আমাদের শরীর সুস্থ রাখার জন্য অসংখ্য ভিটামিন ও খনিজের প্রয়োজন হয়। এর মধ্যে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হলো ভিটামিন বি১২ বা কোবালামিন। অনেক সময় ক্লান্তি বা হাত-পা ঝিনঝিন করাকে আমরা সাধারণ সমস্যা মনে করে এড়িয়ে যাই। কিন্তু এটি হতে পারে শরীরে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতির লক্ষণ। সময়মতো চিকিৎসা না করলে এই অভাব শরীর ও মস্তিষ্কের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি করতে পারে।
ভিটামিন বি১২ কী এবং কেন প্রয়োজন?
ভিটামিন বি১২ এমন একটি পুষ্টি উপাদান, যা আমাদের শরীরে লোহিত রক্তকণিকা তৈরি এবং ডিএনএ (কোষের বংশগতি উপাদান) গঠনে সাহায্য করে। এটি আমাদের স্নায়বিক কার্যক্রম স্বাভাবিক রাখতে অপরিহার্য। আমাদের শরীর নিজে থেকে এই ভিটামিন তৈরি করতে পারে না। তাই খাবার বা সাপ্লিমেন্টের মাধ্যমেই আমাদের এই চাহিদা মেটাতে হয়।
একজন পূর্ণ বয়স্ক মানুষের দৈনিক গড়ে ২.৪ মাইক্রোগ্রাম ভিটামিন বি১২ প্রয়োজন। গর্ভবতী বা শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ান এমন মায়েদের ক্ষেত্রে এই চাহিদার পরিমাণ আরও বেশি।
ঘাটতির লক্ষণগুলো কী কী?
ভিটামিন বি১২-এর অভাব হুট করে বোঝা যায় না। এর লক্ষণগুলো প্রকাশ পায় খুব ধীরে। মূলত তিন ধরনের সমস্যা দেখা দিতে পারে:
১. শারীরিক সমস্যা: সারাক্ষণ ক্লান্তি বা দুর্বলতা অনুভব করা। বমি বমি ভাব, ডায়রিয়া, খিদে কমে যাওয়া এবং ওজন কমে যাওয়া। মুখ বা জিহ্বায় ঘা এবং গায়ের রং ফ্যাকাসে হয়ে যাওয়াও এর অন্যতম লক্ষণ।
২. স্নায়বিক সমস্যা: হাত ও পায়ে ঝিনঝিন করা বা অবশ ভাব হওয়া, দৃষ্টিশক্তির সমস্যা, কথা বলতে বা হাঁটতে অসুবিধা হওয়া এবং কোনো কিছু সহজে মনে রাখতে না পারা।
৩. মানসিক সমস্যা: অকারণে বিষণ্ণতা, খিটখিটে মেজাজ এবং আচরণে অস্বাভাবিক পরিবর্তন।
কেন এই ঘাটতি হয়?
ভিটামিন বি১২ মূলত মাছ, মাংস, দুধ ও ডিমের মতো প্রাণিজ খাবারে পাওয়া যায়। তাই যারা কেবল নিরামিষ খাবার (ভেগান বা ভেজিটেরিয়ান) খান, তাদের এই ঘাটতি হওয়ার ঝুঁকি বেশি।
এ ছাড়া গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা, পেটের অপারেশন, অতিরিক্ত অ্যালকোহল সেবন অথবা ক্রোনস ডিজিজ বা সিলিয়াক ডিজিজের মতো রোগের কারণেও শরীর খাবার থেকে ভিটামিন বি১২ শোষণ করতে পারে না। বয়স্ক ব্যক্তিদের (৭৫ বছরের ঊর্ধ্বে) ক্ষেত্রেও শোষণের ক্ষমতা কমে যাওয়ায় এই সমস্যা বেশি দেখা যায়।
চিকিৎসা না করালে ঝুঁকি কতটা?
ভিটামিন বি১২-এর অভাবকে গুরুত্ব না দিলে তা অ্যানিমিয়া বা রক্তাল্পতা তৈরি করে। এর চেয়েও ভয়ংকর হলো এটি স্নায়ুতন্ত্র এবং মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি করতে পারে। দীর্ঘদিনের ঘাটতি থেকে প্যারালাইসিস, স্মৃতিভ্রম, এমনকি মানসিক ভ্রম বা প্যারানয়া পর্যন্ত হতে পারে।
রোগ নির্ণয় ও সমাধান
ওপরে উল্লিখিত লক্ষণগুলো দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শে রক্ত পরীক্ষা (যেমন- CBC বা B12 Test) করানো উচিত। রোগ নির্ণয় হয়ে গেলে এর চিকিৎসা বেশ সহজ। চিকিৎসকরা সাধারণত বি১২ ট্যাবলেট, ইনজেকশন বা নাসাল স্প্রে দিয়ে থাকেন। পাশাপাশি ডায়েটে পরিবর্তন আনার পরামর্শ দেন।
প্রতিরোধে করণীয়
শরীরে এই ভিটামিনের স্বাভাবিক মাত্রা বজায় রাখতে আমাদের সচেতন হতে হবে।
দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় মাছ, মাংস, ডিম ও দুগ্ধজাত খাবার রাখুন।
নিরামিষভোজী হলে ভিটামিন বি১২ যুক্ত সিরিয়াল, পাউরুটি বা চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট গ্রহণ করুন।
অতিরিক্ত মদ্যপান পরিহার করুন এবং গ্যাস্ট্রিকের সমস্যা থাকলে দীর্ঘমেয়াদি ওষুধ সেবনের আগে চিকিৎসকের সঙ্গে কথা বলুন।
সুস্থ-সবল জীবনের জন্য পুষ্টিকর খাবারের কোনো বিকল্প নেই। তাই ছোটখাটো শারীরিক পরিবর্তনকে অবহেলা না করে সচেতন হওয়াই বুদ্ধিমানের কাজ।


