ঢাকা ১১ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১, শনিবার, ২৫ মে ২০২৪

মায়ের জন্য

প্রকাশ: ১০ মে ২০২৪, ০৩:১৪ পিএম
মায়ের জন্য
ফরাসি আর্টিস্ট উইলিয়াম অ্যাডফ বাগরো এবং পিয়েরে অগ্যস্ত রনোয়ার এর আঁকা মা ও শিশু

মা যদি আমাদের ভালো না বাসতেন, আদর না করতেন, যত্ন না করতেন- তাহলে আমাদের জীবন এতটা সুন্দর ও মধুময় হয়ে উঠত না। কীভাবে? টাইমস অব ইন্ডিয়া অবলম্বনে বিস্তারিত জানাচ্ছেন আহমেদ রিয়াজ

মায়ের ভালোবাসা তুলনাহীন
এটা কেবল মানুষ নয়, প্রাণীদের বেলায়ও সত্যি। মানুষ থেকে হাতি (হাতিদের গর্ভধারণের সময় ২২ মাস), এমনকি ওরাংওটাংও (যারা সন্তান জন্মের চার মাস পর্যন্ত সন্তানকে চোখের আড়ালও করে না), মেরু ভালুক (যারা গর্ভধারণের সময় দ্বিগুণ ওজনের হয়ে যায় এবং আট মাস না খেয়ে থাকে), বাঘ, সিংহ, সিলমাছ, তিমিসহ প্রত্যেক প্রাণীর মায়েরা সন্তানদের জন্য কত কিছু যে করে। এই সন্তান জন্ম দেওয়ার জন্য মায়েদের কত রকমের শারীরিক ধকল যে সইতে হয় জীবনভর, তার হিসাব কি কেউ করেছি কখনো। সন্তানের প্রতি মায়ের এই ভালোবাসা তুলনাহীন।

মাতৃত্বে বদলে যায় মায়ের মস্তিষ্ক
এক গবেষণায় দেখা গেছে সন্তান জন্মের চার মাস পর মায়ের মস্তিষ্কে অনেক বেশি গ্রে ম্যাটার দেখায়। এই গ্রে ম্যাটার হচ্ছে মস্তিষ্ক ও স্পাইনাল কর্ডের মাঝামাঝি প্রয়োজনীয় এক ধরনের টিস্যু। এই টিস্যু মানসিক অবস্থা, শ্মরণশক্তি, আবেগ এবং চলাফেরা নিয়ন্ত্রণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিজ্ঞানীদের বিশ্বাস গর্ভাবস্থায় মস্তিষ্কে হরমোন প্রবাহের কারণে এটা ঘটে- যেমনটা টিনএজ হরমোনগুলো তাদের মস্তিষ্ক বিকাশের দিকে নিয়ে যায়।

সন্তানও মাকে আজীবনের সুরক্ষা দেয়
সন্তান জন্ম দেওয়ার মাধ্যমে মা ও সন্তানের শরীরের কোষ অদলবদল হয়। এবং মায়ের শরীরে এই কোষগুলো কয়েক দশক ধরে থাকে। গবেষকরা বলেন এসব কোষ কোনো নারীকে কয়েক ধরনের ক্যান্সার থেকে সুরক্ষা দেয়। এর মধ্যে আলঝেইমার এমনকি হার্টের নানা রোগ থেকেও রক্ষা করে।

মা কাছে থাকলে মানসিক চাপ কমে যায়
গবেষণায় প্রমাণিত হয়েছে যে, মা কাছে থাকলে, এমনকি ফোনে মায়ের কণ্ঠ শুনলে অক্সিটসিন বেড়ে যায় এবং কর্টিসল স্তর কমে যায়- যা শিশুদের শান্ত করে দেয় এবং এমনকি টিনএজারদের আরও বেশি দায়িত্বশীল করে তোলে। তিন মাস বয়সী শিশুর সঙ্গে মায়ের হৃদস্পন্দনে সমন্বয় ঘটে, যখন মায়ের কাছ থেকে সামান্যতম আদরের ছোঁয়াও পায় শিশু- এমনকি মায়ের হাসিতেও।

জন্মের আগেই মায়ের কণ্ঠ চিনতে পারে শিশু
গবেষণায় দেখা গেছে গর্ভে থাকার সময় মায়ের কণ্ঠ শুনলে শিশুর হৃদস্পন্দর বেড়ে যায়, যেটা অন্য কারও কণ্ঠ শুনলে হয় না। মায়ের হৃদস্পন্দনের শব্দ এবং মায়ের কণ্ঠ শিশুর মস্তিষ্ক গঠনে বিশেষ সহায়ক হয়, এমনকি জন্মের পরও।

সবার আগে
অন্য কেউ উপলব্ধি করার আগে মা তার সন্তানের কান্নার শব্দ টের পেয়ে যান, কারণ সন্তানের জন্মের পর মায়ের অক্সিটসিন স্তর বেড়ে যায়। এই পরিবর্তনের কারণ হচ্ছে সন্তানের শব্দ মায়ের শ্রবণ প্রক্রিয়া আরও বেশি অনুভূতিশীল হয়।

শিশুরা মায়েদের যে নামে ডাকে
ইংরেজ শিশুর কাছে ‘মম’, চাইনিজ শিশুর কাছে ‘মামা’, আইসল্যান্ডের শিশুর কাছে ‘মাম্মা’, হিব্রু শিশুর কাছে ‘এম’, ভিয়েতনামি শিশুর ‘মি’, ভারতীয় শিশুর কাছে ‘মা, বাংলাদেশের শিশুর কাছেও ‘মা’- ভাষার যত বৈচিত্র্যই থাকুক না কেন, যে কোনো শিশুর প্রথম শব্দই ‘মা’।

