এবং জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিত করার পক্ষে প্রায় সবাই। কিন্তু এমন অসংখ্য আছিয়া-রামিসা, যারা সমাজের মানুষরূপী হায়নাদের বর্বরতার শিকার হয়ে নির্মমভাবে প্রাণ হারিয়েছে, তাদের ক্ষেত্রেও তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত হচ্ছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। ভুক্তভোগী ও তাদের পরিবারগুলো তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ায় গুরুত্ব পাওয়ার ক্ষেত্রে বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন কি না, তা সংশ্লিষ্টদের খতিয়ে দেখা দরকার বলে মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা। 

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্যমতে, গত পাঁচ বছরে (২০২১ থেকে ২০২৫) সারা দেশে বিভিন্নভাবে ২ হাজার ৫৮১ শিশু হত্যার শিকার হয়েছে, যাদের মধ্যে ১৬৭ জনকে ধর্ষণের পর খুন করা হয়। এর মধ্যে ২০২৫ সালে খুন হয় ৪১০ শিশু, যাদের মধ্যে ধর্ষণসহ হত্যার শিকার হয় ৩২ জন। তার আগে ২০২৪ সালে ৫৭৪ শিশু, ২০২৩ সালে ৪৮৫ জন, ২০২২ সালে ৫১৬ জন এবং ২০২১ সালে ৫৯৬ শিশু খুন হয়েছে।

 অন্যদিকে বিভিন্ন সূত্রমতে, চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত অন্তত ১২০ শিশু খুন হয়েছে, যাদের মধ্যে প্রায় অর্ধশত শিশু ধর্ষণের পর নির্মমভাবে হত্যার শিকার হয়। ফলে যে হারে দেশের বিভিন্ন স্থানে শিশু ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে, সে অনুসারে সমান গুরুত্ব দিয়ে এসব ঘটনার দ্রুত তদন্ত বা বিচার প্রক্রিয়া শেষ করার কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই কারও কাছেই। 

এ প্রসঙ্গে আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) জ্যেষ্ঠ সমন্বয়ক ও মানবাধিকারকর্মী আবু আহমেদ ফয়জুল কবির গত সোমবার খবরের কাগজকে বলেন, আইনের শাসন ও মানবাধিকারের মৌলিক নীতি হলো, সব নাগরিক আইনের দৃষ্টিতে সমান এবং প্রতিটি ভুক্তভোগী সমান গুরুত্ব পাওয়ার অধিকার রাখে। কোনো ঘটনা বেশি আলোচিত হওয়ায় দ্রুত বিচার হবে, আর একই ধরনের ঘটনায় দুর্বলের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা থাকবে– এটি ন্যায়বিচারের চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। কাজেই আমাদের এমন ব্যবস্থা প্রণয়ন করতে হবে যেন দ্রুততম সময়ে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা যায়।
আবু আহমেদ ফয়জুল কবির আরও বলেন, ‘যেকোনো আলোচিত ঘটনার পাশাপাশি প্রত্যন্ত অঞ্চল বা কম আলোচিত এলাকায় সংঘটিত শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ ও হত্যা মামলাগুলোর ক্ষেত্রেও সমান গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত ও বিচার করতে হবে। ব্যক্তি, স্থান বা প্রচারের মাত্রায় নয়, অপরাধের গুরুত্বের ভিত্তিতেই সব মামলায় সমান অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা জরুরি। আমরা রামিসাসহ সব সহিংসতার শিকার শিশুর জন্য ন্যায়বিচার দেখতে চাই।’

বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ না করার ক্ষেত্রে বিচারকের স্বল্পতাসহ বেশ কিছু কারণকে চিহ্নিত করেছেন সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক। তিনি গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘মামলা নিষ্পত্তিতে দীর্ঘসূত্রতার কারণ হচ্ছে দক্ষ জনবলের অভাব। লাখ লাখ মামলার মধ্যে কয়টা আর মিডিয়াতে আসে। জনবহুল এই দেশে বিচারক আছেন মাত্র ১৮০০ থেকে ১৯০০ জন। বিচার বিভাগের জন্য জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ হয় এক শতাংশেরও কম। তা ছাড়া মামলা নিষ্পত্তি করা তো শুধু আদালতের বিষয় না। মামলার তদন্ত করে পুলিশ। এসব সমস্যা সেখানেও আছে।’

