জীবনযাত্রার ব্যয় কমছেই না। খাদ্য ও খাদ্যবহির্ভূত প্রায় সব খাতেই ব্যয় অনেক বেশি। বাড়ি ভাড়া, যাতায়াত, শিক্ষা, চিকিৎসাসহ বেশির ভাগ খরচ আগের মতোই। এর মধ্যে মানুষ সবচেয়ে বেশি চাপ অনুভব করছে খাবার খরচ নিয়ে। উচ্চ জনপ্রত্যাশা সত্ত্বেও রমজান মাসে সরকার পণ্যের দাম খুব সামান্যই কমাতে পেরেছে। মাছ, মাংস, দুধ, ভোজ্যতেলসহ প্রায় সবকিছুর দামই এখন অনেক বেশি।
আসছে বাজেটে জীবনযাত্রার ব্যয় কমানোর পরামর্শ দিয়ে বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, কম আয়ের মানুষের কষ্ট কমাতে সবচেয়ে গুরুত্ব দিতে হবে খাদ্যপণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নিত্যপণ্যের আমদানি ও উৎপাদন ব্যয় কমাতে হবে। জ্বালানি, শিক্ষা, চিকিৎসা ব্যয় কমাতে শুল্ক-কর-ভ্যাট মওকুফ সুবিধা বাড়াতে হবে। এসব খাতে বাজেটে বরাদ্দ বাড়াতে হবে। সামাজিক নিরাপত্তার আওতা বাড়িয়ে কম আয়ের মানুষের মধ্যে সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। শহরের পাশাপাশি গ্রামের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সাধারণ মানুষের করমুক্ত সীমা বাড়ানো ও ন্যূনতম করের পরিমাণ কমানোর কথাও বলেছেন তারা। কর্মসংস্থানের আওতা বাড়াতে হবে।
গবেষণা প্রতিষ্ঠান সানেমের নির্বাহী পরিচালক ড. সেলিম রায়হান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ধনী প্রভাবশালীরা অতীতে বাজেট প্রণয়নের আগেই সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ করে নিজেদের সুবিধামতো ইস্যু বাজেটে অন্তর্ভুক্ত করেছে। বাজেট হয়ে উঠেছিল ধনীদের সুবিধা দেওয়ার একটি প্রক্রিয়া। সাধারণ মানুষের চাওয়া-পাওয়ার প্রতিফলন আগের বাজেটগুলোতে নেই বললেই চলে। এবার ছাত্র-জনতার আন্দোলনের মধ্য দিয়ে অন্তর্বর্তী সরকার এসেছে। অতীতের মতো এবার উচ্চাভিলাষী বাজেট দেখতে চাই না। বর্তমান সরকার জনমানুষের সরকার। এটা ধরে নিয়েই বলছি, আসছে বাজেটে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে সবচেয়ে গুরুত্ব দিয়ে পদক্ষপ নিতে হবে।’
সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘জীবনযাত্রার ব্যয় নতুন সরকার কমাবে- এমন আশা অনেকের। সরকার দাম কমাতে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। তা কতটা কার্যকর খতিয়ে দেখতে হবে। অন্যদিকে সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পাঁচ মাস পরই ভ্যাট ও সম্পূরক শুল্ক বাড়িয়ে অনেক কিছুর খরচ বাড়িয়েছে। এতে সাধারণ মানুষের ওপর চাপ বেড়েছে। এখন সরকারের উচিত, আগামী অর্থবছরের বাজেটে বছর তিনেক থেকে বেড়ে চলা খরচের লাগাম টানা।’
বাংলাদেশ ট্রেড অ্যান্ড ট্যারিফ কমিশনের (বিটিটিসি) প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সার ও জ্বালানি তেলের দাম কমলে স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত কৃষিপণ্য উৎপাদন ও অন্য পণ্য সরবরাহে ব্যয় কমার সম্ভাবনা রয়েছে। আমদানি ব্যয় নির্বাহে ব্যবহৃত বৈদেশিক মুদ্রার মান ধরে রাখা প্রয়োজন এবং রাজস্ব ও মুদ্রানীতি ঠিক রাখা আবশ্যক। এ বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।
ট্যারিফ কমিশনের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে একই সময়ে চালের দাম ২৪ দশমিক ১৯ শতাংশ কমলেও গত এক বছরে দেশের বাজারে চালের দাম ৭ দশমিক ১৪ শতাংশ হারে বেড়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর চাল আমদানিতে বিভিন্ন শুল্ক-কর প্রত্যাহার করলেও ৩ শতাংশ অগ্রিম আয়কর (এআইটি) বহাল রয়েছে। বর্তমানে ছোলা, ডালে কোনো শুল্ক-কর ছাড় নেই। গত এক বছরে ছোলার দর দেশের বাজারে ৩৫ দশমিক ১৪ শতাংশ বেড়েছে।