কঠোর মা বনাম কোমল মা
যেসব মা খুব বেশি কঠোর নন, তাদের কাছে শিশুরা অনেক বেশি মমতায় বেড়ে ওঠে। কঠিন শাসনে থাকা শিশুর চেয়ে, কঠিন শাসনে না থাকা শিশুদের সঙ্গে মায়ের সম্পর্ক বেশি ভালো হয়।

অ্যান্টিবডি
শিশুর প্রয়োজনীয় অ্যান্টিবডি মায়েরাই উৎপন্ন করেন। শিশুর শরীরে নানান রকম ব্যাকটিরিয়া অথবা ভাইরাস তৈরি হয়, মায়ের দুধে সেগুলোর ক্ষতিকর উপাদান সরিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রয়েছে। এমনকি মা যখন শিশুকে আদরে চুমুও দেন, সেটাও শিশুর শরীরের ক্ষতিকর উপাদানগুলো হটিয়ে দেয়।

মায়ের আদর
যে কারও জীবনে মায়ের আদর ও ভালোবাসা কেবল মানসিক নয়, শারীরিক সক্ষমতাও তৈরি করে। যে সক্ষমতার কারণে আজ যারা টিনএজার, হেসে-খেলে, দৌড়ে, ছুটে বেড়াচ্ছ, মায়ের অকৃত্রিম ভালোবাসা না পেলে কি সেটা সম্ভব হতো? আর এ থেকেই প্রমাণিত হয়, দুনিয়ায় মায়ের চেয়ে বড় বন্ধু আর কেউ নেই। কাজেই সন্তানের কাছ থেকে ভালোবাসা মায়ের প্রাপ্য- মা দিবস কেবল এক দিন নয়- প্রতিদিন।

জাহ্নবী

ঘটনাগুলো নজরুল-জীবনের

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:১৯ পিএম
ঘটনাগুলো নজরুল-জীবনের
গান শেখাচ্ছেন নজরুল। ১৭ বছর বয়সে নজরুল

একবার এক ইংরেজ পরিবারকে ইংরেজিতে ঠিকানা বুঝিয়ে বলতে ভীষণ কষ্ট হয়েছিল নজরুলের। সঙ্গে ছিলেন বাল্যবন্ধু শৈলজানন্দ। তখনই প্রতিজ্ঞা করলেন ইংরেজিতে কথা বলা শিখতে হবে। দুই বন্ধু মিলে শুরু করলেন ইংরেজি খবরের কাগজ পড়া। লাইব্রেরি থেকে ইংরেজি গল্পের বই এনে পড়া। সঙ্গে নিয়ে বসলেন ডিকশনারি। কয়েক দিন খুব চেষ্টা-টেষ্টা চলল। ডিকশনারি খুঁজে খুঁজে অর্থ বের করতে করতেই হাঁপিয়ে গেলেন তারা। এটা নয় ওটা। ওটা নয় সেটা। এমনি করে করে লাইব্রেরি থেকে মোটা মোটা ইংরেজি বই এনে লাইব্রেরি প্রায় ফাঁকা করে ফেললেন দুই বন্ধু। বন্ধু শৈল তো চেষ্টা করে যাচ্ছেন। এদিকে নজরুল কিন্তু লাইব্রেরি থেকে বই এনে পাতা উল্টিয়েও দেখলেন না। মোটা বইগুলো তার ডুগিতবলা বাজানোর জন্যই বেশি কাজে লাগতে থাকল। শেষে বই পড়ে ইংরেজি শেখার কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেললেন। তাই বলে ইংরেজিতে কথা বলা শেখার ভূত কিন্তু মাথা থেকে গেল না। নতুন বুদ্ধি আঁটলেন। ইংরেজিতে কথা বলতে হলে তাদের চাই একজন ইংরেজ। ইংরেজের সঙ্গে কথা বলতে বলতে তারাও ইংরেজের মতো ঝরঝরে ইংরেজি বলবেন। খুঁজতে খুঁজতে মিস্টার শেকার নামে এক ইংরেজকে পেয়েও গেলেন। এত সহজে ইংরেজি শেখার সুযোগ থাকতে বই পড়ার কষ্ট করতে যাবেনই বা কেন? ব্যাস, ইংরেজ তো পাওয়া গেল। এবার শুধু খাতির করার পালা। খাতির করতে গিয়ে দুই বন্ধু ইংরেজিতে কথা চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করলেও ইংরেজ কিন্তু সমানে বাংলায় কথা বলে চললেন। বাংলায় কথা বলতে পেরে ইংরেজ মোটেও ইংরেজি বলছেন না। মহা মুশকিলে পড়লেন দুই বন্ধু। ইংরেজ যখন, ইংরেজি তো বলবেই। এই ভেবে দুজনে তার সঙ্গে খাতির করে বেশ ক’দিন খুব ঘন ঘন তাদের বাড়ি গেলেন। সাহেবের পরিবারের মানুষগুলোর সঙ্গে আলাপ-সালাপও হলো অনেক। আলাপ পরিচয় খাতির সবই হলো, কিন্তু তারা যে সব কথাই বাংলায় বলে! ইংরেজিতে কথাই বলে না। নজরুল বললেন, এরা নিশ্চয় অন্য জাত। আর তা না হলে এরা বাংলাদেশে থেকে বাংলা শিখে ইংরেজি ভুলে গেছে।

নজরুল আর মুজফফর আহমেদ এক সময় বাড়ি ভাড়া নিলেন ৮/এ, টার্নার স্ট্রিটে। এটি ছিল নবযুগ অফিসের খুব কাছে। মাত্র দু-মিনিটের পথ। বাড়ির মাসিক ভাড়া ছিল দশ টাকার কিছু কম। মুসলমানদের বস্তি এলাকার মধ্যে তাদের বাড়িটিই ছিল একতলা পাকা বাড়ি। সেখানে নজরুল এলাকার বয়স্কা মহিলাদের সঙ্গে খাতির জমিয়ে ফেললেন। নানান রকমের খালা জুটে গেল নজরুলের। যাদের গায়ের রং ফর্সা, তারা আবার তার রাঙা খালা হয়ে উঠল। এই খালারা কিন্তু তাকে বেশ ভালোবাসত। প্রায়ই তারা রান্না করা তরকারি দিয়ে যেত।

