প্রায় শেষ হয়ে এসেছে নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশনের কাজ। দেশে প্রথমবারের মতো গঠিত এই কমিশনের সুপারিশসহ প্রতিবেদন দাখিলের শেষ সময় আগামী ৩১ ডিসেম্বর।
প্রতিবেদনের সবশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে কমিশনপ্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার খবরের কাগজকে জানিয়েছেন, অংশীজন ও জনমতকে প্রাধান্য দিয়ে এরই মধ্যে তাদের প্রতিবেদন তৈরির কাজ প্রায় চূড়ান্ত। নির্ধারিত সময়েই সরকারের কাছে তা জমা দিতে সব ধরনের প্রস্তুতি কমিশনের রয়েছে। অদূর ভবিষ্যতে দেশের গণতান্ত্রিক যাত্রাপথকে মসৃণ করার দিকনির্দেশনামূলক নানা সুপারিশ থাকবে সেই প্রস্তাবনায়।
কমিশন সূত্রে জানা গেছে, কার্যকাল শুরুর পর থেকে বিগত ৮০ দিনে ওয়েবসাইটসহ ৫টি মাধ্যমে কমিশনের কাছে এ বিষয়ে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ মতামত ও কমেন্ট দিয়েছেন ১ হাজার ৮০৩টি। এসব মতামত বিচার-বিশ্লেষণ শেষে কমিশনের কাছে অগ্রাধিকার পাচ্ছে অন্তত ১২ থেকে ১৫টি বিষয়। সেগুলো হলো ইসির স্বাধীনতা ও দায়বদ্ধতা, নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, নির্বাচন পদ্ধতি, দ্বি-কক্ষবিশিষ্ট সংসদ, নারী আসন, ‘না’ ভোট, রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি, প্রবাসী ভোট, ইভিএম পদ্ধতি, সীমানা পুনর্নির্ধারণ, ভোটার তালিকা সংশোধন ও হালনাগাদ, প্রার্থীদের হলফনামা, নির্বাচনি ব্যয় প্রভৃতি। এ ছাড়া জাতীয় পরিচয়পত্র, মনোনয়ন-বাণিজ্য, নির্বাচন পর্যবেক্ষণব্যবস্থা, নির্বাচনি অভিযোগ ব্যবস্থাপনা, নির্বাচন কর্মকর্তাদের জবাবদিহি, দলগুলোর দায়িত্বশীল আচরণ, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিরপেক্ষ ভূমিকা, গণমাধ্যম ও সাংবাদিকদের ভূমিকাসহ নানা বিষয়ে মত ও পরামর্শ দিয়েছেন অংশীজনরা।
কার্যক্রম শুরুর প্রথম ধাপে ২২ অক্টোবর থেকে ১৫ নভেম্বর পর্যন্ত অনলাইন মাধ্যম ও সরাসরি নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের মতামত গ্রহণ করে এই সংস্কার কমিশন। এ ছাড়া অংশীজনদের সঙ্গে মতবিনিময়, জরিপ ও লিখিতভাবে মতামত নেয়। এরপর দেশের নিবন্ধিত ৪৮ দলের মধ্যে বিএনপি-জামায়াতসহ ২২টি রাজনৈতিক দলের কাছ থেকে লিখিত মতামত আহ্বান করে। তবে আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ বাকি ২৬টি দলের কাছে কোনো মতামত চাওয়া হয়নি।
মতামত যাচাই-বাছাইয়ের প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে কমিশন সদস্য মীর নাদিয়া নিভিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘এ পর্যন্ত কমিশনের ওয়েবসাইট, ফেসবুক পেজ, মেসেঞ্জার, ই-মেইল ও সরাসরি পত্রযোগে আমাদের কাছে ১ হাজার ৮০০-এর বেশি মতামত ও পরামর্শ দিয়েছেন বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ। তার মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৮১৬ জন মতামত দেন কমিশনের ওয়েবসাইটে। এ ছাড়া ফেসবুকে মন্তব্য এসেছে ৪৩০টি, ই-মেইলে ৪১৪টি, মেসেঞ্জারে ৭৮টি এবং সরাসরি পত্রযোগে ৬৫টি মতামত পেয়েছি।’
