রইব না কো বদ্ধ খাঁচায়, দেখব এ-সব ভুবন ঘুরে -
আকাশ-বাতাস চন্দ্র-তারায় সাগর-জলে পাহাড়-চূড়ে।
আমার সীমার বাঁধন টুটে
দশ দিকেতে পড়ব লুটে;
পাতাল ফেড়ে নামব নীচে, উঠব আবার আকাশ ফুঁড়ে;
বিশ্ব-জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।।
বিশ্ব-জগৎ সম্পর্কে কৌতূহলী কাজী নজরুল ইসলাম ‘সংকল্প’ কবিতায় এই চমৎকার লাইনগুলি লিখেছেন। বিজ্ঞানের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকায় বর্তমানে মুঠোফোনের কল্যাণে আমরা প্রায় সকলেই আপন হাতের মুঠোয় পুরেই বিশ্বকে দেখি, চিনি এবং জানি। ‘কৌতূহল’ এই শব্দটি আমাদের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দেয়, ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতে শেখায়। প্রতিনিয়ত চতুর্দিকে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে আমরা অনেকেই হয়তো ভাবি না, কিন্তু নজরুলের জিজ্ঞাসু মনে জন্ম নেয় নানান প্রশ্ন। ‘জিজ্ঞাসা’ কবিতায় তিনি অবলীলায় প্রশ্ন করেন -
রব না চক্ষু বুঁজি
আমি ভাই দেখব খুঁজি
লুকানো কোথায় কুঁজি
দুনিয়ার আজব-খানার!
আকাশের প্যাঁটরাতে কে
এত সব খেলনা রেখে
খেলে ভাই আড়াল থেকে,
সে ত ভাই ভারী মজার।
বিজ্ঞান আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। কিন্তু প্রচলিত ভাবনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন যে বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ, সমাজ অনেক সময় তাঁকে শাস্তিও দেয়। ‘বিংশ শতাব্দী’ কবিতায় দৃঢ়চেতা নজরুলের স্পষ্ট উচ্চারণ -
হইল প্রভাত বিংশ শতাব্দীর,
নব-চেতনায় জাগো জাগো, ওঠ বীর!
নব ধ্যান নব ধারণায় জাগো,
নব প্রাণ নব প্রেরণায় জাগো,
সকল কালের উচ্চে তোলো গো শির,
সর্ব-বন্ধ-মুক্ত জাগো হে বীর!
প্রচলিত বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার মধ্য দিয়েই আমরা প্রকৃত জ্ঞান আহরণ করি, বিভিন্ন লেখায় একথা বারংবার বলেছেন নজরুল। ‘আশীর্বাদ’ কবিতায় তিনি লিখলেন -
সংস্কারের মিথ্যা বাঁধন
ছিন্ন হউক আগে,
তবে সে তোমার সকল দেউল
রাঙিবে আলোর রাগে।
নজরুলের ‘তরুণ তাপস’ কবিতায় একই ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায় -
ভোল্ রে চির পুরাতনের সনাতনের বোল্।
তরুণ তাপস! নতুন জগৎ সৃষ্টি করে তোল্।
আদিম যুগের পুঁথির বাণী
আজো কি তুই চল্বি মানি?
কালের বুড়ো টানছে ঘানি
তুই সে বাঁধন খোল্।
অভিজাতের পান্সে বিলাস দুখের তাপস! ভোল্।।
সমস্ত বাধাকে অতিক্রম করে আপন লক্ষ্যে স্থির থেকে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য। নিজের সম্পর্কে নজরুলের তাই অমোঘ উচ্চারণ - ‘বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরই অভিযান-সেনাদলের তূর্য-বাদকের একজন আমি - এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমি জানি, এই পথ যাত্রার পাকে পাকে বাঁকে বাঁকে কুটিল-ফণা ভুজঙ্গ প্রখর-দর্শন শার্দুল পশুরাজের ভ্রূকুটি এবং তাদের নখর-দংশনের ক্ষত আজো আমার অঙ্গে অঙ্গে। তবুও ওই আমার পথ, ওই আমার গতি, ওই আমার ধ্রব।’
নজরুল সর্বদা নবীনের জয়গান গেয়েছেন। কুসংস্কারকে দূরে সরিয়ে নতুন সমাজ নির্মাণে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ‘আমি গাই তারি গান’ কবিতায় লিখলেন -
আমি গাই তারি গান -
দৃপ্ত-দম্ভে যে যৌবন আজ ধরি অসি খরশান
হইল বাহির অসম্ভবের অভিযানে দিকে দিকে।
লক্ষ যুগের প্রাচীন মমির পিরামিডে গেল লিখে
তাদের ভাঙার ইতিহাস-লেখা। যাহাদের নিশ্বাসে
