ঢাকা ৩০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, শনিবার, ১৩ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
নাইজেরিয়ায় বন্দুকধারীদের হামলায় ১৭ কৃষক নিহত লাইনে বিড়াল ঢুকে পড়ায় সাময়িক বন্ধ ছিল মেট্রোরেল গাজীপুর পোশাক কারখানায় আগুন কসবায় হজযাত্রীর লাগেজ নিয়ে দুই পক্ষের সংঘর্ষ, আহত ১০ নিখোঁজ নাটকের অবসান, ‘গুপ্ত’ ছিলেন শিবির নেতা জিসান! যুক্তরাষ্ট্রের জয়ের পর ঐক্যের গান গাইলেন পচেত্তিনো মীনা বাজারে চাকরির সুযোগ, শুক্র-শনিবার ছুটি ইংল্যান্ডের ফুটবল ও বুট চুরি করল কে? গণমাধ্যম সংস্কারে ‘ইউনিফাইড ইনস্টিটিউশন’ গঠনের তাগিদ মদে ট্যাক্স বাড়ানোই বিরোধী দলের দুঃখ: প্রধানমন্ত্রী গোপালগঞ্জে নিখোঁজের ৩ দিন পর যুবকের মরদেহ উদ্ধার বাজেটে জনগণের স্বস্তি হলেও বিরোধী দলের অস্বস্তি: প্রধানমন্ত্রী লক্ষ্মীপুরে ইউপি কার্যালয়ে চুরি শাবিপ্রবি থেকে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষ জ্বালানিপ্রতিষ্ঠানে ড. সাকিব বিশ্বকাপ উন্মাদনায় কুইজ ও রিচার্জ অফার, থাকছে জামাল ভূঁইয়ার সাথে খেলা দেখার সুযোগ গবেষণা ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষায় ওয়ার্ল্ড ইউনিভার্সিটির অগ্রণী ভূমিকা ফিফা বিশ্বকাপ ২০২৬ উপলক্ষে ক্রাউন প্লাজা ঢাকা গুলশানে বিশেষ আয়োজন জীবের বৃদ্ধি ও বংশগতি অধ্যায় থেকে ৫টি বহুনির্বাচনি প্রশ্ন ও উত্তর, ৬ষ্ঠ পর্ব, অষ্টম শ্রেণির বিজ্ঞান গাড়ি ভেঙে ইংল্যান্ড দলের সরঞ্জাম চুরি, গ্রেপ্তার ২ কার্যকর জবাবদিহি নিশ্চিতে ব্যবস্থা নিন শুধু সংখ্যা বাড়াতে বিশ্বকাপে আসেনি হাইতি বোয়ালমারীতে আর্জেন্টিনা সমর্থকদের মোটরসাইকেল শোভাযাত্রা যদি এই ছবিগুলো আপনি না দেখে থাকেন শেরপুরে পাহাড়ি ঢলে নিম্নাঞ্চল প্লাবিত কেমন ছিল প্রিয় রাসুল (সা.)-এর চুল মোবারক? কক্সবাজার সফরে প্রধানমন্ত্রী, চকরিয়া-পেকুয়ায় ব্যাপক প্রস্তুতি সরকারের জনকল্যাণ-প্রযুক্তিনির্ভর বাজেটকে স্বাগত জার্মানি বিএনপির পরমাণু সুড়ঙ্গে মাইন পুঁতেছে ইরান, যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দাদের দাবি কক্সবাজারের ‘পাতলী খাল’ পুনর্খনন উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী প্রাইম ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের ৩য় পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত
Nagad desktop

নজরুলের বিজ্ঞান-চেতনা

প্রকাশ: ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬, ০৮:৪৪ এএম
নজরুলের বিজ্ঞান-চেতনা
ছবি: লেখক কর্তৃক সংগৃহীত

রইব না কো বদ্ধ খাঁচায়, দেখব এ-সব ভুবন ঘুরে -
আকাশ-বাতাস চন্দ্র-তারায় সাগর-জলে পাহাড়-চূড়ে।
আমার সীমার বাঁধন টুটে
দশ দিকেতে পড়ব লুটে;
পাতাল ফেড়ে নামব নীচে, উঠব আবার আকাশ ফুঁড়ে;
বিশ্ব-জগৎ দেখব আমি আপন হাতের মুঠোয় পুরে।।

বিশ্ব-জগৎ সম্পর্কে কৌতূহলী কাজী নজরুল ইসলাম ‘সংকল্প’ কবিতায় এই চমৎকার লাইনগুলি লিখেছেন। বিজ্ঞানের জয়যাত্রা অব্যাহত থাকায় বর্তমানে মুঠোফোনের কল্যাণে আমরা প্রায় সকলেই আপন হাতের মুঠোয় পুরেই বিশ্বকে দেখি, চিনি এবং জানি। ‘কৌতূহল’ এই শব্দটি আমাদের মধ্যে প্রশ্নের জন্ম দেয়, ঘটনাকে বিশ্লেষণ করতে শেখায়। প্রতিনিয়ত চতুর্দিকে ঘটে যাওয়া ঘটনা সম্পর্কে আমরা অনেকেই হয়তো ভাবি না, কিন্তু নজরুলের জিজ্ঞাসু মনে জন্ম নেয় নানান প্রশ্ন। ‘জিজ্ঞাসা’ কবিতায় তিনি অবলীলায় প্রশ্ন করেন -

রব না চক্ষু বুঁজি
আমি ভাই দেখব খুঁজি
লুকানো কোথায় কুঁজি
দুনিয়ার আজব-খানার!
আকাশের প্যাঁটরাতে কে
এত সব খেলনা রেখে
খেলে ভাই আড়াল থেকে,
সে ত ভাই ভারী মজার।

বিজ্ঞান আমাদের নতুন করে ভাবতে শেখায়। কিন্তু প্রচলিত ভাবনাকে প্রশ্নবিদ্ধ করেন যে বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ, সমাজ অনেক সময় তাঁকে শাস্তিও দেয়। ‘বিংশ শতাব্দী’ কবিতায় দৃঢ়চেতা নজরুলের স্পষ্ট  উচ্চারণ -

হইল প্রভাত বিংশ শতাব্দীর,
নব-চেতনায় জাগো জাগো, ওঠ বীর!
নব ধ্যান নব ধারণায় জাগো,
নব প্রাণ নব প্রেরণায় জাগো,
সকল কালের উচ্চে তোলো গো শির,
সর্ব-বন্ধ-মুক্ত জাগো হে বীর!

