চব্বিশের জুলাই অভ্যুত্থানসংশ্লিষ্ট হত্যা মামলাগুলোর মধ্যে ১৬৩টির তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। তবে জমা দেওয়া এসব মামলার মধ্যে অন্তত ৪৬টির প্রতিবেদনে অভিযোগ ‘অপ্রমাণিত’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। আবার ১৪টি মামলা ‘মিথ্যা’ হিসেবেও চিহ্নিত করা হয়েছে। সে হিসাবে ৬০টি মামলাকে পিবিআই অপ্রমাণিত হিসেবে উল্লেখ করেছে।
পিবিআইয়ের তদন্তসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মামলার এজাহার বা অভিযোগের অসংলগ্ন বর্ণনা, সাক্ষী-প্রমাণ ও আসামির নাম-পরিচয়ে গরমিল, বাদীকে না পাওয়া বা বাদীর মামলা চালাতে না চাওয়াসহ এমন নানা অসংগতির ভিত্তিকে ওই ৬০টি মামলার তদন্ত প্রতিবেদন ‘অপ্রমাণিত’ হিসেবে আদালতে জমা দেওয়া হয়।
পিবিআই সদর দপ্তর থেকে জানা গেছে, জুলাই অভ্যুত্থান বা বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ঘটনায় হত্যাকাণ্ডের মামলাগুলো পিবিআই ছাড়াও আরও অন্য সংস্থা বা ইউনিট তদন্ত করছে। এর মধ্যে ২৭২টি মামলার তদন্তের দায়িত্ব পায় পিবিআই, যার মধ্যে আদালতে দায়ের হওয়া সিআর (কমপ্লেইন রেজিস্টার) মামলা ১৯৫টি এবং থানায় দায়ের হওয়া জিআর (জেনারেল রেজিস্টার) মামলা ৭৭টি।
পিবিআই সূত্র জানিয়েছে, তদন্তের দায়িত্ব পাওয়া মোট মামলার মধ্যে এখন পর্যন্ত ১৬৩টির (সিআর ১৩৪, জিআর ২৯) তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে জমা দিয়েছে পিবিআই। এর মধ্যে ১০৩টির (সিআর ৮৪, জিআর ১৯) তদন্ত প্রতিবেদনে অভিযোগ ‘প্রমাণিত’ উল্লেখ করা হয়েছে। বাকি ৬০টি (সিআর ৫০, জিআর ১০) মামলার প্রতিবেদনকে ‘অপ্রমাণিত’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়, যার মধ্যে আবার ১৪টি মামলাকে ‘মিথ্যা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এই মিথ্যা মামলার মধ্যে সিআর মামলা ২টি এবং জিআর মামলা ১২টি। অন্যদিকে জিআর মামলা ৭৭টির মধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ৩৭টি, তদন্ত চলমান রয়েছে ৪০টি। এ ছাড়া সিআর মামলায় ১৯৫টির মধ্যে ইতোমধ্যে নিষ্পত্তি হয়েছে ১৩৪টি, তদন্ত চলমান রয়েছে ৬১টি।
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, ‘অপ্রমাণিত’ তদন্ত প্রতিবেদনকে সাধারণত চূড়ান্ত প্রতিবেদন বা ফাইনাল রিপোর্ট বলা হয়ে থাকে। এই ফাইনাল রিপোর্ট দুই ধরনের হয়, যার একটি ফাইনাল রিপোর্ট ‘সত্য’ এবং আরেকটি ফাইনাল রিপোর্ট ‘মিথ্যা’। ‘সত্য’ বলতে সাধারণত, ঘটনাটি সঠিক (যেমন: হত্যা বা মৃত্যুর বিষয়টি নিশ্চিত), কিন্তু অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে এজাহারের বিবরণ, সাক্ষী-প্রমাণ বা আসামি না পাওয়াকে বোঝায়। এ ছাড়া ‘মিথ্যা’ বলতে ঘটনা থেকে শুরু করে অভিযোগের প্রায় গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ভুয়া, অসংলগ্ন বা অস্পষ্ট।
এ প্রসঙ্গে পিবিআই সদর দপ্তরের গণমাধ্যম শাখার পুলিশ সুপার মো. আবু ইউসুফ খবরের কাগজকে বলেন, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনসংক্রান্ত যেসব মামলা পিবিআই তদন্তের দায়িত্ব পেয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে অনিষ্পন্ন প্রায় ৯০ শতাংশের তদন্ত-প্রক্রিয়া এরই মধ্যে সম্পন্ন করা হয়েছে। বাকি ১০ শতাংশ মামলার তদন্তও দ্রুত শেষ করতে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন পিবিআইয়ের সংশ্লিষ্টরা।
