পুরান ঢাকায় গত ১০ নভেম্বর জনাকীর্ণ এলাকায় প্রকাশ্যে গুলি চালিয়ে নৃশংসভাবে খুন করা হয় পুলিশের তালিকাভুক্ত ‘শীর্ষ সন্ত্রাসী’ তারিক সাইফ মামুনকে। ওই ঘটনার এক সপ্তাহের মাথায় গত সোমবার রাতে পল্লবীতে প্রায় একই কায়দায় গুলি করে হত্যা করা হয়েছে যুবদল নেতা গোলাম কিবরিয়াকে। এভাবে রাজধানী ঢাকায় প্রতিনিয়তই বাড়ছে নৃশংস হত্যাকাণ্ড।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তথ্যমতে, গত দশ মাসে (জানুয়ারি-অক্টোবর) শুধু রাজধানীতেই ১৯৮টি হত্যাকাণ্ড ঘটেছে। নভেম্বরে এখন পর্যন্ত আরও বেশ কয়েকটি হত্যাকাণ্ড ঘটলেও পুরান ঢাকা ও পল্লবীর হত্যাকাণ্ড দুটি ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছে। পুলিশের হিসেবে, শুধু রাজধানীতেই মাসে গড়ে ১৯ থেকে ২০টির মতো হত্যাকাণ্ড হচ্ছে।
পুলিশ কর্মকর্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকরা বলছেন, মাদকের কারবার, আধিপত্য, আক্রোশসহ নানা কারণে এসব হত্যাকাণ্ড ঘটছে। কিন্তু উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে- আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কড়াকড়ি বা দৃশ্যমান বিভিন্ন অভিযানের মধ্যেও ঘটছে এসব নৃশংস হত্যাকাণ্ড। ফলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকা বা সক্ষমতা নিয়েও অনেকে প্রশ্ন তুলছেন। বিশেষ করে ঢাকায় ‘আন্ডারওয়ার্ল্ডের’ শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তৎপরতার বিষয়গুলোতে বিশ্লেষকরা উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেছেন। পাশাপাশি সামনে যেহেতু জাতীয় নির্বাচন আয়োজনের কথা চলছে, ফলে এই ধরনের নৃশংস খুনের ঘটনা আরও বাড়তে পারে বলেও মনে করছেন তারা।
এ প্রসঙ্গে অপরাধ বিশেষজ্ঞ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ড. তৌহিদুল হক খবরের কাগজকে বলেন, ‘দেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নানা দিক সামাল দিতে হচ্ছে। সেটার কিছুটা সুযোগ নিচ্ছে পেশাদার খুনি বা অপরাধীরা। পাশাপাশি চিহ্নিত সন্ত্রাসী বা শীর্ষ সন্ত্রাসী অনেকেই এখন কারাগারের বাইরে থেকে আধিপত্য-চাঁদাবাজি বিভিন্ন ধরনের তৎপরতা চালাচ্ছে। এ ছাড়া নির্বাচনকে ঘিরে রাজনৈতিক হানাহানিও বেড়েছে। এই সবমিলে নৃশংস হত্যাকাণ্ডের ঘটনাও বেশি দেখা দিচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর পদক্ষেপ ছাড়া বিকল্প নেই।’
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, পল্লবী থানা যুবদলের সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়ার হত্যার মিশনে ছয়জন অংশ নিয়েছিলেন। তাদের মধ্যে তিনজন সরাসরি শুটার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বাকি তিনজন ছিলেন ‘ইনফর্মার’ (সোর্স বা তথ্যদাতা)। তারা হত্যাকাণ্ডের মিশনে তিনটি মোটরসাইকেল ব্যবহার করেন। খুনের ঘটনার পরপরই জনতার হাতে জনি নামে একজন আটক হন। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে জনির দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে এসব কথা জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানান, যুবদলের পল্লবী থানা শাখার সদস্যসচিব গোলাম কিবরিয়াকে হত্যার মিশনে ১৮ রাউন্ড গুলি খরচ করেন শুটাররা। এই কিলিং মিশনে অংশ নেন জনি ভূঁইয়া, সোহেল ওরফে পাতা সোহেল, মাসুম ওরফে ভাগিনা মাসুম, সোহাগ ওরফে কাল্লু এবং রোকন ও অজ্ঞাত আরও একজন। তাদের মধ্যে এলোপাতাড়ি গুলি চালিয়ে পালানোর সময় জনিকে ধরে ফেলেন স্থানীয় জনতা। এ সময় একটি গুলি লাগে একজন রিকশাচালকের শরীরে। তাকেও সেখান থেকে উদ্ধার করে হাসপাতালে নেওয়া হয়।
পুলিশ ও স্থানীয়রা বলছেন, গতকাল পল্লবী থানায় একটি হত্যা মামলা করেছেন কিবরিয়ার স্ত্রী সাবিহা আক্তার দিনা। মামলায় আটক জনিসহ পাঁচজনের নামে ও অজ্ঞাত আরও কয়েকজনকে আসামি করা হয়। নাম আসা সবাই পল্লবীর চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী, চাঁদাবাজ ও ভাড়াটে খুনি। তারা সবাই বিদেশে পলাতক মিরপুরের চিহ্নিত সন্ত্রাসী ও মাদক কারবারি মামুনের লোক হিসেবে পরিচিত।
গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে ঘটনাস্থল পল্লবীর সি ব্লকের বিক্রমপুর হার্ডওয়্যার অ্যান্ড স্যানিটারি দোকানটি তালাবদ্ধ দেখা যায়। সঙ্গে আশপাশের অধিকাংশ দোকান ছিল বন্ধ। এলাকায় থমথমে এক পরিস্থিতি বিরাজ করছিল। সেখানে কথা হয় একাধিক প্রত্যক্ষদর্শীর সঙ্গে।
তারা খবরের কাগজকে জানান, মো. জনি ভূঁইয়া, সোহাগ ওরফে কাল্লু এবং রোকন সেই দোকানে ঢুকে গুলি চালান। এই তিনজন দোকানে ঢোকার আগে সেখানে নজর রাখছিলেন পাতা সোহেল ওরফে মনির এবং মাসুম ওরফে ভাগিনা মাসুমসহ আরও একজন। একদম কাছে থেকে গুলি করায় কিবরিয়ার গালের চোয়ালে, গলার ডান পাশে, বাম কানের পিছনে, ঘাড়ের পিছনে, বুকের ডান পাশে ও বাম পাশে, ডান হাতের বাহু, বাম হাতের কনুই ও কবজি ঝাঁঝরা হয়ে যায়। একেবারে মৃত্যু নিশ্চিত করে শুটাররা এলাকা ত্যাগ করেন।
গতকাল মঙ্গলবার ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপ-কমিশনার মোহাম্মদ মাকছুদের রহমান বলেন, ঘটনার সময় জনি নামে একজনকে আটক করা হয়েছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে।
পুলিশ আরও জানায়, এই হত্যাকাণ্ডের উদ্দেশ্য কী ছিল, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। ব্যবসায়িক, রাজনৈতিক, মাদক বা আধিপত্য বিস্তারের বিষয়গুলো মাথায় রেখে পুলিশ তদন্ত চালাচ্ছে। পাশাপাশি কোনো সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর ভূমিকা রয়েছে কি না সেটিও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রাথমিক তদন্তে চিহ্নিত সন্ত্রাসী পাতা সোহেল, ভাগনে মাসুম, দর্জি মামুনসহ বেশ কয়েকজন চিহ্নিত সন্ত্রাসীর জড়িত থাকার তথ্য পাওয়া যাচ্ছে।
নিহতের অনুসারীরা জানান, কিবরিয়া অত্যন্ত ভালো মানুষ ছিলেন। তিনি সব সময় মাদকের বিরুদ্ধে সোচ্চার ছিলেন। মাদকবিরোধী বিভিন্ন জনমত গড়ে তোলার চেষ্টায় তিনি কাজ করছিলেন। কিন্তু তার সঙ্গে রাজনৈতিকভাবে কারও কোনো শত্রুতা ছিল না।
