ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটের আর মাত্র ২২ দিন বাকি। এর আগে নির্বাচন কমিশনের (ইসি) সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও আলোচিত ধাপ ছিল ৯ দিনব্যাপী আপিল শুনানি ও নিষ্পত্তি কার্যক্রম। রিটার্নিং কর্মকর্তাদের প্রাথমিক বাছাইয়ে বাদ পড়া ৭২৩ জন প্রার্থীর মধ্যে ৬৪৫ জন আপিল করেছিলেন। গত রবিবার শুনানি শেষে ৪১৮ জন প্রার্থী আবারও ভোটের মাঠে ফিরলেও নির্বাচনি প্রতিযোগিতা থেকে ছিটকে পড়েছেন ২২৭ জন। নির্বাচনি আইন অনুযায়ী, প্রার্থিতা ফিরে পেতে তাদের শেষ ভরসা এখন উচ্চ আদালত।
নির্বাচন বিশ্লেষকরা বলছেন, এ পর্যায়ে ইসিতে আপিল খারিজ হওয়া ব্যক্তিদের সামনে এখন দুটি পথ– উচ্চ আদালতে রিট করা অথবা নির্বাচনি দৌড় থেকে সরে দাঁড়ানো। এছাড়া ভোটের আগে সময়ের স্বল্পতা, আইনি ব্যয় ও অনিশ্চয়তার কারণে সবার পক্ষে আদালতে যাওয়াও সম্ভব হয় না।
ইসি সূত্র জানায়, গত ২৯ ডিসেম্বর মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিনে সারা দেশে আড়াই হাজারের বেশি মনোনয়নপত্র জমা পড়ে। ৩০ ডিসেম্বর থেকে ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত রিটার্নিং কর্মকর্তাদের যাচাই-বাছাইয়ে ৩০০ আসনে বৈধ প্রার্থী ছিলেন ১ হাজার ৮৪২ জন। একই সঙ্গে ৭২৩ জনের মনোনয়নপত্র বাতিল হয়। বাতিল হওয়াদের মধ্যে ৬৪৫ জন ইসির আপিল আদালতে আবেদন করেন। ১০ জানুয়ারি থেকে ১৯ জানুয়ারি পর্যন্ত টানা ৯ দিনের শুনানি শেষে ইসি ৪১৮ জন প্রার্থীর আপিল মঞ্জুর করে। ফলে বৈধ প্রার্থীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ২৫৩ জনে। তবে আপিল খারিজ হওয়ায় বা শুনানিতে ব্যর্থ হওয়ায় ২২৭ জন এ পর্যায়ে নির্বাচনি প্রতিযোগিতা থেকে বাদ পড়েছেন।
আলোচিত প্রার্থীদের কেউ ফিরলেন, কেউ বাদ
আপিল শুনানিতে কয়েকজন আলোচিত প্রার্থী ভোটের মাঠে ফিরেছেন। কুমিল্লা-৩ আসনে বিএনপির প্রার্থী কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদের প্রার্থিতা বহাল রেখেছে ইসি। দ্বৈত নাগরিকত্বের অভিযোগে রবিবার আপিল শুনানি শেষে তার বিষয়ে সিদ্ধান্ত অপেক্ষমাণ ছিল। গতকাল ১৯ জানুয়ারি কমিশন তার প্রার্থিতা বৈধ ঘোষণা করেছে। আপিলে ফিরেছেন সাবেক মন্ত্রী লতিফ সিদ্দিকী ও কয়েকজন স্বতন্ত্র প্রার্থীও। অন্যদিকে কুমিল্লা-৪ আসনের চারবারের সংসদসদস্য মঞ্জুরুল আহসান মুন্সী, চট্টগ্রাম-৯ আসনের জামায়াত প্রার্থী এ কে এম ফজলুল হকসহ একাধিক পরিচিত মুখের প্রার্থিতা শুনানিতে বাতিল করা হয়েছে। এছাড়া ইসির আপিল আদালত থেকে বিএনপি ও জাতীয় পার্টির একাধিক আলোচিত নেতাও প্রার্থিতা ফিরে না পেয়ে ভোটের মাঠ থেকে ছিটকে পড়েছেন।
ইসির আইনি কার্যক্রম কী বলে
গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (আরপিও) অনুযায়ী, রিটার্নিং কর্মকর্তা কোনো প্রার্থীর মনোনয়নপত্র বাতিল করলে, সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি প্রথমে নির্বাচন কমিশনে আপিল করবেন। নির্বাচন কমিশন এই আপিল শুনানি করে সিদ্ধান্ত জানায়। ইসির সিদ্ধান্তে কেউ সন্তুষ্ট না হলে তিনি হাইকোর্ট বিভাগে রিট পিটিশন দায়ের করতে পারেন। আদালত চাইলে ইসির সিদ্ধান্ত স্থগিত করতে পারেন বা প্রার্থীকে নির্বাচনে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার নির্দেশ দিতে পারেন। আদালতের আদেশ পেলে ইসি তা বাস্তবায়নে বাধ্য। তবে নির্বাচনি তফসিল খুব সংক্ষিপ্ত হওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যালট পেপার ছাপার আগেই রায় পাওয়া বড় চ্যালেঞ্জ।
