কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলায় এবার জাতীয় ফল কাঁঠালের বাম্পার ফলন হয়েছে। ভালো ফলন ও বেশি দাম পাওয়ার প্রত্যাশায় খুশি চাষিরা। তাদের চোখে-মুখে তৃপ্তির হাসি।
মাত্র কদিন পরেই পাকা কাঁঠালের মিষ্টি গন্ধে মুখরিত হবে চারপাশ। গাছে গাছে ভিড় করছে পাখ-পাখালি আর কীটপতঙ্গের দল। গাছগুলোতে সারি সারি কাঁঠাল দেখে থমকে দাঁড়ান পথিক। প্রতিটি কাঁঠালগাছে ঝুলে রয়েছে ছোট-বড় শত শত কাঁঠাল। এ সময় কাঁঠালের মিষ্টি রসে গ্রামেগঞ্জে চিড়া, মুড়ি খাওয়ার ধুম পড়ে যায়।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, দাউদকান্দি উপজেলায় বাণিজ্যিকভাবে কাঁঠাল বাগান নেই। বাড়ির আঙিনা,পতিত জমি ও রাস্তার দুই পাশের জমিতে কাঁঠালগাছ রয়েছে। এসব গাছে প্রতিবছর প্রচুর কাঁঠাল উৎপাদন হয়। প্রতিটি গাছের গোড়া থেকে আগা পর্যন্ত শোভা পাচ্ছে পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ জাতীয় ফল কাঁঠাল। উপজেলার চাহিদা পূরণের পাশাপাশি ঢাকা- চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় সরবরাহ করেন গাছ মালিক ও ব্যবসায়ীরা।
পৌর সদরসহ উপজেলার ১৫টি ইউনিয়নে ১২ হেক্টর জমিতে কাঁঠালের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। ২৫০ মে. টন কাঁঠাল উৎপাদন হবে বলে কৃষি অফিস ধারণা করছে।
উপজেলার ইলিয়টগঞ্জের কুশিয়ারা গ্রামে ছোট কিছু বাগানের পাশাপাশি প্রতিটি বাড়ির আঙিনায়, রাস্তার দুই পাশে, পতিত জমিতে প্রচুর কাঁঠালগাছের দেখা মেলে, যা প্রত্যেক পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে থাকে। প্রতিটি গাছে ৫০ থেকে ১০০ এবং তারও অধিক কাঁঠাল ধরেছে। এ যেন কাঁঠালের রাজত্ব।
গতকাল রবিবার সরেজমিনে দেখা গেছে, উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারগুলোতে পাকা কাঁঠাল উঠতে শুরু করেছে। এখানকার অধিকাংশ কাঁঠালগাছগুলো বাগানভিত্তিক না হলেও বাড়ির আঙিনায়, রাস্তার দুই ধারে, পার্ক, স্কুল, কলেজের চত্বরে প্রচুর কাঁঠালগাছের দেখা মেলে। আর এসব গাছে ঝুলে থাকা কাঁঠলের দৃশ্য অনেকের নজর কাড়ে।
তবে উপজেলার চরাঞ্চল কাঁঠালের জন্য প্রসিদ্ধ। ফলনও বেশি হয়। প্রতিটি বাড়ির আঙিনায়, রাস্তার দুই ধারে দেখা যায় সারি সারি কাঁঠালগাছ। বিশেষ করে চেঙ্গাকান্দি, গোলাপের চর, বাহেরচর, গঙ্গা প্রসাদ, কান্দারগাঁও, হাসনাবাদ ভিটিকান্দি, কুশিয়ারা, গ্রাম কাঁঠালের জন্য বিখ্যাত।
স্থানীয়রা জানান, প্রতিদিন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বিভিন্ন হাট-বাজারে, নিরামিষ খাবারের জন্য কাঁচা কাঁঠাল নিতে চাষিদের বাড়িতে পাইকারদের উপচে পড়া ভিড় থাকে। দূর-দূরান্ত থেকে পাইকাররা বিভিন্ন যানবাহনে করে কাঁচা কাঁঠাল দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যায়।
