২০২৪ সালের ৫ আগস্ট সরকার পরিবর্তনের পর দেশজুড়ে সংগঠিতভাবে হামলা চালিয়ে মুক্তিযুদ্ধ, ভাষা আন্দোলন ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিবিজড়িত ভাস্কর্য, ম্যুরাল ও স্মৃতিস্তম্ভে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর করা হয়েছে। রাজধানী থেকে বিভাগীয় শহর, সর্বত্র শিল্প-সংস্কৃতির প্রতীকী স্থাপনাগুলোতে আঘাত হানা হয়েছে। দেড় হাজারেরও বেশি ভাস্কর্য-ম্যুরাল ধ্বংস করা হয়েছে। ঘটনার পর এক বছরের বেশি সময় পার হয়েছে। মেরামত করা হয়নি জাতির ক্ষতিগ্রস্ত স্থাপনাগুলো। ইতিহাস ও ঐতিহ্যের ওপর নেমে এসেছে গভীর ‘শোকের ছায়া’।
স্বাধীনতা-সংগ্রামের সঙ্গে জড়িত নানা স্থাপনায় আগুন লাগানো, হাতুড়ি–শাবল দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়া এবং উপড়ে ফেলার বহু ঘটনা ঘটেছে। সরেজমিনে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়- কোথাও ভাস্কর্য মাটির সঙ্গে মিশে গেছে, কোথাও পোড়া অবশেষ পড়ে আছে।
রাজধানীসহ সারা দেশেই একই চিত্র দেখা গেছে। বিভিন্ন সূত্রে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা মহানগর এলাকায় ২০টি স্থানে প্রায় ১৩০টির বেশি ভাস্কর্য, ম্যুরাল এবং রিলিফ ভাস্কর্য নষ্ট করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধুর পূর্ণ অবয়বের কমপক্ষে সাতটি ভাস্কর্য পুরোপুরি ধ্বংস করা হয়েছে। বিভাগের মধ্যে- ঢাকা বিভাগে ২৭৩টি, চট্টগ্রামে ২০৪টি, রাজশাহীতে ১৬৬টি, খুলনায় ৪৭৯টি, বরিশালে ১০০টি, রংপুরে ১২৯টি, সিলেটে ৪৯টি এবং ময়মনসিংহ বিভাগে ৯৫টি ভাস্কর্য-ম্যুরাল ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ অথবা উপড়ে ফেলা হয়েছে। ৬০ জেলায় ধ্বংস হয়েছে প্রায় দেড় হাজারের বেশি ভাস্কর্য-ম্যুরাল ও স্থাপনা। যার অধিকাংশ হামলাই সংঘটিত হয় ২০২৪ সালের ৫, ৬ ও ৭ আগস্ট।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের অন্যতম স্মৃতিবিজড়িত স্থাপনা ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে বঙ্গবন্ধুর বাড়িটিতেও একাধিকবার হামলা চালানো হয়েছে। শুধু ভাঙচুরই নয়, সেখানে জাদুঘরের ভেতরের মূল্যবান সংগ্রহ লুটপাট করা হয়েছে। বাড়ির অভ্যন্তরীণ অংশে আগুন ধরিয়ে তিনতলা অংশ পুরোপুরি পুড়িয়ে ফেলা হয়। পরে বুলডোজার দিয়ে বাড়ির অংশবিশেষ গুঁড়িয়ে দেওয়া।
ধ্বংসস্তূপ স্বাধীনতা জাদুঘর, নেই কোনো উদ্যোগ
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ও বীরত্বগাথা ধারণ করে গড়ে উঠেছে রাজধানীর সোহ্রাওয়ার্দী উদ্যানে ‘স্বাধীনতা জাদুঘর’। তবে গত বছর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সেই জাদুঘরটি এখন কার্যত ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। বাইরে থেকে দেখলে বোঝার উপায় নেই, এর ভেতরে মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি কতখানি অবহেলিত হয়ে পড়ে আছে। একসময় এই জাদুঘরই ছিল বাঙালির বীরত্ব ও সংগ্রামের জীবন্ত দলিল। তরুণ প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের পরিচয় তুলে ধরার এক আধুনিক কেন্দ্র ছিল এই জাদুঘরটি। কিন্তু আজ এটি শুধুই ধ্বংসস্তূপের স্তব্ধ স্মৃতি বহন করছে।
দায়িত্বরত কর্মচারীদের ভাষ্য, জাদুঘরে দর্শনার্থীদের প্রবেশ অনেক আগেই নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এখন শুধু অফিস খোলা রাখার আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দিনের কিছু সময় দরজা খোলা এবং বন্ধ করে রাখা হয়।
জাদুঘরসংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, মুক্তিযুদ্ধের আলোকচিত্র, প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, ট্যাংক-কামানের অংশ, যুদ্ধকালীন অস্ত্র, সংবাদপত্রের কাটিং, বিদেশি সমর্থনের পোস্টার- সব মিলিয়ে স্বাধীনতা জাদুঘর ছিল তরুণ প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানার এক অনন্য কেন্দ্র। এ জাদুঘরে একসময় ১৪৪টির মতো ঐতিহাসিক আলোকচিত্র ঝুলত, যেখানে মুঘল আমল থেকে শুরু করে ১৯৭১ এর বিজয় পর্যন্ত নানা সময়ের প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্বসম্পন্ন ছবি সংরক্ষিত ছিল। সরকার পতনের দিন হামলা ও অগ্নিসংযোগে সেসবের অধিকাংশই পুড়ে ছাই হয়ে গেছে।
মুক্তিযুদ্ধের সময় ব্যবহৃত মুক্তিযোদ্ধাদের চারটি অস্ত্র চুরি হয়ে গেছে। হামলাকারীরা নষ্ট করেছে বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণের বিরল চিত্রাবলি, ২৫ মার্চ কালরাত্রির ভয়াবহতার আলোকচিত্র, ১৬ ডিসেম্বর আত্মসমর্পণের বড় বড় ছবি। এ ছাড়াও জাদুঘরে ছিল পাকিস্তানি কমান্ডার নিয়াজির আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষরের টেবিলের রেপ্লিকা, কামানের অংশসহ বহু দুর্লভ নিদর্শনও আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। যুদ্ধকালীন বিভিন্ন যন্ত্রপাতি ও যান্ত্রিক নিদর্শনে আগুন দেওয়া হয়েছে, চুরিও হয়েছে অনেক।
ঘটনাস্থলে জাদুঘর পুনরুদ্ধার বা পুনর্নির্মাণের কোনো পরিকল্পনার ছাপ দেখা যায়নি। বরং বারবার হামলার চিত্রই ধরা পড়বে যে কারও চোখে। সর্বশেষ ১৩ নভেম্বর ভাঙচুর করা হয়েছে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের টেরাকোটা ভাস্কর্যটিও। যেখানে বঙ্গবন্ধুর ঐতিহাসিক ৭ মার্চের ভাষণের দৃশ্য এবং ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ উক্তিটি খোদাই করা ছিল। পাশাপাশি বাঙালির মুক্তির সনদ ‘ছয় দফা’ সম্পর্কিত খোদাইকর্মটিও ভাঙা হয়েছে। এখনো বিদ্যুৎ সংযোগ পুরোটা দেওয়া হয়নি। মনিটরিং রুম রয়েছে বেহাল। প্রতিদিন অফিস খোলা হলেও ভেতরে কোনো মেরামত বা রক্ষণাবেক্ষণের কাজ হয় না।
অন্তর্বর্তী সরকার দায়িত্ব নেওয়ার দেড় বছর পার হলেও জাদুঘর পুনরুদ্ধার বা পুনর্নির্মাণের দৃশ্যমান পদক্ষেপ দেখা যায়নি। এ বিষয়ে বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর সচিব মো. সাদেকুল ইসলাম খবরের কাগজকে বলেন, ‘স্বাধীনতা জাদুঘর নিয়ে কোনো বাজেট বা পরিকল্পনা এখনো পাস হয়নি। তাই আমি কিছু বলতে পারছি না। স্বাধীনতা জাদুঘর তিনটি মন্ত্রণালয় দেখে। এর মধ্যে মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘর রয়েছে।’ তিনি জানান, এখন জুলাই জাদুঘরের কাজ চলছে। কিছুদিনের মধ্যে কাজ শেষে হবে। সেটি শেষ হলে হয়তো স্বাধীনতা জাদুঘরের উন্নয়নকাজ শুরু হতে পারে।
মুক্তিযুদ্ধের গবেষকদের মতে, এত স্বল্প সময়ে এমন ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ বাংলাদেশের ইতিহাসে নজিরবিহীন। সেখানেই ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ঐতিহাসিক ভাষণ দেন। সেখানেই ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তানি বাহিনী আত্মসমর্পণ করে, জন্ম হয় বাংলাদেশের। গত বছরের ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর যে নৃশংস লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ঘটে, তার সবচেয়ে বড় বলি হয় এই জাদুঘর। দেখে মনে হয় এ যেন সচেতনভাবে একটি জাতির গর্ব মুছে দেওয়ার প্রচেষ্টা।
লেখক ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক গবেষক সালেক খোকন খবরের কাগজকে বলেন, ‘প্রথমত মুক্তিযুদ্ধ তো বাংলাদেশ নামক জাতির শিকড়ের ইতিহাস, স্বাধীনতা অর্জনে লাখো মানুষের আত্মত্যাগ ও বীরত্বের ইতিহাস। সেই ইতিহাস রক্ষা ও প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। সেটি না হওয়া অবশ্যই দুঃখজনক। জাদুঘরগুলো সংস্কারসহ চালু করা উচিত ছিল।’
তিনি বলেন, ‘আমরা বিজয় দিবস ও স্বাধীনতা দিবস পালন করছি। বলছি মহান বিজয় দিবস, বীর মুক্তিযোদ্ধারা এই দেশ স্বাধীন করেছেন। কিন্তু সেটির প্রতিফলন তো বাস্তবে দেখছি না। একটি দেশের রাজনৈতিক মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু দেশ ও দেশের স্বাধীনতার প্রশ্নে তো রাষ্ট্রের অবস্থান অটল ও পরিষ্কার থাকতে হবে। আমরা মনে করি সেটি নিশ্চিত করা জরুরি।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি ‘মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাঙ্গণ’ ভেঙে হচ্ছে ‘গণমিনার’
রাজধানীর বিজয় সরণিতে বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্য ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে সরকার পতনের দিন। চলতি বছরের ২৭ জুন ‘মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাঙ্গণে’ ঢাকার উত্তর সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে ম্যুরাল ঘেরা সাতটি দেয়াল ভেঙে ফেলা হয়। এই দেয়ালগুলোতে ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত সংগ্রামের ইতিহাসের ছিল। ভাস্কর্যে বিভিন্ন চিত্রকর্ম ফুটিয়ে তোলা হয়েছিল। এই ভাঙচুরের পর তাৎক্ষণিকভাবে বিভিন্ন মহল ক্ষোভ প্রকাশ করে এবং সাংস্কৃতিক আক্রমণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানায়। সিটি করপোরেশন থেকে জানানো হয়, বিজয় সরণির ‘মৃত্যুঞ্জয়ী প্রাঙ্গণ’ স্থানে তৈরি হবে জুলাই স্মরণে ‘গণমিনার’।
ঢাবির শতাধিক ভাস্কর্য এখনো ভাঙা
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) ফুলার রোডের ভাস্কর্যসমষ্টি ভাঙচুর করা হয় গত বছর সরকার পরিবর্তনের পর। ভাস্কর শামীম সিকদারের বিখ্যাত ‘স্বাধীনতা সংগ্রাম’ ভাস্কর্যসমষ্টির শতাধিক ভাস্কর্য ভাঙচুর করে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। ভেঙে ফেলা হয়েছে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, লালন, ইয়াসির আরাফাত, জগদীশচন্দ্র বসুসহ বিশ্বখ্যাত সাহিত্যিক, বিজ্ঞানী, বিপ্লবী ও রাজনৈতিক নেতাদের বহু আবক্ষ ভাস্কর্য।
এ বিষয়ে সম্প্রতি মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টা ফারুক-ই-আজম সাংবাদিকদের (বিবিসি) বলেন, ‘অবহেলা মোটেও নেই। সরকারি কাজগুলো যেভাবে ঢিমেতালে হয়, এটা ওই রকমই একটা ব্যাপার আরকি। তবে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক উপদেষ্টার মতে, মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে যে বিতর্ক নানা মহল সৃষ্টি করছে সেগুলো রাজনৈতিক এবং তাদেরকেই এর দায় নিতে হবে।’
এদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক মহিউদ্দিন আহমদ মনে করেন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতা ও ইতিহাস নিয়ে প্রতিটি সরকার রাজনীতি করেছে। এ ক্ষেত্রে অন্তর্বর্তী সরকার ‘একটা দোদুল্যমান’ অবস্থায় আছে।