মিঠাপানির চরম সংকট আর মাটির বাড়তে থাকা নোনা ভাব এই দুই প্রতিকূলতার সঙ্গেই এখন মিতালি সাতক্ষীরার কৃষকদের। উপকূলের এই কঠিন পরিস্থিতিতে টিকে থাকতে তারা এবার সময়ের আগেই বোরো ধান আবাদ শুরু করেছেন। তবে লোনাপানির চেয়েও বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে সার, কীটনাশক আর তেলের চড়া দাম। নোনা মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে ফসল ফলালেও শেষ পর্যন্ত লাভের মুখ দেখা যাবে কি না, তা নিয়ে চাষিদের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ।
সাধারণত চৈত্র-বৈশাখ মাসে এ অঞ্চলে লবণের তেজ কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা ধানগাছের জন্য যম। সেই ঝুঁকি এড়াতে এবার কৃষকরা কৌশল বদলে আগেভাগেই মাঠে নেমেছেন। কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
বঙ্গোপসাগরে ভৌগোলিক কারণে কোলঘেঁষা সাতক্ষীরা জেলার একটি বড় অংশ বছরের অধিকাংশ সময় লবণাক্ততার ঝুঁকির মুখে থাকে। বিশেষ করে নদী-খাল আর চিংড়ি ঘেরের লোনা পানির প্রভাবে সাধারণ চাষাবাদ ব্যাহত হয়। তবুও জীবন-জীবিকার তাগিদে এই লবণাক্ত মাটির সঙ্গে লড়াই করেই বোরো আবাদ চালিয়ে যাচ্ছেন উপকূলের কৃষকরা।
স্থানীয় কৃষকরা জানান, সাধারণত মার্চ ও এপ্রিল মাসের গ্রীষ্ম মৌসুমে এ অঞ্চলে লবণের তীব্রতা কয়েক গুণ বেড়ে যায়, যা ধান চাষের জন্য বড় বাধা। সেই ঝুঁকি এড়াতে এবার কৌশল বদলেছেন তারা। প্রকৃতির খামখেয়ালিপনার আগেই আবাদ শুরু করেছেন। তাদের লক্ষ্য, বর্ষায় জমে থাকা খালের মিষ্টি পানি ব্যবহার করে দ্রুত ফসল ঘরে তোলা এবং ভূগর্ভস্থ পানির ওপর চাপ কমানো।
আবাদ আগাম শুরু হলেও কৃষকদের চোখে-মুখে এখনো চিন্তার ছাপ। তাদের অভিযোগ, চড়া মূল্যের সার, কীটনাশক আর জ্বালানি তেলের কারণে এবার বিঘাপ্রতি উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে কয়েক গুণ। ফলে উৎপাদিত ধানের কাঙ্ক্ষিত দাম না পেলে বড় অঙ্কের লোকসানের শঙ্কায় আছেন তারা।
সাতক্ষীরা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক (কৃষিবিদ) সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘লবণাক্ততা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে ফসল রক্ষার জন্য আমরা কৃষকদের আগাম চাষে উৎসাহিত করছি। বিশেষ করে লবণাক্ত এলাকায় ব্রি ধান ৬৭, ৯৭, ৯৯ ও বিনা ধান-১০ জাতের ধান চাষ করলে কৃষকরা ভালো ফলন পাবেন। এ ছাড়া কিছু এলাকায় উচ্চফলনশীল হাইব্রিড ধান চাষ করারও পরামর্শ দিচ্ছি আমরা।’
কৃষি বিভাগের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে সাতক্ষীরা জেলায় ৮০ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধান আবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে এই মৌসুমে জেলায় ২ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টন ধান উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, প্রতিকূল আবহাওয়া আর বাজারের অস্থিতিশীলতা, এই দুই চ্যালেঞ্জ জয় করতে সরকারি সহায়তা ও আধুনিক চাষ পদ্ধতির নিয়মিত প্রশিক্ষণ প্রয়োজন। এটি নিশ্চিত করা গেলে উপকূলীয় এ অঞ্চলে বোরো ধানের উৎপাদন আরও কয়েক গুণ বাড়ানো সম্ভব হবে।
সাতক্ষীরা সদরের ফিংড়ি এলাকার কৃষক নাজমুল ইসলাম বলেন, ‘গত বছরের তুলনায় এবার চাষের খরচ অনেক বেড়ে গেছে। ডিজেল আর সারের দাম বাড়ায় সেচ দিতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। আমরা ঝুঁকি নিয়ে চাষ করছি, কিন্তু বাজারে ধানের সঠিক দাম না পেলে বড় লোকসানে পড়তে হবে।’
সাতক্ষীরা সদর উপজেলার গাভা গ্রামের কৃষক মোয়াজ্জেম হোসেন এবার আগাম বোরো ধান চাষ করেছেন। তিনি বলেন, ‘আগাম চাষের ফলে মার্চ-এপ্রিল আসার আগেই ধান পেকে যায়, যা লোনাপানির হাত থেকে ফসল রক্ষা করে। এ ছাড়া খালে জমে থাকা বৃষ্টির মিঠা পানি ব্যবহার করতে পারায় এবার সেচ খরচও কিছুটা কম হয়েছে।’
একই এলাকার কৃষক নিমাই মণ্ডল জানান, শুধু সার-কীটনাশক নয়, দিনমজুরের মজুরিও বেড়েছে। সব মিলিয়ে এক বিঘা জমিতে ধান ফলাতে যা খরচ হচ্ছে, তাতে লাভ করাটা এখন বড় চ্যালেঞ্জ।
আশাশুনি উপজেলার ব্যাংদহ এলাকার কৃষক হরিপদ গাইন বলেন, ‘উপকূলের লোনা মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে আমাদের টিকে থাকতে হয়। যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হয় বা ধানের দাম কম থাকে, তবে আগামীতে বোরো চাষাবাদ করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
আশাশুনি উপজেলার ব্যাংদহ এলাকার কৃষক হরিপদ গাইন বলেন, ‘উপকূলের লোনা মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে আমাদের টিকে থাকতে হয়। যদি প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতি হয় বা ধানের দাম কম থাকে, তবে আগামীতে বোরো চাষাবাদ করা আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।’
প্রতিকূল পরিস্থিতিতেও আশার কথা শোনাচ্ছে জেলা কৃষি বিভাগ। তাদের পরামর্শে কৃষকরা এখন শুধু চিরাচরিত চাষাবাদ নয়, বরং ব্যবহার করছেন উন্নত প্রযুক্তির লবণসহিষ্ণু বীজ।