সুনামগঞ্জ দেখার হাওরের উত্তর পাড়। এখানে থাকা বইশা, ডাকবান ও পালধর হাওরের প্রায় এক হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে মোচাসহ নতুন ধান ডুবে গেছে। আর এই করুণ দৃশ্য হাওরের পাড়ে বসে দেখছেন ইছাগড়ি গ্রামের কৃষক আতাউর রহমান (৫৫)।
তিনি বলেন, ‘খত (কত) কষ্ট কইরা ঋণ লইয়া ধান লাগাইসলাম (লাগিয়েছিলাম।)। মনো খরছিলাম এই বার ধান তুইল্লা ঋণ মারমু (পরিশোধ), বাচ্চা-খাইচ্চার চিকিৎসা, লেখাপড়ার খরচ ছালাইমু, কিন্তু হাওরও ডুবরায় সব ধান তল অই গেছে (হাওরের জলাবদ্ধতায় ধান তলিয়ে যাওয়া)। মাত্র ধানো ফুল আইছিল। ফুলসহ ধান পানির তলে। অখন কিতা খরতাম কুনতা বুঝি না। যে ধান আছে ইটি গরুরে দিলেও খাইতো নায়।’
আতাউর জানান, এ বছর তিনি ২২ কেয়ার (এক কেয়ার সমান ৩০ শতক) জমি চাষ করেছেন। অর্ধেক টাকা ঋণ নিয়েছেন, বাকিটা সারা বছরের জমানো। ধানও ভালো হয়েছে। কিন্তু সামান্য বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতায় সব ধান তলিয়ে গেছে। তিনি জানান, এখন পাঁচ কেয়ার টিকে আছে, তবে কতক্ষণ থাকবে তাও জানা নেই। আর দু-এক দিন বৃষ্টি হলে সেই ধানও তলিয়ে যাবে। এখন তিনি ঋণের টাকা কীভাবে শোধ করবেন আর নিজেই বা কীভাবে চলবেন, তা হাওর পাড়ে বসে বসে চিন্তা করছেন। আতাউর জানান, অপরিকল্পিত বাঁধ এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। দ্রুত বাঁধ কেটে ধান বাঁচানোর দাবি করেন তিনি।
একই গ্রামের জুবের আলী (৪০) বলেন, ‘বড় কষ্ট করে ঋণ নিয়ে ১৬ কেয়ার জমি করেছি। অর্ধেকটা বইশার হাওরে, বাকিগুলো অন্য হাওরে। সব হাওরের ধানই পানির নিচে। এখন আগামী এক বছর কীভাবে কাটবে? ঋণ কীভাবে শোধ করব আর সন্তানের মুখে খাবার কীভাবে তুলে দেব, তার কূলকিনারা করতে পারছি না। ডিসি সাহেবের কাছে অনুরোধ, আমাদের ধান যেন তুলতে পারি সেই ব্যবস্থা করে দেন। ভবিষ্যতে স্লুইচগেট করে দিলে হাওরে জলাবদ্ধতা হবে না। বৃষ্টি হলে হাওরের পানি দ্রুত নেমে যাবে। আমরা ক্ষতি থেকে বাঁচব।’
জানা গেছে, সুনামগঞ্জের ১২টি উপজেলায় ১৪৫ কোটি টাকা ব্যয়ে ৭১০টি প্রকল্পে ৬০২ কিলোমিটার ফসল রক্ষা বাঁধ সংস্কার ও নির্মাণ করা হয়েছে। ফসল রক্ষার জন্য বানানো এসব বাঁধ অপরিকল্পিতভাবে নির্মাণ করায় বৃষ্টির পানি নামতে পারছে না। এতে কয়েক হাজার হেক্টর বোরো ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে।
কয়েক দিনের বৃষ্টিপাতে সুনামগঞ্জের সদর উপজেলার দেখার হাওর, জুয়ালভাঙ্গা হাওর, কাঙলার হাওর, বিশ্বম্ভরপুরের করচার হাওর, শান্তিগঞ্জের খাই হাওর, পাখিমারা হাওর, শাল্লার ছায়ার হাওর, জামালগঞ্জের হালির হাওর এবং তাহিরপুরের শনির হাওরসহ বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দিয়েছে। বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা অস্থায়ী বাঁধের মাটি বর্ষা ও বন্যায় সময় হাওর-নদীতে পড়েছে। এতে এগুলোর পানি সংরক্ষণ ক্ষমতা কমে গেছে। ফলে সামান্য বৃষ্টি হলেই জলাবদ্ধতা দেখা দেয়।