আবু ইউসুফ বলেন, ‘পিবিআই দেশের সাধারণ মানুষ ও সংশ্লিষ্টদের কাছে তদন্তের গ্রহণযোগ্যতার বিষয়ে যথেষ্ট আস্থা অর্জন করেছে। ফলে যেকোনো মামলা পিবিআইয়ে এলে সেগুলো অত্যন্ত পক্ষপাতহীনভাবে নিবিড় তদন্ত চালানো হয়। বহু ‘ক্লু’লেস মামলার তদন্ত করে রহস্য উদ্ঘাটনের মাধ্যমে পিবিআই এরই মধ্যে অনেক সাফল্য দেখিয়েছে। সে কারণে বহুল আলোচিত বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ওই সময়ের যেসব মামলা, সেগুলোকে অধিক গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা হচ্ছে।’
অন্যদিকে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টে ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে নিহতদের ঘটনায় যেসব হত্যা মামলা হয়েছে তার মধ্যে অনেকটির ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হয়নি। সাধারণভাবে হত্যা মামলায় লাশের ময়নাতদন্ত বিচার প্রক্রিয়ায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আদালতের নির্দেশনার মাধ্যমে তদন্ত সংস্থাগুলো কিছু লাশের (গলিত) ময়নাতদন্ত করলেও বেশ কিছুসংখ্যক লাশের বা মামলার ক্ষেত্রে তা হয়নি। ফলে এসব মামলার বিচারে কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে কি না, তা নিয়েও অনেকের মাঝে সংশয় রয়েছে।
এ প্রসঙ্গে পিবিআইয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা খবরের কাগজকে জানান, ওই ঘটনায় যেসব হত্যা মামলায় তদন্তে ময়নাতদন্ত রিপোর্ট নেই, সেখানে লাশ গোসলকারী, জানাজায় অংশগ্রহণকারী ইমাম এবং স্থানীয় ব্যক্তিদের সাক্ষ্যকে প্রধান প্রমাণ হিসেবে গণ্য করা হয়েছে। পাশাপাশি লাশের ছবি, ঘটনার ভিডিও এবং স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া মৃত্যুর সনদ ব্যবহার করে তদন্তের কাজ এগিয়ে নেওয়া হয়েছে বা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান খবরের কাগজকে বলেন, ‘ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন সাধারণত য কোনো হত্যা মামলার বিচার প্রক্রিয়ায় খুবই গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। তবে হত্যা মামলার বিচারটি কোন আদালতে হচ্ছে সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। যদি সাধারণ হত্যা মামলা বা দায়রা জজ আদালতের মামলা হয়, তখন ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন অনেকটাই অত্যাবশ্যকীয় হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু মামলাটি যদি বিশেষ আদালতের হয় বা বিশেষ ধরনের হয়, তখন ময়নাতদন্ত ছাড়াও বিচারিক কাজ সম্পন্ন হতে পারে। বিশেষ করে লাশ বা মরদেহ যদি সমুদ্রে ফেলা হয়, গায়েব করা হয়, পুড়িয়ে ফেলা হয় বা আসামি নিজেই হত্যার কথা স্বীকার করে, তখন এসব ক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত ছাড়াও বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা যায়।’
পুলিশ সদর দপ্তর সূত্রে জানা যায়, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন বা জুলাই অভ্যুত্থানসংক্রান্ত ঘটনায় সারা দেশের থানায় মোট মামলা হয় ১ হাজার ৭৩০টি। এর মধ্যে হত্যা মামলার সংখ্যা ৭৩১টি। এসব মামলার তদন্ত রয়েছে ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি), পিবিআই, সিআইডি এবং বিভিন্ন জেলা পুলিশের হাতে। এর মধ্যে শুধু রাজধানী ঢাকার (ডিএমপি) থানাগুলোতে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ওই ঘটনায় মোট ৭১৫টি মামলা হয়, যার মধ্যে হত্যা মামলা ৪৪৬টি।