অষ্টাদশ পর্ব
অন্যঘর থেকে ইমাদুল হকের কণ্ঠস্বর শুনতে পেলেন রোকেয়া। তিনি দৌড়ে তার কাছে এগিয়ে গেলেন। তার অবস্থা দেখে তিনি কী বুঝলেন কে জানে! তিনি অ্যাম্বুলেন্স ডাকার জন্য টেলিফোনের দিকে হাত বাড়ালেন। ইমাদুল হক তাকে বাধা দিয়ে শুকনো গলায় বললেন, হাসপাতাল নয়, আমাকে অফিসে পাঠানোর ব্যবস্থা করো!
বৈরম খান ঝিমমেরে বসে আছেন। কারও সঙ্গে কোনো কথা বলছেন না। কারও কোনো প্রশ্নের জবাব দিচ্ছেন না। মাঝে-মধ্যেই তার এমন অবস্থা হয়। কোনো সমস্যায় পড়লে তার সঙ্গে কেউ আর কথা বলতে পারে না। তিনি মেজাজ ঠিক রাখতে পারেন না। জাতে-অজাতে গালাগাল শুরু করেন। আজ সকাল থেকে তার মেজাজ গরম। সকালে বাসার কাজের লোকদের সঙ্গে তার চিৎকার চেঁচামেচির কথা তার স্ত্রী দিলরুবা খান শুনেছেন। কিন্তু কেন তার মেজাজ গরম তা তিনি জানেন না। কী ঘটেছে তাও তিনি বুঝতে পারছেন না।
দিলরুবা খান বৈরম খানের পাশে বসলেন। তার পর নরম গলায় বললেন, খ ব্যাপার! কী হয়েছে? তোমাকে ভীষণ চিন্তিত মনে হচ্ছে!
বৈরম খান কোনো জবাব দিচ্ছেন না। দিলরুবা খান আবারও বললেন, পত্রিকায় কিছু লিখেছে নাকি? নাকি শাহবাজ কোনো গণ্ডগোল করেছে?
বৈরম খান কোনো জবাব না দিয়ে আবার নিচে নেমে এলেন। নিচের ড্রয়িং রুমে বসে চিৎকার দিয়ে কাজের লোকদের ডাকাকাছি শুরু করলেন। ম্যাক কিছুক্ষণ আগেই তার বাসায় এসে পৌঁছেছে। কিন্তু সে ভয়ে তার সামনে যাচ্ছে না। সে থরথর করে কাঁপছে। আয়াতুল কুরশি পড়ে বুকে ফুঁ দিচ্ছে। ঘন ঘন আল্লাহর নাম নিচ্ছে। মনে মনে বললেন, হে আল্লাহ রক্ষা করো।
এর মধ্যে ম্যাকের নাম ধরে বৈরম খান কয়েকবার ডাকলেন। এবার তার সামনে না গিয়ে উপায় নেই। ম্যাক ভয়ে ভয়ে তার সামনে গিয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ দিয়ে পানি পড়ছে। ম্যাককে দেখেই বৈরম খান গালাগাল শুরু করলেন। বৈরম খানের মুখ থেকে যেন বুলেটের মতো কথা বের হচ্ছে। দাঁড়িয়ে থেকে সেগুলো সহ্য করছে ম্যাক। টুঁ শব্দটিও সে করতে পারছে না। সে অধিকার তার নেই।
ম্যাক ভালো করেই জানে, বকাবাজি শেষ না হওয়া পর্যন্ত বৈরম খানের মেজাজ ঠাণ্ডা হবে না। আর তার মেজাজ ঠাণ্ডা না হওয়া পর্যন্ত উতাল-পাতাল ঝড় বইতে থাকবে। সেই ঝড়ের আঘাত কোথায় গিয়ে যে লাগবে তা কেউ জানে না। ম্যাকের আগে সম্পাদক ইমাদুল হককে তুলাধোনা করেছেন। তাতেও তার মেজাজ ঠাণ্ডা হয়নি। বকাবাজির একপর্যায়ে বৈরম খান ম্যাককে উদ্দেশ করে বললেন, আমারটা খেয়ে খেয়ে হাতির মতো শরীর বানিয়েছিস। অথচ তোরে দিয়া আমার দুই পয়সার উপকার হয় না! তোর চেহারা দেখলেও এখন আমার শরীর জ্বলে! একটা হাতির বাচ্চা হাতি! তুই আমার সামনে থেকে দূর হয়ে যা!