প্রচলিত বিশ্বাসকে প্রশ্ন করার মধ্য দিয়েই আমরা প্রকৃত জ্ঞান আহরণ করি, বিভিন্ন লেখায় একথা বারংবার বলেছেন নজরুল। ‘আশীর্বাদ’ কবিতায় তিনি লিখলেন -

সংস্কারের মিথ্যা বাঁধন
ছিন্ন হউক আগে,
তবে সে তোমার সকল দেউল
রাঙিবে আলোর রাগে।

নজরুলের ‘তরুণ তাপস’ কবিতায় একই ভাবনার প্রতিফলন দেখা যায় -

ভোল্ রে চির পুরাতনের সনাতনের বোল্।
তরুণ তাপস! নতুন জগৎ সৃষ্টি করে তোল্।
আদিম যুগের পুঁথির বাণী
আজো কি তুই চল্‌বি মানি?
কালের বুড়ো টানছে ঘানি
তুই সে বাঁধন খোল্।
অভিজাতের পান্‌সে বিলাস দুখের তাপস! ভোল্।।

সমস্ত বাধাকে অতিক্রম করে আপন লক্ষ্যে স্থির থেকে এগিয়ে যাওয়াই জীবনের প্রকৃত উদ্দেশ্য। নিজের সম্পর্কে নজরুলের তাই অমোঘ উচ্চারণ - ‘বিংশ শতাব্দীর অসম্ভবের সম্ভাবনার যুগে আমি জন্মগ্রহণ করেছি। এরই  অভিযান-সেনাদলের তূর্য-বাদকের একজন আমি - এই হোক আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়। আমি জানি, এই পথ যাত্রার পাকে পাকে বাঁকে বাঁকে কুটিল-ফণা ভুজঙ্গ প্রখর-দর্শন শার্দুল পশুরাজের ভ্রূকুটি এবং তাদের নখর-দংশনের ক্ষত আজো আমার অঙ্গে অঙ্গে। তবুও ওই আমার পথ, ওই আমার গতি, ওই আমার ধ্রব।’

নজরুল সর্বদা নবীনের জয়গান গেয়েছেন। কুসংস্কারকে দূরে সরিয়ে নতুন সমাজ নির্মাণে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। ‘আমি গাই তারি গান’ কবিতায় লিখলেন -

আমি গাই তারি গান -
দৃপ্ত-দম্ভে যে যৌবন আজ ধরি অসি খরশান
হইল বাহির অসম্ভবের অভিযানে দিকে দিকে। 
লক্ষ যুগের প্রাচীন মমির পিরামিডে গেল লিখে 
তাদের ভাঙার ইতিহাস-লেখা। যাহাদের নিশ্বাসে 
জীর্ণ পুঁথির শুষ্ক পত্র উড়ে গেল একপাশে।
যারা ভেঙে চলে অপ-দেবতার মন্দির আস্তানা, 
বকধার্মিক-নীতিবৃদ্ধের সনাতন তাড়িখানা। 
যাহাদের প্রাণ-স্রোতে ভেসে গেল পুরাতন জঞ্জাল,  
সংস্কারের জগদল-শিলা, শাস্ত্রের কঙ্কাল।
মিথ্যা মোহের পূজা-মণ্ডপে যাহারা অকুতোভয়ে
এল নির্মম - মোহমুদ্‌গর ভাঙনের গদা লয়ে।

‘মাঙ্গলিক’ কবিতায় আদর্শ মানুষের কথা বলতে গিয়ে নজরুল পৃথিবীর সকল শক্তির উৎস সূর্যের কথা উল্লেখ করেছেন। আমরা যেমন সূর্যের অনুপস্থিতি ভাবতেই পারি না, ঠিক সেরকমই প্রকৃত মানুষ ছাড়া এ জগৎ অর্থহীন। কর্মের দ্বারা সূর্যের মতোই মনুষ্যজগতে স্থায়ী আসন লাভ করতে হবে। নজরুলের কলমে -

যে আদর্শ মানুষ আজও জন্মেনি কো এই ধরায়,
তুমিই হবে সেই সে মানুষ অধ্যবসায়, তপস্যায়।
সূর্য-সম শেষ জীবনে রাঙিয়ে যাবে দিগ্বিদিক্,
যুক্ত-করে বিশ্ব-নিখিল গাইবে তোমার মাঙ্গলিক।
অস্ত গেলে রবি যেমন জগৎ দেখে অন্ধকার,
হারিয়ে তোমায় কাঁদবে শোকে তেমনি মানুষ এই ধরার।

গ্লোবাল ওয়ার্মিং (Global Warming) বা বিশ্ব উষ্ণায়ন শব্দবন্ধটির সঙ্গে বর্তমানে আমরা সকলেই পরিচিত। নজরুল তাঁর ‘যুগবাণী’ প্রবন্ধগ্রন্থে ‘রোজ-কেয়ামত বা প্রলয় দিন’ প্রবন্ধে আবহাওয়ার পরিবর্তন বিষয়ে বিস্তৃত আলোচনা করেছেন - ‘‘আগে হইতে আবহাওয়ার ক্রম-পরিবর্তন পরিলক্ষিত হইতেছে। বজ্রাঘাত - বিশেষ করিয়া শীতকালে বজ্রপতন - ক্রমশই বৃদ্ধি পাইতেছে, আর ইহার একদম সোজা কারণ রহিয়াছে যে, পৃথিবীর আর বাতাসের ইলেক্ট্রিসিটি ঠোকাঠুকির দরুনই এই বজ্র উৎপাতের সৃষ্টি! তাহা হইলে কঃ পন্থা? সেই জন্যই বুঝি পান্নাময়ী আগে হইতেই গাহিয়া রাখিয়াছে, ‘মরিব মরিব সখি, নিশ্চয়ই মরিব!’’ 