একই প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী মনজিল মোরসেদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আইনের শাসনের এটি একটি দুর্বলতা। যেই মামলার বিষয়ে মিডিয়াতে খুব হইচই পড়ে যায়, দেশের প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন, তখন সেটি ফার্স্ট ট্র্যাকে কয়েক দিনের মধ্যে বিচার হয়ে যায়। আর এমন অনেক অসহায় বা অন উল্লেখ্য লোক আছেন, যাদের তেমন কোনো লোকজন নেই, তখন মিডিয়াতে তেমন হইচই পড়ে না, প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন না–তাদের মামলার নিষ্পত্তি কবে হবে কেউ বলতে পারেন না। এটা এক ধরনের বৈষম্য। বিচারব্যবস্থায় এমন বৈষম্য থাকলে একে সুষ্ঠু বিচারব্যবস্থা বলে না। আইনের শাসন সুনিশ্চিত করতে গেলে অবশ্যই সব মামলা নিষ্পত্তির ধারাবাহিকতা একই হতে হবে। তাই সরকারের উচিত, সব মামলাই যেন দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সুবিচার নিশ্চিত করা যায়, সে জন্য মহাপরিকল্পনা নেওয়া।’

গতকাল শিশু স্কুলছাত্রী রামিসা হত্যার রায় ঘোষণা করার পর সচিবালয়ে সাংবাদিকদের কাছে প্রতিক্রিয়া জানান আইনমন্ত্রী অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান। তিনি বলেন, ‘মাত্র পাঁচ কার্যদিবসে এই মামলার বিচারকাজ সম্পন্ন করে রায় দেওয়া হয়েছে, যা দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে দ্রুততম সময়ে রায় ঘোষণার রেকর্ড।’

তবে অতীতের আলোচিত বা এই ধরনের অন্য মামলাগুলো দ্রুত নিষ্পত্তির বিষয়ে জানতে চাওয়া হলে মন্ত্রী বলেন, ‘বিচারব্যবস্থার একটি সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তিনি বলেন, অন্য মামলাগুলো যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি করা যায়, সে জন্য ইতোমধ্যেই প্রয়োজনীয় আলোচনা শুরু হয়েছে।’

এ বিষয়ে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমান সমাজে বিভিন্ন ক্ষেত্রে মিডিয়া বা গণমাধ্যমের এক ধরনের প্রভাব লক্ষ করা যাচ্ছে, যা শিশুহত্যার মতো ঘটনার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রেও এক ধরনের ভূমিকা রাখছে। মিডিয়া ক্ষেত্রবিশেষে কোনো কোনো ঘটনাকে বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে থাকে বা দিতেই পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের দায়িত্ব সব নাগরিককে সমানভাবে দেখা, সমান গুরুত্ব দিয়ে আইনি সুরক্ষা ও সেবা দেওয়া। কিন্তু বাস্তবতায় আমরা তেমনটা দেখতে পাই না। প্রতিটি ভুক্তভোগী পরিবারের কাছেই তাদের সন্তান ছিল অত্যন্ত প্রিয়। ফলে কোনো হত্যার বিচার কয়েক দিনেই হবে। আবার কোনো হত্যার বিচার বছরের পর বছর ঝুলে থাকবে–সেটা হলে নাগরিকের মধ্যে হতাশার সৃষ্টি হবে। এখান থেকে বেরিয়ে আসা জরুরি।’

এ প্রসঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) এ এইচ এম শাহাদাত হোসাইন খবরের কাগজকে বলেন, ‘শিশুহত্যা মামলার তদন্ত প্রক্রিয়ায় গাফিলতির কোনো সুযোগ নেই। এ ধরনের মামলায় পুলিশ অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে তদন্ত করে থাকে। তবে সব মামলায় সমানভাবে চার্জশিট জমা দেওয়ার ক্ষেত্রে সময় নির্ধারণ করা যায় না। অনেক সময় সাক্ষ্য, প্রমাণ, আলামতের রিপোর্টসহ নানা কারণে কিছুটা বিলম্ব হয়ে থাকে। তবে শিশুহত্যা মামলার মতো স্পর্শকাতর তদন্তগুলোর আইনি বাধ্যবাধকতা অনুসারে পুলিশ যথাযথভাবে দায়িত্ব পালন করে থাকে। এ জন্য ঊর্ধ্বতনরা নিয়মিত তদারকি করে থাকেন।’