কাজী নজরুলের অনেক গানই তখন আব্বাসউদ্দীনের গলায় রেকর্ড করা হয়েছিল। তিনি নজরুলকে ইসলামি গান লেখার জন্য রাজি করাতে চেষ্টা করলেন এভাবে- “একদিন কাজিদাকে বললাম, ‘কাজিদা, একটা কথা মনে হয়। এই যে পিয়ারু কাওয়াল, কাল্লু কাওয়াল এরা উর্দু কাওয়ালি গায়, এদের গানও শুনি অসম্ভব বিক্রি হয়, এই ধরনের বাংলায় ইসলামি গান দিলে হয় না? তারপর আপনি তো জানেন কীভাবে কাফের কুফর ইত্যাদি বলে বাংলায় মুসলমান সমাজের কাছে আপনাকে আপাঙক্তেয় করে রাখবার জন্য আদা-জল খেয়ে লেগেছে একদল ধর্মান্ধ! আপনি যদি ইসলামি গান লেখেন তা হলে মুসলমানের ঘরে ঘরে আবার উঠবে আপনার জয়গান।’ কথাটা তার মনে লাগল।” নজরুল সঙ্গে সঙ্গে রাজি হলেও রাজি হলেন না গ্রামোফোন কোম্পানির রিহার্সাল ইন-চার্জ ভগবতী বাবু। তাকে রাজি করাতে অবশ্য ছয় মাস সময় লেগেছিল। ভগবতী বাবু রাজি হতেই শিল্পী আব্বাসউদ্দীন গান লেখানোর ব্যবস্থা করে ফেললেন। পাশের ঘরে কাজিদা আছেন- শুনেই আব্বাসউদ্দীন গিয়ে বললেন, ‘ভগবতী বাবু রাজি হয়েছেন।’ তখন সেখানে ইন্দুবালা গান শিখছিলেন নজরুলের কাছে। নজরুল বলে উঠলেন, ‘ইন্দু তুমি বাড়ি যাও, আব্বাসের সঙ্গে কাজ আছে।’ ইন্দুবালা চলে গেলেন। সঙ্গে সঙ্গেই আব্বাসউদ্দীন এক ঠোংগা পান আর চা আনতে পাঠালেন। পান আর চা নিয়ে দরজা বন্ধ করে আধঘণ্টার ভেতরই নজরুল লিখে ফেললেন, ‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ।’ সঙ্গে সঙ্গেই সুরসংযোগ করে আব্বাসউদ্দীনকে শিখিয়েও দিলেন গানটি। পরের দিন ঠিক একই সময় আব্বাসউদ্দীনকে আসতে বললেন। পরের দিন লিখলেন, ‘ইসলামের ওই সওদা লয়ে এলো নবীন সওদাগর।’ তারপর থেকেই নজরুল একের পর এক ইসলামি গান লিখে চলেছেন। গান শুনলে যারা কানে আঙুল দিয়ে রাখত, তাদের কানেও গেল ‘নাম মোহাম্মদ বোল রে মন নাম আহমেদ বোল,’ ‘আল্লাহ আমার প্রভু আমার নাহি নাহি ভয়,’ ‘আল্লা নামের বীজ বুনেছি,’ ‘ত্রিভুবনের প্রিয় মোহাম্মদ এলো রে দুনিয়ায়।’ এ রকম আরও অনেক ইসলামি গান মুগ্ধ হয়ে শুনতে শুরু করল কান থেকে হাত নামিয়ে বাংলার মুসলমানরা। বাংলার মুসলমানের ঘরে ঘরে জেগে উঠল নতুন এক উন্মাদনা।    
 
একদিন স্টুডিওতে বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন বেশ কয়েকজন শিল্পী ও কবি। আড্ডার বিষয় ছিল, টাকা থাকলে প্রিয়ার জন্য কে কী করতেন? কেমন উপহার দিতেন? কত দামি অলংকার কিনতেন? আড্ডা বেশ জমে উঠেছে। এমন সময় কাজী নজরুল এলেন। আড্ডার গল্পসল্প শুনলেন কিছুক্ষণ। কিন্তু কিছুই বললেন না। হঠাৎ হারমোনিয়ামটা টেনে নিলেন। আর বাজাতে বাজাতে সুর তুলে নতুন এক গান গাইতে শুরু করলেন-
মোর প্রিয়া হবে এসো রানী
দেব খোঁপায় তারার ফুল।
কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির
চৈতী চাঁদের দুল।
কণ্ঠে তোমার পরাবো বালিকা,
হংস-সারির দুলানো মালিকা।
বিজলী জরির ফিতায় বাঁধিব
 মেঘ-রং এলা চুল।
 জোছনার সাথে চন্দন দিয়ে
মাখাব তোমার গায়,
রামধনু হতে লাল রং ছানি 
আলতা পরাব পায়।
আমার গানের সাত-সুর দিয়া,
তোমার বাসর রচিব প্রিয়া।
 তোমারে ঘেরিয়া গাহিব আমার
কবিতার বুলবুল।।
গান শেষে নজরুল সবার উদ্দেশে বললেন, কী? কয় টাকা লাগল বধূকে সাজাতে। 

জাহ্নবী

 

