নেত্রকোনার পাহাড়ি ও হাওর অঞ্চলে চলতি বোরো মৌসুমে একটানা শীত, ঘন কুয়াশা ও হিমেল হাওয়ার কারণে ধান রোপণ উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে গেছে। এতে কৃষকদের সময় ও অর্থ দুটোই বেশি খরচ হচ্ছে। পাশাপাশি দেরিতে রোপণের কারণে আগাম বন্যায় ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় চরম দুশ্চিন্তায় পড়েছেন হাওরাঞ্চলের কৃষকরা।
নেত্রকোনার মোহনগঞ্জ, মদন ও খালিয়াজুরী উপজেলার বিস্তীর্ণ হাওর এলাকাকে বোরো ধান চাষের ভাণ্ডার বলা হয়। এই তিন উপজেলার উৎপাদিত ধান শুধু স্থানীয় চাহিদা মেটায় না, বরং জেলার বাইরেও সরবরাহ করা হয়। কিন্তু এ বছর দীর্ঘদিনের শীতল আবহাওয়ার কারণে নির্ধারিত সময়ে জমিতে ধান রোপণ করা যাচ্ছে না। ফলে রোপণে অতিরিক্ত সময় লাগছে। সেই সঙ্গে বেড়েছে শ্রমিকের সংখ্যা ও উৎপাদন ব্যয়।
কৃষকরা বলছেন, হাওর এলাকায় বছরে একটি মাত্র ফসল হয়। বোরো ধানই তাদের একমাত্র ভরসা। যে বছর বোরো চাষে বিলম্ব হয়, সে বছর যদি আগাম বন্যা আসে, তাহলে বিপুল ক্ষতির মুখে পড়তে হয়। এক ফসলি জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেলে সারা বছর পরিবার নিয়ে অনাহারে দিন কাটাতে হয়। অনেক সময় গরু-ছাগল বিক্রি করতে হয়। আবার সংসার চালাতে মহাজনের কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে বাধ্য হন তারা।
মোহনগঞ্জ উপজেলার ডিঙ্গাউথা হাওরপাড়ের কৃষক ফজলুল হক জানান, হাওরের জমিতে একটি মাত্র ফসল হয়। শীতের প্রকোপ বেশি হলে ধান গাছ বড় হলেও অনেক সময় চিটা হয়ে যায়। তখন কৃষকদের দুঃখের সীমা থাকে না। তার ওপর যদি অকাল বন্যা হয়, তাহলে সব শেষ হয়ে যায়। এই ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে কয়েক বছর লেগে যায়।’
তিনি আরও বলেন, এ বছর শীতের কারণে বীজতলা থেকে শুরু করে জমিতে রোপণ পর্যন্ত সবকিছুতেই সমস্যা হচ্ছে। ঠাণ্ডায় ধানের বৃদ্ধি ধীরগতির হয়ে পড়ছে। এতে উৎপাদন নিয়ে অনিশ্চয়তা বাড়ছে।
মদন উপজেলার মাঘান ইউনিয়নের মাঘান গ্রামের কৃষক রহমান মিয়া বলেন, ‘শীতের কারণে একদিকে শ্রমিক বেশি লাগছে। অন্যদিকে জমিতে পোকার আক্রমণের আশঙ্কা আছে। অতিরিক্ত নজর আর যত্ন না নিলে ক্ষতি বেড়ে যেতে পারে। এই পরিস্থিতিতে কৃষি কর্মকর্তাদের সহযোগিতা খুব দরকার।’
কৃষকরা বলছেন, সময়মতো পরামর্শ ও মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানো গেলে ক্ষতির পরিমাণ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। বিশেষ করে রোগবালাই ও পোকার আক্রমণ রোধে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ আমিরুল ইসলাম বলেন, ‘এ বছর প্রচণ্ড শীতের হিমেল হাওয়া ও কুয়াশার কারণে বোরো ধানের রোপণ অন্তত ১০ দিন পিছিয়ে গেছে। তবে সামগ্রিকভাবে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হবে বলে আমরা আশা করছি।’ তিনি আরও জানান, কৃষকদের যেকোনো সমস্যায় জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের কৃষি বিভাগ পাশে থাকবে। প্রয়োজন অনুযায়ী পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়া হবে।
জেলা কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, চলতি বোরো মৌসুমে নেত্রকোনার হাওর এলাকায় বোরো রোপণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪১ হাজার ৭৫ হেক্টর জমিতে। চলতি সপ্তাহ পর্যন্ত রোপণ হয়েছে প্রায় ৪০ হাজার হেক্টর জমিতে। জেলার মোট ১০টি উপজেলায় এ বছর বোরো রোপণের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৮৫ হাজার ৫৪৮ হেক্টর। এ পর্যন্ত রোপণ সম্পন্ন হয়েছে প্রায় ৫৪ হাজার ৭৭৫ হেক্টর জমিতে।
কৃষি বিভাগ বলছে, আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে বাকি জমিতেও দ্রুত রোপণ শেষ করা সম্ভব হবে। তবে আগাম বন্যা বা অন্য কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ দেখা দিলে পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রস্তুত রয়েছে জেলা ও উপজেলা কৃষি বিভাগ।