দীর্ঘ ২৫ বছর সৌদি আরবে হাড়ভাঙা খাটুনির বিনিময়ে আব্বাস উদ্দিন যে কষ্টার্জিত অর্থ দেশে পাঠাতেন, পরিবারের খরচ শেষে তার অধিকাংশই জমা থাকত এক্সিম ব্যাংকে। ভবিষ্যতে দেশে ফিরে একটি বাড়ি করে নিশ্চয়তার জীবন কাটাবেন–সেই আশায় প্রায় ১ কোটি টাকা এফডিআর করে রেখেছিলেন। এখন দেশে ফিরে দুই বছর ধরে ঘুরেও সেই টাকা তুলতে পারছেন না। এখন আবার বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, দুই বছরের মুনাফা কেটে রাখবে। ফলে তার সুখের জীবন এখন দুঃস্বপ্নে ভরে গেছে। স্ত্রী ও তিন সন্তান নিয়ে সংসার চালানোই এখন কঠিন হয়ে গেছে।
আব্বাস উদ্দিনের মতো অধিকাংশ প্রবাসীদের এখন একই অবস্থা। একীভূত করা পাঁচ ব্যাংকের আমানতকারীদের হিসাব থেকে ২০২৪ ও ২০২৫ সালের মুনাফা কেটে নেওয়ার সিদ্ধান্তের বিরূপ প্রভাব পড়ছে দেশের বর্তমান অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি প্রবাসী আয়ে। যদিও আমানতকারীদের আন্দোলনে চাপের মুখে বাংলাদেশ ব্যাংক পরবর্তী সময়ে তা সংশোধন করে বলেছে, ৪ শতাংশ হারে মুনাফা দেওয়া হবে। কিন্তু বাংলাদেশ ব্যাংকের এমন সিদ্ধান্তও প্রত্যাখ্যান করেছেন আমানতকারীরা। তারা পুরো মুনাফাসহ সব ধরনের লেনদেন স্বাভাবিক করার দাবি জানিয়েছেন। যে পাঁচটি ব্যাংক একীভূত করে সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক গঠন করা হয়েছে, সবগুলো শরিয়াহভিত্তিক ব্যাংক। এসব ব্যাংকের মাধ্যমেই প্রবাসীদের পাঠানো অধিকাংশ রেমিট্যান্স আসত। তারা তাদের কষ্টার্জিত অর্থের একটি অংশ পরিবারের খরচের জন্য পাঠালেও একটি অংশ ব্যাংকেই রেখে দিতেন। সেই টাকা থেকে যদি দুই বছরের মুনাফা কেটে নেয়, তাহলে তারা অনেকেই আর দেশে টাকা পাঠাবেন না বলে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সৌদি আরবপ্রবাসী রাশেদুল ইসলাম বর্তমানে দেশে ছুটিতে এসেছেন। জানতে চাইলে তিনি খবরের কাগজকে বলেন, ‘মুনাফা কাটার যে সিদ্ধান্ত বাংলাদেশ ব্যাংক নিয়েছে, তা মোটেও ঠিক নয়। আমাদের কষ্টার্জিত অর্থের নিরাপত্তা যদি সরকার না দিতে পারে, তাহলে প্রবাসীরা কেন রেমিট্যান্স পাঠাবেন? আর পাঠালেও তখন প্রবাসীরা বৈধ উপায়ে অর্থাৎ ব্যাংকিং চ্যানেলে না পাঠিয়ে অবৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাবেন। ফলে ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স কমে যাবে।’ একই বিষয়ে ফ্রান্সে অবস্থানরত প্রবাসী দুলাল মিয়া খবরের কাগজকে বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের দায়িত্ব হচ্ছে আমানতের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু তারাই যদি আমানতের খেয়ানত করে তাহলে অবশ্যই রেমিট্যান্সেও এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। কারণ আমরা যারা রেমিট্যান্স পাঠাই, অবশ্যই আমরা আমাদের আমানতের নিরাপত্তা চাই। সরকার বা বাংলাদেশ ব্যাংক যদি সেই নিরাপত্তা দিতে না পারে, তাহলে আমরা কেন ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স পাঠাব?’