কাঠুরে ক্রিকেটার

প্রকাশ: ২৪ মে ২০২৪, ১২:১৭ পিএম
কাঠুরে ক্রিকেটার
শামার জোসেফ

গায়ানার কানজি নদী ধরে নৌকায় ২২৫ কিলোমিটার পাড়ি দিয়ে যেতে হয় খুবই দুর্গম এক ক্যারিবিয়ান গ্রামে। দুই দিনের দুর্গম পথ পেরিয়ে যাওয়া সেই গ্রামের নাম বারাকারা। প্রশ্ন আসতে পারে, কেন সে গ্রামে যেতে হবে? সে গ্রামে যেতে হবে, কারণ বারাকারা থেকে এবার টিটুয়েন্টি বিশ্বকাপে ওয়েস্ট ইন্ডিজ দলে সুযোগ পেয়েছেন এক তরুণ। নাম তার শামার জোসেফ। এই শামার জোসেফকে নিয়ে নিশ্চয়ই আরও অনেক কাহিনি লিখতে হতে পারে! অথচ বারাকারার কেউ কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবেনি তাদের গ্রামেরই কেউ কখনো ওয়েস্ট ইন্ডিজ জাতীয় দলের হয়ে খেলবে। আরও অবাক করা কথা, ২০১৮ সালের আগে বারাকারায় ছিল না কোনো টেলিফোন কিংবা ইন্টারনেট সংযোগ।

বারাকারা গ্রামের জনসংখ্যা প্রায় সাড়ে ৩০০। তবে জোসেফরা পাঁচ ভাই আর তিন বোন। একবার কার্টলি অ্যাম্ব্রোস আর কার্টেনি ওয়ালশ-এর ফাস্ট বোলিং সে দেখেছিল ভিডিও ক্লিপসে। আর সেই দেখাই তার মধ্যে জাগিয়ে তুলল ফাস্ট বোলার হওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা। আর সেই আকঙ্ক্ষা থেকেই দুর্গম বারাকারার শামার জোসেফ আজ ওয়েস্টইন্ডিজের জাতীয় দলের খেলোয়াড়। শুধু তাই নয়, এ বছরের জানুয়ারিতে শামার জোসেফের একক কৃতিত্বে ভর দিয়ে সুদীর্ঘ ২৭ বছর পর অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে অস্ট্রেলিয়াকে টেস্টে হারিয়ে দিয়েছে ওয়েস্ট ইন্ডিজ। ২০২৪ সালের ১৮ জানুয়ারি জীবনের প্রথম টেস্ট খেলতে নেমেই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে পাঁচটি উইকেট নেন শামার। আর দ্বিতীয় টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ১১.৫ ওভারে ৬৮ রানের বিনিময়ে নিয়েছিলেন সাত উইকেট। চতুর্থ ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান খেলোয়াড় হিসেবে অস্ট্রেলিয়ার মাটিতে এক ইনিংসে সাত উইকেট নেওয়া খেলোয়াড় তিনি। কিন্তু শামারের জীবনের শুরুটা ছিল অন্যরকম। তিনি ছিলেন কাঠুরে। বাবা ও ভাইদের সঙ্গে জঙ্গলে গিয়ে গাছ কেটে কাঠ জোগাড় করতেন। বিশাল বিশাল গাছের গুঁড়িও ঘাড়ে করে নৌকায় তুলতেন আবার নৌকা থেকে নামাতেন। জঙ্গল থেকে কাঠ আনতেন কাঞ্জের নদীর তীরে নিউ আমস্টারডামে। যে কারণে অসম্ভব শারীরিক শক্তি অর্জন করতে পেরেছিলেন। আর সেই গায়ের জোরটা এখন টের পাওয়া যায় মাঠে। ঘণ্টায় ১৪০ কিলোমিটার গতিতে বল করেন শামার। কিন্তু এক সময় পেয়ারা, লেবু ও মাল্টা দিয়ে বোলিং চর্চা করতেন। এরপর চর্চা করতেন টেপটেনিস বলে।

এই জঙ্গলে কাঠ কাটতে গিয়ে একবার ভয়ংকর এক বিপদের মধ্যে পড়ে গিয়েছিলেন শামার। একটি বিশাল গাছ তার মাথার ওপর পড়েই গিয়েছিল প্রায়। দ্রুত সরে না গেলে সেদিন গাছচাপায় মারাই পড়তেন হয়তো। ওই দুর্ঘটনার পর বারাকারা ছেড়ে কাজের খোঁজে নিউ আমস্টারডামে চলে আসেন শামার। পরিবারকে সহায়তা করার জন্য একটা কাজ তার খুবই দরকার ছিল।

নিউ আমস্টারডামে কাজ পেতে খুব একটা বেগ পেতে হয়নি কিশোর শামারকে। একটি নির্মাণাধীন ভবনে শ্রমিক হিসেবে কাজ শুরু করেন। এরপর নিউ আমস্টারডামের স্কটিয়াব্যাংকের নিরাপত্তা শাখায় নিরাপত্তারক্ষী হিসেবে চাকরি শুরু করলেন। টানা ১২ ঘণ্টা পাহারা দেওয়ার কাজ করার পর ক্রিকেট খেলার শারীরিক শক্তি খুব একটা থাকত না। তখনই তার ভালোবাসার মানুষের অনুপ্রেরণা ও সাহস পেয়ে নিরাপত্তাকর্মীর কাজে ইস্তফা দিয়ে ক্রিকেটে মনোযোগ দিলেন। সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেললেন ক্রিকেটেই নিজের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলবেন।