পৃথিবী ক্রমশ  উষ্ণ হয়ে উঠছে - এ সম্পর্কেও নজরুল যথেষ্ট অবগত ছিলেন। এই প্রবন্ধেই তিনি লিখেছিলেন  - ‘দক্ষিণ মেরুতে যে গগন-চুম্বী বরফের মহা আচ্ছাদন রহিয়াছে, তাহা লম্বাতে চৌদ্দ শত মাইল এবং কত শত মাইল যে পুরু তাহার ইয়াত্তাই নাই! এখন এই যে দক্ষিণ মেরুর আবহাওয়া এই রকমে ক্রমেই অসহ্য উষ্ণ হইয়া উঠিতেছে, ইহার পরিণাম কি? সকলেই জানেন বরফ গরম হইলে গলিয়া যায়। সুতরাং এখন দক্ষিণ মেরুর এই অত্যধিক উষ্ণতার দরুন সেখানের ঐ সহস্র সহস্র যোজন-ব্যাপী তুষারের মহাপর্বতসমূহ ভাঙিয়া গলিয়া যাইবে এবং আকাশ-সমান সচল হিমালয়ের মতো তরঙ্গের রাশি চতুর্দিক ধুইয়া-মুছিয়া লইয়া যাইবে। প্রথমে এই মহা-প্লাবনে আক্রান্ত হইবে পৃথিবীর ঢালু দিক অর্থাৎ দক্ষিণ মহাদেশ সমূহ।’

প্রসঙ্গত উল্লেখ করা প্রয়োজন, নজরুলের প্রথম প্রবন্ধগ্রন্থ ‘যুগবাণী’ ১৩২৯ বঙ্গাব্দের কার্তিক মাসে (১৯২২ সাল) গ্রন্থাকারে প্রকাশিত হয়। ১৯২০ সালে নজরুল সান্ধ্য দৈনিক নবযুগ - এ যেসব সম্পাদকীয় প্রবন্ধ লেখেন, তার মধ্যে কয়েকটি এই গ্রন্থে সংকলিত হয় অর্থাৎ পরিষ্কার বোঝা যায় সমাজসচেতন কবি নজরুল শতবর্ষ আগে এই লেখা লিখেছিলেন। আসাদুল হকের লেখা ‘নজরুল যখন বেতারে’ বইটি থেকে জানা যায় - ৩০ ডিসেম্বর ১৯৩৯ সালে বেতারে পল্লী মঙ্গলের আসরে ‘কচুরীপানা’ নামে একটি গীতি-আলেখ্য প্রচারিত হয়। কচুরীপানা কীভাবে অমঙ্গল সাধন করে, তার বর্ণনা দেন পরিবেশ-সচেতন নজরুল -

(এরা) ম্যালেরিয়া আনে, আনে অভাব নরক,
(এরা) অমঙ্গলের দূত, ভীষণ মড়ক!
(এরা) একে একে গ্রাস করে নদী ও নালা।
(যত) বিল ঝিল মাঠ ঘাট ডোবা ও খানা।।
ধ্বংস কর এই কচুরিপানা।।

১৯২২ সালের ১১ আগস্ট নজরুলের একক সম্পাদনায় সপ্তাহে দুবার প্রকাশের ঘোষণা দিয়ে অর্ধ-সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার আত্মপ্রকাশ হয়। ‘ধূমকেতু’ পত্রিকায় বাংলা ভাষায় নজরুলই প্রথম ভারতের পূর্ণ স্বাধীনতা দাবি করেন। পত্রিকার নামকরণ আমাদেরকে আবারও ‘বিজ্ঞান সচেতন’ নজরুলকে আবিষ্কার করার সুযোগ দেয়। পরবর্তী সময়ে 'মৃত তারা' কবিতায় চমৎকারভাবে মহাবিশ্বের প্রেক্ষাপটে সাহিত্যজগতে নিজের অবস্থান বর্ণনা করেছেন নজরুল। বাংলা সাহিত্যজগতের অগ্রজ কবি, সাহিত্যিকদের প্রতি নজরুল কতখানি শ্রদ্ধাশীল ছিলেন, এই কবিতা তারই প্রকাশ। নজরুলের কথায় -

সেদিন আমারে প্রণতি জানাতে এল কত নর-নারী, 
বন্দিয়াছিল আমারে ভাবিয়া সাগ্নিক নভোচারি। 
তাহাদের পানে লজ্জায় আমি চাহিতে পারিনা আজ -
রবি ও শরৎ-চন্দ্র বিরাজে যে মহাগগন মাঝ, 
আলোক দানে স্পর্ধা লইয়া এসেছিনু সেই নভে; 
জানিনা সে মহা অপরাধের যে ক্ষমা পাব আমি কবে।
রবি ও চন্দ্র তেমনি জ্বলিছে, দানিছে তেমনি আলো,
স্নিগ্ধ শান্ত জ্যোতিতে হরিছে বিশ্বের তমঃ কালো। 
আজ মনে নাই সে গগনে কবে উঠেছিল ধূমকেতু, 
ক্ষণিক আতসবাজি সম এসেছিল কৌতুক হেতু। 
যদি ভুলে থাকে, তবে সে পরম ভাগ্য বলিয়া মানি, 
যদি ভুলে থাকে বীণাপাণি মম জ্বালাময় বিষ-বাণী। 
সে বাণীতে মোর কাহারো প্রাসাদ জানিনা জ্বলেছে কি না;
আমি জানি শুধু জ্বলিয়াছি আমি, জ্বালেনি বাণী ও বীণা।
জ্যোতিহীন বিষহীন ধূমকেতু আজো হায় বেঁচে আছি;
বিরাট -পুরীতে অজ্ঞাতবাসে ফাল্গুনী ফেরে নাচি’!

