রাজধানীর খানাখন্দে ভরা সড়কগুলো মেরামতের নামে চলছে জোড়াতালি। কোথাও ইটের কণা ছিটিয়ে, কোথাও সামান্য বালু ফেলে ‘পিচ ঢালার ভান’ করা হচ্ছে। অথচ প্রতিদিন এই সড়ক দিয়েই যাতায়াত করেন লাখ লাখ মানুষ। ভাঙা রাস্তার কারণে একদিকে যেমন দেখা দেয় তীব্র যানজট, অন্যদিকে রাস্তাঘাটের এই বেহাল অবস্থায় প্রতিদিনই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে যানবাহন, ভোগান্তিতে পড়ছেন সাধারণ মানুষ।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা শহর বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র। অথচ এই শহরের সড়কব্যবস্থা আজ নাগরিক জীবনের দুর্ভোগের প্রতীক হয়ে উঠেছে। প্রতি বর্ষা শেষে নতুন করে দেখা দেয় একই সংকট; গর্ত, পানি, ধুলো আর জোড়াতালি মেরামতের গল্প।
পরিকল্পনা, জবাবদিহি ও মানসম্মত কাজের অভাব দূর না হলে এই জনভোগান্তির চিত্র আর বন্ধ হবে না। নগর পরিকল্পনাবিদদের ভাষায়, ঢাকার রাস্তাঘাট যদি না বদলায়, তবে উন্নয়নের গল্পও কেবল কাগজেই থেকে যাবে।
বাজেটে বরাদ্দ, তবুও বেহাল দশা
উত্তর সিটি করপোরেশন এ বছর উন্নয়ন খাতে ৪ হাজার ৬২৪ কোটি টাকা বরাদ্দ রেখেছে। যার মধ্যে সড়ক ও অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বরাদ্দই সর্বাধিক- ২ হাজার ৩২ কোটি টাকা, যা মোট বাজেটের প্রায় ৩৩ শতাংশ। অন্যদিকে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাজেটে সড়ক ও ট্রাফিক অবকাঠামো উন্নয়ন খাতে রয়েছে ৩৬৫ কোটি ১১ লাখ টাকা।
কিন্তু বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। রাজধানীর অনেক সড়ক, উপসড়ক ও অলিগলিতে রাস্তা এখন গর্ত, খাদ ও ভাঙাচোরা অবস্থায় পড়ে আছে। বৃষ্টির সময় এসব স্থানে পানি জমে ‘ছোট জলাশয়ে’ পরিণত হয়। কোথাও কোথাও লোহার রড বেরিয়ে আছে, যা চলাচলে মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করছে।
পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, এই বিপর্যয়ের মূল কারণ দীর্ঘদিন ধরে সংস্কারের অভাব, অপরিকল্পিত খোঁড়াখুঁড়ি, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং পর্যাপ্ত তদারকির ঘাটতি। অপরিকল্পিতভাবে পানি, গ্যাস বা ড্রেনেজ লাইনের কাজের জন্য রাস্তা খোঁড়ার পর সঠিকভাবে মেরামত না করায় অল্প সময়ের মধ্যেই আবার তা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। সামান্য বৃষ্টি নামলেই রাস্তাগুলো ডুবে যায়, গর্তে পানি জমে থাকে, যা দ্রুত রাস্তার ক্ষয় ডেকে আনে।
জোড়াতালির মেরামতে নেই স্থায়ী সমাধান
ঢাকার মিরপুর, মোহাম্মদপুর, কল্যাণপুর, মালিবাগ, রামপুরা, শনির আখড়া -যাত্রবাড়ী, ধানমন্ডি, পান্থপথ, হাতিরপুল, মগবাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা গেছে, সিটি করপোরেশনের কর্মীরা গর্তে ইটের খোয়া বা ভাঙা ইটের টুকরা ফেলে তার ওপর বালু ছিটিয়ে দিচ্ছেন। কিছুদিনের মধ্যেই এসব ইট-বালু উঠে রাস্তাটি আগের মতোই খানাখন্দে পরিণত হচ্ছে। এই জোড়াতালির কাজই আজ ‘স্থায়ী সমাধান’ হিসেবে প্রচারিত হচ্ছে।