শামারের বয়স তখন ছিল ১৪ বছর। এই সময় একদিন প্রাক্তন ক্রিকেটার এবং পরবর্তীতে ব্যবসায়ী ড্যামিয়ন ভ্যানটাল বারাকারায় এলেন। তার সঙ্গে ছিলেন আরেক প্রাক্তন ক্রিকেটার রয়স্টন ক্র্যান্ডন। বারাকারায় তারা একটা প্রীতি ম্যাচ খেলবেন। ওই প্রীতি ম্যাচ খেলতে এসেই শামারের প্রতি নজর পড়ে গেল তাদের। তাদের দুই জোড়া অভিজ্ঞ চোখ ঠিকই শামারের মেধা দেখতে পেয়েছে। শামারের সঙ্গে কথা বললেন ড্যামিয়ন ভ্যানটাল। তাকে আর্থিক নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দিয়ে তুলে নিয়ে এলেন। মুসলিম ইয়থ অর্গানাইজেশন স্পোর্টস ক্লাবের নেটে অনুশীলন করার সুযোগ করে দিলেন।

এরপর তিনি জর্জটাউনে ক্লাব ক্রিকেট খেলতে শুরু করলেন মুসলিম ইয়থ অর্গানাজাইশনের পক্ষে। এই ক্লাব ক্রিকেট খেলতে খেলতেই গায়ানার জাতীয় দলে জায়গা করে নিলেন শামার। এই সময় তিনি ওয়েস্টইন্ডিজের কিংবদন্তি অ্যাম্ব্রোসের ফাস্ট-বোলিং ক্লিনিকে যুক্ত হন এবং অ্যাম্ব্রোসের নজর কাড়েন। এরপর একটি অনুশীলন ম্যাচে আট উইকেট নেন শামার। তারপর আর তাকে পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি।

এরমধ্যেই ২০২৪ সালের জানুয়ারি মাসের জন্য আইসিসি ম্যানস প্লেয়ার অব দ্য মান্থ পুরস্কার পেয়ে যান আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল বা আইসিসি থেকে। শুধু তাই নয়, ওয়েস্ট ইন্ডিজের প্রথম খেলোয়াড় হিসেবে আইসিসির ওই পুরস্কার জেতেন শামার জোসেফ।

কে জানে, শামার জোসেফের হাত ধরেই হয়তো ক্যারিবিয়ান ক্রিকেটের স্বর্ণযুগ উঁকিঝুঁকি মারতে শুরু করেছে!

জাহ্নবী

 

মেঘের অনেক গুণ

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১২:৪৯ পিএম
মেঘের অনেক গুণ
দুর্দান্ত ঢাকার অফিসিয়াল ফেসবুক পেজে মেঘ। সাকিব দম্পতির মাঝে ছোট্ট মেঘ

মেঘের অনেক গুণ। আঁকিয়ে, ডিজাইনার। তবে গুণ থাকলেই তো আর হয় না, সে গুণের প্রকাশ যেমন করতে হয়, তেমনি কদরও করতে হয়। মেঘের গুণের কদর করেছে দুর্দান্ত ঢাকা। দুর্দান্ত ঢাকাকে মনে আছে তো! এবার বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগে ১২ ম্যাচের ১১টিতেই হেরেছে যদিও, তবে অন্য সব দলের চেয়ে একটা দিকে অন্তত এগিয়ে আছে দলটি। আর সেটা হলো গুণের কদর করা। দুর্দান্ত ঢাকার জার্সির ডিজাইন করার দায়িত্ব পেয়েছিল সতের বছর বসয়ী এই গুণী টিনএজ মেঘ।

মাহির সারোয়ার মেঘের জন্ম ঢাকায়, ২০০৬ সালে। প্রয়াত সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনির সন্তান মেঘ। ছোটবেলা থেকেই আঁকতে ভালোবাসেন মেঘ এবং ক্রিকেট নিয়েই তার ধ্যানজ্ঞান। নিয়মিত অনুশীলন করেন শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবে। নিজেকে পেস বোলিং অলরাউন্ডার হিসেবে গড়ে তুলতে প্রচেষ্টারও কমতি নেই। বাংলাদেশ ইন্টারন্যাশনাল টিউটোরিয়াল থেকে ও লেভেলে পড়াশোনা শেষ করেছেন ১৭ বছর বয়সী মেঘ।

আঁকতে ভালো লাগে বলেই জার্সির ডিজাইন নিয়ে মেঘ কাজ করছেন অনেক আগে থেকেই। ২০১৫ সালে ৯ বছর বয়সে মেঘ অংশ নিয়েছিলেন রবির লোগো ডিজাইন হান্টে। সে সময় এ ফোর পেপারে লোগো ডিজাইন করেই সাফল্য পান মেঘ। এরপর থেকে মেঘের স্বপ্ন আরও উঁচুতে উঠতে থাকে। মেঘ প্রতিযোগিতা শুরু করেন নিজের সঙ্গে। নিজেকে নিজে ছাড়িয়ে যাওয়ার প্রতিযোগিতা। পরিশ্রম যে কাউকে হতাশ করে না তার উদাহরণ মেঘ। তিনি জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের ফুটবল জার্সির ডিজাইন করার সুযোগ পান এবং সুযোগটাও কাজে লাগিয়ে ফেলেন।

দেশের ক্রিকেটের অন্যতম বড় ফ্র্যাঞ্জাইজি টুর্নামেন্ট বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ শেষ হয়েছে সেই কবে। তবে বিপিএল শুরুর আগে ট্রফি নিয়ে অফিসিয়াল জার্সি পরে ফটোশুট করেছেন সাত দলের ক্রিকেটাররা। বিশেষভাবে নজর কেড়েছে দুর্দান্ত ঢাকার জার্সি। নীল রঙের বিভিন্ন শেড দিয়ে করা এই জার্সিতে ফুটে উঠেছে পদ্মা সেতু ও ঢাকার মেট্রোরেল। এই জার্সির রূপকার মাহির সারোয়ার মেঘ।

