থেমে থেমে বৃষ্টি, ভ্যাপসা গরম- এডিস মশা বিস্তারে সহায়ক পরিবেশ। এখনই যদি কার্যকরী পদক্ষেপ নেওয়া না যায়, বিগত বছরের চেয়েও ডেঙ্গু পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিতে পারে বলে আশঙ্কা বিশেষজ্ঞদের। তারা ধারণা করছেন, এবার পিক সিজন হতে পারে আগস্ট বা সেপ্টেম্বর মাসে। এদিকে ডেঙ্গু রোগীদের চিকিৎসার জন্য এবার গাইডলাইন আপডেট করছে সরকার। শিগগিরই তা চূড়ান্ত হলে সেই অনুযায়ী চিকিৎসা পাবেন রোগীরা।
একসময় ডেঙ্গু সিজনাল হলেও এখন বছরের প্রতি মাসেই মানুষ ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হচ্ছেন। তাদের অনেকেই মারা যাচ্ছেন। ২০২৩ ও ২০২৪ সালের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, ২০২৪ সালে প্রতি মাসেই ডেঙ্গুতে মৃত্যু হয়েছে। ২০২৩ সালের শুধু মার্চ মাসে মৃত্যু হয়নি।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ২০১৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০১৯ সালের তুলনায় ডেঙ্গুর ভয়াবহতা অনেকটাই বেড়েছে। ২০১৯ সালে ১ লাখ ১ হাজার ৩৭৪ জন আক্রান্তের মধ্যে ১৬৪ জনের মৃত্যু হয়। আর ২০২৪ সালে ১ লাখ ১ হাজার ২১৪ জন আক্রান্তের মধ্যে ৫৭৫ জনের মৃত্যু হয়। আক্রান্তের তুলনায় মৃত্যু বেড়েছে সাড়ে তিন গুণ।
২০১৯-এর পর ২০২০ সালে করোনার কারণে ডেঙ্গুর দিকে নজর ছিল না। ২০২১ সালে আক্রান্ত হন ২৮ হাজার ৪২৯ জন। মৃত্যু হয় ১০৫ জনের। ২০২২ সালে ৬২ হাজার ৩৮২ জন আক্রান্ত হন। মৃত্যু হয় ২৮১ জনের। ২০২৩ সালে ডেঙ্গু পরিস্থিত ভয়াবহ আকার ধারণ করে। এ বছরের মতো আগে কখনোই এত আক্রান্ত বা মৃত্যু হয়নি। এই বছর আক্রান্ত হন ৩ লাখ ২১ হাজার ১৭৯ জন। মৃত্যু হয় ১ হাজার ৭০৫ জনের। এরপর ২০২৪ সালে যদিও আক্রান্ত এবং মৃত্যু কমে আসে, কিন্তু মৃত্যুর দিক থেকে তা ২০১৯, ২০২১ ও ২০২২ এই তিন বছরের চেয়ে বেশি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক কবিরুল বাশার বলেন, ‘আমরা মাঠপর্যায়ে এডিস মশার ঘনত্ব নিয়ে সব সময় কাজ করি। দেখা যাচ্ছে, এডিস মশার ঘনত্ব গত বছরের তুলনায় এ বছর বেশি আছে। গত বছরের এই সময়ে ‘ব্রুটো ইনডেক্স’ পেতাম ১০-এর নিচে, এখন তা ১০-এর ওপরে পাচ্ছি। অন্যদিকে ডেঙ্গু রোগীও বেশি আছেন। আবার অল্প-বিস্তর বৃষ্টিপাতও হচ্ছে। এখনই যদি আমরা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে না নিতে পারি, তাহলে এ বছর ডেঙ্গু পরিস্থিতি গত বছরের তুলনায় খারাপ হওয়ার ঝুঁকি আছে। সে জন্য স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের নেতৃত্বে সারা দেশেই পৌরসভা ও সিটি করপোরেশনগুলোকে সক্রিয় করা, যাতে তারা এখন থেকে এডিস মশা নিধন কার্যক্রম শুরু করে।’ আগস্ট অথবা সেপ্টেম্বরে এবার পিক সিজন হতে পারে বলে ধারণা এই বিশেষজ্ঞের।