জাতীয় সংসদ নির্বাচন আগামী ফেব্রুয়ারিতে অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস। শুধু তাই নয়, নির্বাচন কমিশন (ইসি) ইতোমধ্যে এই প্রশ্নে দৃঢ় অবস্থান ব্যক্ত করে নির্বাচনি রোডম্যাপও ঘোষণা করেছে। কিন্তু তারপরও নির্বাচন নিয়ে জনমনে সন্দেহ-সংশয় কাটছে না। এর কারণ কী, তা নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন উঠেছে। চলছে নানা হিসাব-নিকাশ। সচেতন নাগরিক গোষ্ঠীও জানতে চাইছে আসলে বিষয়টা কী? এত নিশ্চয়তার পরও নির্বাচন নিয়ে কেন এই সংশয়। এ বিষয়ে দলগুলোর পৃথক বক্তব্য জানা গেছে।
বিএনপিসহ সমমনা দলগুলো নির্বাচনের পক্ষে অবস্থান নিলেও জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি দল নেতিবাচক বক্তব্য দিয়েছে। এর ফলে নির্বাচন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে। পাশাপাশি কিছু জায়গায় ‘মব সন্ত্রাস’, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং একের পর এক দাবি উত্থাপিত হওয়ায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে, এমন পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে নির্বাচন কীভাবে হবে? তারা বলছেন, অন্তর্বর্তী সরকারের এক বছর পার হয়েছে; তবু এখন পর্যন্ত দেশে স্থিতিশীলতা আসেনি।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘সংস্কার, গণহত্যার বিচার দৃশ্যমান হয়নি। জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি এবং বাস্তবায়ন পদ্ধতি নিয়ে কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। নির্বাচনকালীন সরকারের রূপরেখা কেমন হবে, কারা থাকবেন, তা এখনো স্পষ্ট হয়নি। সব মিলিয়ে জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ঠিক না করে নির্বাচনের রোডম্যাপ দেওয়ায় নির্বাচন নিয়ে নানা ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।’
অধ্যাপক দিলারা বলেন, ‘জনগণ পরিবর্তন চেয়েছিল, সেই পরিবর্তন না হলে আমজনতা ক্ষুব্ধ হবে; এটাই স্বাভাবিক। সংকট থেকে বের হয়ে আসতে অন্তর্বর্তী সরকার দৃশ্যমান উদ্যোগ নিলে অনিশ্চয়তা কেটে যাবে।’
বিএনপির নির্ভরযোগ্য সূত্র বলছে, নির্বাচনের আগে রাষ্ট্র সংস্কার, জুলাই সনদ ও জুলাই ঘোষণাপত্র বাস্তবায়ন, সংবিধান পরিবর্তন এবং পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচনসহ একের পর এক ইস্যু পরিকল্পিতভাবে তৈরি করছে একটি পক্ষ। নির্বাচন পেছানোর ষড়যন্ত্রের অংশ হিসেবে এসব ইস্যু সামনে আনা হচ্ছে। কারণ নির্বাচন যত ঘনিয়ে আসছে ততই এক ধরনের চাপ অনুভব করছে জামায়াত ও এনসিপি। সভা-সমাবেশ আর ভোটের রাজনীতি এক নয়। ভোটে এককভাবে জিতে আসাও তাদের জন্য কঠিন। তারা বিভিন্ন দাবি তুলে আসন নিয়ে দর-কষাকষি বা সমঝোতার চিন্তা থেকেও বিএনপির ওপর চাপ তৈরির কৌশল নিতে পারে বলেও মনে করছে দলটির হাইকমান্ড। তবে বিএনপির নির্বাচনি জোটে কারা থাকবে তা বলার সময় এখনো আসেনি। যুগপৎ আন্দোলনের শরিকরা থাকবে, এটা অনেকটাই নিশ্চিত।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচন ছাড়া দেশে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হবে না। দেশকে অশান্ত রাখতে একটি গোষ্ঠী সব সময় কাজ করে এবং সেই কাজ এখনো তারা করছে। যারা নির্বাচনে জয়লাভ করবে এবং জনগণের ওপর আস্থা আছে, তাদের তো নির্বাচন নিয়ে ভয় পাওয়ার কিছু নেই।’
তিনি বলেন, ‘ফ্যাসিবাদবিরোধী ঐক্যের মধ্যে যত পানি ঘোলা হবে ততই আওয়ামী লীগের ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হবে। এটা সবাইকে বুঝতে হবে। বিএনপি গণতান্ত্রিক দল, নির্বাচনমুখী দল। বিএনপি নির্বাচন নিয়ে আছে।’
বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান দুদু খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচন নিয়ে কোনো সংশয় নেই। নির্বাচন কমিশন রোডম্যাপ ঘোষণা করেছে। কিন্তু জামায়াতে ইসলামী ও ইসলামী আন্দোলনের অবস্থা মাঠপর্যায়ে খুব ভালো না। নতুন দল এনসিপিও আগে নির্বাচন করেনি। স্বাভাবিক কারণে নির্বাচনে তাদের ভালো করার সম্ভাবনা নেই। তাই হয়তো নির্বাচনে যারা জয়লাভ করবে তাদের সঙ্গে তারা একটা দর-কষাকষির চেষ্টা করছে।’
তিনি বলেন, ‘শেখ হাসিনার আমল ও ড. ইউনূসের সময় এক নয়! বিগত আমলে ভোটের সুযোগ ছিল না। পিআর দাবিতে জামায়াতসহ যারা কর্মসূচি পালন করে আসছে, তারা তা অব্যাহত রাখতে পারে। তবে বর্তমান সরকারের সংবিধান পরিবর্তনের কোনো সুযোগ নেই। অন্যের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাওয়ার ভাবনা সুস্থ কোনো চিন্তা হতে পারে না। জনগণ নির্বাচন প্রত্যাশা করছে, এটা ঠেকানোর কোনো রাস্তা বা সুযোগ নেই।’
সূত্র জানায়, জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বাইরে বিএনপি ও জামায়াতের মধ্যে বিরোধ অবসানের জন্য ইতোমধ্যে আলোচনা শুরু হয়েছে। পর্দার আড়ালে একটি মহল এই দুই দলের মধ্যে মতবিরোধ কমিয়ে আনার উদ্যোগ নিয়েছে। ঐকমত্য কমিশনের আলোচনায় পিআর পদ্ধতি, সংস্কার, বিচার এবং জুলাই সনদ নিয়ে জামায়াতের সঙ্গে বিএনপির প্রকাশ্যে মতবিরোধ দেখা দিয়েছে। এ কারণে অনেকেই যথাসময়ে নির্বাচন হওয়ার প্রশ্নে সংশয় প্রকাশ করছেন।
অপর দিকে, জামায়াতের একটি সূত্র বলছে, লন্ডনে প্রধান উপদেষ্টা ও তারেক রহমানের বৈঠকের পর ফেব্রুয়ারিতে নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়। শুধু বিএনপির চাওয়াকে গুরুত্ব দিয়ে অন্য দলের সঙ্গে আলোচনা ছাড়াই (যদিও নির্বাচনই সবার চাওয়া) নির্বাচনের ঘোষণা দেওয়া হয়। এই বৈঠকের পর সারা দেশে প্রশাসনও বর্তমানে বিএনপির পক্ষে কাজ করছে। তবে নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার, পিআর পদ্ধতি এবং জুলাই সনদ বাস্তবায়নের দাবি থেকে দলটি সরবে না বলেও জানা গেছে।
জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, ‘জনগণ জুলাই সনদের বাস্তবায়ন ও পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন চায়। কিসের ভিত্তিতে নির্বাচন হবে, তা সরকার এখনো নির্ধারণ করেনি। সংস্কার যদি আইনি ভিত্তি না পায়, তাহলে তামাশার সেই সংস্কার করে কী লাভ? আবারও যদি হাসিনামার্কা নির্বাচন হয়, তাহলে জনগণ মানবে না। জুলাই সনদের ভিত্তিতে ভোট হতে হবে। না হলে নির্বাচন নিয়ে প্রশ্ন থেকে যাবে।’
এনসিপির সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক আরিফুল ইসলাম আদীব খবরের কাগজকে বলেন, ‘নতুন সংবিধানের জন্য গণপরিষদ নির্বাচন ও জুলাই সনদ বাস্তবায়নের জন্য গণভোটের দাবি জানিয়ে আসছি আমরা। জুলাই সনদের ভিত্তিতে সংসদ নির্বাচন হতে হবে। কিন্তু জুলাই সনদকে লিখিত চুক্তিপত্র হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা চলছে। এটা জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের বিপরীতে অবস্থান নেওয়া। এসব বিষয়ে কোনো রোডম্যাপ দেওয়া হয়নি।’
তিনি বলেন, ‘সংস্কার ছাড়া নির্বাচন হলে তা হবে একপক্ষীয় নির্বাচন। ২০০৮, ২০১৮ কিংবা ২০২৪ সালের মতো নির্বাচন। কারা জিতবে, কারা হারবে, তা ভারত ও বিভিন্ন সংস্থার যোগসাজশে আগেই নির্ধারিত থাকবে।’