বিপিএলে তার ডিজাইন করা জার্সি দিয়ে খেলা হবে এটা ছিল মেঘের কাছে স্বপ্নের মতো। নিজের ডিজাইন করা জার্সিটা মামার মাধ্যমে দুর্দান্ত ঢাকা কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠিয়ে দেন। অপেক্ষার পালা শেষ হয় কয়েকদিন পর। ঢাকার কর্তৃপক্ষ জানায় মেঘের জার্সি তাদের পছন্দ হয়েছে। খবর শুনে মেঘ এতটাই উৎফুল্ল হয়েছিলেন যে, তার বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল। এরপর সেই জার্সি পরেই অধিনায়কদের ফটোসেশন করেছেন ঢাকার অধিনায়ক মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত।

মেঘের ডিজাইন করা জার্সিতে তুলে ধরা হয়েছে ইতিহাসের বিখ্যাত ঢাকা নগরীর নানা ইতিহাস ও স্থাপনা। মেঘ জানান, ‘আমাদের ঢাকা অনেক ইতিহাস ও ঐতিহ্যের নগরী। এখানকার শহিদ মিনার, সংসদ ভবন, লালবাগ কেল্লা ইত্যাদি তুলে ধরেছি। ঢাকার অন্যতম বাহন মেট্রোরেলও তুলে ধরেছি। আমি অনেক দিন থেকেই এসব ডিজাইন নিয়ে কাজ করি, এবার বড় পরিসরে সেটা প্রকাশ হলো। এর আগেও শেখ জামাল ধানমন্ডি ক্লাবের জার্সি করেছি। এটা আমাকে ভবিষ্যতে আরও অনেক দূরে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা দিয়েছে।’

মাহির মেঘকে নিয়ে একটি পোস্ট শেয়ার করেছে দুর্দান্ত ঢাকা। সেখানে মেঘের ছবি দিয়ে তারা লিখেছে- আমাদের দলের আইকনিক লুকের শিল্পী। আমাদের জার্সি ডিজাইনার মাহির সরওয়ার মেঘ! সেই পোস্ট শেয়ার করে মেঘ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ফেসবুকে লিখেছেন, ‘একজন জার্সি ডিজাইনার হিসেবে এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় অর্জন, ধন্যবাদ সবাইকে।’ দুরন্ত ঢাকার জার্সি করার পর মেঘ দেখা করেছেন দুর্দান্ত ঢাকার খেলোয়াড়দের সঙ্গে। সবাই তাকে উৎসাহ জানিয়েছেন এবং প্রশংসা করেছে বলে জানিয়েছে মেঘ।

জাহ্নবী

মেরি ত্যুসোর জাদুঘর

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১২:৪৬ পিএম
মেরি ত্যুসোর জাদুঘর

প্রায় ২০০ বছর আগের কথা। ১৭৭৭ সালে ১৬ বছর বয়সী এক টিনএজার বানিয়ে ফেললেন ফরাসি দার্শনিক ভলতেয়ারের মোমের মূর্তি। আর ১৮৮ বছর আগে ১৮৩৫ সালের ২২ মে সেই মোমের মূর্তিগুলো নিয়ে প্রতিষ্ঠিত হলো অন্য রকম এক জাদুঘর। এই টিনএজারের নাম মেরি ত্যুসো। আর সেই থেকে শুরু, বিস্তারিত টিনএজপ্লাস ডেস্ক থেকে...

১৮ মে পালন করা হয় আন্তর্জাতিক জাদুঘর দিবস। পৃথিবীতে কত রকমের জাদুঘর রয়েছে। তবে ১৮৮ বছর আগে ১৮৩৫ সালের ২২ মে ইংল্যান্ডের লন্ডনের ওয়েস্টমিনিস্টার শহরের মেরিলবোন রোডে প্রতিষ্ঠিত হয় ব্যতিক্রম এক জাদুঘরের। এর প্রতিষ্ঠাতা এক টিনএজার। নাম তার মেরি ত্যুসো। কে ছিলেন মেরি ত্যুসো?

মেরি ত্যুসোর জন্ম ১৭৬১ সালের ১ ডিসেম্বর ফ্রান্সের স্ট্রসবার্গে। বাবা জোসেফ ছিলেন সৈনিক। মায়ের নাম অ্যানে মেরি ওয়েল্ডার। মেরির জন্মের দুই মাস আগেই বাবা মারা যান। ছয় বছরের মেরিকে নিয়ে তার মা চলে আসেন সুইজারল্যান্ডের বার্ন শহরে। এখানকার স্থানীয় ডাক্তার ফিলিপ কার্টিয়াসের বাড়ি দেখাশোনার কাজ নেন। ডাক্তার ফিলিপ খুব ভালো মোমের মূর্তি বানাতে পারতেন। তার কাছেই মোমের মূর্তি বানানোর কৌশল শিখে নিলেন মেরি ত্যুসো। ওই সময় মোমের মূর্তি বানানোর কাজ ছিল ভীষণ জনপ্রিয় ব্যাপার।

এর মধ্যে মোমের মূর্তি বানিয়ে বেশ সাড়া ফেলেন দেন ত্যুসো। ১৭৮০ থেকে ১৭৮৯ সাল পর্যন্ত ফরাসি বিপ্লব চলতে থাকে। ১৭৮৭ সালে ফ্রান্সের বেশ কয়েকজন বুদ্ধিজীবীর সঙ্গে ত্যুসোকেও গ্রেপ্তার করে কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়। ফরাসি বিপ্লবের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগে তাকে গিলোটিনে হত্যা করার দাবি ওঠে। এ জন্য তার মাথাও মুড়িয়ে ফেলা হয় গিলোটিনে হত্যার প্রস্তুতি হিসেবে। তবে টানা ছয় বছর বন্দি থাকার পর ১৭৯৩ সালে ত্যুসো মুক্তি পান। ১৭৯৪ সালে মৃত্যুর আগে ডাক্তার কার্টিয়াস তার বানানো সব মোমের মূর্তির স্বত্ব মেরি ত্যুসোকে দিয়ে যান। ১৭৯৫ সালে ফ্রান্সিস ত্যুসোর সঙ্গে মেরির বিয়ে হয়।