ভোটের আগে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার ইতিহাস
বাংলাদেশের সংসদীয় নির্বাচনে ভোটের খুব কাছাকাছি সময়ে উচ্চ আদালতের আদেশে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়ার নজির নতুন নয়। ২০০৮ সালের নবম সংসদ নির্বাচনে সাবেক মন্ত্রী মহীউদ্দীন খান আলমগীর উচ্চ আদালতের আদেশে ভোটের আগ মুহূর্তে প্রার্থিতা ফিরে পেয়েছিলেন। ২০১৮ সালের একাদশ সংসদ নির্বাচনেও ক্ষমতাসীন দল ও বিরোধী দলের একাধিক প্রার্থী ভোটের এক সপ্তাহ আগে আদালতের আদেশে নির্বাচনি মাঠে ফেরেন। সাধারণত উচ্চ আদালতের এসব আদেশ আসে ভোটের ৫ থেকে ১০ দিন আগে, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যালট পেপার ছাপার পরও। ফলে সংশ্লিষ্ট প্রার্থীদের ওই সব আসনে ভোট আয়োজনে ইসিকে প্রশাসনিক ও আইনি জটিলতার মুখে পড়তে হয়।
শেষ মুহূর্তে প্রার্থিতা: ইসির বিপত্তি
ভোটের সময় ঘনিয়ে এলে ইসি চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা, ব্যালট পেপার ছাপানো, প্রতীক বরাদ্দ, ভোটকেন্দ্রে ব্যালট পাঠানো ও কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ শেষ করে ফেলে। এই পর্যায়ে আদালতের আদেশে কেউ প্রার্থিতা ফিরে পেলে– ব্যালট পেপার পুনর্মুদ্রণ বা অতিরিক্ত ব্যালট যোগ করতে হয়, ইতোমধ্যে পাঠানো ব্যালটে সংশোধন সম্ভব না হলে বিশেষ নির্দেশনা দিতে হয়, ভোটারদের কাছে প্রার্থীর নাম ও প্রতীক পৌঁছাতে নতুন করে প্রচার চালাতে হয়। ফলে নির্বাচনি ব্যয় বাড়ে, অনেক ক্ষেত্রে সময়সূচিও ব্যাহত হয়।
বিশ্লেষকদের মত
ইসির সাবেক অতিরিক্ত সচিব ও নির্বাচন বিশ্লেষক জেসমিন টুলী এ বিষয়ে খবরের কাগজকে বলেন, ‘ভোটের কয়েক দিন আগে প্রার্থিতা ফিরে পাওয়া আইনি দিক থেকে বৈধ হলেও নির্বাচন ব্যবস্থাপনার জন্য এটি অত্যন্ত বিব্রতকর। এতে ইসির নিরপেক্ষতা নয়, বরং প্রস্তুতি ও দক্ষতার ওপর চাপ পড়ে। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো সব প্রার্থীর জন্য সমান মাঠ নিশ্চিত করা এবং ভোটারদের কাছে সমান তথ্য পৌঁছানো।’ তার মতে, মনোনয়ন ও আপিল নিষ্পত্তির সময়সীমা আরও আগে নির্ধারণ করা না গেলে ভবিষ্যতেও এ ধরনের বিপত্তি কাটানো সম্ভব নয়।
ইসির নির্বাচনি তফসিল অনুযায়ী, আজ ২০ জানুয়ারি প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ দিন, আগামীকাল ২১ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রার্থী তালিকা প্রকাশ এবং তাদের মাঝে প্রতীক বরাদ্দ করা হবে। ২২ জানুয়ারি থেকে সারা দেশে নির্বাচনি প্রচার শুরু হবে। সব শেষে ভোটের আগে স্পষ্ট হবে কতজন বাদ পড়া ব্যক্তি আদালতের আদেশে শেষ মুহূর্তে ভোটের মাঠে ফিরতে পারবেন, আর কতজন এই নির্বাচন থেকে চূড়ান্তভাবে বাদ পড়বেন।