সংশয়-সন্দেহের মূল যেখানে নির্বাচনের আগে রাষ্ট্রের মৌলিক সংস্কার, জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি ও কার্যকর, জুলাই অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতার গণহত্যার বিচার এবং নতুন সংবিধানের জন্য গণপরিষদ নির্বাচনের দাবিতে রাজপথে রয়েছে এনসিপি। অপর দিকে সংখ্যানুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (পিআর) পদ্ধতিতে নির্বাচন, গণহত্যার বিচার ও জুলাই সনদের আইনি ভিত্তি দিয়ে বাস্তবায়নের দাবিতে কর্মসূচি পালন করছে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন। দল দুটি বলছে, জুলাই সনদের আলোকে সংসদ নির্বাচন দিতে হবে। গণভোটের মাধ্যমে পিআর পদ্ধতি চালু করতে হবে। এ ছাড়া নির্বাচনের সময়সীমা নিয়ে গণ-অভ্যুত্থানের পর থেকেই বিএনপির সঙ্গে জামায়াত, এনসিপিসহ কয়েকটি দলের মতবিরোধ দেখা দেয়। প্রথম দিকে এনসিপি একা থাকলেও এখন তাদের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জামায়াত, ইসলামী আন্দোলনসহ কয়েকটি ইসলামী দল। ফলে, এসব ইস্যুতে মত-দ্বিমত ক্রমেই বাড়ছে। এই মত-দ্বিমত গিয়ে পৌঁছায় জাতীয় ঐকমত্য কমিশনে। এই প্রশ্নে ঐকমত্য কমিশনও বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নিয়েছে। সেখানে জাতীয় নির্বাচন ও গণভোট একসঙ্গে করা যায় কি না, সেই প্রস্তাব এসেছে। এমন পরিস্থিতিতে গত বৃহস্পতিবার ইসি সচিব আখতার আহমেদ বলেন, ‘প্রধান উপদেষ্টার নির্দেশনা জাতীয় নির্বাচনের জন্য, সংসদ নির্বাচনের বাইরে আমাদের অন্য কোনো কিছু ভাবার সুযোগ নেই।’ প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এম নাসির উদ্দিন ২৩ আগস্ট বলেছেন, ‘আনুপাতিক পদ্ধতি বা পিআর পদ্ধতিতে নির্বাচন সংবিধানে নেই। সংবিধানের বাইরে আমরা যেতে পারি না।’ ফলে আগামী দিনে কী হয়, সেটা এখন দেখার বিষয়।
বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা বলছেন, পিআর পদ্ধতি যুক্তরাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতে নেই। নিম্নকক্ষের পিআর নিয়ে কমিশনে কোনো আলোচনা হয়নি। বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে তারা আসন সমঝোতা ও রাজনৈতিক মেরুকরণের জন্য চেষ্টা করছে। তাদের লক্ষ্য নিজেদের গুরুত্ব পরোক্ষভাবে বাড়িয়ে তোলা।
বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সাধারণ সম্পাদক সাইফুল হক খবরের কাগজকে, ‘নির্বাচনি রোডম্যাপকে সবাই ইতিবাচকভাবে দেখছে। নির্বাচন নিয়ে যে সংশয় আছে, সেটাও কিছুটা দূর হয়েছে। নির্বাচনের বিষয়ে সরকার ও নির্বাচন কমিশন যে সিদ্ধান্তে যাচ্ছে, রোডম্যাপ তারই পরবর্তী পদক্ষেপ। কর্মপরিকল্পনাগুলো যদি মনোযোগ ও দক্ষতার সঙ্গে এগিয়ে নেওয়া যায়, তাহলে এখন যারা সরকারের সমালোচনা করছে, তাদের মধ্যেও আস্থার জায়গা তৈরি হবে।’
১২-দলীয় জোটের সমন্বয়ক ও বাংলাদেশ জাতীয় দলের চেয়ারম্যান সৈয়দ এহসানুল হুদা বলেন, ‘জামায়াতে ইসলামী অযৌক্তিক কিছু দাবি তুলছে। ছাড় দিয়ে হলেও জুলাই সনদ অবশ্যই সবার মতামতের ভিত্তিতে বাস্তবায়ন করা হবে। আমি মনে করি, এসব ইস্যু সামনে আনা হচ্ছে দর-কষাকষির জন্য।’
লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টির (এলডিপি) মহাসচিব ড. রেদোয়ান আহমদ খবরের কাগজকে বলেন, ‘নির্বাচন যথাসময়ে যেন না হয় এ ধরনের নানা প্রতিকূলতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে একটি গোষ্ঠী। তারা বিভিন্ন দাবি-দাওয়া তুলে পরিস্থিতি ঘোলাটে করার চেষ্টা করছে। পিআরসহ বিভিন্ন দাবিতে মাঠ গরম করারও চেষ্টা করছে। তবে মানুষের তোপের মুখে এসব টিকবে না।’
জাতীয়তাবাদী সমমনা জোটের প্রধান ও এনপিপি চেয়ারম্যান ফরিদুজ্জামান ফরহাদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে দেশে ভোট হয় না। জনগণ নির্বাচনমুখী হয়ে গেছে। তারা এখন ভোটের জন্য প্রস্তুত। নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হলে তার জন্য দু’একটি দল দায়ী থাকবে। আমি মনে করি, যারা এই সময়ে অপ্রাসঙ্গিক কিছু দাবি তুলছে, তারাও শেষ পর্যন্ত নির্বাচনে অংশ নেবে।’