দিনাজপুরে এ বছর আলুর ফলন ভালো হলেও ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় চরম সংকটে পড়েছেন চাষিরা। মাঠে আলু উঠলেই খরচের হিসাব মিলিয়ে সামনে আসছে লোকসানের চিত্র। এতে অনেক চাষিই ভয়ে আলু তুলতে চাইছেন না। উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারদর এতটাই কম যে, আলু তুললেই ক্ষতির আশঙ্কা করছেন তারা।
দিনাজপুর সদর উপজেলার আউলিয়াপুর ইউনিয়নের টিকলির মাঠ ঘুরে দেখা গেছে, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে সবুজ আলুর খেত। মাঠে নারী-পুরুষ, কিশোর-কিশোরীসহ বিভিন্ন বয়সের শ্রমিকরা আলু উত্তোলনে ব্যস্ত। নতুন ‘সেভেন ক্যারেজ’ জাতের আলু তুলতেই এই কর্মচাঞ্চল্য। তবে শ্রমিকদের ব্যস্ততা থাকলেও কৃষকদের চোখেমুখে স্বস্তি নেই।
মাঠে সারিবদ্ধভাবে আলু তোলা হচ্ছে। কেউ ধামায় আলু ভরছেন। কেউ ধামা থেকে বস্তায় ভরছেন। কেউ বস্তার মুখ প্যাকিং করে জমিতে দাঁড় করিয়ে রাখছেন। আবার কেউ সেই বস্তা ভ্যানগাড়িতে করে বাজারে নিয়ে যাচ্ছেন।
চাষিদের অভিযোগ, প্রতি বস্তা আলু তুলতেই খরচ হচ্ছে প্রায় ২০০ টাকা। একটি বস্তার বাজারমূল্য ৬০০ থেকে ৬৫০ টাকা। অথচ শ্রমিক মজুরি, বস্তা, সুতলি ও ভ্যানভাড়া মিলিয়ে খরচ পড়ছে প্রায় ২০০ টাকা। ফলে বস্তাপ্রতি কৃষকের হাতে থাকছে মাত্র ৪০০ থেকে ৪৫০ টাকা। অন্যদিকে এক কেজি আলু উৎপাদনে খরচ পড়েছে ১৫ থেকে ১৬ টাকা। সেখানে মাঠ থেকেই আলু বিক্রি করতে হচ্ছে ৮ থেকে ৯ টাকা কেজি দরে।
শ্রমিক মজুরিও বেড়েছে। চার ঘণ্টার জন্য একজন নারী শ্রমিককে দিতে হচ্ছে ২৫০ টাকা। আট ঘণ্টার জন্য ৫০০ টাকা। পুরুষ শ্রমিকদের ক্ষেত্রে এই মজুরি আরও ৫০০ টাকা বেশি। তরুণ শ্রমিকদের দৈনিক মজুরি ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা। এ ছাড়া প্রতি বস্তার দাম ৬০ টাকা। জমি থেকে বাজারে নিতে ভ্যানভাড়া দিতে হচ্ছে আরও ২০ থেকে ২৫ টাকা। সব মিলিয়ে প্রতি বস্তায় খরচের চাপ বাড়ছেই।
চাষিরা জানান, প্রতি শতক জমিতে ভালো ফলন হলে চার থেকে পাঁচ বস্তা আলু পাওয়া যাচ্ছে। ফলন সন্তোষজনক হলেও বাজারদরের কারণে লাভের আশা ভেঙে গেছে। অনেকের মতে, এভাবে চলতে থাকলে আগামী মৌসুমে আলু চাষ নিয়ে বড় সিদ্ধান্তহীনতায় পড়তে হবে।
টিকলির মাঠের চাষি রুহুল আমিন জানান, তিনি ৬২ শতক জমিতে আলু আবাদ করেছিলেন। এতে তার মোট খরচ হয়েছে প্রায় ৫০ হাজার টাকা। ফলন পেয়েছেন ৫৫ বস্তা। প্রতিটি বস্তা ৬০০ টাকা দরে বিক্রি করলেও আলু উত্তোলন, শ্রমিক ও পরিবহন খরচ মিলিয়ে আরও ১১ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। সব মিলিয়ে তার ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৩ হাজার টাকা। তিনি বলেন, ‘এভাবে ক্ষতি হলে আগামী বছর আলু চাষ করা আমাদের জন্য কঠিন হয়ে যাবে।’
চাষি আইয়ুব আলী বলেন, ‘প্রতি বছর লাভের আশায় আলু চাষ করি। এ বছর বীজের দাম কিছুটা কম হলেও সার, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ বেড়েছে। ৪৮ শতক জমিতে আলু করতে ৬৫ থেকে ৭০ হাজার টাকা খরচ হয়েছে। ফলন ভালো হলেও দাম না থাকায় পরিবার নিয়ে বিপাকে পড়েছি।’
আরেক চাষি নুরুজ্জামান জানান, তিনি ১৮ কাঠা জমি এক বছরের জন্য খাজনা বাবদ ৫০ হাজার টাকায় নিয়েছিলেন। সেখানে আলু আবাদে আরও ৬০ হাজার টাকা খরচ হয়। আলু তোলা ও পরিবহন খরচসহ আরও ৭ হাজার টাকা যোগ হয়েছে। মাঠ থেকেই আট টাকা কেজি দরে আলু বিক্রি করতে বাধ্য হওয়ায় তার ক্ষতি হয়েছে প্রায় ১৪ থেকে ১৫ হাজার টাকা।
চাষি আরিফ হোসেন বলেন, ‘আমার এক কাঠা জমিতে চার বস্তা আলু হয়েছে। ফলন ভালো হলেও দাম না থাকায় মনটা ভেঙে গেছে। আমরা চাষিরা কার কাছে অভিযোগ করব? সামনে আলুর আবাদ বাদ দিয়ে পপকর্ন চাষের কথা ভাবছি। যদি সেখানেও লাভ না হয়, তাহলে টিকে থাকা কঠিন হবে।’
মোবারক হোসেন বলেন, ‘বর্তমানে আলুর দাম কম থাকায় ভয়ে আলু তুলতেই পারছি না। এক কেজি আলু উৎপাদনে যেখানে ১৫ থেকে ১৬ টাকা খরচ, সেখানে বিক্রি করতে হচ্ছে ৯ থেকে ১০ টাকা কেজি দরে। দাম না বাড়লে আমাদের ক্ষতি আরও বাড়বে।’
দিনাজপুর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আফজাল হোসেন জানান, এ বছর দিনাজপুরে আগাম জাতের আলুর ব্যাপক উৎপাদন হয়েছে। ফলন ভালো হলেও বাজারে সরবরাহ বেশি থাকায় দাম কমে গেছে। তিনি বলেন, ‘গত বছর এই নতুন জাতের আলু ৫০ থেকে ৬০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হলেও বর্তমানে বাজারে ১৫ থেকে ২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।’