অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনে ঘাপটি মেরে থাকা কর্মকর্তাদের একটি গ্রুপ হঠাৎ ক্ষমতাধর হয়ে ওঠেন। ক্ষমতাধর এই কর্মকর্তারা একটি বিশেষ গোষ্ঠীর অনুগত। গত দেড় বছরে তারাই প্রশাসনে ছড়ি ঘুরিয়েছেন। তারাই পেয়েছেন ‘প্রাইস পোস্টিং’। সদ্য সমাপ্ত নির্বাচনে যেসব আসনে বিএনপির প্রার্থীরা পরাজিত হয়েছেন, সেখানে কর্তব্য পালনকারী ডিসিদের দিকে রয়েছে আলাদা দৃষ্টি। বিশেষ গোষ্ঠীর অনুগত ক্ষমতাধর কর্মকর্তারা পদোন্নতি, পদায়নে একচ্ছত্র প্রভাব বিস্তার করেছেন– এমন অভিযোগ প্রশাসনেরই সাধারণ কর্মকর্তাদের। বিশেষ গোষ্ঠীর সমর্থক এসব কর্মকর্তার তালিকা তৈরির কাজ শুরু করেছেন বঞ্চিত ও হয়রানির শিকার কর্মকর্তারা।
বঞ্চিত ও হয়রানির শিকার কর্মকর্তাদের অভিযোগ, বিশেষ গোষ্ঠীর অনুগত ও সমর্থক কর্মকর্তারা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময় সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট হয়ে প্রায় সব ক্ষেত্রেই প্রশাসন এবং কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। অন্তর্বর্তী সরকারের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ, প্রধান উপদেষ্টার কার্যালয় এবং কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে বিশেষ গোষ্ঠীর অনুগত ও সমর্থক শীর্ষ কর্মকর্তাদের প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রধান উপদেষ্টার প্রেস উইংয়েও প্রভাব ছিল এই বিশেষ গোষ্ঠীর কর্মকর্তাদের।
নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে পদোন্নতি যোগ্য প্রশাসনের একাধিক ব্যাচের কর্মকর্তারা অভিযোগ করে জানান, তারা এতটাই বেপরোয়া ছিলেন যে, সুপরিয়ির সিলেকশন বোর্ডের (এসএসবি) একাধিক বৈঠকে নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে প্রশাসনের যুগ্ম সচিব পদের কর্মকর্তাদের (নিয়মিত ব্যাচ ২০তম) অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি দেওয়ার সিদ্ধান্ত সত্ত্বেও তা কার্যকর করা যায়নি দীর্ঘ দিন। সচিবালয়ে কর্মরত এই আদর্শের কর্মকর্তারা নিজেদের অনুগত কর্মকর্তাদের অধিকসংখ্যক পদোন্নতির দাবিতে ২০তম ব্যাচের কর্মকর্তাদের এই পদোন্নতি আটকে রেখেছিলেন প্রায় ১ বছর, যা তাদের ছড়ি ঘোরানোর অন্যতম উদাহরণ হয়ে আছে প্রশাসনে।
জনপ্রশাসন বিষয়ক কমিটি যুগ্ম সচিব হিসেবে বাদ পড়া ২৪তম ব্যাচের যোগ্য কর্মকর্তাদের পদোন্নতির রিভিউ করার সুপারিশ করেছিল। তবে ওই ‘ছড়ি ঘোরানো’ গোষ্ঠীর চাপে তা করা সম্ভব হয়নি।
অথচ এরই মধ্যে প্রশাসনের ২১তম ও ২২তম ব্যাচ অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন। আবার নিয়মিত ব্যাচ হিসেবে ২৫তম ব্যাচ যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন। পাশাপাশি ৩১তম ব্যাচের কর্মকর্তারাও উপসচিব পদে পদোন্নতির যোগ্যতা অর্জন করেছেন। সব ব্যাচের পদোন্নতি আটকে আছে নির্দিষ্ট ওই গোষ্ঠীর চাপে।
