চাকরি যেন সোনার হরিণ। অনার্স-মাস্টার্স শেষ করে চাকরির জন্য দীর্ঘদিন অপেক্ষা করেও যখন কিছু মিলছিল না, তখন রাজবাড়ীর বালিয়াকান্দি উপজেলার ভিমনগর গ্রামের এনামুল হক সজিব ভেঙে পড়েননি। চাকরি না পেয়ে তিনি কৃষিকেই জীবিকার পথ হিসেবে বেছে নেন। শুরু করেন একেবারে নতুন ধারার চাষাবাদ- ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ পদ্ধতিতে বিষমুক্ত আম উৎপাদন। এই পথে তিনি পেয়েছেন আর্থিক সচ্ছলতা, সামাজিক মর্যাদা আর তরুণ উদ্যোক্তার পরিচিতি।
প্রায় পাঁচ বছর আগে বাড়ির পাশে চার বিঘা জমিতে ৩৫০টি আমগাছ রোপণ করে শুরু করেন তার পথচলা। গাছে ফল এলেও শুরুতে সফলতা আসেনি। মাছি-পোকার আক্রমণ, অতিরিক্ত কীটনাশক প্রয়োগ এবং ফলের সৌন্দর্যহানি- সব মিলিয়ে কাঙ্ক্ষিত দাম পাননি বাজারে।
এ অবস্থায় ভরসা হয়ে দাঁড়ান মা এবং উপজেলা কৃষি অফিস। কৃষি সম্প্রসারণ অফিসের সহযোগিতায় সজিব প্রশিক্ষণ নেন এবং সিদ্ধান্ত নেন আধুনিক, পরিবেশবান্ধব ‘ফ্রুট ব্যাগিং’ পদ্ধতিতে আম উৎপাদন শুরু করার। এই পদ্ধতিতে আমের ওজন যখন ৮০ থেকে ১০০ গ্রামে পৌঁছায়, তখন প্রতিটি ফল আলাদাভাবে ব্যাগে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। ফলে মাছি-পোকাসহ বিভিন্ন রোগবালাই থেকে ফল সুরক্ষিত থাকে। ব্যাগের ভেতরেই ফল বড় হয়, রং হয় উজ্জ্বল, আর গঠন হয় আকর্ষণীয়। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো- ফল উৎপাদনে এক ফোঁটাও কীটনাশক লাগে না। সজিব বলেন, ‘ব্যাগ ব্যবহারের পর কীটনাশক লাগে না। এটা একেবারেই বিষমুক্ত।’
তার বাগানে বর্তমানে বারি ফোর, হিমসাগর, হাড়িভাঙা, কাটিমন, নবাব পছন্দ, মল্লিকা প্রভৃতি জাতের আম রয়েছে। বিষমুক্ত ও দৃষ্টিনন্দন হওয়ায় এসব আম তিনি বাগান থেকেই বাজারদরের চেয়ে ১০ থেকে ২০ টাকা বেশি দামে বিক্রি করছেন। সজিব বলেন, ‘মান ভালো হলে ক্রেতা দাম বেশি দিতেও প্রস্তুত।’
সজিব এখন আরও চার বিঘা জমিতে কমলা, মালটা ও কুলের চাষ করছেন। এসব ফল চাষও হচ্ছে আধুনিক পদ্ধতিতে। তার এই সাফল্য দেখে অনেক স্থানীয় যুবক ফল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কেউ কেউ বাগানে গিয়ে শিখছেন তার পদ্ধতি, নিচ্ছেন পরামর্শ।
বাগান থেকেই ফল কিনছেন ক্রেতারা। স্থানীয় একজন বলেন, ‘সজিবের বাগানের আমগুলো দেখতে সুন্দর, আকারে বড়, আর খেতেও দারুণ। কোনো দাগ নেই, সুস্বাদু, আর নিশ্চিতভাবে বিষমুক্ত। তাই নিশ্চিন্তে কিনি।’
বালিয়াকান্দি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘এই অঞ্চলে বাণিজ্যিকভাবে ফ্রুট ব্যাগিংয়ে আম চাষের সূচনা করেছেন সজিব। প্রতিটি ব্যাগের খরচ পড়ে ৫ টাকা। তাই সাধারণ কৃষকরা আগ্রহ দেখান না। তবে সজিব দেখিয়ে দিয়েছেন এই পদ্ধতিতে সফল হওয়া যায়।’
তিনি আরও বলেন, ‘এই বছর সজিবের বাগান থেকে ২৪ টনের মতো আম উৎপাদিত হবে বলে ধারণা করছি। প্রতিটি আমের ওজন ৫০০ গ্রামের বেশি। ব্যাগিংয়ের কারণে ফলের রং, আকার ও গঠন সবই উন্নত হয়েছে। এসব ফল রপ্তানিযোগ্য।’
কৃষি কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ফ্রুট ব্যাগিং ব্যবহারে শুধু ফল রক্ষা হয় না, কৃষকও লাভবান হন। আমরা নিরাপদ, বিষমুক্ত এবং পরিবেশবান্ধব ফল উৎপাদনে কৃষকদের উদ্বুদ্ধ করছি। সজিবের মতো উদ্যোক্তারা কৃষির নতুন দিগন্ত উন্মোচন করছেন।’
নিজের স্বপ্নের কথা জানিয়ে সজিব বলেন, ‘চাকরির পেছনে ছুটে সময় নষ্ট না করে আমি সিদ্ধান্ত নিই নিজের কিছু করার। এখন কৃষিই আমার পেশা আর ভালোবাসা। ভবিষ্যতে আরও জমি নিয়ে আধুনিক ফলের বাগান করতে চাই, যেন দেশজুড়ে বিষমুক্ত ফল পৌঁছে দিতে পারি।’
সরকারি সহযোগিতার দিকে তাকিয়ে সজিব বলেন, ‘সরকার যদি আরও সহযোগিতা করে, তাহলে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে ফ্রুট ব্যাগিং পদ্ধতি ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। এতে ভোক্তারা যেমন নিরাপদ ফল পাবেন, তেমনি কৃষকরাও লাভবান হবেন।’