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ২০২৪ সালের এপ্রিলে ৫০৪ জন আক্রান্ত হন। মৃত্যু হয় দুজনের। আর চলতি বছরের এপ্রিলে ৭০১ জন আক্রান্ত হয়েছেন। মৃত্যু হয়েছে সাতজনের। গত বছরের তুলনায় এ বছরের এপ্রিলে ডেঙ্গুতে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার বেশি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘ডেঙ্গু কমার কোনো লক্ষণ দেখছি না। জুলাই-আগস্টের দিকে রোগীর সংখ্যা বেড়ে যায়। এবারও পিক সিজন জুলাই বা আগস্টে হতে পারে। থেমে থেমে বৃষ্টি এবং ভ্যাপসা গরম-এটা এডিস মশার প্রজননের জন্য সহায়ক পরিবেশ। বৃষ্টির পানি জমে থাকার জন্য ময়লা, বিভিন্ন পাত্র, প্লাস্টিক-পলিথিনের ব্যবহার দায়ী। পানি জমে তাতেই এডিসের বিস্তার লাভ করে। পলিথিনের ব্যবহার কমানোর জন্য উপদেষ্টা মহোদয় অনেক পরিশ্রম করেছেন, কিন্তু কতটুকু করতে পারছেন তা দেখার বিষয়। এটা সফল হলেও কিন্তু ডেঙ্গুর প্রকোপ কমে যেত। প্লাস্টিক-পলিথিনের ব্যবহার কমালে এবং সারা দেশে যদি আন্দোলনের মতো ছাত্রদের সম্পৃক্ততায় পরিচ্ছন্নতা অভিযান করা যেত, তাহলে হয়তো একটা দৃশ্যমান পরিবর্তন আসত। সে ধরনের কিছু হচ্ছে না। এখন পর্যন্ত যে পরিসংখ্যান, তাতে গতবারের চেয়ে বেশি খারাপ হতে পারে।’
‘নগর এলাকায় জরিপে লার্ভা কিছুটা কম পাওয়া গেছে’ উল্লেখ করে তিনি বলেন, এটা তো ধরে রাখতে হবে। নগর কর্তৃপক্ষের অনেক বেশি সক্রিয় থাকতে হবে। সেভাবে যদি পরিচ্ছন্ন রাখা যায়, তাহলে সম্ভব। এবার জনপ্রতিনিধি নেই। কিন্তু দেশের জন্য কাজ করতে ইচ্ছুক তরুণ জনগোষ্ঠী আছে। তাদের কাজে লাগাতে হবে। এ ছাড়া জ্বর হলে যাতে বাসার কাছে পরীক্ষা করতে পারে, সে বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে।
ডেঙ্গু রোধে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সমন্বিত কার্যক্রমের অংশ হিসেবে প্রতি সপ্তাহে এলাকাভিত্তিক একটি করে প্রোগ্রাম করছে। একই সঙ্গে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা, মশার ওষুধ দেওয়া এবং সচেতন করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত তিনটি প্রোগ্রাম করেছে। প্রথমে সায়েদাবাদ, তারপর রবীন্দ্র সরোবরে, শনিবার করা হয়েছে শাহজাহানপুরে। আগামী সপ্তাহে করবে লালবাগে। এ ছাড়া বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে একটি ট্রেনিং পুল গঠন করা হয়েছে। তারা মাঠপর্যায়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন।
ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা (অতি. দা.) ডা. নিশাত পারভীন বলেন, ‘এ বছর আমরা একটু আগে থেকে কার্যক্রম শুরু করেছি। যেভাবে কাজ করছি তাতে আশা করছি গত বছরের তুলনায় এবার দক্ষিণ সিটিতে ডেঙ্গুর ভয়াবহতা কম হবে। আমরা পরিচ্ছন্নতার দিকে বেশি জোর দিচ্ছি। পরিচ্ছন্ন না থাকলে মশার ওষুধ দিয়েও কাজ হয় না। নিয়মিত কার্যক্রমের বাইরে গত মাস থেকে প্রতি জোনের স্কুলগুলোয় সচেতনতামূলক প্রোগ্রাম, আপশাশে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং প্রতিটি মসজিদে ডেঙ্গু সচেতনতার বার্তার লিফলেট দেওয়া হচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমাদের যা যা করার সবই করব, সেই সঙ্গে জনগণের সচেতনতা এবং সম্পৃক্ততা খুবই জরুরি। তারা যেন ঘর এবং আনাচে-কানাচে লক্ষ রাখেন, পরিষ্কার করেন।’
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের রোগ নিয়ন্ত্রণ শাখার (সিডিসি) লাইন ডিরেক্টর অধ্যাপক ডা. মো. হালিমুর রশিদ বলেন, ‘ডেঙ্গু রোগীর চিকিৎসার জন্য আমাদের আগের যে গাইডলাইনটি ছিল, সেটি আমরা এবার আপডেট করছি। সপ্তাহখানেকের মধ্যে সেটি চূড়ান্ত হয়ে গেলে ওয়েবসাইটে দিয়ে দেব। সেই অনুযায়ী এবার চিকিৎসা দেওয়া হবে।’