বছরজুড়ে মাঝারি আকারের গরুর চামড়া বিক্রি হয় ৫০০ টাকায়। এক পিস চামড়া প্রক্রিয়াকরণের পর ২০ বর্গফুটের মতো চামড়া পাওয়া যায়। তা দিয়ে দিয়ে অন্তত পাঁচ জোড়া জুতা তৈরি হয়। কিন্তু নামিদামি জুতা প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানগুলো এক জোড়া জুতা বিক্রি করছে ৩ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকায়। তাদের স্যান্ডেলও বিক্রি হচ্ছে দেড় হাজার থেকে ৪ হাজার টাকায়। ভোক্তাদের অভিযোগ, ঈদুল আজহার সময় চামড়ার দাম পাওয়া যায় না। সে সময় মনে হয় চামড়া যেন একটি নিম্নমানের পণ্য। তবে সেই চামড়ার একটি জুতা বা স্যান্ডেলই কিনতে হচ্ছে অস্বাভাবিক উচ্চমূল্যে।
ঈদুল আজহা এলেই চামড়ার দাম নিয়ে দেশে হইচই পড়ে। সরকার কাঁচা চামড়ার দাম বেঁধে দিলেও বাজারে তা মেলে না। সরকার পরিবর্তনের পর এবারও বাণিজ্য মন্ত্রণালয় গত ২৬ মে পশুর চামড়ার দর নির্ধারণ করে দেয়। ঢাকায় গরুর প্রতি বর্গফুট লবণযুক্ত চামড়ার দাম নির্ধারণ করা হয় ৬০-৬৫ টাকা, যা গত বছর ছিল ৫৫-৬০ টাকা। চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, কোরবানিদাতাদের কাছ থেকে ৩০০ থেকে সর্বোচ্চ ৭০০ টাকায় গরুর চামড়া কেনা হয়েছে, মাঝারি আকারের গরুর চামড়া কেনা হয়েছে ৫০০ টাকায়।
রাজধানীর হাজারীবাগ থেকে ট্যানারিশিল্প সরিয়ে সাভার নেওয়ার প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। বহু কারখানাই এখন আর সেখানে নেই। তবে বেশ কয়েকটি বড় কারখানা এখনো রয়ে গেছে। নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে এখনো হাজারীবাগে প্রকাশ্যেই ঈদের সময় সংগৃহীত চামড়া বিক্রি হয়। এ ব্যাপারে এসবি শাহী ট্যানারির পরিচালক মো. কামাল পাশা খবরের কাগজকে বলেন, ‘নানা কারণে ঈদের সময় দেশের সব চামড়া সাভারে যায় না, বিক্রি হয় যত্রতত্র। শিল্প মন্ত্রণালয়ের কারণেই চামড়াশিল্পের দুরবস্থা। এবারও ঈদে কাঁচা চামড়ার দাম অত বাড়েনি। গড়ে ৫০০ টাকায় কাঁচা চামড়া কেনা হয়েছে। তবে লবণযুক্ত চামড়া একটু বেশি দরে বিক্রি হয়।’
৫০০ টাকার চামড়া প্রক্রিয়াকরণে খরচ ২৬৫০ টাকা
চামড়া ব্যবসায়ীরা জানান, ৫০০ টাকার একটি গরুর চামড়ায় লবণ লাগে ১০ থেকে ১১ কেজির মতো। প্রতি কেজির দাম ১৩ টাকা ধরলে ১৪০ টাকার লবণ লাগে। প্রতি পিস কাঁচা চামড়ায় লবণ লাগাতে শ্রমিককে মজুরি দিতে হয় ৫০ থেকে ৮০ টাকা। তা ট্যানারিতে রাখার জন্য ভাড়া দিতে হয় ৩০ টাকা এবং ট্রাকে লোড-আনলোড করতে শ্রমিককে দিতে হয় ২০ টাকা। এভাবে এক পিস চামড়া কেনা থেকে শুরু করে ট্যানারি পর্যন্ত পৌঁছাতে খরচ হয় ৭৭০ টাকা। সেই চামড়া ওয়েট ব্লু করতেও রয়েছে খরচ। পশুর শরীর থেকে প্রথমে চামড়া ও পরে পশম ছাড়িয়ে প্রক্রিয়াজাত করার পর যে চামড়া পাওয়া যায়, তাকেই ওয়েট ব্লু চামড়া বলা হয়। এ পর্যায়ে আসতে কেমিক্যালের জন্য প্রতি বর্গফুটে খরচ হয় ২০ টাকা। ২০ বর্গফুটের চামড়ায় খরচ হয় ৪০০ টাকা। ট্যানারি কারিগরদের প্রতি পিসে মজুরি দিতে হয় ৩০ টাকা এবং এ পর্যায়ে ট্যানারি ভাড়া লাগে ১৫০ টাকা। চামড়া পুরোপুরি পাকা হতে আরও কিছু পথ পাড়ি দিতে হয়। এরপর রয়েছে ড্রাইকাস্ট লেদার করার পালা। এ পর্যায়ে প্রতি বর্গফুটে আরও ৪০ টাকার কেমিক্যাল লাগে। সে হিসাবে ২০ বর্গফুটে খরচ ৮০০ টাকা। অন্য আরও খরচ হয় প্রতি বর্গফুটে ১০ টাকা। সে হিসাবে ২০ বর্গফুটের জন্য খরচ ২০০ টাকা। ড্রাই চামড়াকে চূড়ান্ত পর্যায়ে প্রক্রিয়াকরণে আনতে প্রতি বর্গফুটে আরও ১৫ টাকা করে খরচ হয়। অর্থাৎ পুরো চামড়াটির পেছনে এ পর্যায়ে ব্যয় হয় ৩০০ টাকা। এভাবে এক পিস চামড়া সংগ্রহ করার পর ট্যানারিতে ফিনিশ্ড প্রোডাক্ট বা চূড়ান্ত পর্যায় পর্যন্ত আসতে খরচ হয় ২ হাজার ৬৫০ টাকা। এভাবে সব ধাপ শেষ করতে প্রতি বর্গফুট চামড়া চূড়ান্ত পর্যায়ে আসতে খরচ পড়ে ১৩২ টাকা।
চামড়ার আকার বড় বা দাম বেশি হলে প্রতি বর্গফুটে খরচ সর্বোচ্চ ১৪৭ টাকা হতে পারে। ক্যাটাগরি হিসেবে ধরলে এবিসিডি হচ্ছে সবচেয়ে ভালো কোয়ালিটির চামড়া। ইএফজিএইচ হচ্ছে অপেক্ষাকৃত কম ভালো এবং জিএইচ হচ্ছে তৃতীয় ক্যাটাগরির চামড়া। মো. কামাল পাশাসহ অন্য চামড়া রপ্তানিকারকরা জানান, বে, বাটা, এপেক্সসহ অনেকেই ভালো কোয়ালিটি নিশ্চিত করে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা বর্গফুট রেটে চামড়া কেনে। তারা জুতায় ভালো মানের সোলও দিয়ে থাকে। সেই চামড়ার জুতা সর্বোচ্চ ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। নামিদামি কোম্পানির ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ বাজারের প্রতিযোগিতার জন্য ভালো ডিজাইনার, দক্ষ কারিগরও রাখেন। পণ্যের মূল্য নির্ধারণের সময় ভাড়া ও সেলসম্যানের বেতনও ধরা হয়। এ জন্য সেই কোম্পানিগুলো প্রোডাক্টের দাম বেশি রাখে। কিন্তু রাজধানীর হাজারীবাগের ট্যানারি মোড়েও অরিজিনাল চামড়া দিয়ে জুতা-স্যান্ডেল তৈরি হচ্ছে। তাদের কোয়ালিটিও খারাপ না। অথচ সেগুলোর দাম অনেক কম।
এক প্রশ্নের উত্তরে কামাল পাশা আরও বলেন, কেমিক্যালের দাম কমলে, ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্পের কারখানা চালু হলে, ফুটওয়্যার কারখানার কারিগরদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করলে চামড়া পাকাকরণের খরচ অনেক কমে যাবে। তখন জুতা, স্যান্ডেল, ব্যাগ, মানিব্যাগও ভোক্তারা কম দরে পাবেন।
ট্যানারি মোড়ে গেলে তার বক্তব্যের সঙ্গে এক মত প্রকাশ করে উদ্যোক্তারা বলেন, ভালো মানের মোটা চামড়া বেচাকেনা হচ্ছে ১০০ থেকে ২০০ টাকা বর্গফুট। এসব চামড়া দিয়ে ভালো কোয়ালিটির জুতা, স্যান্ডেল তৈরি করা হয়। এ জন্য দাম বেশি। তবে লাইনিং বা পাতলা চামড়ার দাম অপেক্ষাকৃত একটু কম। এসব চামড়া ৫০ থেকে ১৫০ টাকায় বেচাকেনা হয়, যা দিয়ে জুতা, ব্যাগ, বেল্ট, গাড়ির সিট, সোফা তৈরি করা হয়।
হাজারীবাগে ২-৩ হাজার টাকায় ভালো মানের জুতা
ট্যানারি মোড়ের এসবি লেদারের স্বত্বাধিকারী মো. সানি খবরের কাগজকে বলেন, ‘নামিদামি কোম্পানির মতো আমরাও জুতা তৈরি করি। তা ২ হাজার থেকে সর্বোচ্চ ৩ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। স্যান্ডেলও দেড় থেকে ২ হাজার টাকায় বিক্রি হচ্ছে। সাধারণ জুতা, স্যান্ডেল ১ হাজার ৭০০ টাকায় বিক্রি হয়।’ অন্য উদ্যোক্তারাও বলেন, কম দামে জুতা, স্যান্ডেল, বেল্ট বিক্রি করা হচ্ছে। সরকার কিছু ব্যাপারে উদ্যোগ নিলে আরও কম দামে এসব পণ্য বিক্রি করা যাবে।
