‘হানিট্র্যাপ’ বা মধুর ফাঁদ। অদ্ভুত এক প্রতারণার ফাঁদ এটি। চক্রের সূক্ষ্ম পরিকল্পনায় হানিট্র্যাপে পা দিচ্ছেন এক শ্রেণির সহজ-সরল বা লোভী প্রকৃতির মানুষ। এই ফাঁদে পড়ে কেউ সর্বস্ব খোয়াচ্ছেন, আবার অনেকে প্রাণ বিসর্জন দিচ্ছেন। এই জাতীয় চক্রের ছোবল থেকে রক্ষা পেতে সচেতনতা ও সাবধানতার দিকেই নজর দিতে বলছেন অপরাধ বিশেষজ্ঞরা।
সর্বশেষ রংপুরের কাঁচামাল ব্যবসায়ী আশরাফুল হককে ফাঁদে ফেলে ১০ লাখ টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছিলেন তারই বাল্যবন্ধু জরেজুল ইসলাম। আর সেই ‘হানিট্র্যাপ’ বা মধুর ফাঁদ পাতা হয়েছিল জরেজুলের পরকীয়া প্রেমিকা শামীমাকে দিয়ে। অতঃপর আশরাফুলকে ঢাকায় নিয়ে নির্মমভাবে হত্যার পর লাশ ২৬ টুকরো করে ড্রামে ভরে হাইকোর্টসংলগ্ন জাতীয় ঈদগাহ মাঠের সামনে ফেলে তারা পালিয়ে যান। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ঢাকা ও কুমিল্লায় অভিযান চালিয়ে আশরাফুল হত্যা মামলার প্রধান আসামি জরেজুল ইসলাম (৩৯) ও তার বান্ধবী (প্রেমিকা) শামীমা আক্তারকে (৩৩) গ্রেপ্তার করে র্যাব এবং ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশ। যদিও গতকাল আনুষ্ঠানিক সংবাদ সম্মেলনে পুলিশের এই দুটি ইউনিট হত্যার কারণ ভিন্নভাবে প্রকাশ করেছে। র্যাব বলছে, আশরাফুলকে ‘হানি ট্রাপে’ বা ফাঁদে ফেলে ১০ লাখ টাকা আদায়ের পরিকল্পনার অংশ হিসেবে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে ডিবি পুলিশ বলেছে, জরেজুল, প্রবাসীর স্ত্রী শামীমা এবং আশরাফুলের মধ্যে ত্রিভুজ প্রেমের সম্পর্কের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটেছে।
তথ্য অনুসন্ধানে জানা যায়, এর আগেও ৮ নভেম্বর গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জে বিয়ের প্রলোভনের ফাঁদ তৈরি করা ‘হানিট্র্যাপ’ চক্রের সদস্য সোনিয়া খাতুনকে (২১) গ্রেপ্তার করে পুলিশ। খুরশাল গ্রামের বেলাল উদ্দিন নামে এক ব্যক্তিকে বিয়ের প্রলোভনে ফাঁদে ফেলেছিলেন তিনি। গত ২০ অক্টোবর একটি কাজী অফিসে এক লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করে ১০ হাজার টাকা নগদ নেন সোনিয়াসহ চক্রের সদস্যরা। পরে স্থানীয়রা গোবিন্দগঞ্জ পৌর শহরের রাজমতি মার্কেট এলাকা থেকে ওই নারীকে আটক করে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।
চলতি বছরের ১৬ এপ্রিল বরগুনার পাথরঘাটা থানা এলাকায় সানজিদা তাবাসসুম স্বর্ণা (২৬) নামের এক তরুণীকেও একই অভিযোগে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। ওই তরুণীর বিরুদ্ধে প্রেমের অভিনয় করে প্রতারণার ফাঁদে ফেলে আবদুল্লাহ আল কাফি নামে এক যুবকের কাছ থেকে ১০ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়া ও প্রতিনিয়ত ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগে নারায়ণগঞ্জের সিদ্বিরগঞ্জ থানায় একটি প্রতারণার মামলা রয়েছে।
গত ৫ এপ্রিল রাতে সাভার পৌরসভার মুক্তির মোড়ের তারাপুর এলাকা থেকে সাজেদুল ইসলাম সাদ (২৫) ও জান্নাতুল ফেরদৌস ওরফে মায়া নামে হানি ট্র্যাপ চক্রের দুই সদস্যকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। পুলিশ জানায়, তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রেমের ফাঁদে ফেলে বিভিন্ন বয়সী মানুষকে আটক করে অর্থ হাতিয়ে নিতেন। এর আগে ২০২৩ সালের ১২ মে পশ্চিমবঙ্গের নিউ টাউনের একটি বাড়িতে হত্যাকাণ্ডের শিকার হন ঝিনাইদহ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য আনোয়ারুল আজীম আনার। হত্যার পর তার লাশ টুকরো টুকরো করে ফেলা হয়। হানিট্র্যাপে ফেলে তাকে খুন করা হয় বলে জানায় পুলিশ।
হানিট্র্যাপ কী?