নজরুল রচিত বেশ কিছু গানের মধ্যেও তাঁর বিজ্ঞান চেতনা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ‘তোমার মহাবিশ্বে কিছু হারায় না তো কভু’ - আমাদের নতুনভাবে ভাবতে শেখায়। জন্মের দিন থেকেই যে পরম সত্য নির্ধারিত হয় আমাদের জীবনে, তা হল মৃত্যু। কিন্তু এই মৃত্যুর অভিঘাত আমাদের জীবনে কখন, কীভাবে নেমে আসবে - সত্যিই আমরা জানি না। তাই এই নিয়ে আমাদের মনে কৌতূহলের শেষ নেই। মৃত্যু পরম সত্য - এই কথাটিকে অন্তরে ধারণ ক’রে আত্মপ্রত্যয়ী নজরুল তাই লেখেন -

যাই গো চ’লে যাই না-দেখা লোকে
                জানিতে চির অজানায়।

এই গানের শেষ অংশে নজরুল লিখলেন - ‘যে- দেশ হইতে আসে এ জীবন, যেখানে হারায়’ অর্থাৎ আসা-যাওয়ার মাঝেই আমাদের এই প্রাণ আবর্তিত হয়।

খান মুহাম্মদ মঈনুদ্দীনের ‘যুগস্রষ্টা নজরুল’ গ্রন্থে মঈনুদ্দীন লিখেছেন - ‘‘কোলকাতা গেজেটের ২৪-৯-১৯৩৬ তারিখের সংখ্যায় অনুমোদিত বইয়ের তালিকা প্রকাশিত হলো। দেখা গেল কাজী নজরুলের বই ‘মক্তব-সাহিত্য’ এই তালিকায় স্থান পেয়েছে।’’ 

শিশুদের উপযোগী ‘মক্তব-সাহিত্য’ নজরুলের অনবদ্য সৃষ্টি। ধর্মীয় অনুষঙ্গের পাশাপাশি শিশুদের কথা ভেবে বেশ কিছু লেখা তিনি লিখেছিলেন যা প্রকৃত অর্থেই বিজ্ঞানমনস্ক নজরুলকে তুলে ধরে। ‘পানি’ শিরোনামে লেখায় নজরুল চমৎকারভাবে শিশুদের বোধগম্যতার কথা বিবেচনা করে পানি সম্পর্কে কিছু তথ্য তুলে ধরেছিলেন যা তাদের প্রাত্যহিক জীবনে বিশেষ কাজে লাগবে - ‘নদী পুষ্করিণী প্রভৃতির জলভাগ তোমরা অনেকে দেখিয়াছ। উহাদের অপেক্ষা আরও বৃহৎ জলভাগ আছে তাহাকে সমুদ্র বলে। সমুদ্র দুনিয়ার স্থলভাগকে ঘিরিয়া আছে। ...তাহা হইলে এই দুনিয়ার পানি কত বেশি, তাহা সহজেই অনুমান করিতে পার। সমুদ্রের পানি লোনা৷ উহা কেহ পান করিতে পারে না। পানের জন্য যে পানি ব্যবহার করিবে, তাহা বিশুদ্ধ হওয়া প্রয়োজন। বিশুদ্ধ পানি বর্ণহীন, গন্ধহীন ও স্বাদহীন। যে পানিতে কোন বর্ণ বা গন্ধ আছে তাহা দূষিত বলিয়া জানিবে। দূষিত পানিতে নানারূপ রোগের বীজাণু লুকানো থাকে। দূষিত পানি পান করিলে আমাশয়, টাইফয়েড ও কলেরা প্রভৃতি রোগ আক্রমণ করিতে পারে। নানা কারণে নদী, পুষ্করিণী ও কূপ প্রভৃতির পানি দূষিত হয়। নদীতে লোকে জীবজন্তুর মৃতদেহ ফেলে, বহু গাছপালার পাতা পড়িয়া পচে, লোকে মল-মূত্র ত্যাগ করে ও গো-মহিষাদি স্নান করায়, ইত্যাদি কারণে... পানি দূষিত হয়। ...এইজন্যই গ্রামে মধ্যে মধ্যে এত বেশি সংক্রামক রোগ দেখা দেয়। তোমরা কদাচ এইরূপ জলাশয়ের পানি পান করিবে না। দূষিত পানি পান করিতে হইলে উহা আধঘন্টা আগুনে ফুটাইয়া লইয়া একটি পাত্রে রাখিয়া দিবে; পরে ঠান্ডা হইলে পান করিবে।’

বিজ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ আমাদের জীবনযাপনকে যেমন সহজ করে দেয়, ঠিক তেমনই বর্তমানে বিজ্ঞানের বিপুল প্রয়োগ আমাদের জীবনকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে, প্রকৃতির সঙ্গে আমাদের ক্রমশ দূরত্ব বাড়ছে। নজরুল যেমন বিজ্ঞানের জয়গান গেয়েছেন, পাশাপাশি প্রকৃতিকে ভালোবাসতেও শিখিয়েছেন। ‘চলব আমি হালকা চালে’ কবিতায় নজরুলের কলমে সেই কথাই উঠে এসেছে -

সাবমেরিনের মরণ-নীতি
ভরা ডুবি করছে নিতি
কুমির হতেও ভীষণ রীতি
ডুব দিয়ে সব খাচ্ছে জল!
আমি হব পানকৌড়ি
সঙ্গে সাথী মীন-গৌরী,
ফিরব ঘুরে জল-দেউড়ি
দেখব জলের শীতল তল।।

কখন, কোথায়, কীভাবে আমরা বিজ্ঞানকে ব্যবহার করব তা নির্ভর করে আমাদের বোধের ওপর। অল্প বিদ্যা অনেক সময় বিপদ ডেকে আনে। ‘সত্য আগুন দেখিনি’ কবিতায় নজরুল তাই লিখলেন -

খণ্ড করিয়া দেখিলে পূর্ণে দেখিবে নিয়ত ভুল,
সূর্য কেবলি দগ্ধ করে না, ফোটায়ে কমল ফুল।