প্রিমিয়ার লেদারের স্বত্বাধিকারী শুভ আলী তার শোরুমের বিভিন্ন জুতা-স্যান্ডেল দেখিয়ে খবরের কাগজকে জানান, অরিজিনাল লেদারের তৈরি লোফার বিক্রি করেন সর্বনিম্ন ১ হাজার টাকায়। অন্য জুতা বিক্রি করেন ১ হাজার ২০০ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে। এক জোড়া জুতা তৈরিতে ৪ বর্গফুট চামড়া ছাড়াও ১০ থেকে ১২ ধরনের উপকরণ প্রয়োজন হয়, যেগুলো বিদেশ থেকে আমদানি করা। যেমন- জুতার সোল, লাইনিং বা আস্তরণ, রাবার শিট, সুতা, পেস্টিং, আঠা, বকলেস ইত্যাদি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় দোকান ভাড়া, কারিগরদের মজুরি, কারখানার খরচ, বিক্রয়কর্মীদের বেতন ও পরিবহন ব্যয়। এসব খরচ বাদ দেওয়ার পরও এক জোড়া জুতা ১ হাজার ২০০ থেকে সর্বোচ্চ ২ হাজার ৫০০ টাকার মধ্যে বিক্রি করতে পারলে ৩০০ টাকা লাভ হয়।’
তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের এখানে যে মানের জুতা ২ হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি করা হয়, সেই একই মানের জুতা নামিদামি শোরুমগুলোতে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। কারণ তাদের ব্র্যান্ড ভ্যালু রয়েছে। যদিও জুতার মান একই।’ লেদারের তৈরি একটি বেল্ট ৩৫০ থেকে ৮০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। একই বেল্ট অন্য শোরুমে এক হাজার থেকে এক হাজার ৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। অল্প সময়ের মধ্যে হাজারীবাগে দেড় শর মতো চামড়াজাত পণ্যের দোকান গড়ে উঠেছে।’
জুতার দাম ১২ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা
রাজধানীর এলিফ্যান্ট রোডের বে কোম্পানির একটি শোরুমে দেখা যায়, তারা সর্বনিম্ন ২ হাজার ২৯০ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ১০ হাজার ৯৯০ টাকায় জুতা এবং ৩ হাজার ২৯০ টাকায় স্যান্ডেল বিক্রি করছেন। কেডসও বিক্রি হচ্ছে ৪ হাজার ৪৯০ টাকায়। নামিদামি কোম্পানির বিভিন্ন শোরুমেও দেখা যায়, ২ হাজার ২৯৯ টাকা থেকে শুরু করে ২০ হাজার টাকায় জুতা বিক্রি হচ্ছে। বেল্ট বিক্রি হচ্ছে ৯৯৯ টাকা থেকে শুরু করে ১ হাজার ৪৯৯ টাকায়। শোরুমের বিক্রয়কর্মীরা বলেন, ‘এসব জুতা সব অরিজিনাল লেদারের তৈরি। আমাদের সর্বনিম্ন ২ হাজার ৪৯৯ টাকা থেকে শুরু করে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত লেদারের জুতা আছে।’ দাম এত বেশি কেন? এমন প্রশ্নের উত্তরে মোহাম্মদপুর-রিং রোড শোরুমের বিক্রয়কর্মী মো. মোরশালীন বলেন, ‘আমাদের এখানে সব জুতাই বাংলাদেশে তৈরি। চামড়া ও সোল ভালো কোয়ালিটির। এ জন্য দাম বেশি। চাহিদা আছে, বিক্রিও হচ্ছে। কম দামেরও জুতা-স্যান্ডেল রয়েছে। সেগুলো কিনতে পারেন।’ এ সময় জয়িতা নামে এক ক্রেতা বলেন, ‘চামড়ার দাম নেই। অথচ জুতার এত দাম। এগুলো কে কেনে। আমরা আসলে ঠকছি।’
এ ব্যাপারে জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ আলীম আখতার খান খবরের কাগজকে, ‘কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের (এমআরপি) চেয়ে বেশি দাম নিলে আমরা আইন অনুযায়ী তাদের শাস্তির আওতায় আনি। এপেক্স, বাটা, বে বা যে কোনো কোম্পানি তাদের পণ্যে যে দাম নির্ধারণ করে এটা তাদের নিজস্ব ব্যাপার। মুক্ত বাজার অর্থনীতিতে তারা এটা করছে। শিল্পনীতিতে দাম নির্ধারণে হয়ত কোনো কিছু বলা নেই। তাই যে কোনো কোম্পানি পণ্যের উৎপাদন খরচের সঙ্গে লাভ যোগ করে এমআরপি নির্ধারণ করে। কেউ সেটা বেশি দাম মনে করলে তা কিনবেন না। ’