কোলেস্টেরল হলো রক্তে থাকা এক ধরনের মোমের মতো উপাদান, যা শরীরের কোষ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। রক্তে কোলেস্টেরলের মাত্রা বেড়ে গেলে চর্বি ও অন্যান্য উপাদান ধীরে ধীরে রক্তনালিতে জমে প্লাক তৈরি করে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে এই প্লাক রক্তনালিকে সরু বা বন্ধ করে দিতে পারে। ফলে রক্তপ্রবাহ কমে যায় এবং হৃৎপিণ্ড বা মস্তিষ্কের কোনো অংশ পর্যাপ্ত রক্ত না পেলে হৃদরোগ, হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের মতো মারাত্মক পরিস্থিতির সৃষ্টি হতে পারে। অনেক সময় প্লাকের একটি অংশ ভেঙে রক্তজমাট তৈরি করে আকস্মিক বিপদও ঘটাতে পারে।
কারণ: নিয়ন্ত্রণযোগ্য ও অনিয়ন্ত্রণযোগ্য
উচ্চ কোলেস্টেরলের বড় কারণ হলো জীবনযাত্রার ভুল অভ্যাস। অতিরিক্ত চর্বিযুক্ত খাবার খাওয়া, ব্যায়ামের অভাব, অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার, স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট গ্রহণ—এসব কারণে কোলেস্টেরল দ্রুত বাড়ে। তবে জিনগত কারণেও কারও কোলেস্টেরল বেশি হতে পারে। বাবা-মায়ের কাছ থেকে পাওয়া জিনের পরিবর্তন শরীরে চর্বি ভাঙার প্রক্রিয়াকে ধীর করে দেয়। এ ছাড়াও কিছু রোগ যেমন- ডায়াবেটিস, কিডনি ও লিভারের দীর্ঘমেয়াদি রোগ, হাইপোথাইরয়েডিজম, স্লিপ অ্যাপনিয়া, এইচআইভি/এইডস বা লুপাস—কোলেস্টেরলের মাত্রা বাড়াতে পারে। এমনকি কিছু ওষুধ যেমন ক্যানসার, উচ্চ রক্তচাপ, অনিয়মিত হার্টবিট, অঙ্গ প্রতিস্থাপনের ওষুধও কোলেস্টেরল বাড়াতে ভূমিকা রাখে।
কোলেস্টেরলের ধরন
রক্তে থাকা কোলেস্টেরল প্রোটিনের সঙ্গে মিশে ‘লিপোপ্রোটিন’ তৈরি করে। এরই ওপর ভিত্তি করে কোলেস্টেরলের ধরন নির্ধারিত হয়।
◉ এলডিএল কোলেস্টেরল: ‘খারাপ’ কোলেস্টেরল নামে পরিচিত। এটি রক্তনালির দেয়ালে জমে নালি সংকুচিত করে।
◉ এইচডিএল কোলেস্টেরল: ‘ভালো’ কোলেস্টেরল হিসেবে পরিচিত। এটি অতিরিক্ত কোলেস্টেরল সংগ্রহ করে তা লিভারে ফিরিয়ে নেয়।
◉ ট্রাইগ্লিসারাইড: এটি কোলেস্টেরল নয়, তবে রক্তে থাকা এক ধরনের চর্বি। এর মাত্রা বেশি হলে হৃদরোগের ঝুঁকি বাড়ে।
জটিলতা বা পরিণতি
অতিরিক্ত কোলেস্টেরলে রক্তনালিতে প্লাক জমাট বাঁধায় রোগ সৃষ্টি করতে পারে। এর ফলে বিভিন্ন জটিলতা দেখা দেয়—
অ্যাঞ্জাইনা বা বুকব্যথা: হৃৎপিণ্ডে রক্ত সরবরাহ কমে গেলে বুকের মাঝখানে ব্যথা ও চাপ অনুভূত হয়।
হার্ট অ্যাটাক: কোনো প্লাক ভেঙে রক্তজমাট তৈরি হলে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে হার্ট অ্যাটাক হতে পারে।
স্ট্রোক: মস্তিষ্কে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হলে স্ট্রোকের ঝুঁকি দেখা দেয়, যা জীবনঘাতী হতে পারে।
উচ্চ কোলেস্টেরলের লক্ষণ
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—উচ্চ কোলেস্টেরলের কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ নেই। শুধু রক্ত পরীক্ষা (লিপিড প্রোফাইল) করেই নিশ্চিত হওয়া যায় শরীরে কোলেস্টেরল বেড়েছে কি না। তাই নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা অত্যন্ত জরুরি।
প্রতিরোধই শ্রেষ্ঠ উপায়
জীবনযাত্রায় কয়েকটি সহজ পরিবর্তন উচ্চ কোলেস্টেরল প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে—
তাজা ফল, শাকসবজি, লিন প্রোটিন ও পূর্ণশস্য বেশি খান।
স্যাচুরেটেড ও ট্রান্স ফ্যাট কমান; বদলে মাছ, বাদাম ও জলপাই বা ক্যানোলা তেলের মতো স্বাস্থ্যকর চর্বি নিন।
ওজন নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
প্রতিদিন কমপক্ষে ৩০ মিনিট হাঁটা বা ব্যায়াম করুন।
ধূমপান ও অতিরিক্ত মদ্যপান পরিহার করুন।
প্রয়োজন হলে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ গ্রহণ করুন।
উচ্চ কোলেস্টেরল নীরবে শরীরে ক্ষতি করলেও সচেতন জীবনযাপন, নিয়মিত পরীক্ষা আর স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস আপনাকে সুরক্ষিত রাখতে পারে। নিজের ও পরিবারের সুস্থতার জন্য আজই পরিবর্তন শুরু করা জরুরি।
সূত্র: মায়ো ক্লিনিক


