সাংবাদিক দম্পতি সাগর সরওয়ার ও মেহেরুন রুনী হত্যাকাণ্ডের তদন্তকালে বিদেশি ল্যাবে অজ্ঞাত দুজন পুরুষের ডিএনএ (ডিঅক্সিরাইবো নিউক্লিক এসিড) শনাক্ত হয়েছিল পাঁচ বছর আগে। এরপর সেই ডিএনএ অনুসারে উন্নত প্রযুক্তির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ল্যাবে ‘অবয়ব’ বা স্কেচ তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়। এর জন্য যুক্তরাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠানকে বেশকিছু ডলার পরিশোধ করা হয়েছে। যাতে করে ডিএনএ অনুসারে ব্যক্তিকে আবিষ্কার করা যায়। কিন্তু এখন পর্যন্ত ওই দুই ব্যক্তির ডিএনএ থেকে কোনো অবয়ব বা স্কেচ তৈরি হয়নি। আদৌ কবে হবে সেটাও জানেন না তদন্তসংশ্লিষ্টরা।
তারা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটন ও জড়িতদের আইনের আওতায় আনতে গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত কার্যক্রম চলছে। এ মামলায় আটক হওয়া আট আসামিসহ সন্দেহভাজন ২৫ জনের ‘বুকাল সোয়াব’ (গালের ভেতরের কোষ থেকে সংগ্রহ করা ডিএনএ) আলামত ডিএনএ পরীক্ষার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ইন্ডিপেন্ডেন্ট ফরেনসিক সার্ভিস (আইএফএস) পরীক্ষাগারে পাঠানো হয়। তবে তদন্ত সংস্থা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) এবং চার সদস্যবিশিষ্ট টাস্কফোর্স এখনো নিশ্চিত নয়, কবে নাগাদ ডিএনএ থেকে ওই অবয়ব তৈরি হবে। যদিও এই কাজের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বৈজ্ঞানিক দুটি প্রতিষ্ঠানের চার্জ (কাজের মূল্য) পরিশোধ করেছিল মামলার তৎকালীন তদন্ত সংস্থা র্যাব।
বর্তমানে মামলাটি তদন্ত করছে পিবিআই। ডিএনএ নমুনা থেকে অবয়ব তৈরি প্রসঙ্গে পিবিআই প্রধান অতিরিক্ত আইজিপি মোস্তফা কামাল গতকাল খবরের কাগজকে বলেন, ‘এখনো কোনো অগ্রগতি নেই। অবয়ব তৈরির টেকনোলজি নেই। তবে এখনো এ বিষয়ে চেষ্টা চলছে।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, ঘটনাস্থল থেকে সংগৃহীত আলামত ২০১৯ সালের সেপ্টেম্বরে ঢাকা মেডিকেল কলেজ, সিআইডি ফরেনসিক ল্যাব ও ওয়েবসাইট পর্যালোচনা করে যুক্তরাষ্ট্রের আইএফএসে এবং নেদারল্যান্ডকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানে সর্বাধুনিক পরীক্ষার জন্য পাঠানো হয়। ওই পরীক্ষায় দুজন ভুক্তভোগী (সাগর ও রুনী) এবং দুজন অজ্ঞাতনামা পুরুষের ‘ডিএনএ’ পাওয়া যায়।
এ বিষয়ে পিবিআই ও র্যাবের পদস্থ একাধিক কর্মকর্তা বলছেন, পরীক্ষাগারে অজ্ঞাতনামা দুজন পুরুষের ডিএনএ শনাক্তকরণ এবং ডিএনএ থেকে ব্যক্তির ছবি অথবা অবয়ব প্রস্তুতের জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ‘পারাবন স্ন্যাপশট ডিএনএ ফ্যান্টম সার্ভিসে পাঠানো হয়। প্রতিষ্ঠানটি সিঙ্গেল সোর্স স্যাম্পলের জন্য ১৫০০ ইউএস ডলার, কন্ট্রিবিউটর টু জেনোটাইপের জন্য ১১০০ ইউএস ডলার এবং ট্রেইট প্রেডিকশন ও কম্পোজিটরের জন্য ২১০০ ইউএস ডলার দাবি করে। এতে তৎকালীন তদন্ত সংস্থা র্যাব কর্তৃপক্ষ তাদের সঙ্গে একমত পোষণ করে এবং কাজের ভিত্তিতে ডলার পরিশোধে রাজি হয়।’
এদিকে ২০১৯ সালের ২১ নভেম্বর প্রথম ডিএনএ পরীক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান আইএফএস সার্ভিস চার্জ হিসেবে ১২০০ ডলার দাবি করলে যথাযথ প্রক্রিয়ায় ট্রাস্ট ব্যাংকের মাধ্যমে তা পরিশোধ করে র্যাব কর্তৃপক্ষ। কিন্তু আইএফএসর দেওয়া ডিএনএ মাত্র ১০ শতাংশ মিশ্রণের অবশিষ্ট হওয়ায় পারাবন স্ন্যাপশর্ট তাদের প্রযুক্তিতে ৫০ শতাংশ মিশ্রণ অবশিষ্ট বাধ্যবাধকতা থাকায় কাঙ্ক্ষিত পরীক্ষা করা সম্ভব হয়নি।
পিবিআইর তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, অতীতে এই মামলার তদন্ত পুলিশের তিনটি ইউনিট করেছিল। পরে আদালতের নির্দেশে হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদ্ঘাটনে মামলার তদন্তে একটি টাস্কফোর্স গঠন করে দেওয়া হয়। গত ২০২৪ সালের ৪ নভেম্বর এই মামলার ডকেট হাতে পায় পিবিআই। এরপর থেকে তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে। এই মামলার তদন্তের স্বার্থে ৬২ জন সাক্ষীকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে। এ ছাড়াও ঘটনা জানে বা সন্দেহ পোষণ করছে এমন ব্যক্তি বা সাগর-রুনীর কর্মস্থলে আছেন, তাদেরও জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।
প্রসঙ্গত, ২০১২ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি রাজধানীর পশ্চিম রাজাবাজারের বাসায় নৃশংসভাবে খুন হন সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনী। কিন্তু ঘটনার ১৩ বছরেও এমন হত্যাকাণ্ডের প্রকৃত আসামি শনাক্ত হয়নি। এমনকি সাগর-রুনী হত্যা মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও তা এখন পর্যন্ত ১১৫ বার পেছানো হয়।