হানিট্র্যাপ হলো একটি গোপন কৌশল, যেখানে প্রতারণা, প্রলোভন বা যৌন আবেদন ব্যবহার করে কাউকে ফাঁদে ফেলা হয়। সাধারণত গোপন তথ্য আদায় বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের জন্য এই হ্যানি ট্র্যাপ প্রয়োগ করছে অপরাধী চক্র। এই কৌশলে একজন ব্যক্তি মিথ্যা পরিচয় ধারণ করে অন্য ব্যক্তির সঙ্গে একটি সম্পর্ক তৈরি করে। তার দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে নিজের উদ্দেশ্য পূরণ করে থাকে। রোমান্টিক বা যৌন সম্পর্ক স্থাপনে উৎসাহিত করা হয়। টাকা হাতিয়ে নেওয়ার জন্য ব্যক্তিগত বা সংঘবদ্ধভাবে ব্ল্যাকমেইল করে হ্যানি ট্র্যাপ কৌশল ব্যবহার করছে চক্রগুলো।
এ প্রসঙ্গে সামাজিক অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, প্রতারণার ক্ষেত্রে হানি ট্র্যাপ অপরাধীদের কাছে খুবই কার্যকরী কৌশল। বিভিন্ন সময় হানি ট্র্যাপকে কেন্দ্র করে সংঘাত বা খুনের ঘটনা ঘটছে। এগুলো বেড়ে যাওয়ার পেছনের কারণ খতিয়ে দেখা জরুরি। অনেক সময় যারা ভুক্তভোগী হচ্ছেন তাদের অনেকে মানসম্মানের ভয়ে বিষয়টি এড়িয়ে যান। এখান থেকে উত্তরণ বা প্রতিকারের বিষয় হচ্ছে- ব্যক্তিগতভাবে সর্বোচ্চ সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। ঝুঁকিপূর্ণ বা সন্দেহজনক কোনো ব্যক্তির সঙ্গে সম্পর্কে না জড়ানো বা পরিস্থিতির সঙ্গে যুক্ত না হওয়াসহ এই জাতীয় বিষয়ে সচেতন থাকা জরুরি। তার পরও এ ধরনের ঘটনার শিকার হলে অবশ্যই মামলা বা পুলিশের সহযোগিতা নিতে হবে।
হানিট্র্যাপের শিকার হন আশরাফুল: র্যাব
শামীমা নামে এক নারীকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল সকাল ১০টায় রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র্যাবের মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে র্যাব। এ সময় র্যাব-৩-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল ফায়েজুল আরেফীন জানান, আশরাফুলকে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ১০ লাখ টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করেছিলেন তারই বন্ধু ও মামলার প্রধান আসামি জরেজুল। র্যাবের হাতে গ্রেপ্তার হওয়া শামীমার সঙ্গে জরেজুলের এক বছরের বেশি সময় ধরে প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ১১ নভেম্বর জরেজুল ও আশরাফুল রংপুর থেকে ঢাকায় আসেন। ১২ নভেম্বর তারা শনির আখড়া এলাকায় একটি বাসা ভাড়া নেন। এ সময় শামীমাও তাদের সঙ্গে ছিলেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, আশরাফুলকে শরবতের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ খাওয়ান শামীমা। পরে আশরাফুল ও শামীমার ভিডিও ধারণ করা হয়। এই ভিডিও দেখিয়েই টাকা আদায়ের পরিকল্পনা করা হয়। সেই ভিডিও দেখিয়ে আশরাফুলের কাছে ১০ লাখ টাকা দাবি করা হয়। এ নিয়ে বাগবিতণ্ডার