জীর্ণ পুঁথির শুষ্ক পত্র উড়ে গেল একপাশে।
যারা ভেঙে চলে অপ-দেবতার মন্দির আস্তানা,
বকধার্মিক-নীতিবৃদ্ধের সনাতন তাড়িখানা।
যাহাদের প্রাণ-স্রোতে ভেসে গেল পুরাতন জঞ্জাল,
সংস্কারের জগদল-শিলা, শাস্ত্রের কঙ্কাল।
মিথ্যা মোহের পূজা-মণ্ডপে যাহারা অকুতোভয়ে
এল নির্মম - মোহমুদ্গর ভাঙনের গদা লয়ে।
‘মাঙ্গলিক’ কবিতায় আদর্শ মানুষের কথা বলতে গিয়ে নজরুল পৃথিবীর সকল শক্তির উৎস সূর্যের কথা উল্লেখ করেছেন। আমরা যেমন সূর্যের অনুপস্থিতি ভাবতেই পারি না, ঠিক সেরকমই প্রকৃত মানুষ ছাড়া এ জগৎ অর্থহীন। কর্মের দ্বারা সূর্যের মতোই মনুষ্যজগতে স্থায়ী আসন লাভ করতে হবে। নজরুলের কলমে -
যে আদর্শ মানুষ আজও জন্মেনি কো এই ধরায়,
তুমিই হবে সেই সে মানুষ অধ্যবসায়, তপস্যায়।
সূর্য-সম শেষ জীবনে রাঙিয়ে যাবে দিগ্বিদিক্,
যুক্ত-করে বিশ্ব-নিখিল গাইবে তোমার মাঙ্গলিক।
অস্ত গেলে রবি যেমন জগৎ দেখে অন্ধকার,
হারিয়ে তোমায় কাঁদবে শোকে তেমনি মানুষ এই ধরার।
গ্লোবাল ওয়ার্মিং (Global Warming) বা বিশ্ব উষ্ণায়ন শব্দবন্ধটির সঙ্গে বর্তমানে আমরা সকলেই পরিচিত। নজরুল তাঁর ‘যুগবাণী’ প্রবন্ধগ্রন্থে ‘রোজ-কেয়ামত বা প্রলয় দিন’ প্রবন্ধে আবহাওয়ার পরিবর্তন বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন - ‘‘আগে হইতে আবহাওয়ার ক্রম-পরিবর্তন পরিলক্ষিত হইতেছে। বজ্রাঘাত - বিশেষ করিয়া শীতকালে বজ্রপতন - ক্রমশই বৃদ্ধি পাইতেছে, আর ইহার একদম সোজা কারণ রহিয়াছে যে, পৃথিবীর আর বাতাসের ইলেক্ট্রিসিটি ঠোকাঠুকির দরুনই এই বজ্র উৎপাতের সৃষ্টি! তাহা হইলে কঃ পন্থা? সেই জন্যই বুঝি পান্নাময়ী আগে হইতেই গাহিয়া রাখিয়াছে, ‘মরিব মরিব সখি, নিশ্চয়ই মরিব!’’
পৃথিবী ক্রমশ উষ্ণ হয়ে উঠছে - এ সম্পর্কেও নজরুল যথেষ্ট অবগত ছিলেন। এই প্রবন্ধেই তিনি লিখেছিলেন - ‘দক্ষিণ মেরুতে যে গগন-চুম্বী বরফের মহা আচ্ছাদন রহিয়াছে, তাহা লম্বাতে চৌদ্দ শত মাইল এবং কত শত মাইল যে পুরু তাহার ইয়াত্তাই নাই! এখন এই যে দক্ষিণ মেরুর আবহাওয়া এই রকমে ক্রমেই অসহ্য উষ্ণ হইয়া উঠিতেছে, ইহার পরিণাম কি? সকলেই জানেন বরফ গরম হইলে গলিয়া যায়। সুতরাং এখন দক্ষিণ মেরুর এই অত্যধিক উষ্ণতার দরুন সেখানের ঐ সহস্র সহস্র যোজন-ব্যাপী তুষারের মহাপর্বতসমূহ ভাঙিয়া গলিয়া যাইবে এবং আকাশ-সমান সচল হিমালয়ের মতো তরঙ্গের রাশি চতুর্দিক ধুইয়া-মুছিয়া লইয়া যাইবে। প্রথমে এই মহা-প্লাবনে আক্রান্ত হইবে পৃথিবীর ঢালু দিক অর্থাৎ দক্ষিণ মহাদেশ সমূহ।’
প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন, নজরুলের প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ ‘যুগবাণী’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে (১৯২২ সাল) গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৯২০ সালে নজরুল সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ - এ যেসব সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন, তার মধ্যে কয়েকটি এই গ্রন্থে সংকলিত হয় অর্থাৎ পরিষ্কার বোঝা যায় সমাজসচেতন কবি নজরুল শতবর্ষ আগে এই লেখা লিখেছিলেন। আসাদুল হকের লেখা ‘নজরুল যখন বেতারে’ বইটি থেকে জানা যায় - ৩০ ডিসেম্বর ১৯৩৯ সালে বেতারে পল্লী মঙ্গলের আসরে ‘কচুরীপানা’ নামে একটি গীতি-আলেখ্য প্রচারিত হয়। কচুরীপানা কীভাবে অমঙ্গল সাধন করে, তার বর্ণনা দেন পরিবেশ-সচেতন নজরুল -
(এরা) ম্যালেরিয়া আনে, আনে অভাব নরক,
(এরা) অমঙ্গলের দূত, ভীষণ মড়ক!
