মানুষ সামাজিক প্রাণী, আর বন্ধুত্ব তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ছোটবেলা থেকে শুরু করে কৈশোর, আর তারপর তারুণ্য সব সময়ই বন্ধু ছাড়া জীবন কল্পনা করা যায় না। তবে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বন্ধুত্বের রূপ ও ধরনেও এসেছে পরিবর্তন। বিশেষ করে ডিজিটাল যুগে, বন্ধুত্ব শুধু পাশের ক্লাসের সহপাঠী বা মহল্লার বন্ধুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি মোবাইল ফোন কিংবা ল্যাপটপের মাধ্যমে দেশের সীমানা পেরিয়ে পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা সম্ভব। প্রযুক্তি, বিশেষ করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এই প্রজন্মের বন্ধুত্বকে দিয়েছে নতুন মাত্রা।
আগের দিনে বন্ধুত্ব মানে ছিল মুখোমুখি আড্ডা, মাঠে খেলা কিংবা একসঙ্গে গল্পগুজব। কিন্তু বর্তমানে অনেক তরুণের জন্য অনলাইন বন্ধুত্ব বাস্তব জীবনের বন্ধুত্বের মতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম, টিকটক, টুইটার কিংবা বিভিন্ন গেমিং প্ল্যাটফর্মে গড়ে ওঠা সম্পর্ক অনেক সময় দীর্ঘস্থায়ী হয়।
অনলাইনে বন্ধুত্বের কয়েকটি ধরন
ডিজিটাল যুগে ‘সোশ্যাল মিডিয়া ফ্রেন্ড’ তরুণদের কাছে একটি জনপ্রিয় বন্ধুত্বের ধরন। এরা হয়তো কখনো সামনাসামনি দেখা করেনি, কিন্তু প্রতিদিনের চ্যাট, ভিডিও কল, রিল শেয়ার বা স্টোরিতে রিঅ্যাকশনের মাধ্যমে সম্পর্ক তৈরি হয়। এ ধরনের বন্ধুত্ব অনেক সময় মানসিক সাপোর্ট হিসেবে কাজ করে। কেউ পড়াশোনার চাপ, পারিবারিক সমস্যা বা একাকিত্বের সময় অনলাইনে বন্ধুর সঙ্গে খোলামেলা কথা বলে স্বস্তি খুঁজে পায়।
গেমিং তরুণ সমাজের বড় একটি বিনোদন। অনলাইন মাল্টিপ্লেয়ার গেম খেলতে গিয়ে পরিচয় হয় নতুন বন্ধুদের সঙ্গে। এদেরকে ‘গেমিং ফ্রেন্ড’ বলা যায়। গেমে একসঙ্গে মিশন সম্পন্ন করা, প্রতিযোগিতা করা কিংবা টিমওয়ার্ক করার মাধ্যমে বন্ধুত্ব গভীর হয়। অনেক সময় দেখা যায়, তরুণরা একই দেশের বাইরের গেমারদের সঙ্গেও ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করছে।
শিক্ষা ও ক্যারিয়ার নিয়ে সচেতন তরুণরা অনলাইনে নানা স্টাডি গ্রুপ তৈরি করে। হোয়াটসঅ্যাপ, মেসেঞ্জার কিংবা টেলিগ্রামে গড়ে ওঠা এসব গ্রুপে নোট শেয়ার করা, সমস্যার সমাধান করা বা পরীক্ষার প্রস্তুতি নেওয়া হয় একসঙ্গে। অনেক তরুণ বলেন, এ ধরনের বন্ধুত্ব পড়াশোনায় সহযোগিতার পাশাপাশি মানসিক চাপও কমিয়ে দেয়। একইভাবে, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী বা চাকরিপ্রত্যাশীরা ক্যারিয়ারবিষয়ক গ্রুপে যুক্ত হয়ে নতুন বন্ধু পায়। এদের বলা যায় কার্যকরী বন্ধুত্ব। কারণ তারা শুধু বিনোদন নয়, বরং বাস্তব জীবনের প্রয়োজন মেটায়।
ডিজিটাল বন্ধুত্বের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, এটি সীমাহীন। পৃথিবীর যেকোনো প্রান্তের মানুষের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যায় অনায়াসে। বিভিন্ন সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচয়, মতবিনিময় এবং শেখার সুযোগ বেড়েছে। একই সঙ্গে তরুণরা একে অপরের কাছ থেকে তথ্য ও সহযোগিতা পাচ্ছে দ্রুত। পড়াশোনার গ্রুপ, ক্যারিয়ার কাউন্সেলিং প্ল্যাটফর্ম কিংবা স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের মাধ্যমে গড়ে উঠছে অর্থবহ বন্ধুত্ব। বিশেষ করে কোভিড-১৯ মহামারির সময়ে এই ডিজিটাল বন্ধুত্ব অনেক তরুণকে একাকিত্ব থেকে রক্ষা করেছে।
তবে সবকিছুরই যেমন ইতিবাচক দিক আছে, তেমনি নেতিবাচক দিকও রয়েছে। ডিজিটাল যুগে বন্ধুত্ব অনেক সময় হয়ে পড়ে অগভীর। ‘লাইক’ বা ‘কমেন্ট’-এর মাধ্যমে সম্পর্ক টিকে থাকলেও গভীর মানসিক যোগাযোগ গড়ে ওঠে না। ভুয়া অ্যাকাউন্ট, অনলাইন প্রতারণা কিংবা সাইবার বুলিং অনেক তরুণকে বিপদে ফেলে দিচ্ছে। এ ছাড়া, শুধু অনলাইনে সীমাবদ্ধ থেকে বাস্তব জীবনের সম্পর্ককে অবহেলা করার প্রবণতাও বাড়ছে। ফলে অনেক তরুণ হয়তো হাজারও অনলাইন বন্ধু থাকার পরও বাস্তবে একাকিত্ব অনুভব করছে।
ডিজিটাল যুগ তরুণদের বন্ধুত্বকে দিয়েছে নতুন গতি, নতুন রূপ। একদিকে এটি বিশ্বকে এনে দিয়েছে হাতের মুঠোয়, অন্যদিকে তৈরি করেছে এক নতুন ধরনের সামাজিক বাস্তবতা।

