ছোটবেলা থেকেই আমরা বড়দের কাছে একটি কথা শুনে বড় হয়েছি–‘বাইরে থেকে এসে আগে হাত ধুয়ে নাও।’ কিংবা খাওয়ার আগে হাত ধোয়া আমাদের মজ্জাগত অভ্যাস। কিন্তু আমরা কি জানি, কেবল হাত ভেজানোই যথেষ্ট নয়? সঠিক পদ্ধতিতে হাত ধোয়া এবং এর গুরুত্ব বুঝতে পারলে আমরা অনেক বড় বড় অসুখ থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারি।
কেন হাত ধোয়া এত জরুরি?
আমাদের হাত হলো জীবাণু চলাচলের সবচেয়ে বড় মাধ্যম। আমরা যখনই কোনো ময়লা বা জীবাণুযুক্ত পৃষ্ঠ (যেমন- দরজার হ্যান্ডেল, রিকশার হুড বা টাকা) স্পর্শ করি, জীবাণুগুলো আমাদের হাতে চলে আসে। এর পর যখনই আমরা সেই হাত দিয়ে নাক, মুখ বা চোখ স্পর্শ করি, জীবাণুগুলো সহজেই শরীরের ভেতরে ঢুকে পড়ে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত এবং সঠিকভাবে হাত ধোয়ার মাধ্যমে প্রতি তিন জন ডায়রিয়া রোগীর এক জনকে এবং প্রতি পাঁচ জন শ্বাসতন্ত্রের সংক্রমিত রোগীর এক জনকে সুস্থ রাখা সম্ভব। অর্থাৎ কেবল হাত ধোয়ার মাধ্যমেই আমরা অনেক রোগ রুখে দিতে পারি।
হাত ধোয়ার সঠিক ৫টি ধাপ
অনেকেই তাড়াহুড়ো করে হাত ধুয়ে ফেলেন, যা কার্যকর নয়। হাত ধোয়ার ক্ষেত্রে অন্তত ২০ সেকেন্ড সময় নেওয়া উচিত। নিয়মগুলো হলো:
১. হাত ভেজানো: প্রথমে পরিষ্কার পানি দিয়ে দুই হাত ভালো করে ভিজিয়ে নিন। পানি সাবানকে কার্যকরভাবে কাজ করতে সাহায্য করে।
২. সাবান মাখা: সাবান নিয়ে অন্তত ২০ সেকেন্ড ধরে ফেনা তৈরি করুন। হাতের কবজি, আঙুলের ফাঁক, নখের নিচ এবং হাতের উল্টো পিঠ ঘষে ঘষে পরিষ্কার করুন। ঘর্ষণের ফলেই জীবাণু ধ্বংস হয়।
৩. ভালো করে ধোয়া: আবার পরিষ্কার পানি দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলুন যেন কোনো সাবান লেগে না থাকে।
৪. কল বন্ধ করা: হাত ধোয়া শেষে কল বন্ধ করার সময় টিস্যু বা কনুই ব্যবহার করুন, যাতে পরিষ্কার হাতে আবার জীবাণু না লাগে।
৫. হাত শুকানো: হাত ধোয়ার পর পরিষ্কার তোয়ালে বা টিস্যু দিয়ে হাত শুকিয়ে নিন। মনে রাখবেন, ভেজা হাতে জীবাণু দ্রুত ছড়ায়।
কখন অবশ্যই হাত ধোবেন?
দিনের যেকোনো সময় হাত ধোয়া যেতে পারে, তবে নিচের সময়গুলোতে হাত ধোয়া বাধ্যতামূলক:
◉ খাবার: খাবার তৈরির আগে ও পরে এবং খাওয়ার আগে। কাঁচা মাংস বা মাছ ধরার পর অবশ্যই সাবান দিয়ে হাত ধোবেন।
◉ প্রাণী: পোষা প্রাণী বা অন্য কোনো প্রাণীকে স্পর্শ করার পর এবং তাদের খাবার নাড়াচাড়া করলে।
◉ পরিচর্যা: অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করার পর বা শিশুর ডায়াপার পরিবর্তনের পর।
◉ শারীরিক বর্জ্য: হাঁচি, কাশি বা নাক ঝাড়ার পর এবং টয়লেট ব্যবহারের পর।
◉ বাইরে থেকে ফিরলে: গণপরিবহনে যাতায়াত বা বাইরের কাজ শেষে ঘরে ফিরে আগে হাত ধোয়া জরুরি।
অতিরিক্ত হাত ধোয়ার সতর্কতা
সবকিছুরই একটি সীমা থাকা ভালো। খুব বেশি হাত ধুলে ত্বকের প্রাকৃতিক তেল নষ্ট হয়ে হাত খসখসে হয়ে যেতে পারে বা চামড়া ফেটে যেতে পারে। এতে হিতে বিপরীত হওয়ার আশঙ্কা থাকে। তাই হাত ধোয়ার পর ভালো মানের ময়েশ্চারাইজার ব্যবহার করা যেতে পারে।
পরিশেষে, হাত ধোয়া একটি অতি সাধারণ কাজ মনে হলেও এটি আমাদের জীবন রক্ষাকারী অভ্যাস হতে পারে। নিজে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস করুন এবং আপনার পরিবারকেও এ বিষয়ে সচেতন রাখুন। সুস্থ থাকতে পরিচ্ছন্নতার কোনো বিকল্প নেই।
লেখিকা: চিকিৎসক ও গবেষক