(এরা) একে একে গ্রাস করে নদী ও নালা।
(যত) বিল ঝিল মাঠ ঘাট ডোবা ও খানা।।
ধ্বংস কর এই কচুরিপানা।।
১৯২২ সালের ১১ আগস্ট নজরুলের একক সম্পাদনায় সপ্তাহে দুবার প্রকাশের ঘোষণা দিয়ে অর্ধ-সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার আত্মপ্রকাশ হয়। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় বাংলা ভাষায় নজরুলই প্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করেন। পত্রিকার নামকরণ আমাদেরকে আবারও ‘বিজ্ঞান সচেতন’ নজরুলকে আবিষ্কার করার সুযোগ দেয়। পরবর্তী সময়ে 'মৃত তারা' কবিতায় চমৎকারভাবে মহাবিশ্বের প্রেক্ষাপটে সাহিত্যজগতে নিজের অবস্থান বর্ণনা করেছেন নজরুল। বাংলা সাহিত্যজগতের অগ্রজ কবি, সাহিত্যিকদের প্রতি নজরুল কতখানি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, এই কবিতা তারই প্রকাশ। নজরুলের কথায় -
সেদিন আমারে প্রণতি জানাতে এল কত নর-নারী,
বন্দিয়াছিল আমারে ভাবিয়া সাগ্নিক নভোচারি।
তাহাদের পানে লজ্জায় আমি চাহিতে পারিনা আজ -
রবি ও শরৎ-চন্দ্র বিরাজে যে মহাগগন মাঝ,
আলোক দানে স্পর্ধা লইয়া এসেছিনু সেই নভে;
জানিনা সে মহা অপরাধের যে ক্ষমা পাব আমি কবে।
রবি ও চন্দ্র তেমনি জ্বলিছে, দানিছে তেমনি আলো,
স্নিগ্ধ শান্ত জ্যোতিতে হরিছে বিশ্বের তমঃ কালো।
আজ মনে নাই সে গগনে কবে উঠেছিল ধূমকেতু,
ক্ষণিক আতসবাজি সম এসেছিল কৌতুক হেতু।
যদি ভুলে থাকে, তবে সে পরম ভাগ্য বলিয়া মানি,
যদি ভুলে থাকে বীণাপাণি মম জ্বালাময় বিষ-বাণী।
সে বাণীতে মোর কাহারো প্রাসাদ জানিনা জ্বলেছে কি না;
আমি জানি শুধু জ্বলিয়াছি আমি, জ্বালেনি বাণী ও বীণা।
জ্যোতিহীন বিষহীন ধূমকেতু আজো হায় বেঁচে আছি;
বিরাট -পুরীতে অজ্ঞাতবাসে ফাল্গুনী ফেরে নাচি’!