তারুণ্যের পূজারী নজরুল বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত নতুন পৃথিবী গড়ে তোলার জন্য শিশুদের স্বাগত জানিয়েছেন -

নতুন দিনের মানুষ তোরা
আয় শিশুরা আয়!
নতুন চোখে নতুন লোকের
নতুন ভরসায়।

লেখক: নজরুল সঙ্গীতশিল্পী এবং সভাপতি, ছায়ানট (কলকাতা)

দেশপ্রেমের কালজয়ী কণ্ঠকে শিল্পকলার বিশেষ সম্মাননা

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৯:৫০ পিএম
দেশপ্রেমের কালজয়ী কণ্ঠকে শিল্পকলার বিশেষ সম্মাননা
দেশাত্মবোধক গানের কিংবদন্তি সৈয়দ আব্দুল হাদীকে বিশেষ সম্মাননা প্রদান করা হচ্ছে। ছবি: খবরের কাগজ

বাংলা গানের অবিসংবাদিত সম্রাট, যার কণ্ঠস্বর কয়েক প্রজন্মের আবেগের নাম, সেই বরেণ্য সংগীতশিল্পী সৈয়দ আব্দুল হাদী।

দীর্ঘ অর্ধশতাব্দীরও অধিক সময় ধরে সংগীতের সুধায় সিক্ত করে  তিনি পেয়েছেন এক বিশেষ সম্মাননা।

বাংলাদেশ শিল্পকলা একাডেমির আয়োজনে বর্ণাঢ্য আয়োজনে এই কালজয়ী শিল্পীকে দেওয়া হলো বিশেষ সম্মাননা স্মারক।

শুক্রবার (১২ জুন) সন্ধ্যায় রাজধানীর জাতীয় নাট্যশালা মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হয় এই বিশেষ আয়োজন।

জাতীয় সংস্কৃতির বিকাশ ও লালনে অসামান্য অবদান রাখা গুণীজনদের মূল্যায়নের অংশ হিসেবে এই অনুষ্ঠানের অবতারণা করা হয়।

সম্মাননা গ্রহণকালে আবেগময় কণ্ঠে সৈয়দ আব্দুল হাদী বলেন, ‘আমি সবার প্রশংসায় আকুণ্ঠ নিমজ্জিত হয়েছি। তবে আমার একটিই অনুরোধ; আমরা যেন নিজেদের ভারে দেশটাকে ভারাক্রান্ত না করে ফেলি। আসুন, আমরা সবাই দেশটাকে ভালোবাসি।’ 

অনুষ্ঠানের সূচনা হয় সৈয়দ আব্দুল হাদীর বর্ণাঢ্য জীবন ও কর্মের ওপর নির্মিত একটি প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শনের মাধ্যমে। এরপর মঞ্চে আনুষ্ঠানিকভাবে তাকে সম্মাননা স্মারক তুলে দেওয়া হয়।

এতে সভাপতিত্ব করেন সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম এমপি এবং তথ্য ও সম্প্রচার এবং সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা (প্রতিমন্ত্রী পদমর্যাদা) ড. জাহেদ উর রহমান। সম্মানিত অতিথি হিসেবে ছিলেন জাসাস-এর আহ্বায়ক হেলাল খান।

‘সৈয়দ আব্দুল হাদী’ একটি মানদণ্ড
শিল্পকলা একাডেমির মহাপরিচালক ও কবি শেখ রেজাউদ্দিন আহমেদ (রেজাউদ্দিন স্টালিন) বলেন, ‘বাংলা গানের উচ্চতা এখন নির্ণিত হয় সৈয়দ আব্দুল হাদীর কণ্ঠস্বরকে ঘিরে। নতুন প্রজন্মের কোনো শিল্পী কেমন গাইলেন, তা যাচাই করতে গিয়ে আজও শ্রোতারা সৈয়দ আব্দুল হাদীর গায়কীর মানদণ্ডেই বিচার করেন। এটিই তার সার্থকতা।’

সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম বলেন, ‘বিগত সময়ে আমাদের সংস্কৃতির যে ক্ষতি হয়েছে, তা কাটিয়ে উঠে সংস্কৃতি অঙ্গনকে ঢেলে সাজাতে চাই। রবীন্দ্র-নজরুল থেকে শুরু করে সংগীতের প্রতিটি শাখাকে নতুন উদ্যমে এগিয়ে নেওয়াই আমাদের লক্ষ্য।’

গীতসন্ধ্যায় শ্রদ্ধাঞ্জলি
সম্মাননা পর্ব শেষে আয়োজিত হয় ‘গীতসন্ধ্যা’। এখানে নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের কণ্ঠে সুরের মূর্ছনায় উঠে আসে সৈয়দ আব্দুল হাদীর কালজয়ী সব গান। স্মরণ, নোলক বাবু, অনন্যা আচার্য, পিয়াল হাসানসহ একঝাঁক শিল্পীর পরিবেশনায় মুখরিত হয়ে ওঠে মিলনায়তন। ‘আছেন আমার মোক্তার’ ও ‘সূর্যোদয়ে তুমি, সূর্যাস্তেও তুমি’-এই দুটি গান সমবেত কণ্ঠে পরিবেশনের মাধ্যমে কিংবদন্তি শিল্পীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।

জয়ন্ত সাহা/এসএন

শিল্পের ক্যানভাসে তিন প্রাণের সেতুবন্ধন

প্রকাশ: ১২ জুন ২০২৬, ০৯:২২ পিএম
আপডেট: ১২ জুন ২০২৬, ০৯:২৪ পিএম
শিল্পের ক্যানভাসে তিন প্রাণের সেতুবন্ধন
ছবি: খবরের কাগজ

ক্যানভাস যেন এক নীরব ভাষা, যেখানে তুলির আঁচড়ে জমে ওঠে অস্ফুট অব্যক্ত কথা। প্রকৃতির স্নিগ্ধতা, মানুষের চোখের জলছবি আর রাজপথের সংগ্রামী মানুষদের নীরব মর্যাদার মিশেলে তৈরি এক অদ্ভুত সুরের মূর্ছনা এখন ঢাকার ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার লা গ্যালারিতে। 