এখানে প্রতিটি বড় সাইজের কাঁঠাল কাঁচা বর্তমানে ৬০ থেকে ৮০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। মাঝারি সাইজের কাঁঠাল ৪০ থেকে ৬০ টাকা এবং ছোট কাঁঠাল ৩০ থেকে ৪০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ক্রেতা বিক্রেতাদের কাছে মাঝারি সাইজের কাঁঠালের কদর রয়েছে সবচেয়ে বেশি। ভালো দাম পাওয়ায় খুশি কাঁঠাল মালিকরা।
আষাঢ়-শ্রাবণ মাস কাঁঠাল পাকার উৎকৃষ্ট সময়। তবে বৈশাখ-জ্যৈষ্ঠ মাস থেকে পর্যাপ্ত পরিমাণ কাঁঠাল বাজারে বেচা-কেনা হচ্ছে।
কাঁঠালের একটি বড় গুণ এর কোনো কিছু বাদ যায় না। কাঁঠালের কোষ, খোসা ও বিচি সব কিছুই প্রয়োজনীয়। বিচি উৎকৃষ্টমানের সবজি হিসেবে তরকারি রান্না করে খাওয়া হয়। কাঁঠালের খোসা গরু-ছাগলের প্রিয় খাদ্য। তা ছাড়া কাঁঠালের পাতা ছাগল-ভেড়া-গরুর প্রিয় খাবার হিসেবে ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। কাঁঠাল উৎপাদনে কোনো খরচ না থাকায় চাষিরা বেশি লাভবান হন।
উপজেলার কুশিয়ারা গ্রামের সাইদ আহম্মেদ বলেন, আমাদের ৩৫টি কাঁঠালগাছ। এর মধ্যে ১৫০টি কাঁচা কাঁঠাল বিক্রি করেছি। প্রতিটি গাছে মাশ্আল্লাহ অনেক কাঁঠাল এসেছে। আত্মীয়স্বজন, পরিবারের চাহিদা মিটিয়ে কাঁচা ও পাকা অনেক কাঁঠাল বিক্রি করি।
গঙ্গাপ্রসাদ গ্রামের কৃষক মো. মমিন বলেন, এবার কাঁঠালের বাম্পার ফলন হয়েছে। ভালো দাম পাওয়ার প্রত্যাশা করছি।
কুশিয়ারা গ্রামের গ্রামের কাঁঠাল বাগান মালিক মোহাম্মদ জসিম মিয়া জানান, তাদের বাগানে ৭০ থেকে ৮০টি কাঁঠালগাছ আছে। এখন পর্যন্ত ২০ হাজার টাকার কাঁচা কাঁঠাল বিক্রি করেছি। আর মাত্র কয়েক দিন পরে আবার পাকা কাঁঠাল বিক্রি শুরু হবে। গতবছরের মতো এবারও বাম্পার ফলন হয়েছে কাঁঠালের।
বাহেরচর হাসনাবাদ গ্রামের জুলেখা খাতুন বলেন, ‘আমাদের ৩০টি কাঁঠালগাছ রয়েছে। তিনি কাঁচা কাঁঠাল বিক্রি করেন না। পাকা শুরু হলেই তার গাছের কাঁঠাল বিক্রি করবেন।
ইলিয়টগঞ্জ লক্ষ্মীপুর গ্রামের কৃষক মনি লাল বলেন, এবার কাঁঠালের বাম্পার ফলন হয়েছে। মনে হয় ভালো দামও পাব।
দাউদকান্দি উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডাক্তার হাবিবুর রহমান বলেন, চিকিৎসকদের মতে কাঁঠালে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ভিটামিন-সি ভিটামিন-বি, ভিটামিন ই-ক্যালসিয়াম ফলিক এসিড রয়েছে। টাটকা ফলে পটাশিয়াম ম্যাগনেশিয়াম এবং আয়রনের একটি ভালো উৎস। তা ছাড়া পটাশিয়াম হার্টের গতি ও রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে। পাকা কাঁঠালে প্রচুর পরিমাণ আঁশ রয়েছে। ফলে পাকা কাঁঠাল খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য হওয়া থেকে রক্ষা পাওয়া যায়।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি অফিসার কৃষিবিদ নিগার সুলতানা জানান, উপজেলায় সর্বত্রই কাঁঠালগাছ চোখে পড়ে। কুমিল্লার মাটি বিশেষ করে চরাঞ্চলের মাটি কাঁঠাল চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী। এ বছর উপজেলায় কাঁঠালের বাম্পার ফলন হয়েছে। এতে করে কৃষকরা কাঁঠাল বিক্রি করে অনেক লাভবান হবেন।