নজরুল রচিত বেশ কিছু গানের মধ্যেও তাঁর বিজ্ঞান চেতনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় না তো কভু’ - আমাদের নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। জন্মের দিন থেকেই যে পরম সত্য নির্ধারিত হয় আমাদের জীবনে, তা হল মৃত্যু। কিন্তু এই মৃত্যুর অভিঘাত আমাদের জীবনে কখন, কীভাবে নেমে আসবে - সত্যিই আমরা জানি না। তাই এই নিয়ে আমাদের মনে কৌতূহলের শেষ নেই। মৃত্যু পরম সত্য - এই কথাটিকে অন্তরে ধারণ ক’রে আত্মপ্রত্যয়ী নজরুল তাই লেখেন -
যাই গো চ’লে যাই না-দেখা লোকে
জানিতে চির অজানায়।
এই গানের শেষ অংশে নজরুল লিখলেন - ‘যে- দেশ হইতে আসে এ জীবন, যেখানে হারায়’ অর্থাৎ আসা-যাওয়ার মাঝেই আমাদের এই প্রাণ আবর্তিত হয়।
খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীনের ‘যুগস্রষ্টা নজরুল’ গ্রন্থে মঈনুদ্দীন লিখেছেন - ‘‘কোলকাতা গেজেটের ২৪-৯-১৯৩৬ তারিখের সংখ্যায় অনুমোদিত বইয়ের তালিকা প্রকাশিত হলো। দেখা গেল কাজী নজরুলের বই ‘মক্তব-সাহিত্য’ এই তালিকায় স্থান পেয়েছে।’’
শিশুদের উপযোগী ‘মক্তব-সাহিত্য’ নজরুলের অনবদ্য সৃষ্টি। ধর্মীয় অনুষঙ্গের পাশাপাশি শিশুদের কথা ভেবে বেশ কিছু লেখা তিনি লিখেছিলেন যা প্রকৃত অর্থেই বিজ্ঞানমনস্ক নজরুলকে তুলে ধরে। ‘পানি’ শিরোনামে লেখায় নজরুল চমৎকারভাবে শিশুদের বোধগম্যতার কথা বিবেচনা করে পানি সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরেছিলেন যা তাদের প্রাত্যহিক জীবনে বিশেষ কাজে লাগবে - ‘নদী পুষ্করিণী প্রভৃতির জলভাগ তোমরা অনেকে দেখিয়াছ। উহাদের অপেক্ষা আরও বৃহৎ জলভাগ আছে তাহাকে সমুদ্র বলে। সমুদ্র দুনিয়ার স্থলভাগকে ঘিরিয়া আছে। ...তাহা হইলে এই দুনিয়ার পানি কত বেশি, তাহা সহজেই অনুমান করিতে পার। সমুদ্রের পানি লোনা৷ উহা কেহ পান করিতে পারে না। পানের জন্য যে পানি ব্যবহার করিবে, তাহা বিশুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। বিশুদ্ধ পানি বর্ণহীন, গন্ধহীন ও স্বাদহীন। যে পানিতে কোন বর্ণ বা গন্ধ আছে তাহা দূষিত বলিয়া জানিবে। দূষিত পানিতে নানারূপ রোগের বীজাণু লুকানো থাকে। দূষিত পানি পান করিলে আমাশয়, টাইফয়েড ও কলেরা প্রভৃতি রোগ আক্রমণ করিতে পারে। নানা কারণে নদী, পুষ্করিণী ও কূপ প্রভৃতির পানি দূষিত হয়। নদীতে লোকে জীবজন্তুর মৃতদেহ ফেলে, বহু গাছপালার পাতা পড়িয়া পচে, লোকে মল-মূত্র ত্যাগ করে ও গো-মহিষাদি স্নান করায়, ইত্যাদি কারণে... পানি দূষিত হয়। ...এইজন্যই গ্রামে মধ্যে মধ্যে এত বেশি সংক্রামক রোগ দেখা দেয়। তোমরা কদাচ এইরূপ জলাশয়ের পানি পান করিবে না। দূষিত পানি পান করিতে হইলে উহা আধঘন্টা আগুনে ফুটাইয়া লইয়া একটি পাত্রে রাখিয়া দিবে; পরে ঠান্ডা হইলে পান করিবে।’
বিজ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ আমাদের জীবনযাপনকে যেমন সহজ করে দেয়, ঠিক তেমনই বর্তমানে বিজ্ঞানের বিপুল প্রয়োগ আমাদের জীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের ক্রমশ দূরত্ব বাড়ছে। নজরুল যেমন বিজ্ঞানের জয়গান গেয়েছেন, পাশাপাশি প্রকৃতিকে ভালোবাসতেও শিখিয়েছেন। ‘চলব আমি হালকা চালে’ কবিতায় নজরুলের কলমে সেই কথাই উঠে এসেছে -
সাবমেরিনের মরণ-নীতি
ভরা ডুবি করছে নিতি
কুমির হতেও ভীষণ রীতি
ডুব দিয়ে সব খাচ্ছে জল!
আমি হব পানকৌড়ি
সঙ্গে সাথী মীন-গৌরী,
ফিরব ঘুরে জল-দেউড়ি
দেখব জলের শীতল তল।।
কখন, কোথায়, কীভাবে আমরা বিজ্ঞানকে ব্যবহার করব তা নির্ভর করে আমাদের বোধের ওপর। অল্প বিদ্যা অনেক সময় বিপদ ডেকে আনে। ‘সত্য আগুন দেখিনি’ কবিতায় নজরুল তাই লিখলেন -
খণ্ড করিয়া দেখিলে পূর্ণে দেখিবে নিয়ত ভুল,
সূর্য কেবলি দগ্ধ করে না, ফোটায়ে কমল ফুল।
তারুণ্যের পূজারী নজরুল বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত নতুন পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য শিশুদের স্বাগত জানিয়েছেন -
নতুন দিনের মানুষ তোরা
আয় শিশুরা আয়!
নতুন চোখে নতুন লোকের
নতুন ভরসায়।
লেখক: নজরুল সঙ্গীতশিল্পী এবং সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা)