হাইকু সিঁড়ি- পাহাড়ের গায়ে নির্মিত এক খাড়া সিঁড়ি। হাজার হাজার ধাপবিশিষ্ট খাড়া হাইকিং ট্রেইল। পৃথিবীর বিস্ময়কর জিনিসগুলোর মধ্যে এটি একটি। অনেকে এর নাম দিয়েছেন ‘স্বর্গের সিঁড়ি’। পাহাড়ের গায়ে ওঠা এ সিঁড়ি বেয়ে উঠলে দেখা মিলবে তুলার মতো মেঘ। এ সিঁড়ি আছে যুক্তরাষ্ট্রের হাওয়াই দ্বীপে।
প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে সূর্য ওঠার সঙ্গে সঙ্গে, হাওয়াইয়ের কো’ওলাউ পর্বতমালার পান্না শৈলশিরা বেয়ে একটি সরু ইস্পাতের সিঁড়ি উঠে কুয়াশায় মিলিয়ে যায়। হাইকু সিঁড়ি বা ‘স্বর্গের সিঁড়ি’ নামে পরিচত এ নিষিদ্ধ পথটি বিশ্বব্যাপী অভিযাত্রীদের হৃদয় এবং ইনস্টাগ্রাম ফিড কেড়ে নিয়েছে। যারা এখানে আরোহণ করেছেন, তারা তাদের অভিজ্ঞতাকে অবিশ্বাস্য, অবাস্তব বলে বর্ণনা করেছেন।
হাওয়াইয়ের এ খাড়া সিঁড়ি হাইকিং ট্রেইলের জন্য পর্যটকরা ব্যবহার করলেও আদতে এটি পর্যটকদের জন্য তৈরি করা হয়নি। বর্তমানে এখানে ওঠা বা আরোহণ করা নিষিদ্ধ। কেননা, এতে আছে ৩ হাজার ৯২২টি সিঁড়ির ধাপ। যা প্রায় ২ হাজার ৮০০ ফুট উঁচু! এসব সিঁড়ি ধাতব এবং পাহাড়ের গায়ে আটকানো।
নিষিদ্ধ এ হাইকিং ট্রেইল তৈরি করা হয়েছিল ১৯৪২ সালে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন নৌবাহিনী তৈরি করেছিল এই সিঁড়ি। যখন যুদ্ধের তীব্রতা বেড়ে যায় তখন মার্কিন নৌবাহিনী হাইকু নামে একটি রেডিও স্টেশন নির্মাণ শুরু করে, এটি একটি গোপন স্থাপনা যা তখন প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে পরিচালিত মার্কিন নৌবাহিনীর জাহাজগুলোতে রেডিও সংকেত পাঠানোর জন্য ব্যবহৃত হতো। অ্যান্টেনার প্রয়োজনীয় উচ্চতার জন্য এ ট্রেইল ব্যবহার করা হয়েছিল। মূল কাঠের সিঁড়িগুলো ইঞ্জিনিয়ারদের প্রশান্ত মহাসাগরজুড়ে সংকেত পাঠানোর জন্য ব্যবহৃত যোগাযোগ সরঞ্জামগুলোতে অ্যাক্সেস দিয়েছিল। ধাতব সিঁড়ির পাশে কাঠের সিঁড়ির কিছু অবশিষ্টাংশ এখনো দেখা যায়।
রেডিও স্টেশনটি ১৯৪৩ সালে চালু হয়। এতে শক্তিশালী সংকেত পাঠানোর জন্য, সেই সময়ে মার্কিন নৌবাহিনীর ভ্যাকুয়াম টিউব প্রযুক্তির সাহায্যে সাধারণের চেয়েও বেশি ক্ষমতাসম্পন্ন ট্রান্সমিটারের প্রয়োজন ছিল।
১৯৫০ সালের মধ্যে হাইকু ট্রেইলটি টেকসই ধাতব সিঁড়ি দিয়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছিল- যার মধ্যে ৩ হাজার ৯২২টি সিঁড়ির ধাপ ছিল। যা পাহাড়ের গায়ে দৃঢ়ভাবে আটকানো হয়েছিল। নৌবাহিনীর স্টেশনটি বাতিল করার পর, সিঁড়িগুলো জনসাধারণের জন্য সংক্ষিপ্তভাবে উন্মুক্ত করা হয়েছিল। তবে নিরাপত্তার কারণে ১৯৮৭ সালে এটি বন্ধ করে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু পর্বত আরোহীরা এতে আরোহণ বন্ধ করেনি। সাহসী পর্যটকরা বারবার এখানে আরোহণের জন্য আসে।

গত দুই দশকেরও বেশি সময় ধরে, বিশ্বজুড়ে রোমাঞ্চপ্রেমীরা ‘অনুপ্রবেশ নিষিদ্ধ’ উপেক্ষা করে আবাসিক এলাকা ভেদ করে হাইকু সিঁড়ির গোড়ায় পৌঁছাচ্ছেন। তারা পুলিশি পাহারা এড়াতে অন্ধকারের আড়ালে হাইকিং করেন। শুধু মেঘের ওপরে সূর্যোদয় দেখার আশায় সেখানে আরোহণ করেন। যেখানে তাদের পায়ের নিচে কুয়াশা বিছানো থাকে এবং নিচে বিস্তৃত সমুদ্র দেখা যায়।
এই পাহাড়ে হাইকিং অত্যন্ত খাড়া, পিচ্ছিল, খোলামেলা ও বিপজ্জনক। তবুও এটি যেন নিষিদ্ধ আকর্ষণ। প্রায়ই এখানে উদ্ধারকাজের প্রয়োজন হয়। ফলে হাজার হাজার ডলার খরচ হয়। বছরের পর বছর ধরে আইনি বিতর্কের পর হনোলুলু সিটি কাউন্সিল ২০২১ সালে সিঁড়িটি অপসারণের পক্ষে ভোট দেয়, যার জন্য ২.৫ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দ করা হয়। ২০২৫ সালে এই কিংবদন্তি সিঁড়িটি ভেঙে ফেলার কাজ শুরু হয়। কিন্তু ১২ জুন, ২০২৫ সালে অলাভজনক সংস্থা ‘ফ্রেন্ডস অব হাইকু স্টেয়ার্স’ হাইকু সিঁড়ি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত প্রত্যাহারের জন্য একটি মামলা করে।
এটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্তে বিশ্বব্যাপী সমালোচনার ঝড় ওঠে । অনেকে মনে করেন এটি পরিবেশবান্ধব ও নিরাপদ পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা যায়।
তারেক
.jpg)
.jpg)