দক্ষিণাঞ্চলে চীনাবাদাম চাষ যেন এনে দিয়েছে নতুন সম্ভাবনার আলো। কম খরচে অধিক লাভের এই আবাদ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে বরিশাল বিভাগের নানা প্রান্তে। কৃষকরা বলছেন, অনুকূল আবহাওয়া আর উন্নত জাতের কারণে এবার ফলন ভালো হওয়ারই কথা। সামনে বাদাম তোলার মৌসুম, সেই প্রত্যাশায় কৃষকের মুখে এখন হাসি, আর মনে একটুখানি নিশ্চিন্ত ভবিষ্যতের স্বপ্ন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, চলতি মৌসুমে বিভাগের ছয় জেলায় মোট ১৭ হাজার ৪৭৯ হেক্টর জমিতে চীনাবাদামের আবাদ হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আবাদ হয়েছে ভোলা ও পটুয়াখালী জেলায়। বিশেষ করে ভোলার চরাঞ্চলজুড়ে বিস্তীর্ণ জমিতে চীনাবাদামের চাষ এ অঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।
জেলাভিত্তিক হিসাবে দেখা যায়, বরিশালে ৩০০ হেক্টর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৩৩২ হেক্টর জমিতে। পিরোজপুরে ১৬২ হেক্টরের বিপরীতে ১৫৫ হেক্টর এবং ঝালকাঠিতে ১৫৫ হেক্টরের বিপরীতে ১৫১ হেক্টর জমিতে আবাদ হয়েছে। পটুয়াখালীতে লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৮ হাজার ১৫০ হেক্টর, সেখানে আবাদ হয়েছে ৬ হাজার ৭৫৯ হেক্টর জমিতে। বরগুনায় ৮৭০ হেক্টরের বিপরীতে ৮০৪ হেক্টর এবং ভোলায় ৯ হাজার ৭০০ হেক্টরের লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আবাদ হয়েছে ৯ হাজার ২৭৮ হেক্টর জমিতে।
কৃষি বিভাগ বলছে, উন্নত জাতের ব্যবহার এবং অনুকূল আবহাওয়ার কারণে এবার ফলনও ভালো হয়েছে। প্রতি হেক্টরে ২ দশমিক ৫ থেকে ৩ মেট্রিক টন পর্যন্ত উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে সামগ্রিক উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যেতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। চাষাবাদে ব্যবহৃত উল্লেখযোগ্য জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে ঢাকা-১, বিনা চীনাবাদাম-৪ ও বারি চীনাবাদাম-৮।
মাঠপর্যায়ে গিয়ে দেখা যায়, ভোলার তেঁতুলিয়া নদীর তীরবর্তী নুরাবাদ, নীলকমল, আহমেদপুর, চরকলমি ও মুজিবনগর ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ চরাঞ্চলে ব্যাপকভাবে চীনাবাদামের চাষ হয়েছে। একই চিত্র দেখা গেছে বরিশালের লাহারহাট ও চরবাড়িয়া এলাকায়ও, যেখানে কৃষকরা ধানের বিকল্প হিসেবে এই ফসলের দিকে ঝুঁকছেন।
লাহারহাট এলাকার কৃষক জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘এবার আবহাওয়া ভালো থাকায় ফলন বেশ ভালো হয়েছে। খরচ কম হওয়ায় লাভের আশা করছি। সবকিছু ঠিক থাকলে আগের বছরের চেয়ে বেশি আয় হবে।’
চাঁদপাশা এলাকার কৃষক ইউসুফ মিয়া বলেন, ‘ধানের তুলনায় চীনাবাদাম চাষে খরচ কম, কিন্তু লাভ বেশি। তাই এখন অনেকেই এই চাষে ঝুঁকছেন।’
চরফ্যাশনের কৃষক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ‘চরাঞ্চলের পলি ও দোআঁশ মাটি চীনাবাদামের জন্য খুবই উপযোগী। আমরা প্রতিবছর এই চাষ করে ভালো আয় করছি। সরকার যদি আরও সহায়তা দেয়, তাহলে উৎপাদন আরও বাড়ানো সম্ভব।’ কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এবং কীটপতঙ্গের আক্রমণ না হলে উৎপাদন খরচ বাদ দিয়েও ভালো লাভ করা সম্ভব। ফলে দিন দিন কৃষকদের মধ্যে চীনাবাদাম চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে। বিশেষ করে চরাঞ্চলের পতিত জমি কাজে লাগিয়ে অনেক কৃষক নতুনভাবে এই চাষ শুরু করছেন।
এদিকে উৎপাদিত বাদাম স্থানীয় চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে সরবরাহ করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে পাইকাররা সরাসরি মাঠ থেকেই বাদাম সংগ্রহ করছেন, ফলে কৃষকরা সহজেই বাজার পাচ্ছেন। সংশ্লিষ্টদের মতে, সংরক্ষণ ও প্রক্রিয়াজাতকরণব্যবস্থা উন্নত করা গেলে চীনাবাদাম ভবিষ্যতে রপ্তানিমুখী ফসল হিসেবেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
বরিশাল কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক ড. মোহাম্মদ নজরুল ইসলাম শিকদার বলেন, ‘চীনাবাদাম একটি লাভজনক ও পুষ্টিকর ফসল। কম খরচে বেশি লাভ হওয়ায় কৃষকদের আগ্রহ বাড়ছে। সরকারিভাবে উন্নত বীজ ও প্রযুক্তিগত সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আশা করছি, এবার উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাবে।’
সব মিলিয়ে দক্ষিণাঞ্চলের কৃষিতে নতুন সম্ভাবনার নাম এখন চীনাবাদাম। পরিকল্পিত উদ্যোগ, বাজারব্যবস্থা উন্নয়ন এবং সরকারি সহায়তা অব্যাহত থাকলে এই ফসল শুধু কৃষকের মুখেই হাসি ফোটাবে না, দেশের অর্থনীতিতেও রাখবে গুরুত্বপূর্ণ অবদান এমনটাই মনে করছে কৃষি দপ্তর।