মোল্লাপাড়া ইউনিয়নের সাবেক ইউপি সদস্য রেদোয়ান আলী রায়হান বলেন, ‘মহাসিং নদীর ওপর উথারিয়া বাঁধ দেওয়ায় দেখার হাওরের উত্তর পাড়ের সব ধান পানির নিচে তলিয়ে গেছে। এই এলাকার মানুষ একটি মাত্র ফসলের ওপর নির্ভশীল। দেখার হাওরে ফসল রক্ষার জন্য যে বাঁধ দেওয়া হয়েছে, এই বাঁধই এখন গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছে। উথারিয়ায় যে বাঁধ দেওয়া হয়েছে সেটার কারণে বৃষ্টির পানি নামতে পারছে না।’
তিনি বলেন, ‘আমরা জেলা প্রশাসক ও সংশ্লিষ্ট সবার কাছে একাধিকবার দাবি করেছি, এই অযৌক্তিক, অপরিকল্পিত বাঁধটা কেটে দিয়ে যেন ফসল রক্ষা করা হয়। কিন্তু তারা তা করেননি। এখন আমাদের হাজারও হেক্টর ফসল পানির নিচে তলিয়ে নষ্ট হয়ে গেছে।’
হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল হক মিলন বলেন, ‘দীর্ঘদিন ধরে অপরিকল্পিত ও অপ্রয়োজনীয় বাঁধ নির্মাণ ও বাঁধের কাজে অনিয়ম গাফিলতির কারণে প্রতিবছর কৃষকরা ক্ষতির মুখে পড়েন। এ বছর শুরু থেকেই বাঁধের কাজে অনিয়ম হয়েছে। বছরের শুরুতেই সামান্য বৃষ্টিতে হাওরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। এতে জেলার ১২ উপজেলার প্রায় সব হাওরের ৪০ শতাংশ ফসল তলিয়ে গেছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড ও প্রশাসনের যোগসাজশে হাওরের অনিয়ম-দুর্নীতি হয়েছে। বরাদ্দ বাড়াতে যেখানে বাঁধের প্রয়োজন নেই সেখানেও বাঁধ দেওয়া হয়েছে।’ কৃষকের ফসলহানিতে দোষী ব্যক্তিদের আইনের আওয়তায় আনতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান হাওরের এই নেতা।
হাওরের বাঁধ নানা কারণে বিতর্কিত হয়ে গেছে উল্লেখ করে সচেতন নাগরিক কমিটি সনাক সুনামগঞ্জের সিনিয়র সদস্য অ্যাডভোকেট খলিল রহমান জানান, বাঁধ দেওয়া হয় আগাম বন্যা ও পাহাড়ি ঢল থেকে ফসল রক্ষা করতে। কিন্তু এই বাঁধই হাওরের কৃষকের কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাওরে অপরিকল্পিত বাঁধের কারণে ফসলহানি হচ্ছে। যেসব হাওরে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে, সেখানকার কৃষকরা বাঁধ কেটে দিয়ে পানি বের করতে চাইছেন। বাঁধ কেটে পানি বের করে দিলে দেখা যাবে কিছু কৃষক লাভবান হবেন, আবার আগাম পাহাড়ি ঢল ও বন্যার পানি এই কাটা বাঁধ দিয়ে হাওরে ঢুকে বিস্তীর্ণ এলাকার ফসলের ক্ষতি হবে। তাই সুনামগঞ্জের হাওরে ফসল রক্ষা বাঁধ নির্মাণ, বাঁধ কাটা বা প্রকল্প গ্রহণ এই বিষয়গুলো এখন বিতর্কের জন্ম দিচ্ছে।’
এদিকে হাওরের এমন পরিস্থিতিতে জরুরি সভা করে উপজেলা কমিটির মাধ্যমে শর্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় স্থানে বাঁধ কেটে সাময়িক সমাধান দিতে চেয়েছে জেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসক ড. মোহাম্মদ ইলিয়াস মিয়া বলেন, ‘বাঁধ কাটতে আপত্তি নেই। তবে সুনামগঞ্জের বেশির ভাগ হাওরের ধান এখনো সুরক্ষিত আছে।
আগামী ৭ এপ্রিলের পর থেকে টানা ভারী বৃষ্টিপাতে আশঙ্কা রয়েছে। বাঁধ কেটে দিলে সেখান দিয়ে পাহাড়ি ঢল ও আগাম বন্যার পানি ঢোকার আশঙ্কা আছে। তাই কোনো কৃষক বাঁধ কাটতে চাইলে আমরা কমিটির কাছ থেকে অনুমতি নিতে বলেছি।’