শুক্রবার (১২ জুন) সন্ধ্যায় তিনটি ভিন্ন ধারার প্রতিভাবান শিল্পী মো. ফারিয়াজ ইমরান, নীহারিকা অহনা বারসাত এবং সুরভী আক্তারের শিল্পকর্মে সেজে উঠেছে প্রদর্শনী ‘ত্রিবন্ধন’। শিল্পীর মন ও ক্যানভাসের মধ্যকার এই যে নিবিড় সংযোগ, তা যেন আজ এক মূর্ত রূপ পেয়েছে শিল্পানুরাগীদের সামনে। উদ্বোধনী আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন প্রখ্যাত শিল্পী সাইদুল হক জুইস, রশীদ আমিন এবং অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আনিস। 

স্মৃতির অতল থেকে উঠে আসা পরিচয়, প্রকৃতির সাথে মানবিক বন্ধন আর নগরের ব্যস্ততায় হারিয়ে যাওয়া জীবনের গল্পগুলো এখানে একে অপরের সাথে সংলাপে মগ্ন।

নীহারিকা অহনা বারসাত দর্শকদের নিয়ে গেছেন এক স্বপ্নিল কাব্যিক জগতে। তার জলরঙ ও অ্যাক্রিলিকের বহুস্তরবিশিষ্ট কাজগুলোতে বৃক্ষ, পাখি ও নারীমূর্তির পুনরাবৃত্তি যেন এক প্রকার আরোগ্যের মন্ত্র উচ্চারণ করে। প্রকৃতিকে তিনি কেবল দৃশ্যপট হিসেবে নয়, বরং আত্মরূপান্তরের এক অবিচ্ছেদ্য সঙ্গী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন।

উল্টো পিঠেই আবার সুরভী আক্তারের শিল্পভাষায় ধরা দিয়েছে মানবিকতার সূক্ষ্ম রেখা। এই শিল্পী ব্রাউন পেপারের ধূসর জমিনে লাল বলপয়েন্ট কলমের আঁচড়ে মানুষের চোখের ভাষা পড়তে চেয়েছেন। প্রযুক্তিনির্ভর এই যান্ত্রিক পৃথিবীতে যেখানে মানুষ একে অপরের থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, সেখানে তার প্রতিকৃতিগুলো দর্শককে থমকে দাঁড়াতে এবং দৃষ্টির গভীরে লুকিয়ে থাকা নীরব কথাগুলো শুনতে আহ্বান জানায়।

নগরজীবনের না বলা আখ্যানকে মলাটবন্দি করেছেন মো. ফারিয়াজ ইমরান। ঢাকার রাজপথ, রিকশাচালকদের ঘামভেজা শরীর আর প্রান্তিক মানুষের সংগ্রামগুলোকে তিনি জলরঙের মায়ায় জীবন্ত করে তুলেছেন। সমাজের জনপরিসরে যারা প্রায়শই অদৃশ্য থেকে যান, ফারিয়াজের তুলিতে তারাই হয়ে উঠেছেন অনন্য সাধারণ।

সামগ্রিকভাবে ‘ত্রিবন্ধন’ কেবল একটি প্রদর্শনী নয়, এটি ব্যক্তি, সমাজ ও প্রকৃতির মধ্যকার সম্পর্কের এক নান্দনিক উদযাপন। আগামী ১৭ জুন পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত এই প্রদর্শনীটি সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

জয়ন্ত সাহা/রিফাত/

সুর-ছন্দের আন্তর্জাতিক মেলবন্ধন চার দিনের সংগীত উৎসবে মেতে উঠছে ঢাকা

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৭:৫৭ পিএম
চার দিনের সংগীত উৎসবে মেতে উঠছে ঢাকা
ছবি: সংগৃহীত

বর্ষার আগমনী বার্তার মাঝেই সুরের মায়াজালে জড়াতে শুরু করেছে রাজধানী ঢাকা। শুরু হয়েছে চার দিনব্যাপী আন্তর্জাতিক সঙ্গীত উৎসব 'ফেত দ্য লা মিউজিক ২০২৬'।

বুধবার (১০ জুন) থেকে শুরু হওয়া এই উৎসবে সুরের মূর্ছনা ছড়াচ্ছেন বাংলাদেশ, ফ্রান্স, ব্রাজিল ও ফিনল্যান্ডের শিল্পীরা। আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকা (এএফডি) তাদের সহযোগী সাংস্কৃতিক ও শিল্প প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে যৌথভাবে এই উৎসবের আয়োজন করেছে, যা চলবে আগামী ১৩ জুন পর্যন্ত।

আয়োজকরা জানিয়েছেন, সাংস্কৃতিক বিনিময় ও সৃজনশীল অনুসন্ধানের চেতনাকে কেন্দ্র করে এবারের সুরের আড্ডাকে সাজানো হয়েছে। চার দিনের এই আয়োজনে কর্মশালা, লাইভ পারফরম্যান্স এবং সাংস্কৃতিক মেলবন্ধনের মাধ্যমে দর্শক-শ্রোতারা সমসাময়িক বৈশ্বিক সংগীতধারার এক অনন্য অভিজ্ঞতা পাবেন।