গত ৯ জানুয়ারি প্রজ্ঞাপন জারি করে প্রায় শত পণ্যের সম্পূরক শুল্ক ও ভ্যাট বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি খরচও বাড়ানো হয়েছে। জ্বালানি খরচের কারণে পরিবহন ব্যয় বেড়েছে। ওষুধের দাম কমেনি। শুধু তা-ই না, চিকিৎসা খাতের খরচও এখন অনেক বেশি। শিক্ষা উপকরণের দাম কমেনি। বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বেতন বেড়েই চলেছে।
এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান ড. আবদুল মজিদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘জাতীয় বাজেটের মোট খরচের ৫৫ থেকে ৬০ শতাংশই আসে অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে। সরকার শুল্ক-কর-ভ্যাট আরোপ করে এই অর্থ আয় করে থাকে। এই আয় দিয়ে সরকার খরচ চালায়। শুল্ক-কর-ভ্যাট আরোপ করা হলে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে। জীবনযাত্রার ব্যয় কমাতে পদক্ষেপ নিতে হলে শুল্ক-ভ্যাট-কর কমাতে হবে। এতে সরকারের আয় কমে যাবে। আয় কমে গেলে সরকার খরচ চালাবে কীভাবে? আগামী বাজেটে সরকারকে প্রচলিত ধারার বাইরে গিয়ে শুল্ক-কর-ভ্যাট আরোপ না করেই আয় বাড়াতে হবে। আগামী বাজেটে সরকারকে এ চ্যালেঞ্জ নেওয়ার পরামর্শ দেব।’
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, সাধারণ মানের দুই রুমের পাকা ভবনের বাসার ভাড়া রাজধানীতে গড়ে ৮ থেকে ১০ হাজার টাকা বা তার বেশি। ভালো পরিবেশে তিন রুমের পাকা ভবনের বাসার ভাড়া গড়ে ২৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা। চার সদস্যের সাধারণ পরিবারের খাবার খরচ গড়ে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা বা তার বেশি। এ পরিবারের শিক্ষা, চিকিৎসা, যাতায়াত, জ্বালানিসহ অন্যান্য খরচে চলে যায় ২৫ থেকে ৩৫ হাজার টাকা।
বেসরকারি চাকরিজীবী আহসান আল মাহমুদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাসে ৪০ হাজার টাকা আয় করে চার সদস্যের পরিবার নিয়ে পুষ্টিকর খাবার খেয়ে উন্নত জীবনযাপন করা কখনো সম্ভব না। সরকারের কাছে আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জন্য তিন বেলা পুষ্টিকর খাবার জোগাড় করে উন্নত জীবনযাপনের সুযোগ দেওয়ার দাবি করছি।’
জীবনযাত্রার ব্যয় চালাতে হিমশিম খাওয়া সাধারণ মানুষের ওপর রয়েছে কর পরিশোধের চাপ। বর্তমানে করমুক্ত আয়সীমা ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা। অর্থাৎ এক করবর্ষে একজন ব্যক্তির আয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার বেশি হলেই তাকে কর পরিশোধ করতে হবে। হিসাব কষে দেখা যায়, এক মাসে নিট আয় ২৯ হাজার ১৬৭ টাকার বেশি হলেই কর দিতে হবে। বছর বছর বাজেটের আকার বাড়লেও বাড়ানো হয়নি করমুক্ত আয়সীমা।
এনবিআরের সাবেক সদস্য ফরিদ উদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘সাধারণ করদাতাদের করমুক্ত সীমা বাড়ানো হলে সরকারের আয় গড়ে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা কমবে। অথচ বড় মাপের একজন কর ফাঁকিবাজের কাছে সরকারের হাজার কোটি টাকাও পাওনা থাকে। তাই সাধারণ মানুষকে ছেড়ে বড় মাপের করদাতাদের কাছ থেকে পাওনা আদায় করতে হবে। আগামী বাজেটে সে পথেই সরকারকে হাঁটতে হবে।’