সরকার রোহিঙ্গা শরণার্থীদের হাতে মোবাইল ফোনের সিম (SIM) দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তাদের কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ এবং সময়ের প্রয়োজনকে বিবেচনায় নিয়ে সরকারের পক্ষ থেকে এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। শিবিরে অবস্থানকারী রোহিঙ্গাদের হাতে এখন পাঁচ লাখ অবৈধ সিম রয়েছে।
রাখাইনে মায়ানমারের জান্তা সরকারের গণহত্যা ও নির্যাতন থেকে বাঁচতে পালিয়ে গত ৯ বছরে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছে প্রায় ১৩ লাখ রোহিঙ্গা। এসব রোহিঙ্গার প্রায় সবার কাছে রয়েছে বাংলাদেশের বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের একাধিক অবৈধ সিম। সাধারণত জাতীয় পরিচয়পত্র ছাড়া কাউকে মোবাইল সিম দেওয়ার নিয়ম নেই। কিন্তু লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশের মোবাইল সিম কীভাবে ব্যবহার করেন? এসব সিম অবৈধ হওয়ায় রোহিঙ্গাদের বিষয়ে তেমন তথ্য-উপাত্তও পাচ্ছে না সরকার। তাই তাদের হাতে বিটিসিএলের বৈধ সিম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
আগামী ২৫ আগস্ট প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস রোহিঙ্গাবিষয়ক একটি অনুষ্ঠানে যোগ দিতে কক্সবাজারে যাবেন। তার আগেই ১০ হাজার রোহিঙ্গাকে বিটিসিএলের মোবাইল সিম দেওয়া হবে। পর্যায়ক্রমে আগ্রহী সব রোহিঙ্গাকেই বাংলাদেশি সিম দেবে সরকার।
সংশ্লিষ্ট সূত্র খবরের কাগজকে জানায়, রোহিঙ্গা ক্যাম্পের মধ্যে লক্ষাধিক অবৈধ মোবাইল সিম ব্যবহৃত হয়। যেহেতু এটি রোধ করা সম্ভব নয়, তাই তাদের বৈধ উপায়ে বিটিসিএলের সিম দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। যেহেতু রোহিঙ্গাদের জাতীয় পরিচয়পত্র নেই, সে ক্ষেত্রে জাতিসংঘ শরণার্থীবিষয়ক হাইকমিশনারের (ইউএনএইচসিআর) কাছে রোহিঙ্গাদের যে রেজিস্ট্রেশন নাম্বার আছে তা ব্যবহার করে বাংলাদেশি সিম দেওয়া হবে। সূত্র জানায়, দুটি বিষয় বিবেচনায় নিয়ে রোহিঙ্গাদের হাতে মোবাইল সিম দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। একদিকে রোহিঙ্গাদের মধ্যে অবৈধ সিম ব্যবহার করা বন্ধ হবে এবং সিম ব্যবহারকারীদের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড শনাক্ত করা সম্ভব হবে। রোহিঙ্গাদের অনেকের আত্মীয়স্বজন বিদেশে থাকেন। তারা অনেক সময় মোবাইলের মাধ্যমে কমবেশি রেমিট্যান্স পাঠান। এতে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের কিছুটা উপকার হবে।
কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, বিটিসিএল, কম্পিউটার কাউন্সিল এবং ইউএনএইচসিআর যৌথভাবে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। রোহিঙ্গাদের সিম পাওয়ার ক্ষেত্রে ইউএনএইচসিআর প্রয়োজনীয় তথ্য-উপাত্ত সরবরাহ করবে। এ ছাড়া যেসব রোহিঙ্গাকে মোবাইল সিম দেওয়া হবে, তাদের সব তথ্য-উপাত্ত বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করবে ইউএনএইচসিআর। সূত্র আরও জানায়, মায়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা যেসব রোহিঙ্গার রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেছে ইউএনএইচসিআর, তাদের কোনো তথ্য-উপাত্ত এখনো বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি। এ বিষয়ে রোহিঙ্গাদের যেসব তথ্য-উপাত্ত ইউএনএইচসিআরের কাছে আছে, তার সব তথ্য বাংলাদেশ সরকারের কাছে হস্তান্তরের জন্য বলা হয়েছে। আগামী চার মাসের মধ্যে রেজিস্ট্রেশন করা সব রোহিঙ্গার তথ্য-উপাত্ত বাংলাদেশের কাছে হস্তান্তর করার জন্য সময় চেয়েছে ইউএনএইচসিআর।
এদিকে রোহিঙ্গা ক্যাম্প সূত্রে জানা গেছে, কক্সবাজারের টেকনাফ ও উখিয়ার ক্যাম্পগুলোতে যেসব রোহিঙ্গা রয়েছেন, তাদের মধ্যে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশি মোবাইল সিম ব্যবহার করেন। এসব সিম সবই অবৈধ। রোহিঙ্গারা একটি মোবাইল সিম প্রায় ২-৩ হাজার টাকার বিনিময়ে স্থানীয় বাংলাদেশিদের কাছ থেকে কিনে নেন। অনেক সময় বিভিন্ন মোবাইল অপারেটরের সিম বিক্রেতারা একজন বাংলাদেশির পরিচয়পত্র দিয়ে অনেকগুলো সিম রেজিস্ট্রেশন করেন গ্রাহকের অজান্তেই। গ্রাহককে একটি সিম বুঝিয়ে দিয়ে বাকি সিমগুলো চড়া দামে রোহিঙ্গাদের কাছে বিক্রি করেন। এ ছাড়া প্রায় এক লাখ রোহিঙ্গা উখিয়া ও টেকনাফে মাছ ধরার কাজ করেন। মাছ ধরার ট্রলারমালিকরাই তখন তাদের কাজে নিয়োজিত রোহিঙ্গাদের হাতে মোবাইল সিম তুলে দেন। এসব সিম রোহিঙ্গা ক্যাম্পসহ ওই এলাকার নানা অপরাধমূলক কাজেও ব্যবহৃত হয়। বিশেষ করে মাদক কারবার, মানব পাচার, চাঁদাবাজি, খুনখারাবির ঘটনার ক্ষেত্রেও এসব মোবাইল সিম ব্যবহৃত হয়। সূত্র আরও জানায়, নেটওয়ার্ক সুবিধার জন্য টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলোতে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয় মোবাইল অপারেটর ‘রবি’ সিম। এ ছাড়া গ্রামীণ, বাংলালিংক, এয়ারটেল সিমও ব্যবহার করেন রোহিঙ্গারা। একেকজনের হাতে একাধিক অবৈধ সিমও রয়েছে।
২০১৭ সালে মায়ানমারের জান্তা সরকার সে দেশের রাখাইন রাজ্যে ব্যাপক গণহত্যা ও নির্যাতন করে প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থীকে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য করে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর প্রতিবছর ক্যাম্পে আরও প্রায় ৩৫ হাজার করে সন্তান জন্ম নিচ্ছে। এখনো সেখানে রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন থামেনি। প্রতিদিনই বাংলাদেশে ঢুকছেন শত শত রোহিঙ্গা। গত দেড় বছরে নতুন করে আরও ১ লাখ ২০ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে ঢুকেছেন। রাখাইনে এখনো কয়েক লাখ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী রয়েছে। তাদেরও বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দেওয়ার জন্য নির্যাতন অব্যাহত আছে। মায়ানমার জান্তার পর এক বছর ধরে রাখাইনের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া আরাকান আর্মির সদস্যরাও রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালাচ্ছেন এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে বাংলাদেশের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তারা চান সব রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে পাঠিয়ে দিতে।