রাজধানীর গুলশানের ‘বাটারনোট – আ জ্যাজ ক্যাফেতে’ গতকাল বুধবার বিকেলে ইলেকট্রনিক মিউজিক কর্মশালার মাধ্যমে উৎসবের পর্দা ওঠে। ফরাসি সংগীতশিল্পী ও পারকাশনবাদক সুভাষ ধুনুচন্দ এই কর্মশালা পরিচালনা করেন। উৎসবের দ্বিতীয় দিন আজ বৃহস্পতিবার দর্শকদের জন্য থাকছে বিশেষ কনসার্ট ‘বসা ও সোলেই কুশঁ’। এতে পারফর্ম করবেন ফিনল্যান্ডের মিরভা তুলিয়া, ব্রাজিলের আকিলা লিমা এবং বাংলাদেশের ইমরান আহমেদ, তৌফিক আরিফিন ও তানভীর হক। বোসা নোভার মনোমুগ্ধকর সুর ও ছন্দের মাধ্যমে সেখানে তৈরি হবে এক অনন্য সাংস্কৃতিক সংলাপ। অন্যদিকে আজ সন্ধ্যায় ধানমন্ডির গ্যেটে-ইনস্টিটিউট বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে ‘তবলাট্রনিক’। সুভাষ ধুনুচন্দের লাইভ পারফরম্যান্সে তবলা, পারকাশন এবং ইলেকট্রনিক প্রোগ্রামিংয়ের সমন্বয়ে ঐতিহ্য ও প্রযুক্তির এক দারুণ মেলবন্ধন দেখার অপেক্ষায় আছেন শ্রোতারা।

উৎসবে শুক্রবারের মূল আকর্ষণ অ্যালিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের সংগীত উদ্‌যাপন। তাদের নিজস্ব পরিবেশনার পাশাপাশি সেদিন ক্যাফে লা ভেরান্দায় গান শোনাবেন তপেশ চক্রবর্তী ও জ্যাজ ব্যান্ড ‘দ্য সোসাইটি’। আগামী শনিবার উৎসবের শেষ দিনে সমাপনী আকর্ষণ হিসেবে মঞ্চস্থ হবে ‘বাংলা ব্রাজিল: দ্য সাউন্ড অব দ্য ইউনিভার্স’। ব্রাজিলের আকিলা লিমা এবং বাংলাদেশের মিঠুন চক্রের এক অনন্য পারকাশন যুগলবন্দির মধ্য দিয়ে পর্দা নামবে চার দেশের শিল্পীদের এই মিলনমেলার।

জয়ন্ত সাহা/এসএন

ক্যানভাসে জীবন, সমাজ ও প্রকৃতি আলিয়ঁসে শুরু  হচ্ছে তিন শিল্পীর ‘ত্রিবন্ধন’

প্রকাশ: ১০ জুন ২০২৬, ০৭:৩৮ পিএম
আলিয়ঁসে শুরু  হচ্ছে তিন শিল্পীর ‘ত্রিবন্ধন’
ছবি: সংগৃহীত

একই গ্যালারি, অথচ তিনটি ভিন্ন চোখ দিয়ে দেখা চেনা-অচেনা জীবন। কেউ খুঁজে ফিরছেন প্রকৃতির মাঝে মানুষের আত্মিক আরোগ্য, কেউ মানুষের চোখের গভীরতায় খুঁজছেন মনের অলিগলি, আবার কারও তুলিতে মূর্ত হয়ে উঠছে ঢাকার রাস্তায় খেটে খাওয়া মানুষের নীরব লড়াই। তিন উদীয়মান শিল্পীর এমন তিন ঘরানার শিল্পভাষাকে এক সুতোয় বেঁধেছে ‘ত্রিবন্ধন’।

শুক্রবার (১২ জুন) রাজধানীর ধানমন্ডির আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ দ্য ঢাকার ‘লা গ্যালারি’তে পর্দা উঠবে এই প্রদর্শনীর। তরুণ চিত্রশিল্পী মো. ফারিয়াজ ইমরান, নীহারিকা অহনা বারসাত এবং সুরভী আক্তারের সম্মিলিত চিত্রকর্ম নিয়ে সেজেছে এই প্রদর্শনী।

স্মৃতি, পরিচয়, প্রকৃতি, মানবিক সংযোগ এবং চেনা নগরজীবনের নানা অনুষঙ্গ উঠে এসেছে এই তিন তরুণের ক্যানভাসে। ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি আর মাধ্যম ব্যবহার করলেও, শিল্পীদের কাজগুলো একসঙ্গে মিলে যেন গড়ে তুলেছে সহমর্মিতা, স্থিতিস্থাপকতা আর আত্মরূপান্তরের এক গভীর সংলাপ।

প্রদর্শনীতে শিল্পী নীহারিকা অহনা বারসাতের চিত্রকর্মগুলো দর্শকদের নিয়ে যায় এক কাব্যিক জগতে, যেখানে প্রকৃতি আর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা মিলেমিশে একাকার। তার ক্যানভাসে বারবার ফিরে এসেছে পাখি, বৃক্ষ ও নারীমূর্তি। অ্যাক্রিলিক ও জলরঙে নির্মিত তার বহুস্তরবিশিষ্ট কম্পোজিশনে প্রকৃতি কেবল পটভূমি হয়ে থাকেনি, বরং রূপান্তরের এক সক্রিয় চরিত্র হয়ে উঠেছে। তার প্রতিটি কাজ যেন আরোগ্য, বিকাশ ও আত্ম-অন্বেষণের গল্প বলে; নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করে মানুষ ও পরিবেশের অদৃশ্য সম্পর্ক নিয়ে।

শিল্পী সুরভী আক্তারের ক্যানভাসের মূল শক্তি মানুষের চোখ। মানবমুখের সবচেয়ে অভিব্যক্তিপূর্ণ এই উপাদানটিকে কেন্দ্র করেই তার পুরো শিল্পচর্চা। ব্রাউন পেপারের ওপর লাল বলপয়েন্ট কলম আর রঙিন পেন্সিলের সূক্ষ্ম টানে সুরভী ফুটিয়ে তুলেছেন একের পর এক প্রতিকৃতি। ক্ষণস্থায়ী আর চটজলদি ছবির এই যুগে সুরভীর কাজগুলো দর্শকদের থমকে দাঁড়াতে বাধ্য করে। প্রতিটি চোখের দৃষ্টিতে লুকিয়ে থাকা আবেগ, মনস্তাত্ত্বিক গভীরতা আর মানবিক সংযোগকে নিবিড়ভাবে দেখার আহ্বান জানায় তার এই প্রতিকৃতিগুলো।

