মৎস্যচাষ পরিকল্পনা, সমন্বয় ও গবেষণার মাধ্যমে একের পর এক সাফল্যের পাল্লা ভারি করছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) বিজ্ঞানীরা।
স্বায়ত্তশাসিত এই জাতীয় গবেষণা সংস্থাটি ১৯৮৪ সালে প্রতিষ্ঠিত হলেও জনবল সংগ্রহ ও উন্নয়ন অবকাঠামো গড়ে তোলার পর যথার্থ কাজ শুরু হয় ১৯৮৬ সাল থেকে। যেসব দেশিয় ছোট মাছ বিলুপ্তির আশংকায় চলে গিয়েছিল সেসব মাছের পোনা সংগ্রহ করে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে খাবার টেবিলে ফেরানো হয়েছে। বিলুপ্তপ্রায় অনেক মাছ খামারিরা চাষাবাদ করছে। এতে একদিকে এ খাতে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হওয়ার পাশাপাশি বাজারেও কমেছে এসব মাছের দাম।
গবেষণার ধারাবাহিকতায় সর্বশেষ ২০২২ সালে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে শাল বাইম মাছের কিছু পোনা উৎপাদনে সফলতা আসে। এখনো পুরোদমে চলছে গবেষণা। প্রচুর পরিমাণে এই মাছের পোনা উৎপাদনের মাধ্যমে সারাদেশের হ্যাচারিগুলোতে ছড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছে বিজ্ঞানীরা। শাল বাইমসহ এ পর্যন্ত ৪০ প্রজাতির মাছের সফল প্রজনন সম্পন্ন হয়েছে। এর মধ্যে বর্তমানে হ্যাচারিতে শিং, মাগুর, কৈ, টেংরা, পাবদা, গুলশা, বৈরালিসহ ১২ প্রজাতির মাছ ব্যাপকভাবে উৎপাদিত হচ্ছে। একসময়ের বিলুপ্তপ্রায় এসব মাছ এখন বাজারে হরহামেশাই পাওয়া যায়।
সরেজমিনে ময়মনসিংহ শহরের ঐতিহ্যবাহী মেছুয়া বাজারে দেখা যায়, বাজারে বিভিন্ন দেশীয় প্রজাতির মাছের কমতি নেই। গবেষণার ধারাবাহিকতায় পোনা উৎপাদনের মাধ্যমে চাষাবাদ করা বিলুপ্তির আশংকায় থাকা মাছগুলো ক্রেতারা ন্যায্য দামে কিনতে পারছেন।
আব্দুস সালাম নামে একজন ক্রেতা খবরের কাগজকে বলেন, বাজারে দেশিয় মাছের অভাব নেই। বড় মাছগুলোর সঙ্গে ছোট মাছ বিক্রি হচ্ছে। দাম সহনীয় পর্যায়ে থাকায় আমি নিয়মিত দেশিয় ছোট কিনি।
সেলিম মিয়া নামের একজন বিক্রেতা বলেন, কয়েক বছর আগেও দেশিয় প্রজাতির মাছ বাজারে বেশি পাওয়া যেতো না। কারণ এগুলো চাষ করা হয়নি। তবে এখন বিভিন্ন দেশিয় মাছ অসংখ্য কৃষক চাষাবাদ করায় বাজারে আসছে। এতে কমেছে দাম, খুশি ক্রেতারা।
বিএফআরআই সূত্র জানায়, দেশে মিঠা পানির ২৬০টি প্রজাতির মাছের মধ্যে ১৪৩ প্রজাতির ছোট মাছ রয়েছে। এরমধ্যে ৬৪ প্রজাতির মাছ ছিল বিলুপ্তপ্রায়। গবেষণার মাধ্যমে ধীরে ধীরে ৪০ প্রজাতির মাছের সফল প্রজনন সম্পন্ন হয়েছে। দেশের বিভিন্ন নদী-নালা, খাল-বিল, হাওর-বাওর ও পুকুর থেকে ৮৮ প্রজাতির মাছ সংগ্রহ করে বিএফআরআইয়ে অবস্থিত 'লাইভ জিন ব্যাংক' এ সংরক্ষণ করা হয়েছে। বিলুপ্তির আশংকায় থাকা সব দেশিয় মাছকে পর্যায়ক্রমে খাবার টেবিলে ফেরানো হবে।
বিজ্ঞানীরা জানান, দেশিয় ছোট মাছের প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন, ক্যালসিয়াম, ফসফরাস, লৌহ ও আয়োডিনের মতো প্রয়োজনীয় খনিজ পদার্থ রয়েছে। এসব উপাদান শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাকে শক্তিশালী করে তোলে এবং রক্তশূন্যতা, গলগণ্ড, অন্ধত্ব প্রভৃতি রোগ প্রতিরোধে সহায়তা করে। জনসংখ্যা বৃদ্ধি, জলাশয় সংকোচন, অতি আহরণসহ নানাবিধ কারণে মাছের প্রজনন ও বিচরণ ক্ষেত্র বিনষ্ট হওয়ায় অনেক মাছ ছিল বিলুপ্তপ্রায়। বিলুপ্তির আশংকায় থাকা সব দেশিয় মাছকে চাষাবাদের আওতায় আনতে নিরলসভাবে গবেষণা করছে বিজ্ঞানীরা।
বিএফআরআইয়ের মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. ডুরিন আখতার জাহান বলেন, যেকোনো প্রজাতির মাছের কৃত্রিম প্রজনন সফলভাবে সম্পন্ন হলেও চাষাবাদের আওতায় আনতে অনেক সময় লাগে। কারণ, আমরা প্রচুর পোনা উৎপাদনে মনোযোগ দেওয়ার পাশাপাশি গবেষণা চলমান থাকে। আশা করছি বিলুপ্তপ্রায় আরও কয়েকটি মাছের কৃত্রিম প্রজনন দ্রুতই সম্পন্ন হবে।
মূখ্য বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. মো. রবিউল আউয়াল হোসেন বলেন, আমাদের এখানে লাইভ 'জিন ব্যাংক' রয়েছে। দেশিয় মাছ সংগ্রহ করে এই ব্যাংকে সংরক্ষণ করা হয়। আগে শুধুমাত্র ইনস্টিটিউটের ময়মনসিংহের স্বাদুপানি গবেষণা কেন্দ্র থেকে বিলুপ্তপ্রায় মাছ সংরক্ষণ ও উন্নয়নে গবেষণা পরিচালনা করা হলেও বর্তমানে ময়মনসিংহের স্বাদুপানি কেন্দ্র ছাড়াও বগুড়ার সান্তাহার, নীলফামারী জেলার সৈয়দপুর ও যশোর উপকেন্দ্রে বিলুপ্তপ্রায় মাছ সংরক্ষণে গবেষণা পরিচালনা করা হচ্ছে। সব দেশিয় মাছের সফল প্রজনন সম্পন্ন করতে আমাদের চেষ্টার কমতি নেই।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের (বিএফআরআই) মহাপরিচালক ড. অনুরাধা ভদ্র বলেন, গবেষণার পাশাপাশি এখন কয়েক প্রজাতির মাছের প্রচুর পোনা উৎপাদনের চেষ্টা চলছে। যাতে করে বিলুপ্তপ্রায় দেশিয় মাছগুলো সারাদেশে প্রচুর চাষাবাদ হয়। চাষাবাদ বাড়লে ক্রেতারা কম দামে এসব মাছ পাবে। এতে বিক্রেতারা লাভবান হওয়ার পাশাপাশি এ খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে।
কামরুজ্জামান মিন্টু/মেহেদী/