এদিকে গত বুধবার কুয়েতে অবস্থানরত প্রবাসীরা এ বিষয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তারাও বলছেন, ‘আমরা আমাদের আমানতের নিরাপত্তা চাই। যখন-তখন বাংলাদেশ ব্যাংক যেকোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারে না।’ তারা বলেন, নো হেয়ার কাট, নো হেয়ার কাট।
বাংলাদেশ ব্যাংকের রেমিট্যান্স-সংক্রান্ত প্রতিবেদনেও প্রবাসীদের এমন মন্তব্যের প্রমাণ পাওয়া যায়। প্রতিবেদন অনুযায়ী, এ মাসের প্রথম সাত দিনে রেমিট্যান্স এসেছে ৯০ কোটি ৭০ লাখ ডলার। ৮-১৪ তারিখে রেমিট্যান্স এসেছে ৭৯ কোটি ৬০ লাখ ডলার। আর ১৪ জানুয়ারি বাংলাদেশ ব্যাংক মুনাফা কাটার সিদ্ধান্ত জানিয়ে চিঠি দিয়েছে পাঁচ ব্যাংকের প্রশাসকের কাছে। এর পর থেকে কমতে থাকে রেমিট্যান্স। ১৫-২১ জানুয়ারি রেমিট্যান্স কমে এসেছে ৬২ কোটি ৮০ লাখ ডলারে।
নতুন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকিং চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স পাঠানোর পরিমাণ অব্যাহতভাবে বাড়ছে। এ ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদবিরোধী মনোভাব অন্যতম ভূমিকা রেখেছে। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পাঁচ ব্যাংকের মুনাফা কাটার ঘোষণা দেওয়ার পর থেকেই রেমিট্যান্সপ্রবাহ কিছুটা কমে যাচ্ছে।
এমন পরিস্থিতি চলতে থাকলে আগামীতে মারাত্মক প্রভাব পড়বে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা। তারা বলেন, সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।
এ ব্যাপারে ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফাইন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের নির্বাহী পরিচালক ও বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. মুস্তফা কে মুজেরী খবরের কাগজকে বলেন, ‘বর্তমান সামষ্টিক অর্থনীতিতে যে ইতিবাচক প্রবণতা তৈরি হয়েছে, তার মূলে অন্যতম ভূমিকা রাখছে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স। ফলে সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের অন্যতম দায়িত্ব হচ্ছে সেই রেমিট্যান্সের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কিন্তু সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের সিদ্ধান্তে একীভূত হওয়া পাঁচটি ব্যাংকের আমানতকারীদের হিসাব থেকে দুই বছরের মুনাফা কেটে নেওয়ার ঘোষণায় দেশের পাশাপাশি প্রবাসী আমানতকারীরাও সেটা মানতে চাইছেন না। এই অবস্থায় সরকার এবং বাংলাদেশ ব্যাংককে অবশ্যই এমন সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করা উচিত।’
এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ডিসেম্বর পর্যন্ত প্রতি মাসেই রেমিট্যান্সপ্রবাহ বেড়েছে। গত ডিসেম্বরে দেশে প্রবাসী আয় এসেছে ৩২২ কোটি ডলার। এর আগের মাস নভেম্বরে এসেছিল প্রায় ২৮৯ কোটি ডলার। এর মানে, নভেম্বরের চেয়ে ডিসেম্বরে প্রবাসী আয় ৩৩ কোটি ডলার বেশি এসেছে। ২০২৫ সালে সব মিলিয়ে দেশে ৩ হাজার ২৮২ কোটি ডলারের প্রবাসী আয় এসেছিল। ২০২৫ সালে প্রবাসী আয়ের গতি বেশ ভালো থাকায় ডলারের তেমন সংকট দেখা যায়নি। ডলারের বাজার স্থিতিশীল রাখতে বছরজুড়েই বিভিন্ন ব্যাংক থেকে ডলার কিনেছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এর ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বা মজুত বেড়েছে, যা বেড়ে ৩২ বিলিয়ন তথা ৩ হাজার ২০০ কোটি ডলারে উন্নীত হয়েছে।