কুমিল্লার দাউদকান্দি উপজেলার ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পাশে বিস্তীর্ণ প্লাবনভূমিতে একসঙ্গে মাছ ও ধান চাষের মডেল সারা দেশে প্রশংসিত হয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় শতাধিক প্লাবনভূমি মৎস্য প্রকল্প চালু রয়েছে। এসব প্রকল্পে ব্যাপক কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে।
সমাজবদ্ধভাবে মাছ চাষের উদ্যোগের পেছনে রয়েছে কঠোর পরিকল্পনা, নিয়মিত পরিচর্যা ও নিরলস পরিশ্রম। এর মধ্যে অন্যতম বেকিনগর-বাশরা মিয়াজী বাড়ি গ্রামের আলী আহম্মেদ মিয়াজী।
আলী আহম্মেদ মিয়াজীর নেতৃত্বে ৪০০ একর প্লাবনভূমিতে ৮টি মৎস্য প্রকল্প পরিচালিত হচ্ছে। তিনি এসব প্রকল্পের ব্যবস্থাপনা পরিচালক। বছরে রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, পাঙাশ, গ্রাসকার্প ও সিলভার কার্পসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ বিক্রি হয় প্রায় ৬০ কোটি টাকায়।
পরিশ্রম ও আত্মবিশ্বাসকে শক্তি করে আলী আহম্মেদ মিয়াজী এখন একজন সফল মৎস্যচাষি। তিনি নিজের ভাগ্যের চাকা ঘোরানোর পাশাপাশি এলাকায় চার শতাধিক বেকার যুবকের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছেন। প্লাবনভূমিতে মাছ চাষে তার সাফল্য এখন স্থানীয় মানুষের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস।
আলী আহম্মেদ মিয়াজী দাউদকান্দি উপজেলার বাশরা গ্রামের শহিদুল্লাহ মিয়াজীর দ্বিতীয় পুত্র। ২০১০ সালে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট (বিএফআরআই) থেকে প্রশিক্ষণ ও পরামর্শ নেন। এরপর ছোট পরিসরে মাছ চাষ শুরু করেন। প্রথম বছরেই প্রত্যাশার চেয়ে বেশি লাভ হয়। এতে উৎসাহিত হয়ে প্রকল্পের সংখ্যা ও পোনা ছাড়ার পরিমাণ বাড়ান।
প্রকল্পগুলোতে দেখা যায়, বিশাল জলাশয়ে মাছকে খাবার দিতে ব্যস্ত কর্মচারীরা। কেউ পরিচর্যায়, কেউ নজরদারিতে। বর্তমানে এসব প্রকল্পে চার শতাধিক কর্মচারী কাজ করছেন। আশপাশের গ্রামের বিভিন্ন বয়সী মানুষ এখানে নিয়মিত কাজ পাচ্ছেন।
আলী আহম্মেদ মিয়াজী বলেন, ‘১৫ বছর ধরে মাছ চাষের সঙ্গে জড়িত। লাভ না হলে এখানে টিকে থাকা সম্ভব ছিল না। শুরুটা ছিল কঠিন। তবে সাহস ও আত্মবিশ্বাস নিয়ে কাজ করায় দ্রুত সফলতা এসেছে।’ তিনি আরও বলেন, ‘মাছ চাষের ইচ্ছার কথা পরিবারকে জানালে প্রথমে তারা বাধা দেয়। পরে বুঝিয়ে শুরু করি। এখন সফল হয়েছি। শিক্ষিত বেকার যুবকদের সরকারিভাবে সহায়তা দিলে মাছ চাষে আগ্রহী করে তোলা সম্ভব। এতে বেকারত্ব কমবে, দেশের অর্থনীতিও শক্ত হবে।’
প্লাবনভূমিতে মাছ চাষ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘শুরু থেকেই রুই, কাতলা, তেলাপিয়া, পাঙাশ, গ্রাসকার্প ও সিলভার কার্প চাষ লাভজনক ছিল। এ জন্য অনেকেই এই পদ্ধতিতে আগ্রহী হয়েছেন। তবে গত দুই বছর ধরে প্লাবনভূমির মাছ বিদেশে রপ্তানি করা যাচ্ছে না। এতে অনেক মৎস্যচাষি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। আশা করি, দ্রুত রপ্তানির উদ্যোগ নেওয়া হবে।’
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা সাবিনা ইয়াসমিন জানান, উপজেলায় বছরে মাছের চাহিদা ৬ হাজার ৯৮৭ টন। বিপরীতে গত বছর উৎপাদন হয়েছে ৪৫ হাজার ৩৫৯ টন। এর মধ্যে প্লাবনভূমি থেকে এসেছে প্রায় ৪০ হাজার টন মাছ; যা স্থানীয় চাহিদার চেয়ে প্রায় ৩৯ হাজার ৩৭২ টন বেশি। তিনি বলেন, ‘ছয় মাস মাছ চাষের পর ধানের মৌসুম শুরুর আগে জমিতে আলাদা পরিচর্যার প্রয়োজন হয় না। জমি থাকে পরিষ্কার। ধান চাষে বাড়তি সারও লাগে না।’