এর ফলে সৃষ্টি হচ্ছে নতুন ভোগান্তি। গর্ত ও উঁচু-নিচু রাস্তা এড়াতে গিয়ে চালকরা হঠাৎ ব্রেক কষছেন, দিক পরিবর্তন করছেন, ফলে প্রতিদিনই ঘটছে ছোট-বড় দুর্ঘটনা। বিশেষ করে মোটরসাইকেল ও রিকশাচালকদের ঝুঁকি সবচেয়ে বেশি।
নাগরিক ক্ষোভ- ‘মেরামতের নামে প্রহসন’
রাজধানীবাসীর অভিযোগ, সড়কের এই বেহাল দশা সিটি করপোরেশনের চরম উদাসীনতার ফল। সংস্কারের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ হলেও কোনো স্থায়ী পরিবর্তন দেখা যায়নি। কাজের মান যাচাই বা তদারকিতে কেউ গুরুত্ব দেয় না। এক এলাকা সংস্কার শেষ না হতেই অন্য এলাকায় একই কাজ শুরু হয়, কিন্তু কোথাও স্থায়ী ফল নেই।
দুই সিটি করপোরেশন বিভিন্ন রাস্তার কার্পেটিং কাজ করলেও ম্যানহোলের ঢাকনা মূল সড়কের নিচে রয়ে যায়। এতে বেড়েছে সড়ক দুর্ঘটনা। অনেকেই মৃত্যু-যন্ত্রণায় ভুগছেন। গত ১ নভেম্বর কাঁটাবন থেকে আজিজ সুপার মার্কেটে যাওয়ার পথে পরপর দুটি ম্যানহল ও অসমান্তরাল সড়কের কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। এতে মোটরসাইকেল আরোহী মকবুল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের সহযোগী অধ্যাপক কানিজ ফাতিমা মারাত্মকভাবে আহত হন। এই শিক্ষিকার চোখের নিচে অনেকটা অংশই কেটে গেছে। শুধু এখানেই নয়, মিরপুর রোডের ২৭ নম্বরের মাথায়, আড়ংয়ের সামনে, আসাদগেটে, মোহাম্মদপুরের গ্রিন হেরাল্ড স্কুলের সামনে, নূরজাহান রোডের মাথায় ম্যানহোলগুলো ৫ থেকে ৬ ইঞ্চি নিচে রেখে রাস্তা কার্পেটিং করা হয়েছে। ফলে যখন-তখন মোটরবাইক বা রিকশারোহী সাধারণ মানুষ দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছেন। বিমানবন্দরের মতো গুরুত্বপূর্ণ সড়কেও এভাবে ম্যানহোল নিচে রেখে রাস্তা কার্পেটিং করা হয়েছে। বাংলামোটর থেকে সোনারগাঁও হোটেল অভিমুখী রাস্তা এবং হোটেল ইন্টার কন্টিনেন্টালের সামনেও একই চিত্র দেখা গেছে।
মিরপুরের বাসিন্দা শামীম আহমেদ ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, রাস্তাঘাট এখন এমন পর্যায়ে গেছে যে হাঁটাও কষ্টকর। অথচ কেউ কিছু দেখছে না।
একইভাবে প্রাইভেট কারচালক আজিজ মিয়া বলেন, প্রতিদিনই গাড়ির সাসপেনশন, টায়ার নষ্ট হচ্ছে। ধুলো-বালু ছিটিয়ে রাখলেই কি রাস্তা ঠিক হয়? বরং অবস্থা আরও খারাপ হচ্ছে।
জনস্বাস্থ্যে প্রভাব
ঢাকার সড়কের এই দুরবস্থা এখন নাগরিক জীবনের নিয়মিত অভিশাপ। সড়কের অবস্থা বেহাল হওয়ায় গাড়ি চলাচলে নেমে আসে ধীরগতি। অফিসগামী মানুষকে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে আটকে থাকতে হচ্ছে। স্কুলগামী শিশুদের পক্ষে সময়মতো ক্লাসে পৌঁছানো কঠিন। বৃষ্টির দিনে দুর্ভোগ আরও বাড়ে।
এই অব্যবস্থাপনা জনস্বাস্থ্যেও মারাত্মক প্রভাব ফেলছে। রাস্তাঘাটের ধুলা-বালু ও ইটের গুঁড়া বাতাসে মিশে শ্বাসকষ্ট, হাঁপানি, চর্মরোগ ও অ্যালার্জির মতো রোগ বাড়িয়ে তুলছে। হাসপাতালের হিসাব বলছে, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শ্বাসযন্ত্রের রোগে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা বেড়েছে।
চলতি বছরের অক্টোবরে জলবায়ু পরিবর্তন ও জ্বালানি রূপান্তর নিয়ে কাজ করা আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান ‘স্ট্রাকচারাল ডিপেনডেন্সিস পারপেচুয়েট ডিসপ্রোপোরশনেট চাইল্ডহুড হেলথ বার্ডেন ফ্রম এয়ার পলিউশন’ এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে। সেখানে বাংলাদেশে নিউমোনিয়াজাতীয় শ্বাসযন্ত্রের রোগে পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশুদের যত মৃত্যু হয়, তার ৪০ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে বায়ুদূষণ দায়ী বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। এখানে রাস্তার উড়ন্ত ধূলার কণাও পরিবেশ বিনষ্টের জন্য কম দায়ী নয়।
সড়কের বেহাল দশার বিষয়ে জানতে চাইলে উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মোহাম্মদ এজাজ খবরের কাগজকে বলেন, ‘বিগত ৪০ বছরের তুলনায় ভালো কাজ হয়েছে এবার (এই সরকারের আমলে)। কোথাও সমস্যার খবর পেলে আমরা ব্যবস্থা নিচ্ছি।’
তবে অর্থসংকট ও জনপ্রতিনিধির অভাব বোধ করছেন দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী নূর আজিজুর রহমান। তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘সড়কের সমস্যা সমাধানে অনেক সময় আমাদের মিক্সড ম্যাটারিয়াল দিয়ে কাজ চালাতে হচ্ছে। পুরোটা করতে গেলে অনেক টাকা লাগবে। আমাদের সেই পরিমাণে টাকা এখন নেই। এ ছাড়া পুরোনো প্রজেক্টগুলো শেষ করা যাচ্ছে না। নতুন করে কীভাবে প্রজেক্ট করা সম্ভব হবে? এখন চেষ্টা করছি গুণগত মান ঠিক রাখতে। জনপ্রতিনিধি থাকলে তা হয়তো এ কাজগুলো করা সহজ হতো।
এদিকে নগর পরিকল্পনাবিদরা বলছেন, ঢাকার সড়ক ব্যবস্থাপনা এখন কার্যত বিশৃঙ্খলার পর্যায়ে। পরিকল্পনার অভাব, সমন্বয়হীনতা ও দুর্নীতির কারণে বারবার একই জায়গায় কাজ হলেও কোনো স্থায়ী উন্নতি হচ্ছে না। একটি আধুনিক শহরের মূল কাঠামো হলো টেকসই রাস্তা ও ড্রেনেজ ব্যবস্থা। ঢাকায় এই দুই খাতেই দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা অনুপস্থিত। বরং, প্রতিটি বর্ষা মৌসুম শেষে খোঁড়াখুঁড়ি ও জোড়াতালির কাজ যেন রীতিতে পরিণত হয়েছে।
পরিকল্পনাবিদ এবং বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের (বিআইপি) সভাপতি অধ্যাপক আদিল মুহাম্মদ খান খবরের কাগজকে বলেন, ‘আমাদের এত বাজেট কোথায় এবং কোন কাজে যাচ্ছে তা জবাদিহির আওতায় আনতে হবে। মুখে বললাম উন্নয়ন হচ্ছে, বাস্তবে তা কতখানি হয়েছে তার মানদণ্ড নিশ্চিত করা প্রয়োজন। প্রতিদিন মানুষ সড়ক ব্যবহার করে। তাই এর পরিকল্পনাও সেভাবে করতে হবে। বিজ্ঞানসম্মত পরিকল্পনা তৈরি না হলে আমাদের লক্ষ্য অর্জন হবে না। সড়কের অবকাঠামো ঠিক না হলে জনভোগান্তির অবসান আসবে না।’