দেশের প্রধানতম রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যখন যারা বিরোধী দলে ছিল তারাই তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি চেয়েছিল। আবার তারাই যে যখন সরকারে গেছে, তখন তত্ত্বাবধায়ক পদ্ধতির বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। সর্বশেষ যে আওয়ামী লীগ (বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ) সরকারের আমলে বিদায় নিয়েছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার, একসময়ে এই দলের আন্দোলনের ফল হয়েই জন্ম নিয়েছিল নির্বাচনকালীন এই সরকারব্যবস্থার।
১৯৯০ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর তৎকালীন প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে অস্থায়ী সরকারের অধীনে পরের বছর ১৯৯১ সালে যে নির্বাচনটি হয়েছিল, সেটি ছিল সর্বমহলে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচন। তবে বিএনপির আমলে ১৯৯৪ সালের মাগুরা-২ আসনে উপনির্বাচনের পর নিরপেক্ষ নির্দলীয় সরকারের দাবি ওঠে। তখনকার বিরোধী দল আওয়ামী লীগের নেতা মো. আসাদুজ্জামানের মৃত্যুতে শূন্য ওই আসনের ভোটে নিজেদের প্রার্থী কাজী সালিমুল হক কামালকে জয়ী করতে বিএনপির তৎপরতায় উপনির্বাচনটি প্রশ্নবিদ্ধ হয়।
ওই উপনির্বাচনের পর জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে এলে তখন প্রধান বিরোধী দল আওয়ামী লীগ দাবি করে, দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন সুষ্ঠু হতে পারে না, তাই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা প্রয়োজন। পরে আওয়ামী লীগের দাবির সঙ্গে একমত হয় জাতীয় পার্টি, জামায়াতে ইসলামীসহ অন্যান্য বিরোধী দল। সংসদ থেকে একযোগে পদত্যাগ করেন তারা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থার দাবিতে তখন আওয়ামী লীগ অসহযোগ আন্দোলন করে টানা ৩৯ দিন। তবে বিএনপি তা না মেনে ১৯৯৬ সালের ১৫ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাচনের আয়োজন করে। ওই নির্বাচনের পর বিরোধীদের আন্দোলনের মধ্যেই খালেদা জিয়া প্রধানমন্ত্রী হিসেবে পুনরায় শপথ নেন। পরে ১৯ মার্চ সংসদ অধিবেশন বসে শুধু তত্ত্বাবধায়ক সরকার বিল পাসের জন্য। এরপর সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনীর মাধ্যমে ২৬ মার্চ ভোররাতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত করা বিলটি পাস হয়। এর ধারাবাহিকতায় ১৯৯৬ সালের ৩০ মার্চ খালেদা জিয়া পদত্যাগ করেন এবং ভেঙে যায় ষষ্ঠ জাতীয় সংসদ।
তখনকার সদ্য সাবেক প্রধান বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমানকে প্রধান উপদেষ্টা করে গঠিত হয় প্রথম তত্ত্বাবধায়ক সরকার। এরপর ১৯৯৬ সালেই সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয় দেশে। সেটি ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে প্রথম জাতীয় নির্বাচন। এরপর ২০০১ সালের নির্বাচনও হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে। পরে ২০০৬ সালে বিএনপির বিদায়ের সময় তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠন নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের আইন ছিল, সর্বশেষ অবসরে যাওয়া প্রধান বিচারপতি হবেন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান। তবে বিএনপি সরকার বিচারকদের অবসরের বয়সসীমা বাড়ায়। যার ফলে বিচারপতি কে এম হাসানের আসন্ন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হওয়ার পথ তৈরি হয়। কিন্তু কে এম হাসান একসময় বিএনপি করতেন- এমন অভিযোগ তুলে আওয়ামী লীগ তার ব্যাপারে আপত্তি তোলে। বলে দেয় তারা কে এম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে মানে না। আওয়ামী লীগের অভিযোগ ছিল, তাকে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা করতেই বিচারপতিদের বয়স বাড়ানো হয়েছে।
রাজনীতির এমন ঘোলাটে অবস্থায় কে এম হাসান তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দায়িত্ব নিতে অপারগতা জানান। তারপর সাংবিধানিক অন্যান্য বিকল্পের ক্রম অনুসরণ না করে রাষ্ট্রপতি ইয়াজউদ্দীন আহম্মেদ সরাসরি নিজেই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হন। এতে তৈরি হয় রাজনৈতিক অচলাবস্থা।
একপর্যায়ে ২০০৭ সালে জরুরি অবস্থার মধ্যে ফখরুদ্দীন আহমদের নেতৃত্বে গঠিত হয় তত্ত্বাবধায়ক সরকার। তাদের আমলে ২০০৮ সালে হয় জাতীয় নির্বাচন। সেটিই ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে সর্বশেষ সাধারণ নির্বাচন।
ওই নির্বাচনে জিতে ২০০৯ সালে সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। তবে তারা ২০১১ সালে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী এনে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিল করে। দলটির নেতারা তখন যুক্তি হিসেবে দেখিয়েছিলেন যে সুপ্রিম কোর্টের আপিল বিভাগের একটি রায়ের কারণে তারা এটি করেছেন। ওই রায়ে তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে অসাংবিধানিক বলা হয়েছিল।