একপর্যায়ে ১২ নভেম্বর দুপুরে আশরাফুল পুরোপুরি অচেতন হয়ে পড়লে জরেজুল তাকে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেলেন, মুখে স্কচটেপ লাগান। এরপর হাতুড়ি দিয়ে এলোপাতাড়ি আঘাত করেন। অতিরিক্ত আঘাত এবং মুখে স্কচটেপ লাগানো থাকায় শ্বাস নিতে না পেরে আশরাফুল মারা যান। এরপর ১৩ নভেম্বর সকালে লাশ গুম করতে পাশের বাজার থেকে দুটি প্লাস্টিকের ড্রাম ও অন্য সরঞ্জাম আনা হয়। পরে জরেজুল চাপাতি দিয়ে লাশ টুকরো টুকরো করে দুটি ড্রামে ভরে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় হাইকোর্ট এলাকায় রেখে যান। ধারণকৃত সেই ভিডিও শামীমার মোবাইল থেকে উদ্ধার করেছে র্যাব।
পুলিশ বলছে, আশরাফুল ত্রিভুজ প্রেমের বলি
আশরাফুলকে হত্যার প্রধান আসামি জরেজুলকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল দুপুরে রাজধানীর মিন্টো রোডে ডিএমপি মিডিয়া সেন্টারে সংবাদ সম্মেলনের আয়োজন করে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)। এ সময় ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (গোয়েন্দা) মো. শফিকুল ইসলাম বলেন, হত্যাকাণ্ডটি মূলত একটি ত্রিভুজ প্রেমের কাহিনি। হত্যার মূল আসামি জরেজুল ইসলাম মালয়েশিয়া প্রবাসী। একটি অ্যাপসের মাধ্যমে তিন বছর আগে শামীমার সঙ্গে তার পরিচয় হয়। একপর্যায়ে তাদের মধ্যে প্রেমের সম্পর্কও হয়। দেড় মাস আগে জরেজুল দেশে আসেন। জরেজুলকে বিমানবন্দর থেকে শামীমা রিসিভ করেন। এরপর জরেজুল রংপুর ও শামীমা কুমিল্লায় তাদের বাড়িতে চলে যান। তাদের মধ্যে বিভিন্ন সময়ে মুঠোফোনে অন্তরঙ্গ কথাবার্তা হতো। জরেজুলের স্ত্রী এটা জেনে যান। তখন জরেজুলের স্ত্রী জরেজুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধু আশরাফুল ইসলামের সহায়তা চান এবং আশরাফুল ইসলামকে শামীমার নম্বর দেন। পরে আশরাফুল শামীমাকে বোঝাতে গিয়ে তার প্রেমে পড়ে যান। ভিডিও কলে তাদের মধ্যে যোগাযোগ হতো।
ডিবি প্রধান বলেন, এরই মধ্যে ১৪ লাখ টাকার বিনিময়ে জরেজুলকে জাপান পাঠানোর কথা বলেন শামীমা। এ জন্য তিনি সাত লাখ টাকা দেওয়ার কথা বলেন। শামীমার কাছ থেকে টাকা ও জাপান যাওয়ার কাজ শুরু করতেই ১১ নভেম্বর তিনি ও আশরাফুল রংপুর থেকে ঢাকায় আসেন। ঢাকায় আসার পর শনির আখড়ায় পাঁচ হাজার টাকায় একটি বাসা ভাড়া নেন তারা। পরে আশরাফুল ও শামীমার সম্পর্কের কথা জানতে পারেন জরেজুল। এ নিয়ে জরেজুল ও আশরাফুলের মধ্যে তর্ক ও মনোমালিন্য হয়। একপর্যায়ে আশরাফুল শামীমার সঙ্গে অন্তরঙ্গ হওয়ার চেষ্টা করলে কৌশলে আশরাফুলের হাত বেঁধে জরেজুল হাতুড়ি দিয়ে আঘাত করেন। এ সময় আশরাফুলের মুখের ভেতরে ওড়না ঢুকিয়ে স্কচটেপ দিয়ে পেঁচিয়ে দেন শামীমা। এর কিছুক্ষণ পর আশরাফুল মারা যান। পরে তারা লাশ টুকরো টুকরো করে প্লাস্টিকের ড্রামে ভরে হাইকোর্ট এলাকায় ফেলে আসেন।