কর্মকর্তারা জানান, অন্তর্বর্তী সরকারের প্রায় পুরোটা সময় তারা প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলো প্রভাবিত করার চেষ্টা করেছেন। সরকারের পক্ষ থেকে পদোন্নতি, পদায়নের যেকোনো সিদ্ধান্ত ভিন্ন আদর্শের ওই কর্মকর্তারা ঠেকিয়ে দিয়েছেন। সবকিছু তারা নিজেদের প্রভাব বলয়ে রাখতে চেষ্টা করেছেন। এ জন্য টার্গেট করে কর্মকর্তাদের কখনো ফ্যাসিস্ট সমর্থক, কখনো ভিন্ন আদর্শের কর্মকর্তা, কখনো অযোগ্য, কখনো দুর্নীতিপরায়ণ বলে অভিযোগ এনে অপপ্রচার চালানো হয়েছে। এতে প্রশাসনের গতিশীলতা রুদ্ধ হয়েছে। অপবাদ দিয়ে যোগ্য কর্মকর্তাদের অগুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করে প্রশাসনের ক্ষতি করা হয়েছে।
হতাশা প্রকাশ করে প্রশাসনের সাধারণ কর্মকর্তারা জানান, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মন্ত্রণালয় ও বিভাগে একটি রাজনৈতিক দলের আদর্শিক কর্মকর্তাদের শীর্ষ পদে নিয়োগ দেয় অন্তর্বর্তী সরকার। আর এরই সুযোগ নিয়ে এসব কর্মকর্তা নানা অপকর্মে লিপ্ত হন। সরকারের অনেক সিদ্ধান্তেই প্রভাব বিস্তারের সুযোগ হয় তাদের। কয়েকজন কর্মকর্তা বলেন, কিছু দিন আগে বিতর্কিত কয়েকজন কর্মকর্তা, অপপ্রচার করে স্থানীয় সরকার বিভাগের দক্ষ ও যোগ্য ১৫ কর্মকর্তাকে একযোগে কম গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি করে দিতে সক্ষম হয়। এতে আপাতত তাদের লাভ হলেও ক্ষতি হয়েছে সরকার ও প্রশানের।
এদিকে সম্প্রতি প্রশাসনের ভেতরে দীর্ঘদিন ঘাপটি মেরে থাকা বিশেষ গোষ্ঠীর সমর্থক কর্মকর্তাদের দ্রুত অপসারণের দাবি তুলেছে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তাদের সংগঠন বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিস অ্যাসোসিয়েশন (বিএএসএ)। সংগঠনটির নেতারা বলছেন, অতীতে রাজনৈতিক কারণে পদোন্নতি থেকে বঞ্চিত ও উপেক্ষিত কর্মকর্তাদের যোগ্যতার ভিত্তিতে রিভিউ করে দ্রুত পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন না করলে প্রশাসনে নিরপেক্ষতা ফেরানো কঠিন হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের সময় যারা ছড়ি ঘুরিয়েছেন, তাদের একটি তালিকা তারা তৈরি করছেন বলে জানা গেছে। এই তালিকায় প্রশাসন ক্যাডারের পাশাপাশি তথ্য ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নামও রয়েছে।
সাধারণ কর্মকর্তারা জানান, প্রশাসনে প্রয়োজন দলনিরপেক্ষ, পেশাদার ও দক্ষ কর্মকর্তা। তাদের মতে, গত ১৪ ফেব্রুয়ারি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের দায়িত্বে থাকা শেখ আবদুর রশীদের চুক্তির অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিল করে সরকার। এরপরই প্রশাসনে বিশেষ গোষ্ঠীর অনুগত ও সমর্থক কর্মকর্তারা বদলি আতঙ্কে ভুগছেন। গত ১২ ফেব্রুয়ারি বিএনপি জোট নিরঙ্কুশ বিজয়ে ক্ষমতায় ফিরে আসায় এখন গত দেড় বছর গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগে প্রভাব বিস্তারকারী কর্মকর্তারা তুলনামূলক কম গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরে পদায়নের চেষ্টা করছেন। আবার তাদেরই কিছু কর্মকর্তা নিজেদের বিএনপি সমর্থক প্রমাণের চেষ্টা করছেন।