প্রসঙ্গত, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা যুক্ত করে সংবিধানে ত্রয়োদশ সংশোধনী আনার বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে আইনজীবী এম সলিম উল্লাহসহ কয়েকজন আদালতে গিয়েছিলেন। তবে হাইকোর্ট ২০০৪ সালের ৪ আগস্ট তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থাকে বৈধ বলে রায় দেন। তাতে বলা হয়, ‘ত্রয়োদশ সংশোধনী সংবিধানসম্মত ও বৈধ। এ সংশোধনী সংবিধানের কোনো মৌলিক কাঠামোকে ক্ষতিগ্রস্ত করেনি।’
রিট আবেদনকারীরা হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগে গিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যাওয়ার পর ২০১১ সালের মার্চে আপিল বিভাগে সেই আপিলের শুনানি শুরু হয়। অতি গুরুত্বপূর্ণ এই মামলার শুনানিতে আদালত আটজন অ্যামিকাস কিউরির মতামত শোনেন। তাদের মধ্যে টি এইচ খান, কামাল হোসেন, আমীর-উল ইসলাম, মাহমুদুল ইসলাম ও রোকনউদ্দিন মাহমুদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা রাখার পক্ষে মত দেন। রফিক-উল হক ও এম জহিরের মত ছিল তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংস্কারের। শুধু আজমালুল হোসেন (কেসি) বলেছিলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা সংবিধানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
২০১১ সালের ১০ মে তৎকালীন প্রধান বিচারপতি এ বি এম খায়রুল হকের নেতৃত্বে আপিল বিভাগ রায়ে বলেন, তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা অবৈধ ও অসাংবিধানিক। অবশ্য রায়ে বলা হয়েছিল, সংবিধানের ত্রয়োদশ সংশোধন অসাংবিধানিক ও অবৈধ হলেও জাতীয় সংসদ তার বিবেচনা এবং সিদ্ধান্ত অনুসারে দশম ও একাদশ জাতীয় নির্বাচনকালে প্রয়োজনমতো নতুনভাবে ও আঙ্গিকে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারবে। সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে ওই রায় দিয়েছিলেন আপিল বিভাগ।
রায় ঘোষণার ১৬ মাস পর ২০১২ সালের ১৬ সেপ্টেম্বর ৭৪৭ পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ রায় প্রকাশ করেন আপিল বিভাগ। যদিও এই পূর্ণাঙ্গ রায়ে পরবর্তী দুটি নির্বাচন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে করার বিষয়টি রাখা হয়নি।
এদিকে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায়ের আগেই সংবিধান সংশোধনের উদ্যোগ নিয়েছিল। ২০১১ সালের ৩০ জুন সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিল সংসদে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে পাস হয়। তাতে বাতিল হয়ে যায় তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা।
এবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের বিপক্ষে অবস্থান নেয় তখনকার সংসদের বিরোধী দল বিএনপি। দলটি তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফেরানোর জন্য আন্দোলনের ডাক দেয়।
এর মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক আর ফেরেনি। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় থাকা অবস্থাতেই অনুষ্ঠিত হয় ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের সাধারণ নির্বাচন।
এদিকে ২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় আসার পর তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা বাতিলের রায় পুনর্বিবেচনা (রিভিউ) চেয়ে বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, পাঁচ বিশিষ্ট নাগরিক ও এক ব্যক্তি আদালতে আবেদন করেন।
এর মধ্যে ২০২৪ সালের অক্টোবরে একটি আবেদন করেন বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। এর আগে রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে আবেদন করেন সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) সম্পাদক বদিউল আলম মজুমদারসহ পাঁচ বিশিষ্ট ব্যক্তি। অন্য চারজন হলেন তোফায়েল আহমেদ, এম হাফিজউদ্দিন খান, জোবাইরুল হক ভূঁইয়া ও জাহরা রহমান। রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে ২০২৪ সালের ২৩ অক্টোবর আরেকটি আবেদন করেন জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তা ছাড়া নওগাঁর রানীনগরের নারায়ণপাড়ার বাসিন্দা বীর মুক্তিযোদ্ধা মো. মোফাজ্জল হোসেন আপিল বিভাগের রায় পুনর্বিবেচনা চেয়ে ২০২৪ সালে একটি আবেদন করেন। আবেদনগুলোর ওপর শুনানি নিয়ে গতকাল রায় ঘোষণা করেন আপিল বিভাগ।
আইনজীবীরা বলছেন, রায় অনুসারে পুনরুজ্জীবিত ও পুনর্বহাল হওয়াটা সংবিধানের ৫৮বি ও ৫৮সি অনুচ্ছেদ সাপেক্ষে প্রয়োগ-কার্যকর হবে। বিদ্যমান সংবিধানের ওই অনুচ্ছেদে বলা আছে- সংসদ ভেঙে দেওয়ার ১৫ দিনের মধ্যে তত্ত্বাবধায়ক সরকার গঠিত হবে। এখন সংসদ নেই। তাই আদালত বলেছেন, এখন নয়, সামনে থেকে কার্যকর হবে।
আইনজীবীরা বলেন, রায় কার্যকরের আইনি প্রক্রিয়া হচ্ছে- ভবিষ্যতে জাতীয় সংসদ তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা ফিরিয়ে এনে বিল পাস করলে তা সংবিধানে সন্নিবেশিত হবে বা পুনরুজ্জীবিত হবে।