এ সময় টেলিফোনের রিং বাজে। বৈরম খান টেলিফোনের রিসিভার তুলে হ্যালো বলতেই অপর প্রান্ত থেকে একটি চেনা কণ্ঠ ভেসে এল। পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আবদুল হারিসের ফোন পেয়ে তিনি কিছুটা শান্ত হলেন। তিনি মনে মনে বললেন, পত্রিকা যা-ই লিখুক; পুলিশ হাতে থাকলে আর আটকায় কে? মামলার ধারা ওল্টাতে এক মুহূর্তও সময় লাগে না।
বৈরম খান শান্ত গলায় বললেন, হারিস ভাই কেমন আছেন?
আমি তো ভালোই আছি। কিন্তু আপনার কী অবস্থা? খুব পেরেশানিতে আছেন বোধহয়!
হ্যাঁ ভাই। ভয়ানক পেরেশানি! পত্রিকাগুলা আমারে শেষ করে দিল!
পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আবদুল হারিস অনুযোগের সুরে বললেন, আপনি পত্রিকার মালিক হইয়া কী করলেন? আপনারেও ছাড়ল না! এত দেখছি ভয়ানক অবস্থা!
গাছ বড় হইলে ঝড় তো ভাই লাগবই। বাঙালি চরিত্র! কারও ভালো কেউ দেখতে পারে না। আমি বড় হইছি বলে অনেকেরই চোখ টাটায়। বুঝতে পারছেন! আচ্ছা শোনেন; আপনি ফোন করছেন ভালোই হইছে। আমিও ফোন করছিলাম। আপনি হয়তো খেয়াল করেননি!
জি। মিস কল দেখেই তো আপনাকে ফোন দিলাম।
আপনি তো ভাই জানেনই। আমার শত্রুর অভাব নেই। ষড়যন্ত্রের জালে আমার ছেলে ফাঁসছে। আমার ছেলে যা; আপনার ছেলেও তা। এই ষড়যন্ত্র থেকে তো তাকে বের করে আনতে হবে! তাই না হারিস ভাই? তারে কী করে বাঁচাইবেন সেইটা আপনি দেখেন।
আচ্ছা ঠিক আছে। আপনি আরেকটা কাজ করেন।
কী কাজ, বলেন!
পলিটিক্যাল লাইনে একটু কথা বলে রাখেন। ওই দিকের চাপ এলে তো আমাদের জন্য সমস্যা। বুঝতে পারছেন নিশ্চয়ই।
সেইটা আমি জানি। আমি আজই কথা বলব। আপনি ঠিক থাইকেন। পত্রিকার রিপোর্ট দেখে আবার বিগড়াইয়া যাইয়েন না!
ঠিক আছে; দেখা যাক। আপনি চিন্তা করবেন না।
আবদুল হারিসের কথা শুনে বৈরম খান কিছুটা স্বস্তিবোধ করেন।
১৪
মোহিনী অনেকদিন ধরেই সকালে ছাপা কাগজ পড়েন না। নিজের মোবাইলে পত্রিকার অনলাইন সংস্করণগুলো দেখে নেন। আজ সকালে মোবাইলে পত্রিকার রিপোর্ট দেখে তিনি চমকে উঠলেন। ভারতে নতুন করে ব্যাপকভাবে বেড়েছে করোনার প্রকোপ। মৃত্যের সংখ্যা ও সংক্রমণের হার হু হু করে বাড়ছে। চিকিৎসাবিজ্ঞানীরা বলছেন, এটা ডেলটা ভেরিয়েন্ট। কারোনার প্রথম ঢেউয়ের চেয়ে দ্বিতীয় ঢেউ অনেক বেশি শক্তিশালী। এটা সারা বিশ্ব ছড়িয়ে পড়লে ভয়ংকর অবস্থা হতে পারে!
চলবে...
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