শহুরে জীবনের কোলাহল আর উপেক্ষিত মানুষের গল্প নিয়ে হাজির হয়েছেন মো. ফারিয়াজ ইমরান। তার ক্যানভাসের অনুপ্রেরণা ঢাকার রাস্তাঘাট, বিশেষ করে রিকশাচালক ও নগরের পেছনের সারির খেটে খাওয়া মানুষ। জলরঙের স্তরবিন্যাস আর চমৎকার মানবকেন্দ্রিক কম্পোজিশনের মাধ্যমে ফারিয়াজ তুলে ধরেছেন শ্রমজীবী মানুষের নীরব মর্যাদা, সংগ্রাম ও আত্মমগ্নতার মুহূর্তগুলোকে। ঢাকার চাকা সচল রাখা যে মানুষগুলো জনপরিসরের আলোচনায় প্রায়শই অদৃশ্য থেকে যান, ফারিয়াজের তুলি তাদেরই দিয়েছে সামাজিক স্বীকৃতি ও পরিচয়ের নতুন ভাষা।

এই প্রদর্শনী আগামী ১৭ জুন পর্যন্ত প্রতিদিন বিকেল ৩টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে।

জয়ন্ত সাহা/এসএন

আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর চলচ্চিত্র 'সাঁকোটা দুলছে'

প্রকাশ: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:২৮ এএম
আপডেট: ০৮ জুন ২০২৬, ০৯:৩৫ এএম
আন্তর্জাতিক অঙ্গনে কাজী নজরুল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীর চলচ্চিত্র 'সাঁকোটা দুলছে'
ছবি: খবরের কাগজ

সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসব-২০২৬ এর ‘এশিয়ান নিউ ট্যালেন্ট কম্পিটিশন’ বিভাগে নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র ‘দ্য ব্লাইন্ড গার্ল অ্যান্ড অ্যান এলিফ্যান্ট’ (সাঁকোটা দুলছে)।

চলচ্চিত্রটি পরিচালনা করেছেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদ।

আগামী ১২ থেকে ২১ জুন ২০২৬ পর্যন্ত চীনের সাংহাই শহরে অনুষ্ঠিত সাংহাই চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হবে চলচ্চিত্রটি।

পরিচালক জিহাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের ফিল্ম অ্যান্ড মিডিয়া স্টাডিজ বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী। বর্তমানে তিনি স্নাতকোত্তর পর্যায়ে অধ্যয়নরত।

তরুণ এই পরিচালকের প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এটি। চলচ্চিত্রটির প্রযোজনা করেছেন তার বিভাগেরই সহকারী অধ্যাপক ও জনপ্রিয় অভিনেতা মনোজ কুমার প্রামাণিক।

বাংলাদেশের প্রযোজনা প্রতিষ্ঠান ‘মনপাচিত্র’ এবং জার্মানির ‘মগডোর ফিল্ম’-এর যৌথ উদ্যোগে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রটি। প্রযোজক ও প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানটিরও প্রথম পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র এটি।

সংশ্লিষ্টরা জানান, চলচ্চিত্রটির আন্তর্জাতিক নির্মাণযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন জার্মান প্রযোজক ক্রিস্টোফ থোকে। তিনি সহযোগী প্রযোজক হিসেবে পোস্ট-প্রোডাকশন পর্যায়ে প্রকল্পটির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।

এছাড়া আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন চলচ্চিত্র সমালোচক, প্রযোজক ও প্রোগ্রামার ডার্সি প্যাকুয়েট চলচ্চিত্রটির কনসাল্টিং প্রযোজক হিসেবে এবং চলচ্চিত্র নির্মাতা ও প্রযোজক ফজলে হাসান শিশির সহ-প্রযোজক হিসেবে যুক্ত ছিলেন।

মূলত, গ্রামীণ বাংলাদেশের তিন নারীর জীবনকে কেন্দ্র করে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রটি।

যেখানে গল্পে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে, কুসংস্কার, পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা ও সামাজিক নিপীড়নের বেড়াজাল থেকে মুক্তির স্বপ্ন দেখা এসব নারীর সংগ্রামের গল্প।

সম্পূর্ণ সাদা-কালোতে নির্মিত চলচ্চিত্রটি নারীর জীবন, বিশ্বাস, সামাজিক নিয়ন্ত্রণ এবং ব্যক্তিস্বাধীনতার প্রশ্নকে গ্রামীণ বাংলাদেশের বাস্তবতার আঙ্গিকে উপস্থাপন করেছে।

এশিয়া মহাদেশের অন্যতম বৃহৎ এই চলচ্চিত্র উৎসবে নিজের প্রথম চলচ্চিত্রের নির্বাচনের বিষয়ে পরিচালক ইশতিয়াক আহমেদ জিহাদ বলেন, ‘গ্রামীণ বাংলাদেশে বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতা থেকে আমি দেখেছি, কীভাবে কুসংস্কার, রক্ষণশীলতা এবং সামাজিক বিধিনিষেধ নারীদের জীবনে প্রভাব ফেলে। এই চলচ্চিত্র সেই বাস্তবতা থেকেই জন্ম নিয়েছে। সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হওয়া আমাদের পুরো টিমের জন্য অত্যন্ত সম্মানের। পাশাপাচি চলচ্চিত্রে প্রতিফলিত মানুষদের জীবন ও অভিজ্ঞতার একটি আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি।’

চলচ্চিত্রটির বিষয়ে প্রযোজক মনোজ কুমার প্রামাণিক বলেন, ‘এই যাত্রা শুরু হয়েছিল খুব সীমিত অর্থ, অল্প অভিজ্ঞতা এবং একদল স্বপ্নবান তরুণ চলচ্চিত্রকর্মীকে নিয়ে। সাংহাই আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে নির্বাচিত হওয়া আমাদের বহু বছরের পরিশ্রম, ত্যাগ, বিশ্বাস এবং স্বাধীন চলচ্চিত্রচর্চার প্রতি অঙ্গীকারের স্বীকৃতি।’

তাসনিম হক/তামান্না রুপা/