১৮০২ সালে মেরি ত্যুসো লন্ডনে আসেন তার পোর্ট্রেটগুলোর প্রদর্শনী করার জন্য। ৩৩ বছর ধরে ব্রিটেনের নানান জায়গায় প্রদর্শনী শেষে ১৮৩৫ সালে লন্ডনের বেকার স্ট্রিটে একটি স্থায়ী প্রদর্শনী গড়ে তোলেন মেরি। সেই জায়গাটাই একসময় ধীরে ধীরে মাদাম ত্যুসোর জাদুঘরে পরিণত হয়েছে। 
১৯৭০ সালে মাদাম ত্যুসোর জাদুঘরের বিদেশি শাখা প্রতিষ্ঠা করা হয় নেদারল্যান্ডসের রাজধানী আমস্টারডামে। মাত্র ১৬ বছর বয়সে সামান্য মোমের মূর্তি গড়া এক টিনএজারের মোমের জাদুঘর এরপর ছড়িয়ে পড়তে লাগল পৃথিবীর নানা দেশে, নানা শহরে। এশিয়ার বেইজিং, হংকং, টোকিও, দুবাই, ব্যাংকক, দিল্লিসহ ১০টা, ইউরোপের ভিয়েনা, ইস্তাম্বুল, বার্লিনসহ ৮টা, উত্তর আমেরিকার হলিউড, নিউইয়র্ক, ওয়াশিংটনসহ ৭টা এবং অস্ট্রেলিয়ার সিডনিসহ দুনিয়ার চার মহাদেশের ২৬টি শহরে মাদাম ত্যুসোর জাদুঘর রয়েছে।

জাহ্নবী

অস্ট্রেলিয়ার টিনএজার

প্রকাশ: ১৭ মে ২০২৪, ১২:৪৫ পিএম
অস্ট্রেলিয়ার টিনএজার

অস্ট্রেলিয়ার টিনএজারদের জীবন অন্যান্য উন্নত দেশের টিনএজারদের মতোই। অন্যান্য দেশের মতো অস্ট্রেলিয়ায় ১২-১৭ পর্যন্ত বয়সী ছেলেমেয়েদের টিনএজার হিসেবে ধরা হয়। এই বয়সে তারা হাইস্কুলে যায়। এরপর তারা গ্র্যাজুয়েট হয় এবং ১৮ বছরে পড়লেই প্রাপ্তবয়স্ক হিসেবে স্বীকৃতি পায়। তখন সে ভোট দিতে পারে, মদ এবং সিগারেট কিনতে পারে। অস্ট্রেলিয়ার প্রত্যেক প্রদেশে ভিন্ন ভিন্ন শিক্ষাব্যবস্থা বিদ্যমান।

তবে ছেলেমেয়েদের এক বছরের বাধ্যতামূলক প্রাক-বিদ্যালয় সময়সহ ১৩ বছরের স্কুল জীবন পার করতে হয়। ছয় বছর থেকে শুরু হয় প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পড়াশোনা, চলতে থাকে এর পরের সাত বছর। আট বছর বয়স থেকে শুরু হয় হাইস্কুল। এই পর্ব চলতে থাকে পরের চার বছর। অস্ট্রেলিয়ায় স্কুল জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে নভেম্বর বা ডিসেম্বর পর্যন্ত চলে। সাধারণত একটি বছর বড়ো দুটি ভাগে বিভক্ত থাকে। এগুলোকে সেমিস্টার বলে। আবার বড়ো ভাগগুলো ছোট দুই ভাগে ভাগ হয়। ছোট ভাগের মধ্যে অল্প সময়ের ছুটি থাকে এবং বড় সেমিস্টারের  মধ্যে বেশি সময়ের জন্য ছুটি দিয়ে ভাগ করা হয়। স্কুল কর্তৃপক্ষই সিদ্ধান্ত দেয় একজন ছাত্র কয়টা বিষয় পড়তে পারবে। তবে এই সংখ্যা পাঁচ থেকে সাতের মধ্যে হয়। ইংরেজি এবং অঙ্ক সব প্রদেশেই স্কুলপর্যায়ে ছাত্রদের জন্য  বাধ্যতামূলক। একটা সুযোগ আছে, স্কুল যদি পড়তে না দেয় তবে কোনো ছাত্র নিজের ইচ্ছামতো কোনো বিষয় দূর-শিক্ষা কার্যক্রমের আওতায় পড়তে পারে। দেখা গেছে, শতকরা ৮০ ভাগ অস্ট্রেলিয়ান সাগরপাড়ের ১০০ কিলোমিটারের মধ্যে থাকে। তাই সাগরপাড়ে বেড়াতে যাওয়ার বিষয়টি খুবই উপভোগ করে। সাগরপাড়ে বেড়াতে যাওয়া মানেই প্রচুর আনন্দ। সেখানে প্রাইমারি পর্যায় থেকে হাইস্কুল অবধি ছেলেমেয়েদের সাঁতার শেখার  প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। কেউ কেউ সাঁতারে দুরন্ত হয়ে ওঠে প্রতিযোগিতার জন্য আবার কেউ শুধু জলে পড়ার হাত থেকে বাঁচার জন্য সাঁতারটা শিখে রাখে। তবে স্কুল কর্তৃপক্ষই বাধ্যতামূরকভাবে সাঁতার প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে থাকে।   

গ্রামের দিকের স্কুলগুলো সাধারণত ছোট আকারের হয়ে থাকে। এক কি দুই রুমের। শিক্ষকও হয়তো দুই কী একজন। এসব স্কুলে শিক্ষক পাওয়া খুব মুশকিল হয়। কারণ শিক্ষকরা গ্রামের দিকে মাস্টারি করতে আসতে চান না। গ্রামে কে থাকবে শহরের বিলাসী জীবন ছেড়ে?