গতকাল সকালে সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে নিহত কিবরিয়ার ময়নাতদন্ত সম্পন্ন করেন সহকারী অধ্যাপক ডা. নাশাত জাবিন। ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, নিহতের শরীরে ১৮টি ক্ষতের চিহ্ন পাওয়া গেছে।
অন্যদিকে গত ১২ নভেম্বর ভোরে মধ্য বাড্ডার কমিশনার গলির একটি মেস থেকে মামুন শিকদার (৩৯) নামের এক যুবকের গুলিবিদ্ধ লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। নিহত মামুন পেশায় গাড়িচালক ছিলেন। লাশ উদ্ধারের সময় ঘটনাস্থলে ইয়াবা ট্যাবলেট পাওয়া যায়। মাদকসংক্রান্ত কারণে তাকে হত্যা করা হয়ে থাকতে পারে বলে পুলিশের ধারণা।
গত ১০ নভেম্বর সকালে পুরান ঢাকার ঢাকা মহানগর দায়রা জজ আদালতের ফটকের বিপরীতে ন্যাশনাল মেডিকেল ইনস্টিটিউট হাসপাতালের সামনে জনসমক্ষে গুলি করে হত্যা করা হয় তারিক সাইফ মামুনকে (৫৫)। ঘটনার পর পুলিশ জানায়, আন্ডারওয়ার্ল্ডের দ্বন্দ্বের জেরে এই হত্যাকাণ্ড ঘটে। এর আগে ২৫ মে রবিবার রাতে মধ্যবাড্ডার গুদারাঘাট এলাকায় সন্ত্রাসীদের এলোপাতাড়ি গুলিতে নিহত হন গুলশান থানা বিএনপির যুগ্ম সম্পাদক কামরুল আহসান সাধন। গত ২১ মার্চ গুলশানে পুলিশ প্লাজার সামনের সড়কে সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমন (৩৩) নামের ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সংযোগ ব্যবসায়ীকে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা।
ঢাকায় নৃশংস হত্যাকাণ্ড বেড়ে যাওয়ার প্রসঙ্গে আলাপকালে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গণমাধ্যম শাখার উপকমিশনার (ডিসি) মুহাম্মদ তালেবুর রহমান খবরের কাগজকে বলেন, ‘মাসে গড়ে ১৯ থেকে ২০টি খুনের ঘটনা ঘটে থাকে। এগুলো মূলত- পারিবারিক কলহ, পূর্ব শত্রুতার জের, আধিপত্য বিস্তারকে কেন্দ্র করে হচ্ছে। এমনকি অজ্ঞাতনামা নবজাতকের লাশ উদ্ধার হলেও খুনের মামলা রুজু করা হয়।’
তালেবুর রহমান বলেন, ‘ঢাকা মহানগরীর জনসংখ্যা, আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপট বিবেচনায় ঘটনার সংখ্যা সহনীয় পর্যায়ে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে সংঘটিত বেশির ভাগ খুনের ঘটনার রহস্য উদঘাটনসহ জড়িতদের আইনের আওতায় নিয়ে আসা হচ্ছে।’
এ প্রসঙ্গে পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মোহাম্মদ নুরুল হুদা খবরের কাগজকে বলেন, ‘কোথায় হত্যাকাণ্ড ঘটতে পারে বা অপরাধ সংঘটিত হতে পারে সে বিষয়ে পুলিশের কাছে আগাম গোয়েন্দা তথ্য থাকতে হবে। সেই মোতাবেক কাজ করতে হবে, তবেই নৃশংস এসব হত্যাকাণ্ড বা বড় অপরাধ অনেকটা কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এ ছাড়া যেহেতু দেশের একটা বড় পরিবর্তন হয়েছে, এখন বিভিন্ন লোক ক্ষমতায় আসতে চাইবে, এখন তারা অনেক বেপরোয়া থাকবে। সুতরাং পুলিশকে আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে।’