চলনবিল অধ্যুষিত সিরাজগঞ্জ জেলায় চলতি মৌসুমে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৪০০ মেট্রিকটন ভুট্টা উৎপাদনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ৪৫০ কোটি টাকা।
স্থানীয় কৃষকরা জানিয়েছেন, অন্য ফসলের তুলনায় ভুট্টা চাষে খরচ তুলনামূলক অনেক কম, সেই সাথে কম সময়ে ও কম পরিশ্রমে অধিক পরিমাণ লাভবান হওয়া যায়। এ কারণে প্রতিবছর বোরো ধান ও গমের আবাদ কমিয়ে ভুট্টা চাষে বেশি আগ্রহী হচ্ছেন কৃষকরা। ভুট্টা চাষে তেমন সেচেরও প্রয়োজন হয় না।
সিরাজগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে ১৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এর মধ্যে ১৪ হাজার ৪০০ হেক্টর জমিতে ভুট্টার চাষাবাদ হয়েছে। অর্থাৎ চাহিদার তুলনায় ৬০০ হেক্টর বেশি জমিতে ভুট্টার চাষাবাদ হয়েছে। এ বছর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৭৫ হাজার ৪০০ টন। প্রতি কেজি ভুট্টা ২৫ টাকা হলে, এ বছর প্রায় ৪৫০ কোটি টাকার ভুট্টা উৎপাদন হবে।
চলতি মৌসুমে মেজর-৩৩৫৫, ইউনাইটেড-৫৫ পাইনিয়র-৩৩৫৫, রাজদূত, ডারজিলিং, পালোওয়ান, চাম্পিয়ান, সিনজেনটা-৭৭২০সহ বিভিন্ন জাতের ভুট্টা চাষ করা হয়েছে। চলতি বছর কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের বীজ, সার ও বিভিন্ন ধরনের প্রণোদনা প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। ফলে দেশে খাদ্য উৎপাদনের ঘাটতি অনেকটা মিটবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, তাড়াশ উপজেলার নওগাঁ হাট, উল্লাপাড়া বোয়ালিয়া হাট, প্রতাপ হাট ও সলঙ্গা হাটে, প্রতি মণ শুকনো ভুট্টা ১ হাজার ৩০০ থেকে ১ হাজার ৫০০ টাকা মণ দরে বিক্রি হচ্ছে। এক বিঘা জমিতে ৪০ থেকে ৫০ মণ ভুট্টা উৎপাদন হয় বলে জানান স্থানীয় কৃষকরা। ভুট্টা মৌসুমে প্রতি মণ ভেজা ভুট্টা ৯০০ থেকে ১০০০ টাকা মণ দরে বিক্রি করেন কৃষকরা। যেহেতু সবকিছুর দাম উর্দ্ধগতি তাই এ বছরেও দাম আরও বেশি পাওয়া যাবে বলে মনে করছেন ভুট্টা চাষিরা।
চলনবিল অধ্যুষিত তাড়াশ উপজেলার দোবিলা গ্রামের কৃষক আবু বক্কার সিদ্দিক জানান, প্রতিবছর আমি চার বিঘা জমিতে ভুট্টার চাষ করে আসছি। ভালো লাভবান হওয়াতে এ বছরেও করেছি। প্রতি বিঘা জমি থেকে ৪০ থেকে ৫০ মণ হারে ভুট্টার ফলন হয়। এ বছর গাছে ফল অন্যান্য বছরের তুলনায় বেশি দেখা যাচ্ছে। আশা করছি ভুট্টার বাম্পার ফলন হবে। ভুট্টা চাষে পরিশ্রম ও খরচ অনেক কম হয়।
মাগুরা বিনোদ ইউনিয়নের কৃষক তোফাজ্জাল হোসেন বলেন, ‘গত বছর তিন বিঘা জমিতে ভুট্টার আবাদ করেছিলাম। ফলন ও দাম ভালো পাওয়াতে এ বছর পাঁচ বিঘা জমিতে ভুট্টার আবাদ করেছি। আবহাওয়া ও তাপমাত্রা অনুকূলে থাকায় ভুট্টার গাছ অনেক ভালো হয়েছে। আশা করছি ফলনও অনেক ভালো পাব। বাজারদর ভালো আছে আশা করছি এ বছর ভালো টাকা আয় করতে পারব।
তাড়াশ উপজেলার ঘরগ্রামের কৃষক আলী আহম্মেদ বলেন, ‘গত বছর ভুট্টার দাম আশানুরূপ ছিল’ তাই এ বছর বেশি পরিমাণ জমিতে ভুট্টা চাষ করেছি। ‘এক বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করতে খরচ হয় মাত্র ৭ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা। তার বিপরীতে এক বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষে ৪০ থেকে ৫০ মণ ফলন হয়। তাই চলতি মৌসুমে পাঁচ বিঘা জমিতে ভুট্টার চাষ করেছি। ভুট্টা বিক্রির পাশাপাশি এর গাছগুলো জ্বালানি হিসেবে ব্যবহার করতে পারি।’
মাগুড়া বিনোদ ইউনিয়নের শ্যামপুর গ্রামের আরেক কৃষক মোবারক হোসেন বলেন, কয়েক বছর যাবত বোরো ধান চাষ করে আসছিলাম। ডিজেল, সার ও কীটনাশকের দাম অনেক বৃদ্ধি পাওয়াতে ধান উৎপাদনে খরচ অনেক বেশি। সেই তুলনায় ধানের দাম তেমন পাওয়া যায় না। তাই দুই বছর ধরে বোরোর পরিবর্তে ৫ বিঘা জমিতে ভুট্টা চাষ করে আসছি ও লাভবান হচ্ছি। ধানসহ অন্য ফসলের তুলনায় ভুট্টা চাষে খরচ ও শ্রম কম এবং দাম বেশি হওয়ায় চলনবিল অঞ্চলেরর কৃষকদের মধ্যে ভুট্টা চাষের প্রতি আগ্রহ বাড়ছে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক এ কে এম মনজুরে মাওলা খবরের কাগজকে বলেন, ‘কম সময়ে, কম খরচে ও ফলন ভালো হওয়ায় কৃষকদের মধ্যে ভুট্টা চাষে আগ্রহ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। জেলায় চলতি মৌসুমে ১৩ হাজার ৮০০ হেক্টর জমিতে ভুট্টা চাষাবাদের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল। গতবারের চেয়ে এ বছর বেশি পরিমাণ জমিতে ভুট্টার চাষাবাদ হয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় কৃষকরা এ বছর ভুট্টার বাম্পার ফলন পাবেন বলে আশা করা যাচ্ছে। এ ছাড়া ভুট্টায় রয়েছে প্রচুর পরিমাণে ভিটামিন-এ এবং এর বহুমাত্রিক ব্যবহার। ভুট্টা থেকে মাছ ও মুরগির খাবার উৎপাদন করা লাভজনক এবং এর গাছ জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। চাষাবাদ বাড়ানোর জন্য কৃষি বিভাগ থেকে কৃষকদের নিয়মিত প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অন্য সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।