অস্ট্রেলিয়ার টিনএজাররা টাকা-পয়সার জন্য বাবা-মায়ের ওপর নির্ভর করা অপছন্দ করে। এজন্য তারা স্থানীয় সুপারমার্কেট অথবা রেস্তোরাঁয় কাজ করে পয়সাপাতি উপার্জন করে। ১৬ বছরের নিচে হলে সপ্তাহে ১২ ঘণ্টার বেশি কাজ করা নিষেধ এবং কাজ করতে হলে বাবা-মায়ের অনুমতি নিতে হয়। ১৬ বছর বয়স হলেই একজন টিনএজার নিজের ইনকাম ট্যাক্স ফাইল খুলতে পারে, তার নিজের চিকিৎসা কার্ড করাতে পারে, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলতে পারে।

অস্ট্রেলিয়ার টিনএজাররা বাস করে ফুটবল, ক্রিকেট আর সাঁতার নিয়ে। স্কুলের পর বেশির ভাগ টিনএজার ক্রিকেট বা কোনো খেলা খেলতে নেমে যায়। ছেলেদের প্রিয় হলো ক্রিকেট ও রাগবি এবং মেয়েদের প্রিয় খেলা হলো নেটবল, যা বাস্কেটবলেরই ক্ষুদ্র সংস্করণ। প্রদেশ বা শহরের মধ্যে প্রতিযোগিতার ব্যাপারটি অস্ট্রেলিয়ায় খুবই বেশি। এজন্য খেলার সময় দলের পতাকা বা ক্লাব বা দলের জন্য কোনো নির্দিষ্ট গান স্টেডিয়ামে গাওয়া নিষেধ। দেখা গেছে, এতে দলীয় টান এতই বেড়ে যায় যে শেষতক হাতাহাতি থেকে মারামারিতে গড়ায়।

অস্ট্রেলিয়ার টিনএজারদের জীবন অন্যান্য উন্নত দেশের টিনএজারদের মতোই। তারা এখন বেশির ভাগ সময় বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে চ্যাটিং করে কাটাতে পছন্দ করে। এখন তাদের কাছে পরিবারটা আসে বাইরের জগতের পরে। এতে পরিবারের সঙ্গে টিনএজারদের ব্যবধানও বাড়ছে। সময় কাটানোর জন্য আছে অনেক ব্যবস্থা। যেমন বাইকারদের জন্য আছে ভিন্ন রোড ট্র্যাক। আছে স্কেটিং বাউল, শপিং সেন্টার, বলঅ্যালি, মুভি থিয়েটার, লেজার ট্যাগ ইত্যাদি। এসব স্থানে টিনএজাররা সহজেই সময় কাটাতে পারে। তবে শতকরা ১০ ভাগ টিনএজার কিন্তু শনি ও রবিবার ছুটির আগের রাত শুক্রবার থেকেই পার্টি করা শুরু করে। মদ পান করে ও গাঁজা সেবন করে। বাবা-মায়ের সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার সঙ্গে জড়িত ছেলেমেয়ের সংখ্যা শতকরা ৫০ ভাগ! অস্ট্রেলিয়ার টিনএজাররা মোটামুটি ১৫ বছর বয়সেই যৌনতার স্বাদ পেয়ে যায়। যদিও অস্ট্রেলিয়ায় ১৬ বছরের নিচে কারও সঙ্গে সম্মতি থাকলেও যৌন সম্পর্কে জড়িত হওয়া আইনের দৃষ্টিতে গর্হিত অপরাধ হিসেবে গণ্য করা হয়। উচ্চ আয়ের দেশ হওয়া সত্ত্বেও অস্ট্রেলিয়ার টিনএজারদের মধ্যে অপরাধপ্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেকেই ডাকাতি, গাড়ি চুরি, ছিনতাই ইত্যাদিতে জড়িয়ে পড়ছে। পুলিশ প্রতিবেদন অনুযায়ী যেখানে ২০১৯ সালে এই অপরাধগুলো সংগঠিত হয়েছিল ৯ দশমিক ৮ শতাংশ, সেখানে গত বছর এই হার ১৫ শতাংশেরর ওপর। সবচেয়ে বিস্ময়ের বিষয় এ ধরনের অপরাধে লিপ্ত হচ্ছে ১০- ১৭ বছর বয়সী টিনএজাররা! বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এসব অপরাধ থেকে টিনএজারদের ফিরিয়ে আনার জন্য এখনই দরকার কোনো জোরালো পদক্ষেপ নেওয়া। আবার কেউ বলছেন, টিনএজারদের লালন-পালন করার জন্য আমাদের উচিত পুরনো দিনের নিয়মকানুনগুলো ফিরিয়ে আনা। নিয়মকানুন মানে ল্যাঠ্যাষৌধের কথা বলছেন কি না কে জানে!

তবে যারা অস্ট্রেলিয়ায় নতুন আসে সেই সব টিনএজারের জন্য নতুন পরিস্থিতিতে খাপ খাওয়ানোটা খুব শক্ত। কারণ নতুন পড়ালেখার পদ্ধতি, নতুন বন্ধু জোটানো এবং পরিবারকে বাইরের অনেক কিছুকে বোঝানো। ফেলে আসা নিজের সংস্কৃতির সঙ্গে নতুন সংস্কৃতিকে মেলানো, এসবই অস্ট্রেলিয়ায় নতুন আসা টিনএজারদের জন্য সমস্যাবহুল।

এতসবের পরও অস্ট্রেলিয়ানরা বলে থাকে পরিবার হচ্ছে পরিবার, এর সঙ্গে কোনো কিছুরই তুলনা হয় না। এখনো তারা অনুগত পরিবার ও আত্মীয়-পরিজনদের নিয়েই ভবিষ্যতের দিকে এগোতে চায়।

জাহ্নবী