কমিশনের এই সদস্য আরও বলেন, ‘দেশীয় বিভিন্ন নির্বাচনের নানা দিক বিশ্লেষণ করেছি। ভিন দেশের ভালো নির্বাচনের সম্পর্কে জানার চেষ্টা করেছি। ওয়েবসাইটসহ সব মাধ্যমে আসা মতামত গুরুত্ব দিয়ে আমরা পর্যালোচনা করেছি। অংশীজনসহ সংশ্লিষ্টদের মত জানতে আমরা এ পর্যন্ত ২০-২৫টি অনুষ্ঠানিক বৈঠক করেছি। বিএনপি, জামায়াতসহ ২২টি রাজনৈতিক দল ও জোটের কাছ থেকে লিখিত প্রস্তাব নিয়েছি। গত ১৩ ডিসেম্বর থেকে বিভাগীয় পর্যায়ে অংশীজনদের মতামত নেওয়া হচ্ছে। এরই মধ্যে খুলনা, সিলেট ও রংপুরে বিভাগীয় সভা হয়েছে। এরপর সম্ভব হলে পর্যায়ক্রমে চট্টগ্রাম, রাজশাহীসহ অন্যান্য বিভাগেও সভা করার পরিকল্পনা কমিশনের রয়েছে।’
মতামত বাছাইয়ের সময় কোন বিষয়গুলো প্রাধান্য পেয়েছে- এমন প্রশ্নের জবাবে কমিশনপ্রধান ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, ‘সমালোচিত বিগত তিন সংসদ নির্বাচনসহ সব নির্বাচনের প্রতিবন্ধকতাগুলো আমরা জানার চেষ্টা করেছি। নির্বাচনসংশ্লিষ্ট আইন-বিধিগুলো পর্যালোচনা করেছি। সুষ্ঠু ও স্বচ্ছ নির্বাচন অনুষ্ঠানে যত ধরনের প্রতিবন্ধকতা রয়েছে সেগুলো দূর করে গণতন্ত্রকে সুসংহত করা দরকার। এ ক্ষেত্রে প্রতিবেদন তৈরিতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুকে আমরা অগ্রাধিকারে রেখেছি। যেগুলো নির্বাচনের আগে সংস্কার করা অতীব জরুরি।
সংকট সমাধানের স্বল্প ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের পথ খুঁজেছি। এ ক্ষেত্রে শুধু আগামী জাতীয় নির্বাচনই নয়, স্থানীয় সরকার নির্বাচনের প্রতিবন্ধতাগুলো দূর করার উপায় খুঁজেছি। তবে ইভিএম পদ্ধতির ব্যাপারে বেশির ভাগের মত ছিল নেতিবাচক। কমিশনের প্রস্তাবনায়ও থাকবে না ইভিএম ফিরিয়ে আনার পক্ষে কোনো প্রস্তাব। অতীতে নির্বাচনকেন্দ্রিক যত ধরনের অন্যায়-অপকর্ম হয়েছে, সেগুলো যাতে ভবিষ্যতে বন্ধ হয়, নির্বাচনব্যবস্থা যাতে গণতান্ত্রিক, শক্তিশালী ও কার্যকর হয়, সেই ধরনের প্রস্তাব আমরা সরকারকে দিতে চাই।’
ড. বদিউল আলম বলেন, ‘সংস্কার ইস্যুতে রাজনৈতিক অংশীজন ও দেশবাসীর কাছ থেকে পাওয়া সব ধরনের মতামত সমন্বয় ও নিজেদের পর্যালোচনার মাধ্যমে আমরা যথাযথ সুপারিশমালা তৈরি করছি। কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। তার মধ্যে আইনকানুনসহ যেসব জায়গায় পরিবর্তনের সুপারিশ থাকবে চূড়ান্ত রিপোর্টে সেগুলো হাইলাইট করে সংযোজন করে দেওয়া হবে। তবে দেশের নির্বাচনব্যবস্থায় বিদ্যমান দীর্ঘ ১৫-১৬ বছরের নানা অসংগতি মাত্র ৯০ দিনের মধ্যে বের করে আনতে তার টিমের সদস্যদের প্রচণ্ড বেগ পেতে হচ্ছে। এমনকি অংশীজনসহ সংশ্লিষ্ট অনেকের মতামত সরাসরি নেওয়া সম্ভব হয়নি। তারপরও আমি এবং আমার টিমের সদস্যরা তাদের সর্বোচ্চ সময় ও আন্তরিকতা দিয়ে এই কাজ গুছিয়ে এনেছি।’
কাজ শেষ করতে সরকারের কাছে বাড়তি সময় কি চাইবেন? জবাবে তিনি বলেন, ‘সময় বাড়ানোর দরকার হবে না। আগামী ৩১ ডিসেম্বর প্রতিবেদন জমা দিতে চাইছি। সেই লক্ষ্যে সার্বিক প্রস্তুতি চলছে।’
গত ৩ অক্টোবর এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ড. বদিউল আলম মজুমদারকে প্রধান করে আট সদস্যবিশিষ্ট নির্বাচনব্যবস্থা সংস্কার কমিশন গঠন করে অন্তর্বর্তী সরকার। সরকারি প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, এই কমিশনকে পরবর্তী ৯০ দিন, অর্থাৎ আগামী ৩১ ডিসেম্বরের মধ্যে এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় সুপারিশসহ তাদের প্রতিবেদন সরকারের কাছে হস্তান্তর করতে হবে।